ঝিনুক নীরবে সহো - একজন আপাদমস্তক কবির জীবনচিত্র

মো. ইয়াকুব আলী
মো. ইয়াকুব আলী মো. ইয়াকুব আলী
প্রকাশিত: ১২:১২ পিএম, ২৯ জুন ২০২২

‘হা সুখী মানুষ, তোমরাই শুধু জানলে না অসুখ কত ভালো কতো চিরহরিৎ বৃক্ষের মতো শ্যামল কত পরোপকার কত সুন্দর’

এমন উচ্চারণ কেবলমাত্র একজন কবিই করতে পারেন, যিনি খুব অল্প বয়সে অসুখের যন্ত্রণায় বুঁদ হয়েছিলেন। যিনি ‘একটুখানি আয়ুষ্মতী ঘুম চেয়েছিলেন’। তারপর একদিন কালঘুম তাকে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দিলো।

‘সূর্যের রৌদ্রের চাবুক বানিয়ে আমি মৃত্যুকে সাবধান করে দিই!
অসুখে কে আবার কার পদানত?’

কবি আবুল হাসানকে নিয়ে শামসুর রাহমান বলেছিলেন, আবুল হাসান মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত কবি, কবি ছাড়া আর কিছুই নন। তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে রয়ে গেছে কবিতা। তার এলোমেলো জীবনের ছাপ পড়েছে তার কবিতাতেও। এই এলোমেলামি তার কবিতার দুর্বলতা এবং শক্তি।’

আবুল হাসানকে নিয়ে এটা সবচেয়ে উপযুক্ত কথা যে তিনি একজন আপাদমস্তক কবি। শুধুমাত্র কবি হবেন বলেই নিজের নাম আবুল হোসেন মিঞা বদলে রেখেছেন আবুল হাসান। মাত্র ২৯ বছরের একটা জীবন আর তিনটা প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ছিলো তার কিন্তু সেগুলোই তাকে অমর করে রেখেছে।

কবি আবুল হাসান সারাজীবন উন্মূল উদ্বাস্তু জীবন যাপন করে গেছেন। বৈষয়িকতা কখনওই ছুঁতে পারেনি। আসলে বৈষয়িক হওয়ার মতো বয়সও তার হয়নি। ত্রিশ বছর বয়স তো আসলে কৈশোর থেকে তারুণ্যে রূপান্তরের সময়। কিন্তু এর মধ্যেই নিজের কবি সত্ত্বাকে নিয়ে করেছেন ঘষামাজা কারণ তিনি কোনো স্বভাব কবি ছিলেন না।

এভাবেই সৃষ্ট করেছেন অমর সব কাব্য। এই কবি আবুল হাসানকে ধারণ করেছেন আমাদের সমসাময়িক আরেকজন কবি মোশতাক আহমদ। রচনা করেছেন ‘ঝিনুক নীরবে সহো’ নামের এক ডকু-ফিকশন।

ডকু-ফিকশনের মানে আমার জানা নেই তবে লেখক ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে, কিছু ঘটনা ও সংলাপ সত্যাশ্রয়ী, কিছু ঘটনা ও সংলাপ আবার নিরূপায় হয়েই সত্যের কাছাকাছি, তবে তাকে হয়তো সত্যের অপলাপ বলা যাবে না। ঘটে যা সব সত্য নয়, লেখকের উর্বর মস্তিষ্কও সত্য সৃষ্টি করে।’

আসলে একজন মানুষকে যখন অন্য একজন মানুষ নিজের মধ্যে ধারণ করেন তখন তিনি নিজেও হয়ে ওঠেন সেই মানুষটা তাই কল্পনা করার স্বাধীনতা তিনি পেতেই পারেন। এই বইয়ে আবুল হাসানের পাশাপাশি পট পরিবর্তন হয়েছে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রেরও।

আবুল হাসানের জন্ম ১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট আর পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম ১৫ আগস্ট। এরপর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে জন্ম বাংলাদেশ নামক একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের। এসব ঘটনাবলীর মধ্য দিয়েই আবুল হাসানের বেড়ে ওঠা। তিনি পারিপার্শ্বিকতার এসব পরিবর্তনই দেখতেন কিন্তু এগুলোকে কেন জানি কবিতায় নিয়ে আসতেন না।

