‘নিচতারা’

শায়লা জাবীন
শায়লা জাবীন শায়লা জাবীন
প্রকাশিত: ১০:৪১ এএম, ০৭ আগস্ট ২০২২
ছবি: সংগৃহীত

বেশ অনেক বছর আগের কথা। শ্রাবণ মাস, এমন কিটকিটে গরমে কাঠ ফাটে কি-না জানি না, কিন্তু মাটি ফেটে চৌচির। তেমনি এক খাঁ খাঁ করা রোদ্রের দিনে চেয়ারম্যান বাড়ির মধ্যে উঠানে কিশোরী থেকে তরুণীর দিকে ধাবিত হওয়া ‘নিচতারা’ নামে একটি মেয়ে পা দিয়ে ছড়ানো ধান মাড়াই করছে। মধ্যে উঠান থেকে বাড়ির ভেতরে ঢোকার দরজার কাছে তেজপাতা গাছের ছায়ায় বসে লাবণ্য চোখের পলক না ফেলে নিচতারাকে দেখছে।

মনে কিঞ্চিৎ বিস্ময় মেশানো হিংসা। এই বাড়িতে কাজ করে নিচতারা কিন্তু কি যে অদ্ভুত সুন্দর সুন্দর কাজ করে। দেখতেও কি মায়াকাড়া অথচ লাবণ্যর জীবন কি বোরিং। গল্পের বই না থাকলে সে দম আটকে মরেই যেত এতদিন।

লাবণ্যরা ঢাকায় থাকে, গরমের ছুটিতে নানাবাড়িতে বেড়াতে এসেছে। এমনিতে কখনোই গরমে আসা হয় না, বরং শীতকালে বেড়াতে আসা হয় দাদাবাড়ি/নানাবাড়ি। এবার কি যেন জরুরি কাজ আছে তাই আম্মু এসেছে পাঁচ দিনের জন্য, সঙ্গে লাবণ্য আর তার ছোট ভাই অরণ্য। লাবণ্য ক্লাস টেনে পড়ে, অরণ্য ক্লাস সিক্সে।

দুপুর বেলা ভাত খাওয়ার পর বাড়ির সবাই ভাত ঘুমে বা ঝিমগল্পে ব্যস্ত। লাবণ্য উত্তরের ঘর থেকে মধ্যে উঠানের দিকে যাওয়ার দরজা খুলে ছোট্ট দুইধাপের সিঁড়িতে বসে নিচতারাকে দেখছে। মাথার ওপরে তেজপাতা গাছ ছায়া দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

লাবণ্যের মা এসে একবার ঝাঁঝালো গলায় বকা দিয়ে গেছে, কেন না ঘুমিয়ে এই গরমে বসে আছে! লাবণ্য কোনো উত্তর না দিয়ে তার মা’র দিকে তাকিয়ে ছিল, সে জানে উত্তর দিয়ে লাভ নেই, তার মা নিজে যেটা বোঝে তার বাইরে আর কিছু নেই। এই পৃথিবীতে লাবণ্য তার মা’র চেয়ে বোকা মানুষ একটাও দেখেনি এখন পর্যন্ত।

সবাই তাকে ঠকায় কিন্তু সে কিছু না বুঝে সবার সঙ্গেই চিৎকার চেঁচামেচি করে। লাবণ্য কয়েকবার বোঝাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে, তাই আর চেষ্টা করে না। তার মা’র ধারণা লাবণ্যর মাথায় কোনো বুদ্ধি নেই, গোবরও নেই। তাই সারাদিন গল্পের বই পড়ে, মাথায় কিছু থাকলে পড়ার বই পড়তো।

কি যেন একটা পাখি ডেকে যাচ্ছে একটানা। লাবণ্য পাখির ডাকের উৎস খুঁজতে গিয়ে পেছন দিকে তাকালো, বেশ পুরোনো বাঁশঝাড় তার পাশেই নানাবাড়ির কবরস্তান। কিন্তু পাখি নজরে এলো না। শুধু ডাকটাই মাথায় ঢুকলো। ঢুকুক মাথায়, মনে না ঢুকলেই হয়। মনে একবার কেউ ঢুকলে আর বের হয় না!

