আপনি কি জীবন নিয়ে হতাশ?

শায়লা জাবীন
শায়লা জাবীন শায়লা জাবীন
প্রকাশিত: ১১:০২ এএম, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২
প্রতীকী ছবি

পরের সপ্তাহ। পারিজাত তার চেম্বারে বসে সিফাত রহমানের পাঠানো প্রশ্নোত্তর পড়ছেন যা পাঁচ দিন আগেই ই-মেইলে এসেছে। তখনও একবার পড়েছেন, এখন আবার। পড়ার পর একটু চিন্তাতেই পড়লেন তিনি। সিফাত বেশ সরাসরি কথা বলে। সিফাতের জিপির নাম দেখলেন। এরপর উঠে গিয়ে সিফাত রহমানকে ডাকলেন।

সিফাত নিজের নাম শুনে উঠে দাঁড়ালেন এবং ভেতরে এসে গুডমর্নিং বলে বসলেন। আগের মতোই চুপচাপ বসে আছেন নিজের হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে।

গুডমর্নিং, কেমন গেলো আপনার সপ্তাহ?

যেমন যায় সবসময়....

আপনার প্রশ্নের উত্তরগুলো আমি পেয়েছি। ধন্যবাদ আগে পাঠানোর জন্য। আমি কিছুটা সময় পেয়েছি উত্তরগুলো পড়ার। আপনি কি আপনার দেওয়া উত্তরগুলোর সঙ্গে এখনো একমত নাকি কোনো উত্তর বদলাতে চান?

জ্বি, একমত। কিছুই বদলাতে চাই না। আপনার কাছে কি অবাক লাগছে উত্তরগুলো?

নাহ, আমার অবাক লাগেনি। আমি আমার প্রফেশনের জায়গা থেকে প্রশ্নটা করেছি। এটা আমার কাজ, যেকোন সিদ্ধান্ত ক্লায়েন্ট ঠান্ডা মাথায় নিচ্ছে কি না কনফার্ম হওয়া। কারণ উত্তেজনা, রাগের মাথায় আমরা অনেক সময় বেঠিক সিদ্ধান্ত নেই।

সিফাত খুব স্বাভাবিকভাবেই বললো, আমি কি রেগে আছি বলে আপনার মনে হচ্ছে? আমি ঠান্ডা মাথাতেই উত্তর লিখেছি। আপনি আমার গত নয় বছরের কাহিনির ৩০-৪০ মিনিট শুনেছেন মাত্র।

কিন্তু আমি জানি গত নয় বছর, মানে ১০৮ মাসের প্রতিটা দিন রাত মিনিট ঘণ্টা সেকেন্ড আমার কেমন গেছে। সবার জীবনে তো একটা চাওয়া থাকে। মানুষ তো আমরা সবাই আলাদা, তাই না।

জ্বি, তা তো অবশ্যই...

অনেক বছর আগে, এসএসসি শেষ করে অপেক্ষা করছিলাম ফলাফলের জন্য। কলেজে ভর্তি হবো, তখন আমাদের এলাকার শেষ গলিতে একটা দোতালা বাসায় একটা ফ্যামিলি আসলো। ওই বাসায় একটা মেয়ে ছিল। নীলাঞ্জনা নাম। মেয়েটাকে খুব মনে ধরেছিলো সেই সময়, আমাদের বাসার সামনে দিয়ে স্কুলে যেত, ক্লাস টেনে পড়তো, আমার এক ক্লাস নিচে।

কী যেন একটা ছিল মেয়েটার চেহারাটায়। ধারালো কিছু নয়। কিন্তু খুবই স্নিগ্ধ। চোখ ফেরানো যেত না। দেখলেই থমকে যেতাম। সেও বরাবরই চুপচাপ ছিল। মাঝে মধ্যে চলতে ফিরতে দেখা হত। দৃষ্টি বিনিময়, আর কিছু না।

কিন্তু বাবার সরকারি বদলির চাকরি। ঠিক ওই সময়ে বাবা বদলি হয়ে ঢাকায় চলে আসেন। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও। খুব মন খারাপ হয়ে যায়। নীলাঞ্জনাকে হারিয়ে ফেলি, কখনোই আর খুঁজে পাইনি।

এখনো নীলাঞ্জনার মতো বা কাছাকাছি চেহারার কোনো মেয়ে দেখলেই চমকে যাই, মনে হয় নীলা না তো?

