ছোট গল্প: অন্ধ কুঠুরি

শায়লা জাবীন
শায়লা জাবীন শায়লা জাবীন
প্রকাশিত: ০৮:৪৬ এএম, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২
ছবি- পিক্সেল

কিরে কিছু বলিস না কেন?
সেই কখন থেকে ঝিম মেরে আছিস।

হু...

কিসের হু, কিছু একটা বল

কি বলবো?

তোর কিছু বলার নেই?

হু

আবার হু

দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিঝুম বললো কি বলবো? বলে কি হবে...
কিছু কি বদলাবে?

ঝিম মেরে থাকলে বদলাবে?

জানি না, তু্ই যা তো, ভালো লাগছে না কিছু

যাচ্ছি, কিন্তু শেষবারের মতো জানতে চাচ্ছি তু্ই কি যাবি না একবারও দেখতে?

না।

কেন?

এই না বললি শেষবার, তাহলে আবার প্রশ্ন করছিস কেন?

সেজান চোখ বড় করে নিঝুমের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বেরিয়ে গেলো...

নিঝুম দরজা লাগিয়ে দিয়ে বাথরুমে গিয়ে বেসিনের কল ছেড়ে দিলো... এতক্ষণ দুচোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল,
আর পারলো না, এইবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো...

রাতুল মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলো...

উল্টা পাশ থেকে প্রাইভেটকার এসে ধাক্কা দেয়, রাতুল এখন হাসপাতালে, অবস্থা আশঙ্কাজনক।

খবরটা প্রথমে নিঝুমকে সায়মা দিয়েছে, এরপর সেজান বাসায় এসেছিল ওকে নিতে, শেষবার রাতুলকে দেখতে যেতে বলতে, অবস্থা ভালো না রাতুলের কিন্তু নিঝুম গেলো না, কি করে যায়...

বছর পাঁচেক আগে নিঝুমকে প্রথম রাতুলই প্রপোজ করেছিল, নিঝুম হ্যাঁ বা না কিছুই বলেনি, তবে মাঝে মাঝেই ফোনে কথা হতো, খারাপ লাগতো না...

কিন্তু বাইরে কখনো দেখা করেনি, ক্যাম্পাসে দেখা হতো, দুজনেই চুপচাপ স্বাভাবিক থাকতো, বন্ধু বান্ধবরাও কেউ কিছু বুঝতে পারেনি...

এভাবে বছরখানেক যাওয়ার পর রাতুলকে দেখা গেলো অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করতে, ফোনে জিজ্ঞাসা করতেই বললো তুমি তো হ্যাঁ না কিছু বলো না, কতদিন কথা বললাম...
এই মেয়েটা আমাদের দুই ব্যাচ জুনিয়র, সুন্দর না?
অবশ্য তুমি আরও বেশি সুন্দর।

নিঝুম এত কষ্ট পেলো, ছেলেরা কি এমন নাকি রাতুলই এমন সে ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না, কাউকে বলতেও পারলো না, আজকে খুব মাথা ধরেছে বলে ফোন রেখে দিলো।

এরপর থেকে নিঝুম আর তেমন কথা বলে না রাতুলের সঙ্গে, ক্যাম্পাসেও না...
সেই মেয়েটার সঙ্গে রাতুলকে মাঝে মধ্যে ঘুরতে দেখা যায়...
রাতুল নিঝুমকেও ফোন করে, কেমন আছে জানতে চায়, নিঝুম দুই এক লাইন বলে ফোন রেখে দেয়, বা ফোন ধরে না, কিন্তু বুকের ভেতরে ব্যথা...

মনটা খুবই পোড়ায়, ছেলেটা এমন হাঁদারাম, পছন্দ না করলে কেউ এক বছর ধরে কথা বলে!

আরও বছরখানেক গেলো, রাতুলকে দেখা গেলো অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে, ক্যাম্পাসে একদিন মুখোমুখি হতেই বললো আগেরটা ব্রেকআপ হয়ে গেছে... এখন যে মেয়ের সঙ্গে ঘুরছে সে ওদের বাসার পরের গলিতে থাকে, বড্ড গায়ে পড়া টাইপ, কিন্তু মেয়ে ভালো...

তুমি কাউকে খুঁজে পেয়েছো নিঝুম?

নিঝুমের ইচ্ছে করলো ঠাস করে একটা চড় লাগায়, অনেক কষ্টে রাগ সামলে নিয়ে কাজ আছে বলে চলে গেলো, মনে মনে ভাবলো, যাক এমন ফাউল ছেলের হাত থেকে আল্লাহ তাকে বাঁচাইছে...

গেলো আরও এক বছর, সবার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা...
পরীক্ষা শেষ হলো যেদিন, সেদিন দরজার বাইরে দেখে রাতুল দাঁড়িয়ে...

কি ব্যাপার তুমি! পরীক্ষা দাওনি?

হুম, দিয়েছি, তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম...

আমার জন্য! কেন
তোমার গার্লফ্রেন্ড কই?

