শহর ছেড়ে গ্রামে বাস সবাই বলে সর্বনাশ

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১১:৩০ এএম, ০৯ ডিসেম্বর ২০২১

গ্রাম ছেড়ে শহরে বাস, দেশ ছেড়ে বিদেশে বাস, এটা নতুন কিছু না। যুগে যুগে মানুষ জাতি এবং পশুপাখি প্রয়োজনের তাগিদে পরিবার, সমাজ এব দেশ ছেড়ে দূরপরবাসে পাড়ি দিয়েছে/দিচ্ছে। পাখিরা সাধারণত খাবারের সন্ধানে আর মানুষ জাতি ভালো সুযোগের সন্ধানে বা গুড ট্যু বেটার লাইফ পেতে এ কাজটি করে। আমি যেমন সেই চল্লিশ বছর আগে দেশে ছেড়ে বিদেশে এসেছি নতুন কিছু জানা, শেখা এবং শেয়ার করার জন্য।

প্রশ্ন হতে পারে আমি নিজ দেশ ছেড়ে বিদেশে এসে কি ভালো আছি, সুখে আছি? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে ভালো বা সুখে থাকার ওপর একটু বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রথমতো ভালো বা সুখে থাকা এটা ব্যক্তিকেদ্রিক, এটা একেক জনের কাছে একেক রকম। দ্বিতীয়তো যদি তুলনা করি যারা আমার সমবয়সী এবং আজীবন নিজ দেশে আছে তাদের সঙ্গে, তবে দেখা যাবে হয়তো অর্থে-পার্থক্যে থাকতে পারে।

যদিও আমি মনে করি ভালো বা সুখি থাকতে খুব একটা বেশি কিছুর দরকার পড়ে না যদি চাহিদা সারাক্ষণ দৌড়ের ওপর না রাখে এবং যদি কারও সঙ্গে কারও তুলনা না করা হয়। সত্যি কথা বলতে মানুষ জাতি ভেতরে ভেতরে প্রতিযোগিতা পছন্দ করে আর সেই পছন্দের কারণে তুলনা করাটা অভ্যাসে পরিণত হয়, যার ফলে কথায় বলে ‘সুখে থাকলেও মাঝে মধ্যে ভুতে কিলায়’।

তারপর আমাদের মধ্যে রয়েছে অনুভূতি, যেমন আমরা হাসতে পারি, কাঁদতে পারি। আমাদের মধ্যে রয়েছে লোভ, লালসা কামনা, বাসনা ইত্যাদি। সব মিলে ভিষণ কঠিন ব্যাপার সতন্ত্রভাবে জীবন যাপন করা।

ভালো এবং সুখ কি? এর উত্তর বরং এভাবে দেওয়া যেতে পারে। আমি ইচ্ছে করলে সৃজনশীলভাবে যা করার বা যা দরকার সেটা করতে বা পেতে পারি, সে সামর্থ্য আমার রয়েছে। ইচ্ছে হলে যেখানে খুশি যেতে পারি, যা কিছু খেতে মন চাই, তা খেতে পারি। ফলে বলতে পারি ভালো না থাকলে দূরপরবাসে এত বছর বসবাস করা সম্ভব হতো না। ভালো আছি, সুখে আছি এগুলো না বলে বরং বলা যেতে পারে “I have chosen my choice and I have control over my choices.”

তাহলে বলা যেতে পারে চয়েজ বা পছন্দ একটি সুন্দর শব্দ। পছন্দ যতক্ষণ আওতাধীন ততক্ষণ যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। এই যেতে পারার নাম চেঞ্জ বা পরিবর্তন। সেটা হতে পারে যেমন জীবনের পরিবর্তন। জীবনের পরিবর্তন ঘটাতে একদিন যেমন নিজ দেশ ছেড়ে দূর-পরবাসে এসেছিলাম এবার ঠিক সেই জীবনের পরিবর্তনের জন্য সুইডেনের শহর ছেড়ে গ্রামে বসবাস শুরু করেছি।

