এমন মেয়ে কে বিয়ে করবে!

শায়লা জাবীন
শায়লা জাবীন শায়লা জাবীন
প্রকাশিত: ১০:৫৮ এএম, ০৫ অক্টোবর ২০২২
প্রতীকী ছবি

রিদিতা বসে আছে বারান্দার মেঝেতে। চোখ যদিও ঊর্ধ্বগগণে। এই ভর দুপুরে কি দেখছে এত মনোযোগ দিয়ে কে জানে। রিদিতার ঘরের সঙ্গেই এক চিলতে বারান্দা। শীতের রোদ পোহাতে, বর্ষার বৃষ্টিতে ভিজতে, গ্রীষ্মের কাল বৈশাখী হাওয়ায় উড়তে আর বসন্তে মন কেমন করতে জুড়ি নেই এই বারান্দার।

পাশেই একটা ছোট্ট মোড়া রাখা, কিন্তু রিদিতা মেঝেতেই হাঁটু গেড়ে বসা। রেলিংয়ের ধার ঘিরে টবে লাগানো কিছু সাকুলেন্ট আর পাতাবাহার। বাসার একদম পেছনের দিককার ঘরটা রিদিতার, তাই বারান্দাটাও পেছনেই। একটু সাবেকি আমলের বাড়ি, এজন্য বাড়ির পেছন দিকটা খানিকটা খোলা জায়গার পর উচু প্রাচীর।

ওদিকে তাকালে বাড়ির পেছন দিকটা কিছুটা দেখা যায়। সারাবেলা ধরেই হরেক রকম পাখিদের আনাগোনা। কাক, চড়ুই, বাবুই, শালিক, কোকিল ছাড়া তেমন কোনো পাখি চেনে না সে। মাঝে মধ্যে সাদা পালকের কিছু পাখি আসে। নাম জানে না, খুব জানতে ইচ্ছে করে নাম।

পেছনের বাড়িটার সীমানায় লাগানো তেঁতুল গাছ যার বেশিরভাগ ডালপালা রিদিতাদের বাড়ির অংশে এসে পড়েছে। মধ্যে দুপুরে সবাই যখন ভাত ঘুমে তখন বারান্দায় বসে ঘন সবুজ রঙয়ের তেঁতুলপাতা দেখতে বেশ লাগে। থেকে থেকে দক্ষিণা বাতাসও এসে গায়ে লাগে। আজ অবশ্য রিদিতা আকাশ দেখছে। কি যেন খুঁজছে, তাই মেঝেতে বসে তাকিয়ে যেন পুরো আকাশটা দেখা যায়।

অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পরে কিছু না পেয়ে কিছুটা হতাশ হয়ে উঠে দাঁড়ালো রিদিতা। এবার মোড়ায় বসলো। পা হাঁটু একদম ধরে গেছে। বসে বসে তেঁতুলপাতার দিকে চোখ ফেলতেই কানে কোকিলের ডাক ভেসে এলো। এখন বসন্তকাল, কোকিলরা তো ডাকবেই।

রিদিতা অনার্স থার্ড ইয়ারে কেমিস্ট্রিতে পড়ে। তুলনামূলক একটু চুপচাপ স্বভাবের মেয়ে কিন্তু মাঝে মাঝে একা কথা বলে। আজও যেমন বলছে কিন্তু কি যেন বলছে! হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের দিকে ফিরতে নিলো ঠিক তখনই রিদিতার মনে হলো কেউ মাথার ভেতরে বলছে, আজ শুক্রবার। মনে আছে কাল শনি, আর মাত্র একটা দিন।

রিদিতার গলা শুকিয়ে গেলো, মুখ রক্তশূন্য, উজ্জ্বল শ্যামা বর্ণের গায়ের রঙ। কোমর পর্যন্ত এক ঢাল কালো চুল। বেশ মায়াময় আঁখি, গরুর চোখের মতো বিশাল না। তবে মায়ায় ভরা, উচ্চতা মাঝারি। পাঁচফুট তিনের কাছে তবে বেশ হালকা গড়ন। দ্রুত সে তার ঘরে ঢুকে গেলো।

বিছানায় পা উঠিয়ে বসে নখগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলো। মৃদুলা ঘরে ঢুকলো, রিদিতার ছোট বোন, মাত্র দুই বছরের ছোট। কি রে আপা তোর কি হয়েছে? কি বকছিস।

কিছু না, তু্ই কখন এলি?

এখনই, আজও কোনো স্বপ্ন দেখেছিস, চেহারা এমন কেন?

না তো, এমনিতেই

শোন আপা, বাবা বলছে তোকে কোনো ভালো চিকিৎসক দেখাবে।

কেন? আমার কী হয়েছে?

