কিযীর ইচ্ছের মানচিত্র যেন মানব মনের সুরতহাল

মো. ইয়াকুব আলী
মো. ইয়াকুব আলী মো. ইয়াকুব আলী
প্রকাশিত: ১১:৫৭ এএম, ২০ আগস্ট ২০২২

ইচ্ছের মানচিত্র সুলেখিকা কিযী তাহনিনের প্রথম গল্পগ্রন্থ। এই বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখা আছে, ‘কিযী তাহনিন তাকিয়ে দেখতে ভালোবাসেন, চারপাশ-জংলা কিংবা পুষ্পবাগান। শ্যাওলা সবুজ ডোবা কিংবা টলটলে স্বচ্ছ পুকুর। কাছে, দূরে, প্রাণ আর অপ্রাণের মাঝে খোঁজেন বেঁচে থাকার সূত্র, হৃদয়-সাগরে লুকিয়ে থাকা অমূল্য মণি-মাণিক্যের গল্প।’

বইটা পড়া শেষ করার পর এই কথাগুলোর মর্ম বুঝা যায়। এই বইয়ে মোট গল্প আছে আঠারোটা। প্রত্যেকটা গল্পের বিষয়বস্তুই আলাদা। সেখানে একদিকে যেমন আছে বাড়ির কাজের ছেলের রুটিন করে প্রতি বছর হারিয়ে যাওয়ার গল্প তেমনি আছে রাস্তার পাশে রোজ রোজ এসে ঠাঁই বসে থাকা পাগলের গল্প।

একদিকে চাঁপা ফুলের গল্প, হারাধন নামের একটা গরুর গল্প আবার পাশাপাশি আছে হঠাৎ বিয়ের গল্প, খুন্তি বুড়ির গল্প৷ তবে গল্পের বিষয়বস্তু যাইহোক না কেন লেখক অত্যন্ত সুনিপুণভাবে গল্পের চরিত্রের মনের ভাবনাগুলো তুলে এনেছেন। গল্পগুলো পড়তে বসলে আপনি নিজেই এক একটা চরিত্র হয়ে উঠবেন। আর অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করবেন লেখক আপনার ভাবনাগুলো তো বটেই এমনকি আপনি যেগুলো অবচেতন মনে কখনও কখনও কল্পনা করেছেন সেটাও তুলে এনেছেন এই বইয়ের পাতায় পাতায়।

আপনি নিজের অজান্তেই বইয়ের জীবন্ত হয়ে উঠা অক্ষরগুলো ছুঁয়ে দেখবেন। বইয়ের গল্পগুলো কি আসলেই খুব সাধারণ চিরায়ত গল্প? এমন একটা প্রশ্ন পাঠকের মনে তৈরি হতে পারে। এমন বিষয়বস্তু নিয়েও যে গল্প লেখা যায় এটাই পাঠককে বারবার ভাবাবে। বিংশ শতাব্দী পেরিয়ে আমরা প্রযুক্তির উৎকর্ষতার শীর্ষে অবস্থান করছি। এখন যান্ত্রিকতা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর এই যান্ত্রিকতার সঙ্গে তাল মেলাতে যেয়ে আমরা নিজদের মনের কোণে উঁকি দেওয়ার সময় পর্যন্ত পাচ্ছি না। লেখক এই বইয়ে আমাদের হয়ে ঠিক সেই কাজটাই করেছেন।

আর লেখকের বর্ণনা শৈলি, উপযুক্ত উপমার প্রয়োগ লেখাগুলোকে আরও আপন করে তুলেছে। ভাষা একটা এলাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের সাথে যেমন সম্পর্কিত ঠিক তেমনি সে এলাকার জীবনাচারের সাথেও ওতোপ্রোতভাবে মিশে যায়। আবার সময়ের প্রয়োজনে ভাষারও বিবর্তন হয়। পুরোনো শব্দ ত্যাগ করে নতুন নতুন শব্দ সম্ভারে সজ্জিত হয়। এই বইয়ে এমন কিছু শব্দ এবং ভাষা আছে যেগুলো এখন আর সচরাচর ব্যবহার করা হয় না বা গল্পের বইয়ের পাতায় স্থান পায় না। হয়তোবা অভিধানের পাতায় শুয়ে শুয়ে তারা নিজেদের মৃত্যুর প্রহর গুনে চলেছে।

