একটি শীতল পাটির গল্প

মো. ইয়াকুব আলী
মো. ইয়াকুব আলী মো. ইয়াকুব আলী
প্রকাশিত: ১২:৪৬ পিএম, ২৯ জানুয়ারি ২০২২

যদি কিন্তুর মারপ্যাঁচে আটকেপড়া জীবনে গল্পের বই অনেক বিশ্বস্ত সঙ্গী। অবশ্য নিরবচ্ছিন্ন পড়ার মধ্যে বাগড়া দিয়ে বসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নামের মানুষকে অসামাজিক বানানোর অব্যর্থ অস্ত্র। তবে এই কালো থাবা বই পড়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি একটা শীতল পাটির কারণে।

ঘরে বসে আউট বই পড়ার চেয়ে গাছের ছায়ায় শীতল পাটি বিছিয়ে পড়লে বই পড়ার আনন্দ বহুগুণে বেড়ে যায়। ঢাকা শহর থেকে সবুজ দিনে দিনে বিদায় নিচ্ছে। সেই জায়গাটা দখল করে নিচ্ছে কংক্রিটের জংগল। আগে উত্তর খান থেকে গুলশানে অফিস যাওয়ার পথে অনেক সবুজ দেখতাম। বিশেষ করে উত্তরা আসার পথে এয়ারপোর্টের আগে একটা বিশাল সবুজ বনানী ছিলো। এবার এসে দেখি সেখানে এয়ারপোর্ট পরিবর্ধনের কাজ চলছে।

আর উত্তর খানে আগে সব ঋতুতে প্রায় সব রকমের ফসলের আবাদ হতো। এমনকি খেজুরের রস, তালের রস পর্যন্ত পাওয়া যেতো। নগরায়নের কালো থাবায় এখন সেখানেও কংক্রিটের জংগল। দৃষ্টি বেশি দূর যেতে পারে না। ঢাকার মধ্যে এখন খালি জায়গা বলতে এই উত্তর খানই যেটুকু আছে। শিক্ষিত লোভী মানুষেরা তাই এখানে হানা দিয়েছে।

যাইহোক শীতল পাটির কাছে ফিরে আসি। ঘরের মধ্যে তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে বাইরের চেয়ে কম তাই পাটিটা নিয়ে ছাদে বিছিয়ে দিয়ে বই হাতে নিয়ে শুয়ে পড়ি। শীতের নিস্প্রভ সূর্যের মিষ্টি আলো গায়ে এসে পড়ে শরীরের আড়মোড়া কাটিয়ে দেয়। আর হাত দিয়ে চোখটাকে আড়াল করলেই আর চোখ খুলে বই পড়তে সমস্যা হয় না। বাসার পাশে অনেকগুলো জায়গায় ইমারত নির্মাণের কাজ চলছে।

সারাদিন হাতুড়ি, কাঠ, পেরেক, রডের শব্দ। সেগুলোকে ছাপিয়ে মাঝে মধ্যে কানে আসে শ্রমিকের কণ্ঠে বাউল বা লালন গীতি। আর আশপাশের বিভিন্ন ছাদে বিভিন্ন রকমের দৃশ্য মনটাকে একঘেয়েমিতে আটকে পড়তে দেয় না। কোন ছাদে পায়রা উড়ছে। কোন ছাদে শিশু দৌড়াচ্ছে। আবার কোন ছাদে আমার মতোই বিলাসী মন নিয়ে কেউ কেউ রোদ পোহাচ্ছে। আর আছে ছাড়া ছাড়া সবুজ। সবুজকে ধ্বংস করার মাসুল দিচ্ছে মানুষ ছাদে সবুজের ছিটেফোঁটা সমারোহ করে।

তবে সবচেয়ে উপভোগ্য বিষয় হচ্ছে পাখিদের সঙ্গ। দোয়েল, বুলবুলি, ফিঙে, শালিক, ধান শালিক, চড়ুই, টুনটুনিসহ আরও কয়েক প্রকারের নাম না জানা পাখি। আর না মানা মেহমান হিসেবে আছে কাক। মাঝে মধ্যে দূর আকাশে চিলেরও দেখা পাওয়া যায়। আর কদাচিৎ দেখা পাওয়া যায় সুইচোরা পাখির। আমি অবাক বিস্ময়ে ভাবি এই পাখি কিভাবে সারাক্ষণ উড়ে বেড়ায়।