অনেকে অবাক হয়েছে, অনেকে প্রশ্ন করেছে, কী কারণে আমি শহর ছেড়ে গ্রামে বসবাস শুরু করলাম ইত্যাদি। আসুন জানা যাক কিছু অপ্রিয় সত্য তথ্য। আমরা সবাই এখন গুগলের ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (দি ওয়েব) এর সঙ্গে খুব ভালোভাবে যুক্ত। হিন্দু, মুসলিম, বৌধ্য, খ্রিস্টান, জাত, অজাত, শিক্ষিত, অশিক্ষিত ঘুষখোর, ধর্ষক, দুর্নীতিবাজ, ধান্দাবাজ যাই বলি না কেন, মত, দ্বিমত যাই থাকুক না কেন, কিছু যাই আসে না। আশ্চর্য এত ঘৃণা একে অপরকে, তারপরও ব্যবহারিক দিক দিয়ে একই জিনিস দেদারছে ব্যবহার চলছে।

ঘটনা কি? কেউ কি আমাকে এর একটি সঠিক উত্তর দিতে পারবে? যাইহোক আমরা হয়তো এখনও ভালোভাবে বাংলাদেশের অবকাঠামো বা পরিকাঠামো করতে পারিনি। তবে বিশ্ব পরিকাঠামোর সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে শুরু করেছি গুগল তারই একটি উদাহরণ।

আমি সুইডেনে থাকি। এখানে রাজার যে সুযোগ-সুবিধা রয়েছে আমারও ঠিক শতভাগ না হলেও প্রায় সমপরিমাণ সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এখানে গ্রাম বা শহর বলে কথা নেই, সব কিছুই সব জায়গাতে বিরাজমান। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো, শিক্ষা, চিকিৎসা বিলাসিতাসহ সবধরনের সুযোগ থাকার কারণে শহর ছেড়ে গ্রামে বসবাস। ঘরে বসে অফিস করা, স্কুল করা থেকে শুরু করে বেশিরভাগ কাজ করার ব্যবস্থা রয়েছে। এত সব সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্তেও অনেকে এখনও শহরকেন্দ্রিক কারণ সেটা তাদের ব্যক্তিগত চয়েজ।

এবার চলুন কিছুক্ষণের জন্য ভাবনার জগত থেকে ঘুরে আসি। মনে করুন আপনি ঢাকা শহরের একটি বস্তি এলাকায় বসবাস করছেন। নুন আনতে পানতা থাকে না, এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে জীবন চলছে। সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই, ঘরে খাবার নেই। গ্রামে থাকার জায়গা নেই, শুধু নেই আর নেই। হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে রাত পোহাতেই দেখতে পেলেন বাংলাদেশের সব কিছুর সঙ্গে সুইডেনের জীবন ব্যবস্থার যে বর্ণনা দিয়েছি, হুবহু মিল।

কি করবেন তখন? বাংলাদেশের ৫৫১২৬ বর্গ মাইলের যেকোনো জায়গা বসবাস করতে চাইবেন। কারণ দেশের পরিকাঠামো, দেশের মানুষের মধ্যে কোন কোন পার্থক্য নেই। উপরের ভাবনকে বাস্তবে রূপ দিতে পারলে বাংলাদেশ সোনার বাংলা হবে। এই কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে সবাই বলবে আমাকে আমার মাথায় সমস্যা আছে। এটা জীবনেও হবে না।

ছোট বেলায় পড়েছিলাম ‘পারিবো না এ কথাটি বলিবো না আর একবারে না পারিলে দেখ শতবার’। আমরা একবারও এখন পর্যন্ত সেই চেষ্টাটিই করিনি অথচ সবাই বলবে সম্ভব নয়। সুইডেন ঠাণ্ডা বরফের দেশ, তারপর পাহাড় আর জঙ্গল ভরা, তারা যদি পারে শহর ছেড়ে গ্রামে বাস করতে, তাদের দেশে যদি লাউ গাছে লাউ ধরাতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ কেন সুইডেনের মতো হতে পারবে না? খুব জানতে ইচ্ছে করে!

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

এমআরএম/এএসএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]