একটা বেশ বড় দীর্ঘশ্বাস ফেললো সিফাত। কিছুক্ষণ চুপ থেকে এরপর আবার শুরু করলো বলা।

ঢাকায় এসে এইচএসসি শেষ করলাম, খুবই ব্যস্ততায় সময় গেলো, ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়ে ভর্তি হলাম, ফার্স্ট ইয়ার এ ক্লাসের একটা মেয়েকে ভালো লাগলো, কারণ মেয়েটার চেহারার আদলে কোথায় যেন নীলার সঙ্গে মিল ছিল, ভাবছিলাম একদিন বলবো কিন্তু কীভাবে! হঠাৎ দেখি বলার আগেই ক্লাসের অন্য এক ছেলের সঙ্গে সে এনগেজ, তাই আর বলাই হয়নি। পরে ওরা বিয়েও করেছে।

এরপর পরিচয় হয়েছে অনেকের সঙ্গেই কিন্তু ওইভাবে আর কাউকে আর মনে ধরেনি। মাঝে মাঝে ফ্যান্টাসি পেয়ে বসতো, নীলাঞ্জনাকে নিয়ে চন্দ্রিমার কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে হাঁটছি বা রমনায় খুব মনে হতো। ইসস... যদি রাস্তায় হঠাৎ করে একদিন নীলাঞ্জনাকে দেখতে পেতাম!

কিন্তু দেখা আর পাইনি...

এভাবেই পড়াশোনা শেষ করে চাকরিতে ঢুকলাম। সেখানে আমার এক কলিগ আমাকে পছন্দ করতো। আমি বেশ বুঝতাম কিন্তু আমার তাকে মনে ধরলো না। সে পিছু লেগেছিল, ফোন করতো। টেক্সট করতো। বাইরে দেখা করতে চাইতো। ছুটির দিনে একসঙ্গে লাঞ্চ করতে বলতো।

আমি তাকে এড়াতে গিয়ে চাকরি বদলিয়ে ফেললাম। জয়েন করলাম নতুন চাকরিতে। এই চাকরি আগেরটার চেয়েও ভালো।

বাসায় ওই সময় মেয়ে দেখছিলো। তাদেরও অনেক বাছ-বিচার, চাওয়া পাওয়া। বড় ভাই বোনের এনে দেওয়া মেয়েদের বায়োডাটা দেখি।

ছবি দেখি। দু’একটাতে আগ্রহ দেখাই কিন্তু বাসায় দেখি চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সেগুলো বাদ দেয় বা ভুল বের করে। এক সময় আমার মা বললেন, আচ্ছা বিয়ে তো করবে সিফাত, সংসার করবে সে। তোমরা এত বাছ-বিচার করছো কেন? সিফাতকে পছন্দ করতে দাও।

কারোরই বিষয়টা পছন্দ হলো না, সবার ধারণা আমি আবার কিছু বুঝি নাকি! আমি বাসার সবার ছোট তাই কারোর তেমন ভরসা নেই আমার প্রতি।

এরপর আরও ৭-৮টা বায়োডাটা দেখে, ৩টা মেয়েকে শর্ট লিস্টেড করার পর জাফিরাকে ফাইনাল করলো বাসায়। আমরা মেয়ে দেখতে গেলাম। আচার ব্যবহার কথাবার্তা ভালো। ফ্যামিলির সবাই শিক্ষিত। দু’পক্ষের মতের ভিত্তিতেই আমাদের ফোনে কথা বলা শুরু হলো, আরও ২/৩ বার কফি বা আইসক্রিম খেতে গিয়ে দেখা হলো আমাদের।

কাজের ফাঁকে বা ছুটির দিনে ফোনে কথা হতো, কখনো টেক্সট। আমি ততদিনে বুঝে গিয়েছিলাম বাসার পছন্দেই বিয়ে করতে হবে। নয়তো ঝামেলা বাড়বে, মেনে নিলাম।

কিন্তু বিশ্বাস করুন এই যে ফোনে কথা বলতাম, জাফিরা তখন তার মা বা বোনের কথা কিছু বলতো না। দুই একবার কেনাকাটা সংক্রান্ত বিষয় ছাড়া। আমার কাছে মেয়েটাকে খারাপ লাগেনি, চেহারায় মিষ্টি একটা ভাব আছে। তুলনামূলক অবিবাহিত মেয়েদের চেয়ে একটু স্বাস্থ্য ভালো।