এক কবিতা সন্ন্যাসী আবুল হাসান। এই কথাটি হাসানের বন্ধু সুরাইয়া খানমের। তার মাঝে এক ধরনের সন্ন্যাস ছিল, কবি ছাড়া কিছুই তিনি হতে চাননি। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা অসমাপ্ত। চাকরিজীবন বিক্ষিপ্ত, খণ্ড খণ্ড। তার মাঝে ছিল কিছু কিছু স্ববিরোধিতাও। চারপাশে মন্বন্তর, যুদ্ধ আর বিবিধ অস্থিরতাকে আত্মস্থ করে হাসান নিমগ্ন থেকেছেন কবিতার শিল্পিত উদযাপনে, নিজের সৃষ্টিতে। এই দেশে আবুল হাসানের কবিত্ব ও জীবন প্রবাদপ্রতীম।

স্বল্পায়ু জীবন নিয়েও আবুল হাসান অদ্বৈত ও মৃত্যুকে জয় করেছেন। ক্লাস ফোরে উঠে একটি অনুষ্ঠানে প্রথম স্বরচিত কবিতা পাঠ করে ছোট হাসান টুকু। ক্লাস সিক্সে উঠে গোপালগঞ্জের হাইস্কুলে ভর্তি হন। ক্লাস এইটে উঠে নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠানে বেলায়েত হোসেনের লেখা নজরুলকে দেখে এলাম নাটকে প্রমীলা নজরুলের ভূমিকায় অভিনয় করে সবাইকে মুগ্ধ করেন। ক্লাসের সেরা মেধাবী ছাত্রও ছিলেন। হেড স্যার রুস্তম আলী মোল্লা টুকুকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন। আর নানা সাংস্কৃতিক যজ্ঞে যুক্ত করে টুকুকে স্বপ্ন দেখাতেন।

প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ নিয়ে হাসান বলেছিলেন, ‘সনাতনভাবে রাজা শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত হয়, আমি এখানে সে অর্থে ব্যবহার করিনি। রাজা এখানে মূল্যবোধের প্রতীক। প্রতিটি সমাজে কালের প্রবাহে কিছু মূল্যবোধ বিদায় নেয় আর কিছু নতুন মূল্যবোধের আবির্ভাব ঘটে। আমি এখানে মূল্যবোধের পালাবদল বোঝাতে নাম রেখেছি ‘রাজা যায় রাজা আসে’... আমার কাছে কবিতা লেখাটা হলো শব্দের খেলা, মাইকেল বলেছেন শব্দে শব্দে বিয়া। লোরকা বলেছেন, ‘‘My poetry is a game. My life is a game. But I am not a game.’’

রাজা যায়রাজা আসের কম্পোজ প্রায় শেষ হয়ে গেছে! এ সময় একদিন হুমায়ুন আজাদ হাসানকে বললেন, তার বইয়ের শেষ কবিতার নাম হুমায়ুন আজাদ। সেই কবিতায় তিনি তার জন্ম সাতচল্লিশ সাল থেকে একাত্তর সাল পর্যন্ত ইতিহাসের বিভিন্ন উত্থান পতন ধরে রেখেছেন। হলে ফিরেই হাসানও লিখে ফেললেন আত্মপরিচয়ের এক কবিতাঃ আবুল হাসান। এই কবিতাটি পড়ে শহীদ কাদরী বললেন, ‘কবি হতে এসেছো, নিজের নামটা খোদাই করে যাও।’

‘সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র, মায়াবী করুণ
এটা সেই পাথরের নাম না কি? এটা তাই?
এটা কি পাথর নাকি কোনো নদী? উপগ্রহ? কোনো রাজা?

ঝিনুক নীরবে সহো

কী অর্থ বহন করে এসব মিলিত অক্ষর?

