কায়রোর পথে পথে অসহায় তানিয়ার সেইসব দিন

প্রবাস ডেস্ক
প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭:৩০ পিএম, ১০ জানুয়ারি ২০২২

মিশরের রাজধানী কায়রোর মুনিব বাস টার্মিনালের শৌচাগারের ফটকে দুই শিশুসন্তানসহ বসা ছিলেন বাংলাদেশি প্রবাসী তানিয়া। মানসিক ভারসাম্যহীন এ নারীর মুখের দিকে তাকিয়েই মনে হবে তিনি ভীষণ ক্ষুধার্ত। বিদেশ বিভুঁইয়ে কারও সঙ্গে তেমন কথাও বলছেন না। কেউ বিরক্ত করলে তেড়ে আসছেন। কিছু খেতে দিলে নিজে না খেয়ে তুলে দিচ্ছিলেন কোলের দুই সন্তানের মুখে।

তানিয়ার এ করুণ দশার নেপথ্যের গল্পটা কী? কেনইবা তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দুই সন্তান নিয়ে পথে পথে ঘুরছেন?

জানা যায়, গত ২৩ ডিসেম্বর স্থানীয় সময় রাত ৯টায় একটি পুলিশ ভ্যানে করে দুই শিশুসন্তানসহ তানিয়াকে কায়রোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে রেখে চলে যায় পুলিশের একটি টিম। খবর পেয়ে দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) ইসমাঈল হোসেন সেখানে গিয়ে তানিয়া ও তার সন্তানদের উদ্ধার করে দূতাবাসের বেসমেন্টের একটি রুমে নিয়ে আশ্রয় দেন।

এরপর কিছু খাবার ও পানীয় দিয়ে ইসমাঈল হোসেন তানিয়ার কাছে জানার চেষ্টা করেন, তার এ অবস্থার কারণ এবং স্বামীর হদিস। কিন্তু কোনো প্রশ্নেরই সঠিক উত্তর না দিয়ে অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা বলতে থাকেন ওই প্রবাসী নারী। পরদিন ২৪ ডিসেম্বর মা ও দুই শিশুসন্তানের জন্য শীতের কাপড়, কম্বল, শুকনো খাবার কিনে দিয়ে দুদিন তাদের দূতাবাসের নিচতলার সেই রুমেই রাখা হয়।

দাপ্তরিক কাজে বিঘ্ন ঘটাতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে ২৬ ডিসেম্বর তানিয়া ও তার দুই সন্তানকে দূতাবাস এলাকার আরব ঈল মা'দী নামক স্থানে প্রবাসী এক নারীর কাছে রাখা হয়। এরপরই দূতাবাসের শ্রম বিভাগ তানিয়ার বিষয়ে মিশর সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে।

mishor1

এরই মধ্যে ২৮ ডিসেম্বর তানিয়াকে আশ্রয় দেওয়া সেই প্রবাসী নারী দূতাবাসে টেলিফোন করে জানান, তানিয়া ও তার দুই সন্তানকে তার বাসায় রাখা সম্ভব নয়। কারণ হিসেবে তিনি জানান, মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় তানিয়া বাসা নোংরা ও কাপড়-অলঙ্কার নষ্ট করেন, আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন, পুরো ঘর এলোমেলো করেন। কেউ বাসায় এলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। তাই তিনি তানিয়া ও তার দুই সন্তানকে অন্যত্র স্থানান্তর করতে দূতাবাসকে অনুরোধ করেন।

তানিয়ার মানসিক অবস্থার ক্রমাবনতি হওয়ায় প্রথম সচিব (শ্রম) ইসমাঈল হোসেন বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে কায়রো বিমানবন্দরের কাছে মার্গ এলাকায় একটি খালি বাসার সন্ধান পান। মার্গের বাংলাদেশি ব্যবসায়ী নূর নবীর সঙ্গে কথা বলে তানিয়া ও তার দুই সন্তানকে শ্রম কল্যাণ বিভাগের গাড়িতে সেই বাসায় রেখে আসেন।

ইসমাঈল হোসেন জাগো নিউজকে জানান, কায়রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারেন, গত ২০ ডিসেম্বর স্বামী-সন্তানসহ চারজন মিশর থেকে বাংলাদেশে যাওয়ার লক্ষে কায়রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যান। রেড লিস্টে থাকার অভিযোগে বিমানবন্দরে পুলিশ আল-আমিন নামে একজন বাংলাদেশি প্রবাসীকে আটক করে। সেই আল-আমিনই তানিয়ার স্বামী। পুলিশ তানিয়া ও দুই সন্তানকে বাংলাদেশে পাঠাতে চাইলেও মানসিকভাবে অসুস্থ তানিয়ে দেশে ফিরতে অপারগতা জানান এবং বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। সেই থেকে দুই শিশু নিয়ে পথে পথে কাটছে তানিয়ার দিনরাত।

মিশর জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা থেকে ছাড়পত্র পাওয়া গেলে তানিয়ার স্বামী আল-আমিন বাংলাদেশে ফেরার অনুমতি পাবেন বলে জানিয়েছে কায়রো ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ।

আল-আমিন মিশরের বন্দর নগরী আলেক্সান্দ্রিয়ার পোশাক শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। মিশরের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগসহ দেশটির বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় কায়রোস্থ নুজহাত আদালতের রায়ে ছাড়া পান তিনি। পরে পুরো পরিবারকে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে বলা হলে তাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে দূতাবাসকে অনুরোধ করেন আল-আমিন।

এরপর আদালতের অনুমতিতে ও বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় গতকাল রোববার (৯ জানুয়ারি) স্ত্রী তানিয়া ও দুই সন্তানকে নিয়ে বিমানযোগে বাংলাদেশের উদ্দেশে মিশর ত্যাগ করেন আল-আমিন। ওইদিন বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পৌঁছান তারা। এরপর সেখান থেকে যান চাঁদপুরের মতলব উপজেলার সারে পাঁছানী গ্রামে নিজ বাড়িতে। ওই গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আল-আমিন।

এমকেআর/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]