লেখালেখি এবং লেখক

মো. ইয়াকুব আলী
মো. ইয়াকুব আলী মো. ইয়াকুব আলী
প্রকাশিত: ০৮:৪২ এএম, ২২ নভেম্বর ২০২২

লেখালেখি সবাই করতে পারে, বিশেষ করে বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সবাই রাতারাতি লেখক বনে যান। কিন্তু লেখক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন হয় দীর্ঘমেয়াদি সাধনা ও অধ্যাবসায়। আর অবধারিতভাবে দরকার হয় বিশাল পাঠ সম্ভার। যার পড়াশোনা যত বেশি তার লেখার গভীরতাও তত বেশি।

জীবনকে গভীরভাবে দেখার এবং সেই জীবনবোধ প্রকাশ করার সৌন্দর্য তার লেখায় উঠে আসে। তখন তার শব্দ চয়ন, বাক্য গঠন এবং লেখার বুনন হয় শক্ত। লেখা পাঠ করলে তার বিষয়বস্তু যেন হৃদয়ে গেঁথে যায়। সময়ে সময়ে অনুরণিত হয়।

এভাবেই যারা প্রকৃত লেখক তারা পাঠক প্রিয়তা না পেলেও তাদের লেখা টিকে থাকে কালের সাক্ষী হয়ে।

বাংলাদেশের আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, জহির রায়হান, আহমেদ ছফা থেকে শুরু করে বর্তমান কালের শাহাদুজ্জামান প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়। কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ, শহীদ কাদরী, হেলাল হাফিজ, সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রহমান, আল মাহমুদ থেকে তসলিমা নাসরিনের কবিতা একবার পড়লে সেটা মস্তিষ্কে স্থায়ী আসন করে নেয়।

এসব কবি লেখকদের সমসাময়িক সময়ে মানুষ তাদের কীভাবে মূল্যায়ন করতেন সেটা আমাকে ভাবায়। আমরা একটা সময় বইমেলায় লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে হুমায়ূন আহমেদ বা মুহম্মদ জাফর ইকবালের অটোগ্রাফ নিতাম আর মনে মনে নিজেদের ধন্য মনে করতাম। হুমায়ূন আহমেদ গত হয়েছেন। প্রবাসে থাকার কারণে মুহম্মদ জাফর ইকবালের অটোগ্রাফও বহুদিন নেওয়া হয় না।

সমসাময়িক লেখকদের লেখা পড়তে পারা, তাদের কাছ থেকে অটোগ্রাফ নেওয়া এবং তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারলে আমার মনের মধ্যে এক ধরনের ছেলেমানুষি খুশি কাজ করে। আমি নিশ্চৎ আমাদের প্রজন্মের সবারই এমন হয়। প্রবাসে এসে দেশের সঙ্গে যোগাযোগের সবচেয়ে সহজ এবং সুলভ মাধ্যম ছিল ফেসবুক। এই ফেসবুকেই খুঁজে পেয়েছিলাম একজন নাজমীন মর্তুজাকে।

নাজমীন মর্তুজার জন্ম ১৫ মার্চ ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দ। পঞ্জিকার হিসাবে আমার চেয়ে তিনি মাত্র দুই বছরের বড়। কিন্তু তার লেখা পড়লে মনে হয় যেন তিনি ‘হাজার বছর ধরে এই পৃথিবীর পথে হাঁটছেন’। তার লেখা বই বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা লেখা যেই একবার পড়বেন তিনিই তার গুণমুগ্ধ পাঠক হয়ে যাবেন। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

শহুরে আধুনিকতা এবং গ্রামীণ স্নিগ্ধতার অপূর্ব সমন্বয় তার লেখাকে বিশিষ্ট করে তুলেছে। সমসাময়িক অন্য লেখকদের থেকে তার স্বতন্ত্রতা এখানেই। নিজের গ্রামীণ কাঁদামাটি মাখা শৈশবকে যেমন ভোলেননি তেমনি বড় হয়ে উঠার সঙ্গে সঙ্গে রপ্ত করে নিয়েছেন আধুনিকতাও। আর এভাবেই তার কাব্যে তৈরি হয় এক অপূর্ব ব্যাঞ্জ। আর তার পড়াশোনার ব্যাপ্তিও বিশাল।

সব ধরনের লেখায় পড়েছেন। যেটা তার কাব্য বা লেখা পাঠ করলে সহজেই বোঝা যায়। পাশাপাশি সেই ছোটবেলা থেকেই কলকাতার বিখ্যাৎ ফ্যাশন ম্যাগাজিন ‘সানন্দা’র পাঠক। যার ফলে তার পোশাক পরিচ্ছদও আধুনিক তবে মোটেও দৃষ্টিকটূ নয়।

