বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করছে ‘ইয়ুথ হাব’

আহমাদুল কবির
আহমাদুল কবির আহমাদুল কবির , মালয়েশিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৮:৩১ পিএম, ২১ মে ২০২২
মালয়েশিয়ার নেগেরি সেম্বিলান স্টেটের স্কুল শিক্ষার্থীদের পাইথন প্রোগ্রামিংয়ের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন ইয়ুথ হাবের সভাপতি পাভেল সারওয়ার

‘ইয়ুথ হাব’ একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, যা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সঙ্গে সঙ্গতি রেখে টেক শিক্ষা, উদ্যোক্তা, সামাজিক উদ্ভাবন ও যুব উন্নয়নে কাজ করছে।

সংগঠন পাভেল সারওয়ার (বাংলাদেশ) সুমাইয়া জাফরিন চৌধুরী (বাংলাদেশ) ও নিরাজ ভুসাল (নেপাল) ইয়ুথ হাব প্রতিষ্ঠা করেন যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও যুবকদের মধ্যে একটি শক্তিশালী বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া যায়। আপনি যা পছন্দ করেন তা করুন, অন্যদের অনুপ্রাণিত করুন, বিশ্বকে পরিবর্তন করুন।

ইয়ুথ হাব তরুণদের উৎপাদনশীল ও যোগ্য নাগরিক হওয়ার জন্য প্রস্তুত করতে এবং বিশেষ করে মেয়েদের, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তায় শিক্ষিত ও সক্ষম করতে কাজ করছে।

মালয়েশিয়ার সারাওয়াক রাজ্যে কমনওয়েথ ইয়ুথ ইনোভেশন সেন্টার, পূর্ত মন্ত্রণালয়, মালয়েশিয়ার সাথে যৌথ উদ্যোগে পাঁচদিন ব্যাপী বুট ক্যাম্প আয়োজন।মালয়েশিয়ার সারাওয়াক রাজ্যে কমনওয়েথ ইয়ুথ ইনোভেশন সেন্টার, পূর্ত মন্ত্রণালয়, মালয়েশিয়ার সাথে যৌথ উদ্যোগে পাঁচদিন ব্যাপী বুট ক্যাম্প আয়োজন।

সংস্থাটি শিক্ষা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের শক্তিকে একত্রিত করে পরিবর্তন তৈরি করছে যাতে প্রতিটি যুবকের ভবিষ্যতের জন্য জীবনের এবং দক্ষতার সর্বোত্তম সূচনা হয়। আজ পর্যন্ত তাদের প্রকল্পের মাধ্যমে লক্ষাধিকের বেশি মানুষ উপকৃত হয়েছে।

ইয়ুথ হাব মূলত মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ ও নেপালভিত্তিক হলেও নাইজেরিয়া, সিয়েরা লিওন, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ অন্যান্য কয়েকটি দেশে প্রকল্প রয়েছে।

ইয়ুথ হাবের সভাপতি পাভেল সারওয়ার বলেন, আমরা মূলত ৬ থেকে ১৬ ও ১৭ থেকে ৩৫ এই দুটি বয়সভিত্তিক শ্রেণি নিয়ে কাজ করছি। আমাদের অন্যতম একটি উদ্যোগ হলো ‘স্কুল কোডার্স’ যার উদ্দেশ্য হলো ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের সঙ্গে পরিচিত করা, তাদের কোডিং সম্পর্কে মৌলিক বিষয়গুলো শেখানো, শিক্ষার্থীদের তাদের স্কুল জীবন থেকে কম্পিউটার শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট করা, আইসিটি ও স্টেম এবং বিশেষ করে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং সম্পর্কিত তাদের দক্ষতা উন্নত করা।

দিনাজপুরে শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণমালয়েশিয়ার সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকদের গুগল ফর ইডুকেশনের ওপর প্রশিক্ষণ।

‘কোড’ লিখতে, আইসিটি ও প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি তরুণদের অনুপ্রাণিত করতে এবং বিভিন্ন তথ্য পেতে সাহায্য করা। স্কুল কোডার্স এমন একটি উদ্যোগ যার উদ্দেশ্য তরুণদের, অভিভাবক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী, বেসরকারি খাত এবং নীতিনির্ধারকদের সবার জন্য ন্যায়সঙ্গত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার অগ্রগতির দিকে নিয়ে আসা।