এজন্য সবসময় বলতো সে তার বোনের দেওয়া জিমের ডায়েট ফলো করছে। আমি স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছি। এসব নিয়ে অত মাথা ঘামাইনি, বিয়ে হয়ে গেলো ঠিকঠাক মতোই।

কিন্তু সবকিছুই উল্টে গেলো বিয়ের পরদিন থেকে। তিনদিন পর হানিমুনে মালদ্বীপ যাওয়ার কথা ছিল। শুরু হলো। তার বড় বোন বলছে মালদ্বীপ কি কেউ যায়? টিকিট বদলিয়ে সিঙ্গাপুর যেতে বা পাতোয়া।

কিন্তু আমার তো খুব শখ ছিল মালদ্বীপ যাওয়ার! বিয়ের পরদিন থেকেই জাফিরা ঘ্যান ঘ্যান শুরু করলো। অগত্যা টিকিট বদলাতে হলো। এরপর থেকে আমি আমার সব ইচ্ছে বদলাচ্ছি, এখনো।

খুবই দুঃখজনক, খারাপ লাগছে আপনার জন্য...

জাফিরা আপনাকে বুঝতে পারেনি...

চেষ্টা করলে না বুঝবে, বিয়ের সব অনুষ্ঠানের পর আমার আম্মা ওদের বাসার সবাইকে দাওয়াত দিলো। আমি এমনিতে ডাল ভাত মাছ পছন্দ করি। তারপরে গরমের আবহাওয়া, টানা ৪টা বিয়ের অনুষ্ঠানে পোলাও, বিরিয়ানি খেয়ে ক্লান্ত, আম্মাকে বললাম ভাত, ডাল, মাছ, ভর্তা এগুলো রান্না করতে। একটু পর শুনি আমার শাশুড়ি নাকি ফোন করে জাফিরাকে বলেছে কাচ্চি বিরিয়ানি, রোস্ট, বোরহানি কাবাব করতে। তা না হলে নাকি তাদের মান সম্মান থাকবে না!

আমি যখন আম্মাকে বলছিলাম সেসব কথা শুনে জাফিরা তার মাকে ফোন করে সব বলে দিয়েছে। এরপর তনি কন্ডিশন দিয়েছেন।

আচ্ছা বলুন তো খাওয়ার মেনু দিয়ে কারো মান সম্মান বাঁচানো যায়?

নতুন বিয়ে করা বউ জাফিরা। তাই তাকে কিছু না বলে আম্মাকেই মেনু বদলাতে বললাম। পরপর এত রিচ খাবার খেয়ে আমি অসুস্থ হয়ে গেলাম। জাফিরার সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, সে হাত পা নেড়ে তার মা বোন কি কি বলেছে আর কোন আত্মীয় কি কি এনেছেন সেগুলোর বয়ান।

সেই যে শুরু... এখনো চলমান

জ্বি, বুঝেছি

আসলে বাংলাদেশে একটা ছেলের সঙ্গে একটা মেয়ের বিয়ে হয় না। বিয়ে হয় এক পরিবারের সঙ্গে আর এক পরিবারের। সবাই নিজেদের স্ট্যাটাস, চাওয়া পাওয়ার সামাজিকতা নিয়ে এত ব্যস্ত থাকে যে মাঝপথে দুটো ছেলেমেয়ের সারা জীবনের সম্পর্ক কোনখানে গিয়ে আটকে যায়, সেই খবর কেউ রাখে না।

গত সাত দিনে আপনি জাফিরাকে কিছু বলার চেষ্টা করেছেন? আপনার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে?

নাহ, বাসা মাথায় তুলবে। গেলো সপ্তাহে একদিন রাতে শুয়ে থেকে বললাম, পরশু আমার ছুটি আছে, তুমিও অব নাও। চলো দুজনে বিচে যাই। অনেকদিন যাইনি।

জাফিরা বললো তিনমাস আগেই তো গেলাম চার ফামিলি মিলে। তৃনা ভাবির কথায় এখনো তার মেজাজ খারাপ হয়ে আছে। মহিলার কথার কোনো হুস নাই। (জাফিরা সেদিন যে ড্রেস পরে গিয়েছিলো সেটা তার বোন দিয়েছিলো। লেটেস্ট ডিসাইন, বিখ্যাত ব্র্যান্ড, কিন্তু তৃনা ভাবি নাকি বলেছেন ওটা একবছর আগের ডিজাইন।