নাজমীন মর্তুজা একটা সময় মাঠপর্যায়ে গবেষণা করেছেন বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্য নিয়ে।

গবেষণাভিত্তিক তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, ফোকলোর ও লিখিত সাহিত্য: জারিগানের আসরে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ আত্তীকরণ ও পরিবেশন-পদ্ধতি, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র, বাংলাদেশের ফোকলোর, সাইদুর রহমান বয়াতি: সাধকের স্বদেশ ও সমগ্র, বাংলা পুথি সাহিত্য। তিনি গবেষণাকর্মের স্বীকৃতি-স্বরূপ অর্জন করেছেন সিটি-আনন্দ আলো পুরস্কার ২০১২। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন আন্তর্জাতিক বঙ্গবিদ্যা সম্মেলন এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের লোকউৎসবে। তিনি ভাবনগর ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও ভাবনগর আন্তর্জাতিক গবেষণা পত্রিকার সহকারী সম্পাদক।

এছাড়াও আছে কাব্যগ্রন্থ, গুরুপরম্পরা, শ্রীরাধার উক্তি, মহামায়া কঙ্কাবতী, বাস্তবের লুকোচুরি; এবং উপন্যাস, নোনাজলের চোরাবালি। এখনও লিখে চলেছেন প্রতিনিয়ত। লেখকের কাজ লেখালেখি করা। সমাজের আধমরাদের ঘা দেওয়া। সমসাময়িক সমস্যার বেড়াজাল ছিন্ন করা। বিশ্বমানবতার জয়গান গাওয়া। একজন অন্য পেশার মানুষের সাথে লেখকের তফাৎ হলো তিনি সবকিছুই প্রকাশ করেন শিল্পসম্মতভাবে। যার ফলে তাঁর লেখা হয়ে উঠে মানবমুক্তির হাতিয়ার।

কিন্তু বর্তমানের দুনিয়ায় সবাই শুধু লেখেন রাতারাতি ভাইরাল হওয়ার জন্য। আবার দুদিন পরে নতুন কিছু একটা ভাইরাল হলেই পুরোনো ভাইরালটা হারিয়ে যায় নিমেষেই। যার ফলে লেখাটা শুধুমাত্র ইথারেই থেকে যায় কিন্তু মানব জাতির কোনো কাজে আসে না।

কবিতা আমার কাছে সবসময়ই দুর্বোধ্য ছিল। আর ছোটবেলায় প্রথম আট লাইন মুখস্ত করে লিখতে হতো বলে কবিতার প্রতি তৈরি হয়েছিল এক ধরনের বিতৃষ্ণা। হয়তোবা আমার মানসিক পরিপক্কতাতেও ঘাটতি ছিল। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে কবিতার রূপ রস আহরণ করতে শিখছি। অতি সম্প্রতি পড়া আকবার আলী খানের ‘চাবিকাঠির খোঁজে’ বইটা আমার সেই কাজটাই সহজ করে দিয়েছে। এখন কবিতা পড়লে অন্ততপক্ষে ভাবি কবি কি বলতে চেয়েছেন। যদিও আমার ভাবনা হয়তোবা কবির ভাবনার সাথে দূর-দুরান্তেও মিলবে না। কিন্তু ভাবনার খোরাক তৈরি করায় হয়তোবা কবির কাজ।

নাজমীন মর্তুজা আমাদের সমসাময়িক কবি হওয়াতে তার কবিতার ভাবনা হয়তোবা কিছুটা বুঝতে পারি। কিন্তু পুরোটা ধরতে পারি এমন দাবি কখনোই করবো না। তার কবিতার অলংকার কবিতাকে পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে। ওই একইভাবে হয়তোবা অন্য একজন কবিও লিখতে পারবেন কিন্তু তার মতো প্রকাশ সম্ভব না সেটা নিশ্চৎ করেই বলা যায়।

আর তার আছে অভিজ্ঞতার বিশাল ঝুলি। জীবনের বিভিন্ন বাঁকে পোড় খাওয়া খাঁটি একজন মানুষ। পরীক্ষিত একজন লেখক। তিনি যে আমাকে স্নেহ করেন এটা আমাকে প্রচন্ডরকম আনন্দ দেয়। সমসাময়িক একজন খাঁটি লেখকের স্নেহধন্য হওয়া কি কম সৌভাগ্যের ব্যাপার।

দোয়া করি তিনি আমাদের জন্য অবিরাম লিখতে থাকবেন। তার লেখার মাধ্যমে সমৃদ্ধ হবে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি। আর আমরা হবো আলোকিত।

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]