নিচতারা

শায়লা জাবীন
শায়লা জাবীন শায়লা জাবীন
প্রকাশিত: ১১:১৭ এএম, ২০ আগস্ট ২০২২

লাবণ্য সারারাত ঘুমাতে পারলো না, এপাশ ওপাশ। ছটফট প্রতি মুহূর্ত। এই দুনিয়ায় আপন তাহলে কে? এমন মাও হয়? ধর্ম ও সমাজে মা কে কত সম্মান দেওয়া হয়েছে। নিজের পেটের সন্তানের সঙ্গে কোনো মা এমন কিভাবে করতে পারে?

কারণ শুধুই অভাব। সে তো অনেকেরই আছে, তাই বলে এত কদর্য রূপ! তার মা তাকে কিভাবে আগলে রাখে প্রতিটা মুহূর্তে। কিশোরী একটা মেয়ে বেশ বড় একটা ধাক্কা খেলো তার মনোজগতে। এমন একটা ঘটনা শুনবে সে ঘুণাক্ষরেও আচ করতে পারেনি। এক রাতেই সে অনেকটা বড় হয়ে গেল।

এমনিতেই নতুন জায়গায় তার সহজে ঘুম আসে না। আচ্ছা এই ঘটনা নিচতারা, নানুকে বলেনি কেন! নানু তো বেশ ধীরস্থির। তাকেই বা বললো কেনো, এর মাঝে কি কোনো কারণ আছে! নিচতারার অন্য বোনটার কি অবস্থা?

নিচতারাকে তার বাঁচাতে হবে। বড় নানা, নানুর কবরের পাখি ডাকার যে ব্যাখ্যা সেটা সুরাহা করতে হবে। নিচতারা কি মনগড়া কথা বললো, না সত্য! মনে মনে গুছিয়ে ফেললো সকাল থেকে সে কি কি করবে, অনেক কাজ একদিনে, আম্মু বলছে পরদিন চলে যাবে।

বাইরে কুকুর ডাকছে এত বিশ্রীভাবে। মন সিঁটিয়ে গেলো। বৃষ্টি এখনো ঝরছে। পুরোনো আমলের ঢালাই দেওয়া দালান তাই শব্দ তেমন জোরদার না, বৈঠকখানা বা খাওয়ার ঘরের টিনের চালে বৃষ্টির শব্দটা ঠিকমতো শোনা যায়। কান দিয়ে মনের ভেতরে ঢুকে যায়।

অরণ্য ঘুমিয়ে কাঁদা, নিচতারা ও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে গেছে। ঘরে নিভু নিভু করে একটা হারিকেন রেখে গেছে নিতু খালা। লাবণ্য ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষায়। মনে মনে সে প্ল্যান গুছিয়ে ফেলেছে।

চুপচাপ শুয়ে শুয়ে সে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। কাঠের জানালার পাল্লার ফাঁক দিয়ে চিকন সাদা আলো তেরছা হয়ে ছাদের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় তির্যক রেখা হয়ে কি যে বলতে চাইছে বোঝা যাচ্ছে না। বাইরে থেকে আলো এত রাতে! আজ কি তাহলে পূর্ণিমা!

আলোটা তো চাঁদের আলোই মনে হচ্ছে। নানার গলা খাকারির শব্দ শোনা গেল। তার মানে রাত্রি দিপ্রহর শেষের দিকে, তাহাজ্জুত এর সেরা সময়। তবুও লাবণ্য শুয়েই থাকলো, মনে মনে ঠিক করলো ফজর ওয়াক্ত হলে উঠবে।

লাবণ্যর চোখ একটু ধরে এসেছিল। আশসাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লালাহ। ধ্বনি কানে আসলো, চোখ ভরা ঘুম। চোখের পাঁপড়ি খোলা যাচ্ছে না, তবুও উঠলো।

কিরে এত সকালে উঠলি যে

ফজর পড়বো তাই, বাসায় পড়তে পারি না, ইবলিস ভর করে, ঘুম থেকে উঠতেই পারি না

আচ্ছা, ফজর পড়ে তালে আবার ঘুমা

আখতারুন্নেচ্ছা উঠেছে,

লাবণ্য নানুর সাথেই নামাজ পড়লো, নামাজ শেষে আখতারুন্নেচ্ছা নামাজের চকিতে বসেই তাসবীহ গুনছে। তার ঠোঁট খুব দ্রুত নড়ছে।

লাবণ্য বোঝার চেষ্টা করছে ঠোঁট নাড়ানো দেখে নানু কোনো জিকির করছে।

মনে হচ্ছে ‘সুবহানআল্লাহ’ পড়ছেন

নানু তুমি কি সুবহান্নাল্লাহ পড়ছো?

