দি পাওয়ার অব ফুটবল

মো. ইয়াকুব আলী
মো. ইয়াকুব আলী মো. ইয়াকুব আলী
প্রকাশিত: ০১:৪৪ পিএম, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২
অস্ট্রেলিয়ার সমর্থকদের পাশাপাশি ছিল আর্জেন্টিনার সমর্থক

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন পরীক্ষার প্রস্তুতি কি চলছে। সাধারণ জ্ঞান বইয়ের সারা বিশ্ব অংশে একটা প্রশ্ন ছিল এমন কোনো উৎসবকে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ বলা হয়। যতদূর মনে পড়ে উত্তরের চারটি বিকল্পের মধ্যে ছিল- অলিম্পিক গেমস, বিশ্বকাপ ফুটবল, বিশ্বকাপ ক্রিকেট, সাফ গেমস এমন সব উত্তর।

স্থায়িত্ব এবং মাত্রার বৈচিত্রের কারণে আমার মাথায় ঘুরছিল উত্তর হবে অলিম্পিক গেমস। কিন্তু উত্তরপত্রে গিয়ে দেখলাম উত্তর হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল। তখন মনে হলো আসলেই বিশ্বকাপ ফুটবল যেভাবে সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয় এভাবে হয়তোবা আর কোনো উৎসব সারাবিশ্বের মানুষকে একই সূতোয় বাঁধতে পারে না।

একটু পেছন ফিরে দেখা যাক। এক টাকা দামের বাংলা, ইংরেজি আর অংকের এক্সারসাইজ খাতা পাওয়া যায় দোকানে। সেই খাতার ওপর বল পায়ে এক লোকের ছবি দেওয়া। তার মাথার কাছে বিশ্বকাপ ফুটবলের ছবি দেওয়া। ছবিটার নিচে লেখা ম্যারাডোনা। এভাবেই আমাদের পরিচয় ফুটবল অন্যতম ইতিহাসের সেরা মহাতারকা ম্যারাডোনার সাথে।

তখনও বল আমাদের কাছে সহজলভ্য নয়। আমরা বিভিন্ন প্রকারের কাগজ একত্র করে পাটের সুতলি দিয়ে দলা পাকিয়ে বেঁধে খেলতে নেমে পড়ি। এলাকায় বিদ্যুৎ বা টেলিভিশন না থাকায় বাস্তবে ফুটবল খেলা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু পাড়ায় পাড়ায় ফুটবল খেলার প্রতিযোগিতা চলে। আর সেখানে ট্রফি হিসাবে দেওয়া পানপাতা আকারের ‘সিল’। কালো কাঠের শরীরে টিনের তৈরি কিছু প্রতিকৃতি গাঁথা থাকে। কখনও সেটা ধরে দেখার সুযোগ পেলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম আমরা।

এরপর শহরতলিতে এসে প্রথম পরিচয় বিদ্যুৎ, টেলিভিশন এবং ফুটবলের জাদুকর ম্যারাডোনার সঙ্গে। পাড়ার একমাত্র টেলিভিশনে খেলার দেখার ব্যবস্থা। যেদিন খেলা থাকে সেদিন টেলিভশন ঘর থেকে বের করে বারান্দায় চেয়ার পেতে তার ওপর বসিয়ে দেওয়া হয়। সারা উঠোনজুড়ে পাড়ার সব মানুষ দর্শক হিসাবে ভিড় করে।

সামনের দিকে ছোটদের বসার জন্য খেজুরের পাতার পাটি বিছিয়ে দেওয়া হয়। আর বড়রা পেছনে দাঁড়িয়ে খেলা দেখেন। ম্যারাডোনার পায়ে বল আসার সঙ্গে সঙ্গে সারা উঠোনজুড়ে নিঃশব্দ নীরবতা নেমে আসে। সবাই যেন নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে যায়। ম্যারাডোনাকে বিপরীত দলের খেলোয়াড় ল্যাং মেরে ফেলে দিলে তাকে শাপশাপান্ত করে রাগ ঝাড়ে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় ম্যারাডোনা যেন আমাদের পাড়ার হয়ে বল খেলছে। এরপর আমাদের হাতে আসে বাদামের (জাম্বুরাকে কুষ্টিয়া অঞ্চলে বাদাম বলা হয়) বল। সেটা নিয়ে আমরা পাড়ার মধ্যে খোলা জায়গায় ঢোলকলমীর ডাল দিয়ে গোলপোস্ট বানিয়ে খেলতে নেমে পড়ি।

পুরো গ্রামসুদ্ধ মানুষ ম্যারাডোনা তথা আর্জেন্টিনার সমর্থক। আমি তখনও জানি না যে আর্জেন্টিনার বাইরে অন্য দলকেও সমর্থন করা যায়। বন্ধু আমিনুরের বাড়িতে খেলা দেখতে যেয়ে জানলাম কিছু কিছু মানুষ বিশ্বকাপ ফুটবলে অন্য দলকেও দেয়। আমিনুরের ছোট চাচা হচ্ছেন ব্রাজিলের সমর্থক। তাই খেলা দেখতে বসলেই অবধারিতভাবে ছোট চাচার সঙ্গে আমাদের বিতর্ক শুরু হয়ে যেত।