নিচতারা একটা সুতির ওড়না গলার একপাশ দিয়ে আড়াআড়ি করে বুকের ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে কোমরে দুই প্যাচ দিয়ে বেঁধে রেখেছে। ইসস এভাবে ওড়না পরতে এত ইচ্ছে করে, কিন্তু এটাও নিষেধ আম্মুর, এসব নাকি কাজের লোকদের স্বভাব। হঠাৎ কি মনে করে ওড়না খুলে ফেললো নিচতারা।

এবার ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে নিয়ে বাকিটা দিয়ে পুরো শরীরে জড়িয়ে ফেললো। লাবণ্যের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে একটা হাসি দিয়ে বললো, চান্দিফাটা গরম খালা, থাকা যাচ্ছে না আর। মাথা সেদ্ধ হয়ে গেছে।

অনেকক্ষণ থেকে তো তুমি কাজ করছো এই গরমে, এখানে ছায়া আছে। এসে বসো, আমি একটু করে দেখি তোমার কাজ। এবার নিচতারা মুখে হাত দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো, কন কি খালা। আপনার সুন্দর পা গরমে পুড়ে যাবি, এগুলা গায়ের অশিক্ষিত মানসের কাজ, আপনাদের না।

লাবণ্যের খুবই মন খারাপ হলো, সে বললো আম্মু জানবে কোথা থেকে। আমি কিছুই বলবো না, তুমিও বলবে না। নিচতারা এদিক সেদিক তাকিয়ে লাবণ্যের দিকে এগিয়ে এলো। বলে না খালা, আমিই আপনাকে এই কাজ করতে দেমো না, অনেক কষ্টের। আপনাকে আমার খুবই পছন্দ, দেখলেই শান্তি লাগে, কতকিছু মনে হয়।

লাবণ্য জিজ্ঞাসা করলো কি মনে হয়?

আজকে কমো না, মেলা কাম, আর একদিন

আমরা তো চলে যাব আর ২দিন পরেই।

দেখেন যাওয়া হয় কি-না।

এই কথা বলছো কেন? আর তোমাকে না বলছি আমাকে তুমি করে বলবা। আমি তোমার ছোট।

ছি ছি খালা, কি যে কন, আপনি এই এলাকার জমিদারের পুতি, আপনাকে আমার মতো কামের লোক তুমি করে কবার সাহস পাবি। কি যে কন। মেলা সময় দম নিছি, এখন যাই কাম করি, চাচি দেখলে চিল্লাবে।

আর আচ্ছেন আল্লাহর ইচ্ছায়, যাবেন ও তার ইচ্ছায়।
হুকুম না হলে যাওয়া হবি না।

এটা বললে কেন? আমার সামনের টেস্ট পরীক্ষা, যেতে হবে।
এমনিতেই কলাম, মনেত আসলো।

আচ্ছা একটু আগে একটা পাখি ডেকে গেলো একটানা, নাম জানো পাখিটার? খুঁজে পাইনি

হ, ঘুঘু, বাঁশঝাড়ের পাশেই কবরস্তানের যেই পাশে বড় দাদা দাদির কবর, তার ওপর যে ডালিম গাছ সেটি আসে প্রত্যেকদিন দুপুরে ডাকে। কিন্তু বুঝবের পারি না, দাদার কবর নাকি দাদির। বুঝলে এটা কাম হতো।

তুমি এতো ডিটেইলস জানো কিভাবে?

বুঝলে কি কাজ হতো?

তার আরো দোয়া লাগবি গো খালা, মরা মানুষ তো কথা কবার পারে না, পাখিক দিয়ে কওয়ায়।

দুনিয়ার বেমাক পশু পাখি মরা মানষের কথা শুনবের পায়, খালি হামরা, জেতা মানসেরা শুনি না কিছু, তাই রাতদিন হাসপের পারি।

লাবণ্যের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। কিন্তু বুঝতে দিলো না।

ঘুঘু পাখিটা আবারও ডাকছে।

তার হাতে একটা সাইন্স ফিকশন বই, পৃষ্ঠার নম্বর মনে রেখে বইটা বন্ধ করে সে নিচতারাকে বললো তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছো যার কবরের ওপর ডালিম গাছে বসে যে ঘুঘু পাখিটা ডাকছে সে আরো দোয়া চাইছে দুনিয়ার মানুষদের কাছে, তার জন্য?

জ্বী খালা, উঁনার কবরে কষ্ট হচ্ছে।

আচ্ছা আজকে আমি দুইজনের জন্যই দোয়া করবো, আম্মুকে তো বলা যাবে না, নানু কে বলবো।

কাউকে বলা যাবি না খালা, আপনাক পাগল কবি, আমাক গাল পারবি, হামাকের বাড়ির উল্টা পাশে যে বিল আছে, তার দক্ষিণ কোনায় এক বুড়া কোবরাজ থাকে, তার কাছে একবার হামার বাপের বাতের বেদনার ওষুধ আনবের গেছলাম, তখনি উনি বলছে। এজন্য পাখি ডাকে।

উনি যা বলে, সব ঠিক হয়।

কাউকে বলবো না, তাহলে আমাকে বললে কেন?

আপনি জিজ্ঞাসা করলেন তাই।

আর আপনাক তো হামি চিনি খালা, আমি মন ধরবের পারি আপনি অন্য মানুষ, তাই কছি।

এখন যাই।

লাবণ্য চুপচাপ নিচতারার যাওয়া দেখলো।
সে আবারো ধান মাড়াচ্ছে পা দিয়ে, মাথায় কাপড়।

ছোট মামাকে আসতে দেখলো বাইরের উঠানে, সঙ্গে আরো একটা ছেলে, বন্ধু মনে হয়।

লাবণ্য একটু গলা উঁচিয়ে নিচতারাকে বললো, তোমার নামটা খুবই সুন্দর, ‘নিচতারা’, আমার খুব পছন্দ, এই নামের অর্থ কি জানো?

