মরুর বুকে একদিন

প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:৩৫ পিএম, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | আপডেট: ০৪:৩৮ পিএম, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

মরুর বুকের স্মৃতিগুলো আমায় আজও কাঁদায়। দেশ থেকে এসেছি দুবাই'র এক প্রান্তে। জাবেল আলী ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়ায়। প্রথমে হিমায়িত ফ্যাক্টরিতে কাজে যোগ দেই। শহর থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ জাবেল আলী এলাকাটি। খুবই একা হয়ে পড়েছি এখানে। যদিও প্রবাসে এদেশে আমি নতুন না। তারপরও কেন জানি নিজেকে শুধুই একা একা মনে হচ্ছে।

বাংলা বলার মতো একজনও মানুষ পেলাম না। প্রথম দিন এসে চাচাতো ভাই মনিরের সঙ্গে ফোনে অনেক কান্নাকাটি করেছি। ফ্যাক্টরির প্রায় ৯৫ শতাংশ লোকই ইন্ডিয়ার কেরালা প্রদেশের। মালায়ালাম ভাষায় তারা কথা বলে। যাকে সহজে সহ্য করা যায় না। অনেক ভাষা শুনেছি কিন্তু এ ভাষার মতো এতো কর্কশ এবং কঠিন ভাষা কোথাও শুনিনি।

যখন ওরা কথা বলে মনে হয় হাতুড়ি দিয়ে লোহা পেটাচ্ছে। ঠিক কামার বাড়ির পাশ দিয়ে গেলে যে শব্দ পাওয়া যায় তেমনটি। মাথা ধরে ওদের পাশে একটু বসে থাকলাম। দুর্ভাগ্যজনক আমার থাকার জায়গাটা হলো ওদের সঙ্গে। আরেকটি অভ্যাসের কথা তো বলাই হয়নি। মদ্যপান ওদের কাছে পানির মতো। ছুটির দিনগুলো ওদের কাছে ঈদের দিনের মতো উল্লাসের।

বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু করে মদের আসর চলতে থাকে পরের দিন মধ্যরাত পর্যন্ত। আমি ওই সময় খুব সমস্যায় পড়ে গেছিলাম। একদিকে বাঙালি কাউকে পাচ্ছি না, অন্যদিকে মদের আসর। বার বার দেশের কথা মনে হচ্ছিল।

পাশেই একটি মসজিদ ছিল। কাজের শেষে রুমে বসে না থেকে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে দেশের মানুষের খোঁজ করতে থাকি। মনটা বড়ই উদাসীন লাগছিল। রাতের খাবার খেয়েও বিছানায় না গিয়ে হাঁটতে থাকি দেশের মানুষের খোঁজে। এভাবে চলতে থাকলাম বেশ কিছুদিন।

একদিন মসজিদে এক পাকিস্তানি লোকের দেখা মিললো। লোকটার নাম লোকমান। তার সঙ্গে কথায় কথায় একজন বাংলাদেশি লোকের সন্ধান পেলাম। তিনি আমাকে জানালেন আমাদের ফ্যাক্টরিতে আনোয়ার নামে একজন বাংলাদেশি আছে। খুব ভালো ছেলে। বললাম তাকে কখন পাওয়া যাবে। লোকটা জানালো সে তো দিনের বেলায় কাজে থাকে আমি সন্ধ্যায় তার রুমে গেলে আনোয়ারকে পেতে পারি।

প্রথম দিন আনোয়ারের খোঁজে এভিআই ফ্যাক্টরিতে গিয়ে পেলাম না। পরের দিন আবার গেলাম। একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে গোসলের জন্য। কাঁধে গামছা, হাতে গোসলের বালতি। জিজ্ঞেস করলাম এখানে আনোয়ার বলে কি কেউ আছেন? ছেলেটা আমার প্রশ্নে উত্তর না দিয়ে আমাকে সরাসরি ওর রুমে নিয়ে দু’তলা খাটে নিয়ে বসালো। হতবাক হয়ে গেলাম ছেলেটির কাণ্ড দেখে। আমাকে জানে না চেনে না অথচ এভাবে অপরিচিত একজন লোককে সরাসরি রুমে নিয়ে গিয়ে খাটের ওপর বসতে দিল।

ছেলেটা বলতে লাগলো আমিই আনোয়ার, তবে আমাকে কীভাবে চিনলেন বা কীভাবে আমার কাছে এলেন। আমি পাকিস্তানি লোকমান ভাইয়ের সব কথা আনোয়ার ভাইকে বললাম। খুবই খুশি হলাম আনোয়ারকে পেয়ে কারণ, কথা বলার মতো আমি কাউকে পাচ্ছিলাম না। তাছাড়া আনোয়ারের ব্যবহারে ব্যাপক খুশি হলাম। একদিনের পরিচয়ে আনোয়ার আমাকে ওর দুবাই আসার প্রেক্ষাপট এক এক করে শোনালো।

আনোয়ারের বাড়ি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলা কমপ্লেক্সে। কথোপকথনে জানতে পারলাম দুবাই হয়ে লন্ডন যাওয়ার উদ্দেশে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন আনোয়ার। দালালের প্রতারণায় আজ তাকে দুবাইতেই কাজ করতে হচ্ছে। এখন সে লন্ডনের আশাও ছেড়ে দিয়েছে। ওদের পরিবারের ছবির অ্যালবামটি আমাকে দেখালো।

আনোয়ারের সঙ্গে সখ্যতা থাকে মাত্র এক সপ্তাহ। ভেবেছিলাম, তাকে কাছে পেয়ে আমার একাকীত্বটা হয়তো লাঘব হবে। আনোয়ার কাজের জায়গা পরিবর্তন করে দুবাই শহরে চলে যায়। যাবার বেলায় একখানা বই আমাকে দেয়। বইখানা আনোয়ারের এক দিদি পুরস্কার দিয়েছিল বিদেশ আসার সময়।

মো: ফারুক হোসেন/এমআরএম/আরআইপি

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - jagofeature@gmail.com

আপনার মতামত লিখুন :