এবার সেই শব্দগুলোর দিকে একটু নজর দেওয়া যাক। ‘হৃৎ জমিনে গল্পের কয়েকটা লাইন এমন, ‘এই গল্পে মিশে আছে প্রতিদিনের হিসাব-নিকাশ। রোজকার হেঁশেল থেকে ভেসে আসা চেনা ফোড়নের ঘ্রাণ, পটোল আর আলু ভাজি, সর্ষে শাক দিয়ে কুঁচো চিংড়ির, শোয়েব, শারমিন আর ঝর্ণা। শৈলেনদা আর সন্ধ্যামালতি, খলিল মোল্লাবার এমনি আরও অনেকের। এমনকি একটি গোলাপি নকল মুক্তা বসানো সোনার নাকফুলেরও।’

‘অঙ্কলক্ষ্মী’ গল্পের মঈনের গায়ের রঙকে মা বলতেন, ‘গম রঙা গায়ের রঙ।’ ‘আত্মবিশ্বাসের ষড়যন্ত্র’ গল্পের খাইরুল জোয়ার্দার যাকে বন্ধুরা মজা করে খাইরুল জর্দা নাম দিয়েছে তার একটা বক্তব্য এমন, ‘আমি খাইরুল জর্দা বলছি থুক্কু খাইরুল জোয়ার্দার বলছি। ‘নায়ক হয়ে ওঠার গল্পের একটা লাইন এমন- ‘ছেঁড়া ইচ্ছেগুলোকে কুড়িয়ে নিয়ে জোড়াতালি রিফু করে আবার ঠিকঠাক করতে ইচ্ছে করে।’ ‘রাস্তাটা ভেঙে যাচ্ছে থমকে যাওয়া সময়ের একটি লাইন এমন, ‘কোনো হুরপার নেই, একটু একটু করে ভাঙছে।’

‘হৃদয় পুড়ে হৃদয়পুরে’ গল্পের একটা লাইন এমন, ‘ফোকলা দাঁতে হামানদিস্তা ছেঁচা পান মুখে রসালো লাল হাসি।’ ‘পেয়ারউদ্দিন খানের সাদা সুখ’ গল্পের একটা লাইন এমন- ‘মিসেস দোয়া পড়ে মাথায় ফুঁ দিতে যেয়ে হাতের খুন্তির ঝোল লাগিয়ে দিল সাদা শার্টে।’

এক্কা-দোক্কা তেক্কা গল্পের কয়েকটা লাইন এমন, ‘গাছপাড়া আম দিয়ে, পাটি পাতা, কড়া রোদে বিছানো আমসত্ত্ব তৈরির গল্প। কোমর ছড়ানো চুলে খেজুর বেণি বাঁধার গল্প, শীতের সকালে পুকুরে প্রায় ডুবতে বসা, বেশ ওঠা এক ছেড়া, পুরনো হলদে হয়ে যাওয়া সময়ের গল্প।’ এমন আরও অনেক শব্দ এবং বাক্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এই বইয়ের সর্বত্র।

বইয়ের নামের সাথে মিল রেখেই লেখক প্রত্যেকটা গল্পের চরিত্রগুলোর গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন। এবার সেদিকে নজর দেওয়া যাক। ‘মধুর রব’ গল্পের মনু মিয়ার অভিমানের পরিমাণ বোঝাতে লিখেছেন, ‘বিশাল মেঘের সমান বড় এক দলা অভিমান।’ ‘আপনার চেয়ে আপন যে জন’ গল্পের কয়েকটা লাইন এমন, ‘মুগ্ধ লতার কাছে বিয়ে মানে এখন একসাথে মরে যাবার বাজি। আমি নাকি তার জীবনের চাঁদের আলো। নয়ন পানে না তাকিয়েও হৃদয় ছোঁয়া যায় ও তিনি তো বুঝলেন সেই জ্যৈষ্ঠ দিনে ও আর তো আসবে না ফিরে অমন দিন।’