আখতারুন্নেচ্ছা তাসবীহ গুনা থামিয়ে দিলেন, মনে মনে ভাবছেন মেয়ে মানুষের এতো বুদ্ধি ভালো না,
নজর লাগবে, হিংসা বাড়বে।

মুখে বললো ময়না পাখি যাও তো নারিকেল তেলের শিশি আর চিরুনিটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে আনো। সঙ্গে কাজলদানী টাও আনো।

লাবণ্যর এতো ভালো লাগে নানুর মুখে ‘ময়না পাখি’ ডাকটা শুনতে, আর তো কেউ ডাকে না এমন করে।

আখতারুন্নেচ্ছা লাবণ্যর চুলে তেল দিতে দিতে বলছে কি সুন্দর কিশকিশে কালো চুল, বেশি করে তেল দিবি
মাথা ঠান্ডা থাকবে।

আমার মাথা তো ঠান্ডাই নানু, আরোকত ঠান্ডা হতে হবে?

তুমি বরং আম্মুকে বলো বেশি করে তেল দিতে মাথায়, তার মাথা গরম।

সারাক্ষণ আমাকে বলে চুল কেটে ফেলতে, আমি নাকি সামলাতে পারি না, তাকে বলবা একটু আমি চুল কাটবো না। আরও বড় করবো।

তেল দেওয়া চুল বেণী করে দিয়ে, হাতের মধ্যমা আঙুলে কাজল নিয়ে লাবণ্যকে ঘুরতে বললো আখতারুন্নেচ্ছা। চোখে কাজল দিয়ে কানের লতির পেছনেও লাগিয়ে দিলো আর বিড়বিড় করে আয়াতুল কুরসী পড়ে ফুঁ দিয়ে দিলো।

বাচ্চাদের মতো কপালে কোনায় কাজলটিপ দেওয়া যাচ্ছে না আর তোকে। তাই কানের লতির পেছনেই দিলাম।

কুক্কুরুশ কুক করে মোরগ ডাকছে।

যাতো, নিচতারাকে উঠিয়ে দে, আমি তোর নানাকে খাবার দেই

মন্টু এসেছে, পিন্টুর ছোট ভাই। সে এই বাড়ির হাঁস, মুরগী, কবুতর, গরু, ছাগল দেখাশোনা করে, কিন্তু পিন্টু যেমন বুদ্ধিমান মন্টু ঠিক তার উল্টোটা, সে প্রায়শই গরু ছাগল হাঁস মুরগীর সাথে কথাও বলে।

আসফাকউদ্দীন বললেন, বুঝলি লাবণ্য।

বিদ্যুতের কথা একদমই পাকাপাকি, এর পরেরবার এলে তোদের আর কষ্ট করতে হবে না, বিদ্যুৎ এসে যাবে ততদিনে ইনশাআল্লাহ।

এটা কি বললে নানা, তাহলে তো গ্রাম ও শহর হয়ে যাবে, কোনো মজাই তো আর থাকবে না, ঘুটঘুটে অন্ধকার, জোনাকি পোকা, জোসনা রাত, হারিকেন সব হারিয়ে যাবে।

বিদ্যুৎ আনার কি দরকার?

আসফাকউদ্দীন হাসছেন, আচ্ছা তু্ই আসলে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হবে, চিন্তা করিস না, তোর কি লাগবে বল বাজার থেকে?

লাড্ডু, বুন্দিয়ার লাড্ডু খেতে ইচ্ছে করছে।

পিন্টু এসে দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়,

নিচতারা উঠে অন্যপাশে দরজা পাকের ঘরে গেল।

আসফাকউদ্দীন পিন্টুকে উদ্দেশ্য করে বললো আজ সন্ধ্যায় হ্যাজাক জ্বালাস, অনেকদিন জ্বালানো হয় না, অরণ্য খুশি হবে।
আর এখন চল, তোকে বাজার করে দেই।

লাবণ্য বারান্দার চেয়ারে পা দুলিয়ে বসে মুড়ি মুড়কি চাবাচ্ছে, ঘড়ি দেখলো। তার কাজ শুরু করতে হবে, সময় কম।

উঠানের এক কোনা থেকে শলার ঝাড়ু দিয়ে উঠান ঝাড়ু দিচ্ছে নিচতারা, এত সুন্দর শব্দ ছন্দের সঙ্গে একটানা।
বেজে যাচ্ছে। ভেজা উঠোন ঝরে পরা পাতা সব পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।

পামেলির মা আসছে না কেন রে নিচতারা, কাল বলিস নাই?

বলছি তো, আসবি হয়তো একটু পরে, বেজায় ঢিলা।

লাবণ্য ঘর থেকে একটা পাতলা শাল গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বের হলো, রাতে বৃষ্টি হওয়ায় সকাল টা একটু শীত শীত, তার মা ওঠার আগেই বের হতে হবে,

নানু আমি একটু হেঁটে আসি

কার সঙ্গে যাস? একা যাস না

চিন্তা করো না, মন্টু বা ছোটমামাকে নিয়ে যাব।

রাশেদ কি উঠছে?