এই যে যা স্বপ্ন দেখিস সব সত্য হয়ে যায়। আচ্ছা আপা আমাকে নিয়ে কিছু দেখিস না কখনো?

হু... নাহ, দেখি না।

আমি তোর এত কাছে থাকি, তাও দেখিস না! আজব ব্যাপার, তু্ই আমাকে নিয়ে একটুও ভাবিস না তার মানে।

ভাবি তো, কিন্তু স্বপ্ন তো না দেখাই ভালো। কি না কি দেখি!

আচ্ছা বলতো আজ কি বৃষ্টি হবে?

আমি তো আকাশে কোনো মেঘ খুঁজে পেলাম না।

তাহলে হবে না...

কিন্তু হওয়ার কথা তো

স্বপ্নে দেখেছিস?

আরে না...

রিদিতা বলতে চাচ্ছে না মৃদুলাকে যে সে কয়দিন ধরে মাথার ভেতরে কথাও শুনতে পায়। কবে জানি বাসার সবাই মিলে তাকে মানসিক হাসপাতালে রেখে আসে। এমনিতেই সে দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারে না। দিন দিন ওজন কমে যাচ্ছে। তিনদিন আগের দেখা স্বপ্ন ভাবলেই তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। কিন্তু সে কি করবে জানে না।

মৃদুলা আবার বেশি সুন্দর দেখতে। চেহারা বেশ কাটাকাটা। নাক-চোখ-মুখ ধারালো। চুল অবশ্য ছোট করে কাটা ঘাড়ের নিচে শেষ। সবেমাত্র অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে ম্যাথমেটিক্সে। রিদিতা খুবই পছন্দ করে তার বোনকে। বললো কাল কিন্তু কলেজ যাস না।

কেন?

এমনিতেই, ঝড়বৃষ্টি হবে

না, কাল যেতে হবে। নতুন এক স্যার এসেছে।

ক্লাসে ঢুকেই দেয়ালের দিকে তাকিয়ে লেকচার দেওয়া শুরু করে। আচ্ছা আপা আমি কি দেখতে খারাপ? বা অন্য মেয়েরা?

তা হবে কেন, স্যারের হয়তো প্রেমিকা বা বউ আছে। আর উনি তো পড়াতে আসেন, মেয়েদের দিকে তাকাতে না।

তো, থাকলে আছে, তাই বলে ছাত্রীদের দিকে তাকানো যাবে না? উনার সঙ্গে তো কেউ প্রেম করতে চাচ্ছে না, কেউ তো চিরকুট ও পাঠায়নি

‘চিরল চিরল তেঁতুল পাতা তেঁতুল বড় টক
তোমার সঙ্গে প্রেম করিতে আমার বড় শখ’

যত্তসব, দেয়ালের দিকে তাকিয়ে অংক করায়

তাহলে সেই ক্লাসে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে গেছিস কেন? না গেলেই হয়...

এজন্যই তো যাব, কত ধানে কত চাল হয় কাল দেখতে হবে। কাল আমাদের তিন বান্ধবীর একটা প্ল্যান আছে।

কী প্ল্যান?

বলা যাবে না তোকে, খেতে আয়। মা ডাকছে।

খিদে নেই রে, আমি একটু ঘুমাই তু্ই যা।

ইসস এখন ঘুমাবি?

মা কি রান্না করেছে আগে শোন, পালং শাক ছোট চিংড়ি দিয়ে, ছোট লাল আলুর ভর্তা, রুই মাছের দোপেঁয়াজা, আর মুগ ডাল দিয়ে মুড়ি ঘন্ট। আমার তো মনে হচ্ছে তিন প্লেট ভাত খেয়ে ফেলবো, তাড়াতাড়ি আয়, খেয়ে ঘুমাস।

আচ্ছা, তু্ই যা আসছি...

তু্ই গত রাতেও ঘুমাতে পারিসনি তাই না?

চল খেয়ে আসি...

অনেক আগের বানানো সেগুন কাঠের ভারি খাবার টেবিল, আর কাজ করা চেয়ার। তারা দুবোনই খেতে বসলো। অন্যপাশে ওদের বাবা-মা, রিদিতা কিছুই তেমন খেলোনা। বা খেতে পারলো না।

ওদের মা রোকসানা বেগম বললো, তুমি তো শুধুই নাড়াচাড়া করছো, খাচ্ছো না।

খেতে ভালো লাগছে না?

না, অনেক মজা হয়েছে মা...