ইয়ুথ হাব মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশি শিশু-কিশোরসহ মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংগঠনের সহযোগিতায় দেশটির বিভিন্ন রাজ্যের স্কুল পর্যায়ে তথ্য-প্রযুক্তির শিক্ষা নিয়ে কাজ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ, স্থানীয় মালয়েশিয়ান ও প্রবাসী বাংলাদেশি ১০০০ এর বেশি শিশু কিশোর ইয়ুথ হাব থেকে স্ক্রেচ, পাইথন, এমআইটি এপ ইনভেন্টর, এপ মেকার প্লাস শিখছে।

এছাড়া মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে প্রবাসী শিশু-কিশোরদের নিয়ে ‘মুজিব ও বাংলাদেশ’ হ্যাকাথনের আয়োজন করে। প্রবাসী ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ডিজিটাল বাংলাদেশের অংশীদার হতে ২০১৭ সাল থেকে কোডিং কোর্স, বিভিন্ন কর্মশালা, বুট ক্যাম্পের আয়োজন করছে।

দিনাজপুরে শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণদিনাজপুরে শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ

গার্লস ইন আইসিটি- এই উদ্যোগটি স্থানীয় মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেয়ে এবং তরুণীদের লক্ষ্য করে যারা আইসিটি এবং স্টেমের প্রতি আগ্রহী। আমরা বিশ্বাস করি, যদি মেয়েরা আইসিটি’র সঙ্গে কাজ করার বিভিন্ন কাজ এবং পদ্ধতিগুলো বুঝতে পারে, তাহলে তারা তাদের সম্প্রদায়, তাদের কর্মস্থলে এবং সরকারে কীভাবে আইসিটি ব্যবহার করা হয় সে সম্পর্কে গভীর ধারণা পাবে।

ইয়ুথ হাব সাইবার নিরাপত্তা শিক্ষার প্রচারের জন্য ‘মেয়েদের জন্য সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতা’ ইভেন্টের আয়োজন করে আসছে। আরেক সহ-প্রতিষ্ঠাতা নিরাজ ভুসাল (নেপাল) বলেন, শিক্ষা অপেক্ষা গ্রহণযোগ্য আর কোনো কিছুই হতে পারে না। বিশেষত আমাদের উদ্যোগগুলো প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিয়ে।

এ লক্ষ্যে যুবকদের, স্কুলের শিক্ষার্থী, একাডেমিক, উদ্যোক্তা, শিল্প বিশেষজ্ঞ, পিতামাতা, সরকারি কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারকদের একত্রে আনার জন্য নিরলস কাজ করছি।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মাঝে খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ।রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মাঝে খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ।

সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, প্রোগ্রামিং ওয়ার্কশপ, স্কুল হলিডে প্রোগ্রাম, ক্যারিয়ার টক, ওপেন হাউস ডে, গার্লস ইনোভেশন বুট ক্যাম্প, সামিট ও কনফারেন্সের আয়োজন করে ইয়ুথ হাব।

একজন শিশুর ধীরে ধীরে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে বেড়ে ওঠা বেশিরভাগই একজন যোগ্য এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ শিক্ষকের উপর নির্ভর করে। সেজন্য আমরা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকি। তাই আমরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের গুগল ফর এডুকেশনের ওপর বিনামূল্যে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষাকে আরও ফলপ্রসূ এবং অর্থবহ করে তুলি।

১৮ থেকে ৩৫ বছর পর্যায়ে উদ্যোক্তা দক্ষতা অর্জনের জন্য যুবক, শিক্ষাবিদ, উদ্যোক্তা, শিল্প বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মকর্তাদের এক প্ল্যাটফর্মের অধীনে নিয়ে আসার লক্ষ্যে স্কুল প্রেইনার কাজ করছে। ইয়ুথ হাব উদ্যোক্তাদের তথ্য, সহায়তা, পরামর্শদাতা এবং ক্যারিয়ার বিকাশের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।

ময়মনসিংহ জেলায় স্কুল শিক্ষার্থীদের মাঝে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি নেপকিন বিতরণ ও পিরিয়ড সচেতনতামূলক উঠান বৈঠক।ময়মনসিংহ জেলায় স্কুল শিক্ষার্থীদের মাঝে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি নেপকিন বিতরণ ও পিরিয়ড সচেতনতামূলক উঠান বৈঠক।

ইয়ুথ হাবের সাধারণ সম্পাদক সুমাইয়া জাফরিন চৌধুরী বলেন, আমরা তরুণদের দক্ষতা উন্নীত করার জন্য অনেক প্রকল্প চালাচ্ছি। আমরা প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা ও বিশ্বব্যাপী লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ নিশ্চিত করার দিকে মনোনীবেশ করছি।