দি পাওয়ার অব ফুটবলকানায় কানায় পূর্ণ সিডনির ডার্লিং হারবারের মাঠ

এই আলোচনাটা আমাদের খেলা দেখাতে বাড়তি আনন্দ যোগ করতো। এছাড়াও তখন দেয়ালে দেয়ালে আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিলের পতাকা আঁকা দেখতাম আমরা। তার নিচে লেখা থাকতো যারা এই পতাকা এঁকেছে তাদের নাম এবং সংগঠনের নাম। এরপর ঢাকাতে এসে দেখলাম এই সমর্থন করা যেন একটা উৎসবের রূপ নিয়েছে।

বাড়ির ছাদে ছাদে সমর্থক দলের বাহারি রঙের পতাকা শোভা পাচ্ছে। অনেকেই নিজের সমর্থক দেশের ওপরে বাংলাদেশের পতাকাও টাঙিয়ে দিয়েছেন। পাখির দৃষ্টিতে তখন বাংলাদেশকে দেখলে মনেহবে পতাকার দেশ, উৎসবের দেশ। আমি তাই এই সমর্থন করাটাকে স্বাগত জানাই। উৎসব প্রিয় জাতি আমরা অন্যের জয়কে নিজের জয় বানিয়ে উৎসবে মেতে উঠি। অবশ্য বর্তমানে এই অবস্থা পরিবর্তিত হয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে ফুটবল বিশ্বকাপে বিভিন্ন দলকে সমর্থনের এই হাওয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও এসে লেগেছে। সেগুলো নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যেও চলছে বিতর্ক ও আলোচনা। তবে এইবার অস্ট্রেলিয়া খেলার যোগ্যতা অর্জন করলে অনেকেই অস্ট্রেলিয়াকে সমর্থন দিয়ে গেছেন। আর রাউন্ড ষোলতে খেলার যোগ্যতা অর্জন করার ফলে সেই পালে আরও হাওয়া লেগেছে।

রাউন্ড ষোলতে খেলার যোগ্যতা অর্জন করলে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বিভিন্ন স্থানে সেই ম্যাচ বড় পর্দায় দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আগের দিন বুয়েটের আমাদের ব্যাচের পুরোকৌশলের গ্রীষ্মকালীন পুনর্মিলনীর সময় আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম এইবার আমরা এই ম্যাচটা বড় পর্দায় দেখবো।

স্থান হিসাবে ঠিক করা হলো সিডনির ডার্লিং হারবার। ভোর ছয়টায় ম্যাচ শুরু হবে। আমাদের বাসা থেকে যেতে সবমিলিয়ে ঘণ্টা দেড়েক লাগবে। সেই মোতাবেক আমরা মোবাইলের ঘড়িতে রাত চারটার অ্যালার্ম দিয়ে রাখলাম।

দি পাওয়ার অব ফুটবলভোর রাতে সপরিবারে দলবেঁধে খেলা দেখতে যাওয়া

ভোরে ঘুম থেকে উঠে সবাই সবাইকে ফোন দিয়ে জাগিয়ে দেওয়া হলো প্রথমে। এরপর ট্রেনে চড়ে বসা। আমাদের ধারণা ছিল ম্যাচ শুরুর ঠিক আগে দিয়েই যেহেতু মাঠে পৌঁছাবো আমরা নিশ্চয়ই মাঠে জায়গা পাবো। কারণ অস্ট্রেলিয়ার প্রধান খেলা রাগবি যেটাকে এরা ‘ফুটি’ বলে। ফুটবলকে বলে সকার আর ক্রিকেটকে বলে ‘ক্রিকি’।

এখানকার স্থানীয় টিভি চ্যানেলে ফুটি ছাড়া তেমন কোনো খেলারই সরাসরি সম্প্রচার করা হয় না। তবে এইবারের বিশ্বকাপ খেলাগুলো দেখাচ্ছে। অর্থনীতির ‘ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই’ নীতি মেনেই এটা করা হয়। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম তেমন একটা জনসমাগম হবে না। কিন্তু আমাদের ধারণা ছিল মহাভুল।

ডার্লিং হারবারে পৌঁছে দেখি মূল মাঠ ম্যাচ শুরুর আগেই কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। আমরা পুরো মাঠ অতিক্রম করে মাঠের বাইরের আরো দুটো পর্দার একটার সামনে স্থির হলাম। যেখানে পর্দার কিছুটা কাছাকাছি কোণার দিকে আমরা বসার জায়গা পেলাম।