খুবই ক্লান্ত লাগছে, ঘুমাবো

আচ্ছা, খাওয়া শেষ করে ঘুমাও

তোমার বাবা বলছিল আজ রাতে রাহাতকে আসতে বলবে। আমাদের সঙ্গে রাতের খাবার খেতে। তুমিও পরিচিত হলে।

আমি এখন বিয়ে করবো না মা, অনার্সটা শেষ করি।

রফিক সাহেব গলা খাকারি দিয়ে বললেন, আহা দেখা সাক্ষাৎ হলেই বিয়ে করতে হবে কে বলেছে? কথা বলে দেখো কেমন লাগে।ছেলেটাকে ভালো মনে হলো তাই আসতে বলেছি। অনার্স শেষ করার আগে আমিও তোমার বিয়ে দিতে চাই না। মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়াটা জরুরি, তোমারতো আরও বেশি, তোমার শরীর কেমন এখন?

জ্বি আব্বা, ভালো।

কালকে মৃদুলাকে কলেজে যেতে দিও না তোমরা। ঝামেলা হবে। আমি উঠি তোমরা খাও।

রিদিতা তার ঘরে এসে বিছানায় গুটিসুটি হয়ে কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে গেলো।

চারপাশ বেশ অন্ধকার, মোমবাতি হাতে কে যেন এগিয়ে আসছে। কাছে আসতেই দেখে সাদা শার্ট পরা বেশ লম্বা।
একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, শার্টের হাতা গোটানো কনুই পর্যন্ত। হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছে রিদিতার দিকে। মোমের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেলো আর কিছু দেখা যাচ্ছে না, চেহারাটা বেশ ঝাপসা।

এই আপা, ওঠ আর কত ঘুমাবি? সন্ধ্যে হয়ে গেছে তো... ঘরের লাইট দেই?

রিদিতা চোখ বন্ধ রেখেই বললো

না, লাইট না, মোম জ্বালা... উঠছি।

মোম! তোর মাথা ঠিক আছে?

নাকি আবারো স্বপ্ন দেখলি...

দেখ আকাশ ভেঙে বৃষ্টি হচ্ছে, কোনো থামাথামি নাই...সঙ্গে আছে মেঘের ডাক।

রিদিতা চোখ খুলে অবাক হয়ে তাকালো। কখন থেকে বৃষ্টি হচ্ছে? আকাশে তো কোনো মেঘই ছিল না দুপুরে।

ওসব না ভেবে রেডি হ, এই বৃষ্টির মধ্যেই কাকভেজা হয়ে রাহাত ভাই এসেছেন, বেচারা তো দেখি তোকে না দেখেই দিওয়ানা, বলেই রিনরিনে গলায় হাসা শুরু করলো মৃদুলা।

রোকসানা বেগম ঘরে ঢুকলেন, রিদিতা এই লাল শাড়িটা পরে আসো ড্রইং রুমে, রাহাত এসেছে।

আম্মা আমি শাড়ি পরতে পারবো না।

কেন?

এমনিতেই, কোনো কারণ নেই, কটকটে লাল একটা শাড়ি এনেছো, এভাবেই যাই, এই জামাটা কি খারাপ?

আচ্ছা, আমি আকাশী নীল শাড়ি এনে দিচ্ছি বা সবুজ, যেকোনো একটা পরো, ঝামেলা করো না।
মৃদুলা আমার সঙ্গে আসো, শাড়ি নিয়ে যাও।

রিদিতা মুখ গম্ভীর করে বৃষ্টি দেখছে, হঠাৎ তার মনে হলো আকাশী নীল রঙের শাড়িটা পরা যায়। আকাশী নীল রঙ বৃষ্টির সঙ্গে ভেঙে এসেছে শাড়িতে।

ঝমঝমিয়ে বৃষ্টির হচ্ছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে...

রিদিতা আকাশী নীল শাড়ি পরে মৃদুলাকে বললো রাহাত সাহেবকে বলো এই ঘরে আসতে। বাবার সামনে কথা বলতে পারবো না। এই ঘরে আসলে আমি উনাকে বলি আমার কি সমস্যা। এমন মেয়েকে কে বিয়ে করবে!

আপা একদম চুপ, তোর কোনো সমস্যা নেই। তু্ই দুনিয়ায় অনেক মানুষের চেয়ে সুস্থ। কোনো উল্টোপালটা কথা বলবি না কিন্তু।
ইস কি যে সুন্দর লাগছে তোকে। নজর লেগে যাবে।

এক্ষুনি কাজল দে চোখে।

আমি মা’কে বলে দেখি।

মৃদুলা বের হয়ে যেতেই পরপর দুটো বিশাল বাজ পড়ার শব্দ। সঙ্গে সঙ্গেই বিদ্রুৎ চলে গেলো।

রিদিতা বৃষ্টি দেখছিল। হঠাৎ চমকে উঠলো। এটা কি করে সম্ভব!

লম্বা মতো একটা ছেলে সাদা ফুল শার্ট পরা, হাতা গোটানো কনুই পর্যন্ত। হাতে জ্বালানো মোমবাতি নিয়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে।

ঠিক একটু আগে দেখা স্বপ্নটা।

চলবে...

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]