অবশ্যই উঠছে, গাধা নিয়ে কেউ ঘুমাতে পারে?

আর না উঠলে উঠানো হবে, এই মন্টু একটু আয় তো আমার সাথে

মন্টু হাতে একটা কবুতর নিয়ে বিড়বিড় করতে করতে আসলো, কাছে আসলে বোঝা গেলো বলছে, ‘আগ করিস না কইতর, উই চলি আসপি। মায়া বাড়াচ্ছে দূরে যায়ে, তোক ছাড়া থাকপের পারবি না’।

লাবণ্য হাঁটতে হাঁটতে বললো ওর সঙ্গী চলে গেছে?

নাহ, গোস্বা করছে খালা, একটু ঝগড়াঝাটির মতো ব্যাপার আর কি।

বৈঠকখানার বারান্দায় রাশের বসে আছে, দেখেই বোঝা যাচ্ছে রাতে ঘুমায়নি।

ম্যাজিসিয়ান কই মামা

উফফ! আর বলিস না, সারারাত কালো জ্বীন দাঁড়ায় আছে তার সামনে বলে বলে চিল্লাইছে, ঘুমান যায়? পিন্টুর সঙ্গে পাঠায় দিসি। আব্বাকে বলছি হোটেল থেকে নাস্তা করায় দিতে।

হুম, আম্মুর দোয়া কাজে দিসে। এখন চলো আমার সঙ্গে, হেঁটে আসি।

মন্টু, তু্ই কবুতর এর সঙ্গীকে খুঁজে বের কর। আজকে ওদের দু’জনের বিয়ে, নানু পোলাও রান্না করবে। বিয়ের খানা পিনাও হবে, আর নানুকে বলিস রাশেদ মামা আমার সাথে আছে।

তু্ই এত বুদ্ধি নিয়ে ঘুমাস কেমনে?

ঘুমাই না তো,

শোনো মামা, বুদ্ধিমানরাই কেবল অন্যের বুদ্ধি ধরতে পারে, বোকারা না। বোকারা ভাবে সে নিজে শুধু চালাক, অন্যরা বোকার হদ্দ।
এটা আমার সূত্র, সেই সূত্রে তুমিও অনেক বুদ্ধিমান মামা।

এখন বলোতো বিলের দক্ষিণে কবিরাজের বাড়ি কোনটা?

কবিরাজকে কি দরকার?

বলছি, চলো এগোই।

যেতে যেতে রাশেদকে কারণ বললো লাবণ্য, আরো বললো, বাসার কাউকে এখনই কিছু না বলতে।

তমিজ দাদা বাড়িতে আছেন?

একটা পুরোনো কালো ফ্রেমের গোল চশমা চোখে, সাদা হাফ হাতা মলিন গেঞ্জি আর সবুজ একরঙা লুঙ্গি পরা বেশ বয়স্ক এক লোক বেরিয়ে এলেন।

রাশেদকে দেখে বললো, এত সকালে।

বাড়িতে সবাই ভালো?

উনি কে?

জ্বী, বাড়িতে সবাই ভালো।

বড়পার মেয়ে লাবণ্য, আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছে।

তমিজ প্রামানিক লাবণ্যর দিকে তাকালো। চশমা খুলে গেঞ্জির তলা দিয়ে মুছে আবার চোখে দিয়ে তাকালো (চমকে গেলেন, বেগম আম্মার মতন!)

লাবণ্য বললো, আস সালামু আলাইকুম

ওয়ালাইকুম আস সালাম, আম্মাজান ভেতরে আসেন।

লাবণ্য ও রাশেদ ভেতরে বসে আছে। খুবই সাধারণ ঘর, আসবাব ও সাধারণ।

একজন ভদ্রমহিলা এসে দুই গ্লাস লেবুর শরবত দিয়ে গেলো, বলে গেলো বাড়ির গাছের কাগজী লেবু দিয়ে বানাইছে, আর একবার এসে দিয়ে গেলো বাটিতে করে কোরানো নারিকেল, পাটালি গুড়, মুড়ি।

রাশেদ খাওয়া দেখেই বলছে খিদা লাগছে। লাবণ্য ইশারা করলো সে খাবে না।

কবিরাজ তমিজ প্রামানিক এসে বসলেন, বলেন আম্মাজান কি বিত্তান্ত?

আপনিতো অনেক আগের মানুষ। আমার নানার চেয়েও বড়, আগের কথা নিশ্চয়ই একটু হলেও মনে আছে, বড় নানার কথা জানতে এসেছি।

জমিদার সাব!

আপনি নিচতারাকে বড় নানা-নানুর কবর নিয়ে কি কিছু বলেছেন?

চলবে...

এমআরএম/এএসএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]