নিচতারা হেসে বলে উঠলো, হায়রে কপাল খালা।

নাম তো সোন্দর আপনের, শুনলেই মন ভালো হয়ে যায়।
হামরা গরিব মানুষ, নিচু ঘর তাই নাম নিচতারা।

উচা ঘর হলে নাম হলোনি উচতারা, মাজলা ঘর হলে নাম হলোনি মেজতারা, বলে নিচতারা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লো।

লাবণ্য নিচতারার হাসি লক্ষ্য করছে, একটু কি অস্বাভাবিক।
মুখে কিছু বললো না, উত্তর দিক থেকে বাতাস এসে গায়ে লাগলো। গরম বাতাস সঙ্গে পাখির ডাক, কিন্তু এই ডাকটা আগের ডাকের মতো না, অন্য কোনো পাখি।

নিচতারাকে আর জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করলো না।
সে একমনে ধানগুলো উঠাচ্ছে, কি মায়াবতী দেখতে।

হাসলে গালে টোল পড়ে।
লাবণ্য উঠে দাঁড়ালো, তেজপাতা গাছ থেকে দুটো পাতা ছিঁড়ে নিয়ে গন্ধ শুঁকতে লাগলো।
অদ্ভুত সুন্দর একটা মিষ্টি গন্ধ
একই সাথে মিষ্টি একটা খাবারের নাম আর একটা ঝাল খাবারের নাম মাথায় ঘুরছে।

নিচতারা কখন ধানের গোলা গুছিয়ে এসে পাশে দাঁড়িয়েছে লক্ষ্য করিনি লাবণ্য, বলে উঠলো, আমি হলাম যে খালা আপনার হাতের পাতা।

তার মানে? লাবণ্য জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো।

মানে হলো তেজপাতা, যাক সব তরকারি রানতেই লাগে
মিষ্টি রানতেও লাগে, কেমবা বাসনা দূর করে সোন্দর বাসনা লিয়ে আসে সবতেই, কিন্তু রান্না শ্যাস হলে খাওয়ার সময় সবার আগে তেজপাতা ফালে দেওয়া হয়, রান্না শেষ, আর দরকার নাই, হামরা হলাম তাই, বাড়ির সব কাজ ই করি, কাম শেষ হলে তু্ই যাহ, বিদায় হ তাড়াতাড়ি।

আর লাগবি না তোক।
নিচতারা হাসতে শুরু করলো।
হাসতে হাসতে ভেতর উঠানে চলে গেলো।

লাবণ্য নিচতারার যাওয়া দেখছিলো।

পেছন থেকেই কে যেন ডাক দিলো, লাবণ্য বলে।

লাবণ্য চমকে উঠলো, পরক্ষণেই তাকিয়ে দেখে ছোট মামা,
তার পাশে তার বন্ধু।

কিরে এমন চমকালি কেন? তু্ই তো লাবণ্য, নাকি ভুল নামে ডাকছি।

না, অন্যমনস্ক ছিলাম মামা, তোমায় লক্ষ্য করিনি।

অরণ্য কোথায়? এ আমার বন্ধু শ্যামল, ম্যাজিক পারে, অরণ্য তো ম্যাজিক পছন্দ করে। তাই নিয়ে এলাম, খুশি হবে।

অরণ্য, আছে হয়তো কোথাও। দেখো বাসার ভেতরে।

তোর কি হয়েছে রে লাবণ্য, নিজের নামেই চমকে গেলি, আবার অরণ্য কোথায় জানিস না।

আহা আম্মুকে জিজ্ঞাসা করো না, আমি এখানে অনেকক্ষণ নিচতারার সঙ্গে কথা বলছিলাম।

নিচতারা! ওর সঙ্গে কিন্তু জ্বীন আছে, বুঝে সুঝে কথা বলিস, অবশ্য তু্ই বুদ্ধিমতি মেয়ে, বড় আপার মতো গাধী না।

পাশে দাঁড়ানো মামার বন্ধুটি বলে উঠলো, ইন্টারেস্টটিং।

সাথে জ্বীন আছে, এমন কাউকে আগে কখনোই দেখিনি,

আমি কি নিচতারার সঙ্গে কথা বলতে পারি?

(ছোট গল্প ‘নিচতারার’ প্রথম অংশ। পুরো গল্পটা ২য় পর্বে শেষ হবে। এই গল্পের প্রতিটি চরিত্র কাল্পনিক, কারো সঙ্গে মিলে গেলে কাকতাল মাত্র।)

এমআরএম/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]