সফট স্কিল ডেভেলপ করার মাধ্যমে তরুণদের উৎপাদনশীল ও যোগ্য নাগরিক হওয়ার জন্য প্রস্তুত করতে কাজ করছে ইয়ুথ হাব। তরুণদের জন্য সিভি রাইটিং, কমিউনিকেশন স্কিলস, ডিজিটাল মার্কেটিং, ফেসভিউ ইন্টারভিউ বোর্ড ইত্যাদি বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

করোনাকালীন নারীরা বাসায় বসে যাতে কাজ করে নির্বিঘ্নে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে এমন উপলব্ধি থেকে ইয়ুথ হাব ভার্চুয়াল ভেঞ্চার নামে নতুন এক উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। ২০২০ এর জুন মাসে এর যাত্রা শুরু হয় এই ভেঞ্চারের। এরই মধ্যে অনেকেই এই উদ্যোগ থেকে লাভবান হয়েছেন।

সুমাইয়া জাফরিন চৌধুরী বলেন, পিরিয়ড নারীদের জন্য একটি প্রাকৃতিক শারীরিক প্রক্রিয়া, যা তাদের সুস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু বাংলাদেশে এটি অবহেলিত। স্যানিটারি ন্যাপকিনের অপর্যাপ্ত ব্যবহারের কারণে মারাত্মক সংক্রমণ, এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে।

বেশিরভাগ নারীরা তাদের স্বামী, বাবা-বা ভাইকে এই পণ্যগুলো কিনতে বলতে লজ্জা বা দ্বিধা বোধ করেন। বাংলাদেশে মাত্র ১৪ শতাংশ নারী স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করছেন এবং অনেকেই তাদের পিরিয়ডে অস্বাস্থ্যকর থাকেন।

এই সমস্যা সমাধানে ইয়ুথ হাব ত্রিকোনোমিটি প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ করছে। সুবিধাবঞ্চিত নারীদের বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ ও পিরিয়ড সচেতনাতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে সংস্থাটি। এরই মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১৭ হাজার নারীদের মাঝে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি প্যাড বিতরণ করেছে।

মালয়েশিয়ার স্থানীয় স্কুল শিক্ষার্থীদের স্কেচ প্রোগ্রামিংয়ের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন ইয়ুথ হাবের সভাপতি পাভেল সারওয়ার।মালয়েশিয়ার স্থানীয় স্কুল শিক্ষার্থীদের স্কেচ প্রোগ্রামিংয়ের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন ইয়ুথ হাবের সভাপতি পাভেল সারওয়ার।

এছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য সেবা, বাংলাদেশের যেকোনো দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো, বিশেষ করে শীতের সময় শীতার্তদের জন্য গরম পোশাক ও বন্যার সময় ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ সহায়তা করে। লকডাউনের সময় মালয়েশিয়া প্রবাসীদের মাঝে খাদ্য সহায়তা করাসহ বাংলাদেশ বিভিন্ন মাদরাসায় বিনামূল্যে কোরআন বিতরণ, স্কুলে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করে আসছে।

করোনা মহামারির শুরুর দিকে ইয়ুথ হাব ও অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জ নামের উদ্যোগটি গ্রহণ করে। ঘরে বসেও পথ দেখানো সম্ভব এই স্লোগানকে সামনে রেখে দেশব্যাপী গুগল ম্যাপে বিভিন্ন জরুরি সেবার স্থানগুলো যুক্ত করা হয়। এই উদ্যোগে ৩১ হাজারের বেশি তরুণ-তরুণী লক্ষাধিক নতুন স্থান ম্যাপে যুক্ত করে। এই উদ্যোগটি বাংলাদেশে একটি বড় প্রভাব তৈরি করে।

নানাবিধ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংস্থাটির যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। শিশু-কিশোর, যুব, নারী উন্নয়ন ও বিভিন্ন সামাজিক কাজের অবদানের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সম্মাননা ও সনদ গ্রহণ করে সংগঠনটি।

এছাড়া ইয়ুথ হাব সরকারি বেসকারি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সস্থার সাথে যৌথ উদ্যোগে বিভিন্ন সভা সেমিনারের নিয়মিত আয়োজন করে আসছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইয়ুথ হাব কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রবাসী তরুণ ও নারীদের আত্ম উন্নয়ন ও স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে।

তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে লাল সবুজের পতাকাকে বিশ্বের দরবারে উচুতে তুলে ধরতে নিরলশভাবে কাজ করছে ইয়ুথ হাব।

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]