‘রাজা যায় রাজা আসের কবিতাগুলোতে তরুণ কবির চেতনার ভিতটাকে চেনা যায়-
‘মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবে না’ জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন।
‘শুধু আমি জানি আমি একটা মানুষ,
আর পৃথিবীতে এখনও আমার মাতৃভাষা, ক্ষুধা!’ - মাতৃভাষা।
‘কেবল পতাকা দেখি,
কেবল উৎসব দেখি,
স্বাধীনতা দেখি,
তবে কি আমার ভাই আজ
ঐ স্বাধীন পতাকা?
তবে কি আমার বোন, তিমিরের বেদীতে উৎসব?’ উচ্চারণগুলি শোকের।

বইটি উৎসর্গ পত্রে লিখেছিলেন, ‘আমার মা আমার মাতৃভূমির মতোই অসহায়।’ হাসান মনে করতেন প্রচারধর্মিতা পেলে ভাব আর আবেগের স্বতঃস্ফুর্ততা আর থাকে না। রাজনৈতিক চিন্তা বা কোনো রকম পূর্ব ধারণা যেন শিল্পকে গ্রাস না করে এটাই ছিল হাসানের বক্তব্য। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের কবিতায় বৰ্ণনামূলক উচ্ছ্বাস। হাসান নিজের সাথে নিজেই বোঝাপড়া করতে বসলেন।

হাসানের মতে, নিতান্ত দল-ভাত খাওয়া একজন বাঙালি যুবার হৃদয়ের ভেতর ভালোবাসা আছে- অথচ সেই ভালোবাসা এখন ওদের ভাষায় এমনভাবে লিখতে হবে যেনো সেটার বৈজ্ঞানিকীকরণ হয়।... এখন আমার শিব গড়তে বাঁদরের অবস্থা। এখন আমি সত্যি শব্দগুলো কবিতায় লিখতে পারছি না। ফলে কবিতায় লেখা হচ্ছে না আর।’

হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য একটা সময় হাসানকে পূর্ব জার্মানির রাজধানী বার্লিনে যেতে হয়। সেই হাসপাতালে পরিচয় হয় আরেক হৃদরোগী চিত্রশিল্পী রাইনহার্ট হেভিক্যার সঙ্গে। হাসান তাকে রাজা যায় রাজা আসের একটা কপি উপহার দিলেন। রাইনহার্ট বললেন, তোমাদের দেশের শিল্পীরা তো খুবই আর্টিস্টিক প্রচ্ছদ করেন! তোমার ভাষা শিখে নেওয়ার দায়িত্ব আমার।

প্রচ্ছদ দেখেই তোমার কবিতা অর্ধেকটা বুঝে নিয়েছি। এরপর দুজনের পরিচয় বন্ধুত্বে রূপ নেয় এবং হাসান তাকে সাথে সাথেই তার কবিতার বই জার্মান ভাষায় অনুবাদের লিখিত অনুমতি দিয়ে দেন। হাসানের কাছে মধুরতম স্মৃতি ছিল জন্মস্থান বরিশাল আর কলেজ কম্পাউন্ডের দিনগুলো।

হাসানের মতে, জীবনানন্দ কি কবি হতেন যদি ওই শহর তার জন্মভূমি না হতো? যার কৈশোরের এবং যৌবনের পাদপীঠ। আমার তো বিশ্বাসই হয় না।... বরিশাল যদি বুকভরা উপার্জন হয় তাহলে ঢাকা আমার সেই উপার্জনের সব কেড়ে নেওয়া বেতাল বদমাশ।’

প্রত্যেক কবির মতোই হাসানের মধ্যেও বাস করতো দ্বৈত সত্ত্বা। হাসানের অন্তরাত্মা যাকে কেউ দ্বিখণ্ডিত করতে পারবে না। সেই সত্ত্বা ফিরে যেতে চায় শহরের দেওয়ালের ফাঁকে। আর হাসানের দ্বিতীয় সত্ত্বাভাবে জন্মভূমি ঝনঝনিয়াতেই আছে তার প্রাণভোমরা। ওখানে গিয়ে মায়ের কাছে, পাখির কাছে নদীর কাছে থাকলেই প্রকৃতির অশেষ প্রশ্রয়ে কবিতা লিখবেন আর মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ করবেন।

হাসান যে কোনো অবস্থাতেই কবিতা লিখতে পারতেন। জার্মান বন্ধু রাইনহার্টের বাড়িতে সোমরসের আড্ডায় বসে রচনা করেন ‘আমি আছি শেষ মদ’
‘কে বলে নিঃশেষিত?

নিঃশেষিত হতে হতে তবু সব নিঃশেষিত হয়নি এখনো!
মদের পাত্রের ঠোঁটে শেষ মদিরার চিহ্ন
কে কবে মুছেছে ঠোঁটে? কার সাধ্য কতদূর পারে?

