স্রোতে গা ভাসাবেন না!

মো. ইয়াকুব আলী
মো. ইয়াকুব আলী মো. ইয়াকুব আলী
প্রকাশিত: ০৪:৪৯ পিএম, ২৮ জানুয়ারি ২০২২
ছবি: সংগৃহীত

যদি কোনো কিছু আপনার সামর্থ্যের বাইরে হয় সেটা করতে না যাওয়ায় ভালো। সোজা কথায় সেটা করতে যাওয়া নেহায়েৎ বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। এতে জীবনের ঝুঁকি পর্যন্ত হতে পারে। ২৬ শে জানুয়ারি অস্ট্রেলিয়া ডে উপলক্ষে আমরা সপরিবারে গিয়েছিলাম ওয়াটামলা সৈকতে।

ওয়াটামলা আমাদের খুবই পছন্দের একটা জায়গা। ওখানে মূল সৈকতের পাশের ক্রিকটাতে বাচ্চাদের ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায়। এই হ্রদটার পাশেই পাথরের উঁচু পাহাড়। সেখান থেকে দামাল ছেলেমেয়েরা ক্রিকের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে অহর্নিশি।

আমিও ওখানে গেলেই উঁচু পাথর থেকে ঝাঁপ দিয়ে পানিতে পড়ি। এই অনুভূতির কোনো তুলনা নেই। জীবনকে অনেকভাবেই উপভোগ করা যায় তবে সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে হাতের নাগালে প্রাপ্ত সুবিধাগুলোর সদ্ব্যবহার করা। ছোটবেলায় আমরা পুকুরের পাড়ের শানবাঁধানো ঘাট থেকে পানিতে লাফ দিতাম। পুকুরের পাশে বন্ধুদের বাড়ির ছাদ থেকেও পানিতে লাফ দেওয়া হতো।

এমনকি পুকুরের পাড়ের গাছ থেকেও পানিতে লাফিয়ে পড়তাম আমরা। আমাদের জ্বালায় পুকুরের পানিতে বাঁশের পুরো আগাটা কঞ্চিসহ ফেলে রাখা হতো কিন্তু কোনো বাধায় আমাদের পানিতে লাফ দেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারতো না।

যাইহোক। এর আগেও ওয়াটামলা গিয়ে জাম্পিং রক থেকে একাধিকবার লাফ দিয়েছি।

আমার মতো সবাই লাফ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে উপরে যায় ঠিকই কিন্তু যাওয়ার পর গভীরতা দেখে অনেকেই পিছু হঁটে। আবার অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখে দেখে সাহস সঞ্চয় করে হয়তোবা কোনোমতে একবার লাফ দেয়। আমিও সেদিন গিয়ে কয়েকবার লাফ দেওয়ার পর দেখি একজন পাকিস্তানি ছেলে যার সঙ্গে আমি কেলোগসে ঝাড়ুদারের কাজ করতাম।

সেও লাফ দেওয়ার অপেক্ষায়। আমি যা করি সবসময় তাই করলাম। তাকে অনেক উৎসাহ দিলাম লাফ দেওয়ার জন্য কিন্তু সে রাজি হলো না। এরই মধ্যে আমি আরও দু’বার লাফ দিয়ে ফেলেছি।

এরপর যখন আবার উপরে গেছি তখন দেখলাম সে তার বন্ধুর সাহায্যে একেবারে নিচের পাথরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি উপর থেকে লাফ দেওয়ার কিছুক্ষণ পরেই সে নিচের পাথর থেকে লাফ দিলো। কিন্তু লাফ দেওয়ার পর পানিতে তার নড়াচড়া দেখেই আমার কেমন জানি সন্দেহ হলো সে সাঁতার জানে না।

আমি দ্রুত সাঁতার কেটে তার কাছে গেলাম। ততক্ষণে তার বন্ধুও নিচের পাথর থেকে লাফ দিয়ে তার কাছে গেছে। আমি তার কাছে যেতে যেতেই ভাবছিলাম যে আমি তো তাকে ধরে রাখতে পারবো না। কিছু একটা দরকার যেটার সাহায্যে সে ভেসে থাকতে পারে।

পাশেই একটা বড় বল ভাসতে দেখে তাকে দিলাম কিন্তু ভয়ে সেটা সে আর ধরতে পারলো না। আমি একেবারে ওর কাছে গেলে ও আমাকে জড়িয়ে ধরে ভেসে থাকার চেষ্টা করতে চাইলো কিন্তু ওর ভারে আমি ডুবে যাচ্ছিলাম তাই ওকে আমি ছেড়ে দিলাম।

এরপর অনেক জোরে জোরে ‘হেল্প হেল্প’ বলে চিৎকার করলাম কিন্তু লাইফগার্ডের দেখা পেলাম না। আমারও দম ফুরিয়ে আসছিলো তাই আমি বাধ্য হয়ে নিচের পাথর কোনোমতে ধরে একটু নিঃশ্বাস নিয়ে নিলাম। এরপর কোনোমতে ওর বন্ধু ওকে একটু কম গভীরতায় নিয়ে গেছে।

আমি তার কাছে গিয়ে বললাম তুমি সাঁতার জানো না? উত্তরে সে বললো না আমি সাঁতার জানি না। বললাম তুমি এই কথা আমাদের আগে বলোনি কেন? আজই বাসায় গিয়ে সাঁতার প্রশিক্ষণে ভর্তি হয়ে যাবে। তারপর আমাদের কাছে রাখা জুস আর বিস্কিট খেতে দিলাম ওকে এবং ওর বন্ধুকে।

ও বললো আমার পাকস্থলি পানি দিয়ে ভর্তি। বললাম হোক তবুও খাও, ফুড ইজ দ্য বেস্ট মেডিসিন। এরপর আমি আবার ষষ্ঠ বারের মতো লাফ দেওয়ার জন্য উপরে উঠলাম। ততক্ষণে পুলিশ চলে এসেছিলো তাই আমাদের আর লাফ দেয়া হলো না।

ওয়াটামলাতে লাফ দিতে গিয়ে প্রতি বছরই কেউ না কেউ মারা যায়। বিভিন্ন কারণেই সেটা হতে পারে কিন্তু সাঁতার না জেনে লাফ দিতে যাওয়ার মতো বোকামি আর নেই। তাই অন্যের কোথায় স্রোতে না গা না ভাসিয়ে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করা উচিত।

এমআরএম/এএসএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]