এরা খায়ই বা কখন? আর বিশ্রাম নেয়ই বা কখন। দোয়েলগুলো অবিরাম শিস দিয়ে যায়। তাদের শিসের তীব্রতা এতোই তীব্র যে দূরের কোনো জায়গায় বসে শিস দিলেও শুনতে পাওয়া যায়। বুলবুলিও ডেকে চলে অবিরাম। সেই তুলনায় ফিঙের সংখ্যা কম। আর চড়ুই আছে সারাক্ষণই। পুরুষ চড়ুই স্ত্রী চড়ুই মিলে বাসা তৈরির উপকরণ সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছে।

পাখিগুলো কখনও জোড়ায় জোড়ায় আবার কখনও দলবেঁধেও আসে। টুনটুনি আসে হঠাৎ হঠাৎ। এসে পেয়ারা, সফেদা, লেবু পাতার ফাঁকে নেচে বেড়ায় আর মিষ্টি সুরে ডাকে। ছবি তুলতে গেলেই ফুড়ুৎ। আর ছাদের বাইরের অংশে যেখান দিয়ে গোসলখানার পাইপগুলো উঠে গেছে সেখানে আশ্রয় নিয়েছে একজোড়া চামচিকা। তাহিয়া প্রথম দেখেছিলো। সন্ধ্যা হবার সঙ্গে সঙ্গে তারা বেরিয়ে পড়ে।

বাসার সামনের কোণাকুণি খোলা জায়গায় সকাল-বিকাল শিশু-কিশোরেরা এসে ক্রিকেট খেলায় মেতে উঠে। তার পাশের জায়গাটায় দুটো ছাগল গোছড় দেওয়া থাকে সারাদিন। তার পাশেই পুকুরের মধ্যে আটটা হাস চড়ে বেড়ায়। আর আছে এক দঙ্গল বেওয়ারিশ কুকুর এবং তাদের একগাদা কুকুরছানা। তাদের খেলাধুলা চলে সারাদিন। খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে গেলে রোদ পড়ে এমন জায়গা দেখে বালিতে গা এলিয়ে শুয়ে পড়ে। তার পাশেই কলা গাছের একটা ছোট জঙ্গল।

সেখানে এক কাধি কলা ধরেছে। আর তার মাথায় ঝুলছে লাল রঙের মোচা। একটু দূরের একটা কদম গাছ দাঁড়িয়ে আছে সঙ্গীহীন। পূর্ব পাশের বাসাটার মধ্যে এখনো একটা গ্রামীণ পরিবেশ বিদ্যমান। এতটুকু জায়গার মধ্যে ডুমুর, বড়োই, চালতা, পেয়ারা, সাজনা, আমের একাধিক গাছ আছে। তার মধ্যে আবার সবজির জন্য লাগানো হয়েছে শিম, মৌলভী কচু। ডুমুর গাছের সারা শরীরে গুটি বসন্তের মতো ডুমুর ধরে আছে।

বড়োই গাছে এসেছে বড়োই। চালতা গাছে ঝুলছে চালতা। আম আর সাজনা গাছে ফুল এসেছে। অবশ্য সাজনা গাছে গত মৌসুমের কয়েকটা পাকা সাজনাও ঝুলছে। পেয়ারা গাছের বাড় অনুযায়ী ফলের দেখা নেই।

শীতল পাটিতে শুয়ে বই পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে গেলে এই দৃশ্যগুলো দেখি। একই দৃশ্য প্রতিদিন দেখি কিন্তু একঘেয়ে বা বিরক্তিকর লাগে না। আবার ফিরে এসে বই নিয়ে বসি। এভাবে পড়তে পড়তে গত এক সপ্তাহে এই তিনটা বই পড়া শেষ করেছি। সবার আগে শুরু করেছিলাম রূপসী বাংলা কিন্তু কবিতা আমি কম বুঝি। তাই একই কবিতা বহুবার পড়তে হয়। তাই এই বইটা শেষ হয়েছে সবার পরে।

এর মাঝেই শেষ করে ফেলেছি রূপকথার বইটা। আর সবচেয়ে কম সময়ে শেষ করেছি সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের বইটা। রিভিউ লেখার পরিকল্পনা আছে। যাইহোক এ সবই সম্ভব হয়েছে শীতল পাটিটার কারণে। শৈশবের খেজুরের পাটির জায়গা নিয়েছে বর্তমান কালের প্লাস্টিকের পাটি কিন্তু এতে করে পাটির চরিত্র বদলে যায়নি।

এখনো মনের মধ্যে সেই একই আবেদন রয়ে গেছে। শীতল পাটিগুলো হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকুক আমাদের জীবনে। আর কিছুক্ষণের জন্য হলেও আমাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যাক আটপৌরে আনন্দের ক্ষণে।

এমআরএম/এএসএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]