থরে থরে মাটির পাত্রজুড়ে
আমি আছি শেষ মদ
কেউ তাকে পারবে না চুমুকে সরাতে!

হাসানের জীবনাবসানের পর তার কবরের এপিটাফে লেখা হয় তারই রচিত দুটো লাইন -
‘যতদূর থাকো ফের দেখা হবে, কেন না মানুষ
যদিও বিরোধকামী, কিন্তু তার মিলনই মৌলিক।’

নির্মলেন্দু গুণ ভাবছিলেন, নিয়তির অমোঘ নির্দেশেই কি বছর দশেক আগেই আবুল হাসান লিখে গিয়েছিলেন তার প্রিয় একটি কবিতা, যার সূত্রে দুজনের বন্ধুত্বের সূচনা হয়েছিল!
একদিন ঝরা পাতার মতো নামহীন নিঃশব্দে
তোমাদের কাছ থেকে ঝরে যাবো যখোন
পেছনে ফেলে রেখে আমার নিদ্রাহীনতার কয়কে গুচ্ছ ফুল।

‘একমাত্র মৃত্যুই সুন্দর,
চাঁদের, মতো আত্মা আমার মেলে দিতে পারি
আজ অনন্ত মৃত্যুর সম্ভাষণে।’

এই বইটা ঠিক যেন একটা চলচ্চিত্রের স্থির রূপায়ণ। চলচ্চিত্রে যেভাবে একটা দৃশ্য দিয়ে শুরু হয় তারপর কল্পনায় পেছনের দৃশ্যগুলো দেখানো হয়। এখানেও ঠিক তাই। হাসানের জীবনের শেষ দিনে গল্পের শুরু এরপর লেখক ফিরে গেছেন তার অতীতে। সেখানে একে একে সব চরিত্রেরা কেন্দ্রীয় চরিত্র হাসানকে ঘিরে স্বমহিমায় আবির্ভুত হয়েছেন। লেখক সুনিপুন দক্ষতায় আমাদের সব গল্প বলে গেছেন। হাসান জার্মানিতে বসে ভাবছেন জন্মভূমি বরিশাল নিয়ে। পাশাপাশি চিত্রায়িত করা হয়েছে হাসানের জীবনের প্রেমকেও।

পুরো বইটা শেষ করার পর একজন মানুষ যেমন একটা চলচিত্র দেখে ছলছল নয়নে সিট থেকে উঠে পড়েন তেমনি পাঠকেরও দৃষ্টিও ঝাপসা হয়ে আসবে। এই বই শেষ করার পর আমার দিকে তাকিয়ে আমাদের মেয়েটা জিজ্ঞেস করেছিল, বাবা তুমি কি কাঁদছো?

আসাদ চৌধুরী হাসানের জানাজা থেকে ফিরে এসে বলেছিলেন, হাসান মারা যাওয়ার পর যারা হাসপাতালে, জানাজায় গিয়েছিলেন তাদের যে শোক প্রত্যক্ষ করেছি তার মধ্যে সামাজিকতার অনেক ঊর্ধ্বে, প্রাণের ব্যাপার ছিলো।

‘সামাজিক প্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠিত যারা, তাদের মৃত্যুতে উৎসবের অহংকার থাকে, দেখানোর ব্যাপার থাকে, কিন্তু সেখানে তা ছিলো না। হাসানের সংস্পর্শে যারাই এসেছেন, পেশায় তিনি যেই হোন, কবিতা তাকে স্পর্শ করত। তিনি বুঝতে বাধ্য হতেন, একজন কবির মুখোমুখি তিনি হয়েছেন।’

এই বই পড়ার পরও পাঠকেরও ঠিক একই উপলব্ধি হবে লেখকের সম্মন্ধে। লেখক কাহিনির বর্ণনা করতে যেয়ে কখনওই হাসানের কবি সত্ত্বাকে খাটো করেননি। লেখক নিজে কবি হওয়াতে এটা সম্ভবপর হয়েছে বলে আমার মনে হয়। আর হাসানের জীবনচিত্রের যে চিত্রনাট্য তিনি এই ডকু-ফিকশনে লিখেছেন সেটাতো এক কথায় অনন্য। আসলে একজন শিল্পীর পরিচয় তার সৃষ্টিতে হতে পারে সেটা কবিতা, গল্প, উপন্যাস বা চিত্রনাট্য।

এমআরএম/জেআইএম

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]