দি পাওয়ার অব ফুটবলযে যেখান থেকে পেরেছেন উপভোগ করেছেন ফুটবল খেলা

খেলার মধ্য বিরতিতে আমরা কফি আনতে গিয়ে দোকানগুলোর সামনে মানুষের দীর্ঘ সারি। সেখানে বন্ধুদের রেখে আমি পুরো এলাকা চক্কর দিতে বেড়িয়ে পড়লাম। ডার্লিং হারবার মাঠের মধ্যে দুটো বড় পর্দায় খেলা দেখানো হচ্ছে। আর পুরো মাঠের চারদিকে সাউন্ড বক্স দিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেন একেবারে স্টেডিয়ামের শব্দের একটা অনুভূতি হচ্ছে।

মূল মাঠের বাইরে বিভিন্ন ভবনের সিঁড়ি, ছাদে যে যেখানে পেরেছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই খেলা দেখছেন। পাশাপাশি মাঠের পাশের ছোট ছোট বটগাছেও অনেকে অনেক উঠে পড়েছেন। আর পাশের পার্কের বিভিন্ন রাইডের উঁচু উঁচু স্থানও ভরে উঠেছে মানুষে মানুষে। চারদিকে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলের জার্সির রঙের জার্সি পরা মানুষের উপচেপড়া ভিড়। এর মধ্যেও বেশকিছু নীল আকাশি রঙের আর্জেন্টিনার জার্সি পরা মানুষেরও দেখা পাওয়া গেলো।

দি পাওয়ার অব ফুটবলঅনেকে উত্তেজনায় উঠে পড়েছেন গাছের ডগায়

আমরা যেখানে বসেছিলাম সেখানেই নীল সাদা জার্সি পরা দুই তরুণী এবং এক তরুণকে দেখে পরিচিত হলাম। আমার গায়ে তখন অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পতাকা। বললাম, আমি বাংলাদেশের মানুষ। শুনে সাথে সাথে তারা বললো, আমি জানি তোমাদের দেশের কথা। তোমাদের দেশের লোক বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করে।

উত্তরে বললাম, বাংলাদেশের ফুটবলই সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা আর বিশ্বকাপ ফুটবলতো এক উন্মাদনার নাম। আবাল বৃদ্ধ বণিতা সবাই এই উৎসবে শামিল হয় যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী। সবাই রীতিমতো প্রতিযোগিতা করে পছন্দের দলের দীর্ঘতম পতাকা বানানোর চেষ্টা করে।

দি পাওয়ার অব ফুটবলসপরিবারে দলবেঁধে খেলা উপভোগ করা

উত্তরে এক তরুণী বললেন, হ্যাঁ আমাদের দেশের সবগুলো টিভি চ্যানেলে তোমাদের দেশের খবর প্রচার করা হয়েছে। আমার কাছে লিংকগুলো এখন নেই নাহলে তোমাকে দেখতে পারতাম। এরপর তাদের সঙ্গে সেলফি তুললাম। তারা আনন্দ সহকারে পোজ দিলেন। এরপর মাঠের মধ্যে পেয়ে গেলাম একজন অস্ট্রেলিয়ান মেসিকে। তাকে সেলফি তোলার প্রস্তাব দিলে সেও সানন্দে বিজয় চিহ্ন দেখিয়ে পোজ দিলেন।

বিশ্বকাপ ফুটবল আসলেই ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ সাত সমুদ্র তের নদীর দেশ অস্ট্রেলিয়াতে এসে আবারও তার প্রমাণ পেলাম। ফুটবলের উন্মাদনা সবাইকে একই সূত্রে বেঁধে ফেলেছে। বড় পর্দায় দলবেঁধে সবাই খেলা দেখেছেন। আর বড় পর্দায় খেলা দেখতে যেয়ে আমাদের মনেহচ্ছিল আমরা যেন স্টেডিয়ামের জনসমুদ্রেই আছি।

দি পাওয়ার অব ফুটবলঅনেকে উত্তেজনায় চড়ে বসেছেন পার্কের বিভিন্ন রাইডে

যেকোন একটা আক্রমণ বা প্রতি আক্রমণের সময় সেই সমুদ্রে ঢেউ উঠে। গোল হলে পড়ে যায় শোরগোল। চলতে থাকে দীর্ঘক্ষণ। বিশ্বব্যাপী ফুটবলের এই উন্মাদনা এটাই প্রমাণ করে যে সারা পৃথিবীর মানুষই আসলে উৎসব প্রিয়। তারা যেকোনো উপলক্ষে আনন্দ করতে ভালোবাসেন। নিজের দেশের দল খেলুক বা না খেলুক সবাই একটা পছন্দনীয় দল বেছে নিয়ে সমর্থন দেন।

আমি বিশ্বাস করি এতে বিশ্বব্যাপী মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসায় প্রকাশ পায়। এভাবেই একদিন মানুষ সকল যুদ্ধ ও সহিংসতাকে জয় করতে শিখে যাবে। বিশ্বকাপ ফুটবল হয়ে উঠুক সংঘাতময় পৃথিবীকে শান্তিতে বদলে দেওয়ার মাধ্যম। আসলেই হয়ে উঠুক ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’।

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]