বৈধপথে এসেও আজ আমরা অবৈধ

জিসান মাহমুদ
জিসান মাহমুদ জিসান মাহমুদ , লেখক ও পর্যটক, কুয়েত
প্রকাশিত: ০৮:৫৭ এএম, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২
ছবি: সংগৃহীত

‘এসি-ফ্যান কিছুই ছিল না। মরুভূমিতে নিজেকে খাপ খাওয়াতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এমনও সময় গেছে শুধু খুবুজ (রুটি) খেয়ে দিন পার করেছি। অনেক সময় কুয়েতি মালিক মারধরও করতেন। এতকিছুর পরও ঠিকমতো টাকা পেতাম না। এখনো তিন মাসের বেতন পায়। একটা সময় বাধ্য হয়ে অবৈধ হয়ে যাই।’

হৃদয়-বিদারক কথাগুলো বলছিলেন রাজবাড়ি সদর উপজেলার করিম মিয়া (ছদ্মনাম)। ২০১৫ সালে পরিবারের সুখের আশায় ভাগ্যের খোঁজে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতে পাড়ি জমান তিনি।

‘দালাল বলেছিলেন, দোকানের ভিসায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বেতন হবে ৪০-৪৫ হাজার টাকা। দালাল আপন চাচা হওয়ায় বিশ্বাস করে ৩ লাখ টাকা দিয়ে ভিসা নিয়েছিলাম। কুয়েতে এসে দেখি কথার সঙ্গে কাজের কোনো মিল নেই। পাঠিয়ে দিয়েছে ধুধু মরুভূমিতে।’

করিম মিয়া বলেন, কুয়েতের ওপরা অঞ্চলে মরুভূমিতে আমাকে উট চরানোর কাজ দেওয়া হয়। সারাদিন উট নিয়ে কাজ করার পর একটু স্বস্তিতে ঘুমাবো, সেটাও পারতাম না। না আছে এসি, না আছে ফ্যান। ছিল না কোনো ফ্রিজ। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে যেতাম। বেতন যেখানে ৪০-৪৫ হাজার টাকা দেবে বলা হয়েছিল সেখানে দিচ্ছে ৭০ দিনার। যা বাংলাদেশি টাকায় সাড়ে ১৯ হাজার।

‘দেশে থাকতেই ভালো ছিলাম। মাসে ৩০ হাজার টাকার বেশি আয় করতাম। আরেকটু বেশি উপার্জনের আশায় কুয়েতে এসে যেন ‘নরকে’ পড়ে গেলাম। নিজ চাচা এমন বেঈমানি করবেন, তা ভাবতেও পারিনি। আসার পর চাচাকে বললাম, আপনি আমাকে মরুভূমিতে নিয়ে আসবেন সেটা আগে বলেননি কেন? চাচার কোনো উত্তর নেই। বললেন, তিনি নিজেই এসব কাজ করেছেন।’

তিনি বলেন, বেতন বাড়ানোর জন্য বারবার কুয়েতি মালিককে তাগিদ দিলেও একটি পয়সাও বাড়াননি। অবশেষে ২ বছর পর ২০ দিনার বাড়লো। বেতন বাড়ানো হলো ঠিকই কিন্তু মালিক পরিবর্তন হওয়ায় এবার বেতন বন্ধ করে দেওয়া হলো। ৯ মাস কোনো বেতন দেওয় হয়নি।

শুধু যে করিম মিয়ার বেতন বন্ধ করে দিয়েছে তা নয়, ওখানে যারা কাজ করতেন সবার একই অবস্থা। এরপর ছুটিতে যাওয়ার জন্য আবেদন করলে তাও দিতে নারাজ তার মালিক।

‘একবার মালিক কয়েকদিনের জন্য উটের সঙ্গে সৌদি নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে যে পরিমাণ কষ্ট করেছি তা বোঝানোর মতো নয়। মরুর বুকে সপ্তাহে তারা কয়েকদিন কিছু সময়ের জন্য আসে। এসে প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে যায়। আমাদের তো এখান থেকে বের হওয়া নিষেধ।’

তিনি বলেন, এখন আর চাচার দেখা পায় না, বাড়িতে চিন্তা করবে তাই কিছুই জানায়নি। ৩ বছর শেষ হলে কোম্পানি ছুটি দেয়। সঙ্গে ৬ মাসের পাওনা বেতন দিয়ে দেয়। বাকি ৩ মাসের বেতন আসার পর দেবে বলেছিল। ছুটি কাটিয়ে এসে যখন পাওনা বেতন চাইলাম তখন মালিক বললো আমার চাচাকে টাকা দিয়ে দিয়েছে। চাচার কাছে ফোন করতেই চাচা তা অস্বীকার করে।’

‘৩ মাসের বেতন আর পেলাম না। এর মধ্যে অনেকে কষ্ট সহ্য করতে না পেরে সেখান থেকে অন্য জায়গায় চলে যায়। তখন মাত্র আমরা দুইজন ছিলাম। এখানকার কাজ এত কষ্ট যে অন্যান্য দেশের শ্রমিকরা এ ধরনের কাজ করতেই চাই না। দীর্ঘ সময় মরুর তপ্ত বালুতে কাটাতে হয়। অনেকটা বন্দি বা নির্বাসিত জীবনের মতোই।’

মরুভূমির আশপাশে কোনো লোকালয় না থাকায় বাড়তি আয়ের সুযোগ নেই এসব শ্রমিকদের। অন্যদিকে কুয়েতে যে কোনো কাজ করাও অবৈধ। যে কাজের জন্য তিনি নিবন্ধিত, ঠিক সেই কাজ ছাড়া অন্য কোথাও কর্মরত থাকা অবস্থাই পুলিশের হাতে ধরা পড়লে সরাসরি জেল-জরিমানা। পরে জেলখাটা আসামির পরিচয়ে চিরতরে ছাড়তে হয় কুয়েত।

একটা সময় করিম মিয়া সেখান থেকে চলে যান কুয়েত সিটিতে। সেখানে অবৈধভাবে দিন পার করছেন এখন। নরক থেকে মুক্তি পেলেও তার মনে ভয়ের চিন্তা কাজ করে সবসময়। ধরা পড়লেই নির্বাসিত। এমনকি জেলও খাটতে হতে পারে। বর্তমানে প্রচুর সংখ্যক প্রবাসী বৈধপথে এসে অবৈধভাবে কুয়েতে অবস্থানরত। এদের বেশির ভাগই দালালের ফাঁদে পড়ে নিজের সর্বস্ব হারিয়েছেন।

সরকার রেমিট্যান্সের আশা করে কিন্তু এসব প্রবাসীদের কথা একবারও ভাবেন না, আক্ষেপ করিম মিয়ার। বৈধপথে এসেও তাদের অবৈধ থাকতে হচ্ছে। অবৈধ থাকা আর জেলখানায় থাকার মাঝে কোনো তফাৎ নেই। পুলিশের ভয়ে কোথাও বের হওয়া যায় না।

তারা যে রেমিট্যান্স পাঠাবে তার মাধ্যম কী? বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠাতে হলে তো সিভিল আইডি (পরিচয়পত্র) প্রয়োজন। সেটা তো তাদের নেই। সরকার এর কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। তাহলে কেন তারা বৈধপথে রেমিট্যান্স আশা করেন?

এমআরএম/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]