আরেহ ধুর, বিদায় করে দিয়েছি, খুবই ধান্দাবাজ
সারাক্ষণ গিফট চায়, এটা চায়, সেটা চায়
তোমার মতো কেউ না...

ওহ আচ্ছা, বাসায় যাই...

নিঝুম শোনো, আমি তো জানি তুমি কারো সঙ্গে এনগেজ না, আমি তো তোমাকেই সবার আগে প্রপোজ করেছিলাম, তুমি কি ভেবে দেখবে আবার?

নিঝুম অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো রাতুলের দিকে,
বললো হু, এটা সত্যি যে তুমিই আমাকে প্রপোজ করেছিলে, আমরা এক বছর ফোনে কথাও বলেছিলাম, এরপর হুট করে কিছু না জানিয়ে অন্য একজনকে গার্লফ্রেন্ড বানিয়ে ফেললে, বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ব্রেকআপ তখন দেখি আর একজন... এখন বলছো সে ধান্দাবাজ!

কে জানে হয়তো আমাকেও বলতে এমন কিছু একটা, তারপরে অন্য কারোর দিকে ছুটতে...
আসলে ধান্দাবাজ যে কে সেটা যদি তুমি বুঝতে!

যাও, আর একজনকে খুঁজে নাও, খুব সহজেই পেয়ে যাবে। বলে নিঝুম চলে গেলো, একবারও পেছনে তাকালো না।

রাতুল দাঁড়িয়ে ছিল যতক্ষণ পর্যন্ত নিঝুমকে দেখা যায়...

এরপর আর রাতুলের সঙ্গে তেমন দেখা হয়নি,
নিঝুম মাস্টার্স ক্লাসে রাতুলকে দেখেনি, বন্ধুবান্ধবের কাছে শুনেছে রাতুল অন্য একটা ইউনিভার্সিটিতে এমবিএ ভর্তি হয়েছে, মাঝে মাঝে শুনতো ক্লাসের অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে ঘোরাফেরা করে এদিক-সেদিক।

বান্ধবীদের মধ্যে একমাত্র সায়মা পুরো ঘটনা জানতো, নিঝুমকে বলতো, তু্ই তো রাতুলকে পছন্দ করিস, বললি না কেন?

আমি কি করে জানবো যে সে কিছু না বলে অন্য একটা মেয়ে নিয়ে ঘোরাঘুরি শুরু করবে? সম্পর্ক কি এত সস্তা, ইচ্ছে হলে আজ এ, কাল সে... সবই রাতুলের ইচ্ছে, অন্যের মন বা ইচ্ছে বলে কিছু নাই? আচ্ছা রাতুল এমন কেন সে...একটুও মন পোড়ায় না?

জানি নাহ, তবে আজকালকার মেয়েগুলোও বেশ সস্তা, যখন তখন যার তার সঙ্গে জুড়ে যায়...

বলেছে, তু্ই, আমি, শম্পা আজকালকার মেয়ে না?

শোন, আমরা হলাম এন্টিক পিস, শোকেস এ ভালো, গার্লফ্রেন্ড হিসেবে হয়তো না, আমাদের গোনায় ধরিস না।
বেশিরভাগ কেমন সেটা দেখ...

মাস্টার্স শেষ হয়ে গেলো নিঝুমের, বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় চলছে...

সেই সায়মা আজ সকালে ফোন করে রাতুলের সড়ক দুর্ঘটনার খবর দিলো, কান্না করছিল... বললো নিঝুম শোন, রাতুল আসলে তোকেই পছন্দ করে, ওই সব গার্লফ্রেন্ড সে ইচ্ছে করে বানাতো যেন তোর দেখে ঈর্ষা হয়, মনের কথা রাতুলকে বলিস, রাতুলের বোন ফোন করেছিল, সে বললো, রাতুলের জ্ঞান নাই, ঘুমের মধ্যেই তোর কথা বারবার বলছে...প্লিজ যা, একবার অন্তত দেখে আয়।

দেখি, বলে ফোন রেখে দিয়েছিল নিঝুম।

ঘণ্টাখানেক পর রাতুলের ক্লোজ ফ্রেন্ড সেজান এসেছিল নিঝুমকে নিতে, একটু আগে চলে গেলো।

নিঝুম জানে না সে কি করবে...

সে রাতুলকে এভাবে দেখতে চায় না, মুখে যাই বলুক সবসময়েই রাতুলের জন্য সে দোয়া করেছে রাতুল যাকে নিয়ে ভালো থাকে থাক, সুখে থাক...

কিভাবে খারাপ চাইবে, আসলেই তো সে কখনো মুখ ফুটে কিছু বলেনি, তাই বলে তো ভালোবাসা ঝরে পরে না, বেঁচে থাকে অন্ধ কুঠুরিতে আজীবন আলো হয়ে।

ওযু করে জায়-নামাজ নিয়ে বসলো নিঝুম, নামাজ পড়ে দোয়া করলো, আল্লাহ তুমি আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও রাতুলকে ফিরিয়ে দাও, রাতুলবিহীন পৃথিবীতে আমি একা বেঁচে থাকতে চাই না।

এমআরএম/জিকেএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]