তার ছোট ভাইয়ের বউয়ের ওই ড্রেস পরা ছবি আছে ফেসবুক এক বছর আগের। উনি সেই ছবি ফেসবুকে বের করেও দেখিয়েছেন সেদিন। এরপর থেকে জাফিরার মুখকালো, ফেরার সময় গাড়িতে উঠেই তার বোনকে ফোন দিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি, কান্নাকাটি।)

বললাম, আহা এবার তো আমরা দুজনে যেতে চাচ্ছি। অন্য কেউ না।

বললো, তার কাজ আছে সে ছুটি নিতে পারবে না। বাচ্চাদের স্কুল খোলা, তার বোন বলছে এভাবে হুটহাট বেরিয়ে পয়সা নষ্ট না করে টাকা জমিয়ে নিউজিল্যান্ড বেড়িয়ে আসতে। অন্য একটা দেশ দেখা হবে। আমার এত বিচে যাওয়ার শখ, আমি যেন বাথটাবে পানি ঢেলে বসে থাকি।

এরপর এই মেয়ের সঙ্গে কি কথা বলবো? আপনি বলুন মানুষ কেন বিয়ে করে? আমি একজন ভালোবাসার মানুষ চেয়েছিলাম, জাফিরার সঙ্গে আমার কোনো মেন্টাল অ্যাটাচমেন্ট নাই, আমি অনেক চেষ্টা করেছি, পারিনি।

জ্বি, বুঝেছি। যেই বয়সটায় মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠিত হয়। ঠিক সেই বয়সে ভুল পারেনটিং, অতিরিক্ত কনন্ট্রলিং বিহেবিয়ারের কারণে জাফিরার ব্যক্তিত্ব গঠন ব্যাহত হয়েছে। জাফিরার মনে বদ্ধমূল ধারণা হলো তার মা এবং বোন যা বলেন সবকিছুই ঠিক এবং তার বাবা-মার পরিবার পৃথিবীর আদর্শ ফামিলি।

এর বাইরে অন্যরা ভুল বা বেঠিক। খুব ছোট গন্ডিতে অতিরিক্ত নজরদারি আর চাপিয়ে দেওয়া মনোভাবের কারণে উনি এমনটা হয়ে গেছেন যেটা বদলানো কঠিন, কারণ উনি যেন এমনটাই থাকেন তা তার মা চেয়েছেন। জাফিরা নিজে নিজের সমস্যাটা বুঝলে হয়তো বা কিছুটা কমতো!

আমি কি আপনার দেওয়া প্রশ্ন উত্তর নিয়ে আপনার সঙ্গে একটু আলোচনা করতে পারি?

অবশ্যই পারেন। আমি তো এসেছি এখানে আলোচোনা করতেই।

প্রশ্নগুলোতে বেশিরভাগ উত্তর হ্যাঁ, না অথবা উত্তর দিতে অনিচ্ছুক এমনভাবে সাজানো। আর কিছু উত্তর আছে নাম্বারিং। ১ থেকে ১০, সংখ্যার আধিক্য পজিটিভ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এছাড়া কিছু উত্তরের নিচে আপনার নিজের ব্যাখ্যা করার অপশনস আছে।

জ্বি

একটা প্রশ্ন ছিল এমন...

আপনার বর্তমান জীবনকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন, নম্বর ১-১০।

আপনি স্কোর করেছেন ৪!

আপনি কি বর্তমান জীবন নিয়ে হতাশ?

আপনি লিখেছেন, হ্যাঁ।

কারণও হিসেবে সুন্দর ব্যাখ্যা করেছেন।

আপনি কি আপনার স্ত্রীকে নিয়ে কতখানি সুখী?

আপনি কোনো নম্বর সিলেক্ট না করে, নিচে শূন্য (0) লিখেছেন, কারণ বলেননি।

অন্য একটি প্রশ্নে আপনার কি কখনো নিজের ক্ষতি করতে ইচ্ছে করে? আত্মহত্যা বা মরে যেতে ইচ্ছে করে?

আপনি উত্তর দিতে অনিচ্ছুক লিখেছেন।

আপনার কি কাউকে মেরে ফেলতে বা ক্ষতি করতে ইচ্ছে করে কি?

আপনি হ্যাঁ বলেছেন,

কিন্তু কাকে লেখেননি।

বাকি প্রশ্নের উত্তরে আমি পরে আসছি। এখন বলুন। আপনার কাকে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করে?

এমআরএম/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]