‘হৃৎ জমিনে’ গল্পের কয়েকটা লাইন এমন, ‘খুব কাছে যা থাকে তাকে ভালোবাসায় উত্তেজনা কম, দূরের ভালোবাসা কাছে টানে বেশি। পুরনো কিছু যখন নতুন করে ফিরে আসে, তখন তাকে আরও নতুন মনেহয়। ‘হারাধন’ গল্পের গৌতমের সাথে তার গোয়ালের গরুর কথোপকথন এমন, ‘তোর চোখ দেখলি বিমলার জন্য মন কেমন করে, আর বিমলারে যখন কানতি দেখি, তখন ওর চোখ, কেমন যেন তোর চোখের মতন লাগে।’ এই গল্পের অন্য একটা জায়গায় গৌতম তার বউকে বলছে, ‘শরম তো বড়লোকেরা টাকা দিয়ে কেনে, চাষাদের কোন শরম থাকতি নেই।’

‘স্মৃতি বর্তমান’ গল্পে লিখেছেন, ‘সংগ্রামের দেশে ভয়কে বাস্তুহারা হতে হত, দুটো একসাথে থাকতে পারে না। সময় সংগ্রাম আর ভয়কে একসাথে থাকতে দেয় না।’ ‘আজ দিনটা অন্যরকম’ গল্পে লিখেছেন, ‘প্রতিটি জানালা যেন বইয়ের মলাট। কপাট খুলে দিলে গল্প মেলে, জানালার ওপাশে।’

অঙ্কলক্ষ্মী গল্পে লিখেছেন, ‘সম্পর্ক হলো বাতাবিলেবুর মতো। শক্ত সবুজ ভদ্রতার খোসাটি ছাড়ালে, হালকা গোলাপি আস্তরণের মতো সামাজিকতার স্বচ্ছ আড়াল। সেই পর্দার আড়াল মিটলেই সম্পর্কের রঙ আর টকমিষ্টি স্বাদ বোঝা যায়।’

‘আত্মবিশ্বাসের ষড়যন্ত্র’ গল্পে লিখেছেন, ‘বেঁচে থাকা, শুধু নিঃশ্বাস নেয়া ছাড়াও আরও কত কিছু যে শেখায়। কিছুটা ভুল আর বিশ্বাস মেশানো বেঁচে থাকা নির্ভর করে তাকে। অন্যের কাছে জিতবার চেয়েও নিজের কাছে জিতে যাওয়ার অনুভূতি তাকে আনন্দ দেয়।’

‘নায়ক হয়ে ওঠার গল্পতে লিখেছেন, ‘মধ্যবিত্ত পরিবারের সিন্দুকে অর্থকড়ি না থাকুক, সম্মান নামক এক অদৃশ্য ঐতিহ্য যত্নে রাখা থাকে। পুরনো মখমল কাপড়ে মোড়ানো সেই ঐতিহ্যবাহী সম্মানকে সামান্য এদিক-সেদিক নাড়াচাড়া করালেই তা ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ে।’ ‘গুণে আর দোষে’ গল্পে লিখেছেন, ‘সবাই যে যার মতো খুশি, সহজে সরলে, গুণে আর দোষে। সবাই সবার মতো করে খুশি।’

এই বইয়ের ভূমিকায় লেখক লিখেছেন, ‘জীবন তো আসলে জীবনের চেয়েও বড়। জীবন নামের এক বিস্ময়কর ক্ষেত্রে গল্প আর চরিত্রেরা সীমানার তারকাঁটা পরোয়া করে না। তারা ইচ্ছে মতো আসে, ইচ্ছে মতো ভাসে, ইচ্ছে মতন ফিরে যায়। তৈরি করে মানচিত্র। ইচ্ছের মানচিত্র।’ এই কথাগুলোই এই বইয়ের গল্পগুলো সম্মন্ধে সবচেয়ে মানানসই বর্ণনা।

এই বইটা লেখকের প্রথম প্রকাশিত বই। কিন্তু এই বইয়ের গল্পগুলো পড়লে সেটা কখনওই মনে হয় না। মনে হয় যেন একজন অনেক অভিজ্ঞ লেখক এমন গল্প হরহামেশাই লেখেন। এই বইয়ের মুখবন্ধে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের কথাগুলো দিয়ে লেখাটা শেষ করতে চাই।

যেগুলো আসলে লেখক সম্পর্কে আমার নিজেরও উপলব্ধি, ‘কিযীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাটা প্রবল। চরিত্রদের মনোজগতের ভেতরেও সে জোরালো আলো ফেলতে পারে। পাঠককে সহযাত্রী করতে পারে তার চরিত্রদের, যেহেতু তারা উঠে আসে আমাদের নিত্যদিনের, চেনাশোনার পরিমন্ডল থেকে।’

এমআরএম/এএসএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]