আমার বাবাই সেরা

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬:৩৬ পিএম, ০৯ নভেম্বর ২০১৯

বাবাকে নিয়ে লিখতে বসলে লেখা শেষ হবে না। তিনি আমার দেখা সেরা মানুষদের একজন। আমাদের সুখের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করতেন তিনি। তার পরিশ্রম দেখে মাঝে মাঝে খুব রাগ হত। বাবা কেন দিনরাত বিরতিহীন এত পরিশ্রম করেন। বাবার পরিশ্রম দেখে মনে হত তার জন্মই হয়েছে পরিশ্রম করার জন্য।

বাবা খুব ভোরে মাঠে কাজে চলে যেতেন। সন্ধ্যা অবধি মাঠেই কাজ করতেন। সকাল নয়টা বাজলে মাঠে বাবার জন্য খাবার নিয়ে যেতাম। বাবা জমির আইলে বসে খাবার খেয়ে একটা বিড়ি টেনে আবারও কাজ শুরু করতেন। দুপুরে আবারও যখন বাবার জন্য খাবার নিয়ে যেতাম তখনও বাবাকে দেখতেন জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করে চলেছেন। আমাকে দেখে কিছুক্ষণ কাজে বিরতি দিয়ে ময়লা, ভেজা পোশাকেই খাবার খেতে বসতেন। আমার বাবার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতাম। বাবার চেহারার দিকে তাকালে কষ্টে বুকটা ফেটে যেত।

বাবার খাওয়ার সময় মাঝে মাঝে আমাকেও জোর করে মুখে খাবার তুলে দিতেন। বাবা তৃপ্তি সহকারে খেয়ে একটি বিড়ি টেনে আবারও কাজে মনোযোগী হতেন। সন্ধ্যার সময় ক্লান্ত দেহে বাসায় ফিরে গোসল করে বিশ্রাম করতেন। অনেক সময় বিশ্রাম না করেই কাজের সন্ধ্যানে বেরিয়ে যেতেন।

তবে আমার বাবা ছিলেন একটু পাগলাটে। হঠাৎ করেই তার মাথা গরম হয়ে যায়। সবাই উত্তরাধিকারসূত্রে বাবার অঢেল সম্পত্তি, সোনা, টাকা-পয়সা পেয়ে থাকে। আর আমার বাবা পেয়েছে পাগলামোটা।

বাবা যখন পাগলামো করতেন তখন দাদি মাকে বলতেন, মা আমার ছেলেটা উত্তরাধিকারসূত্রে পাগলামো পেয়েছে তাই এমন আচরণ করে তুই কিছু মনে করিস না। যদিও বাবা জন্মের ছয়মাসের মধ্যে পিতৃহারা হন তবুও পিতার রক্ত তার শরীরে বইছে।

দাদির মুখে শুনেছি বাবা একটা সময় হঠাৎ পাগল হয়ে যান। তার সফলতায় ঈর্শ্বানিত হয়ে তার সহকর্মী ও বন্ধুদের মাঝে কেউ তাকে কি যেন খাইয়ে দেয়। আর সে থেকে বাবা প্রায় বছরখানেক পাগল ছিলেন। পাগল বলতে পুরোপুরি পাগল। কেউ বলেনি বাবা আবার সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। কিন্তু উপরওয়ালার অসীম কৃপায় বাবা সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে।

কিন্তু এরই মধ্যে তিনি চাকরিচ্যুত হন। সম্পদ যা ছিল তা বিক্রি করে তার চিকিৎসা করা হয়। বলা চলে বাবা হঠাৎ পথের ফকির হয়ে যান। আমাদের সম্পদ বলতে রইল বাবার গায়ের শক্তি।

এরপর বাবা শূন্য হাতে আমাদের লালন পালনের দায়িত্ব নেন। মাঠে কৃষি কাজ, গবাদি পশু পালন ও সিজনাল ব্যবসা করে সংসারের ব্যয় বহন করতে থাকেন। বাবা সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলেও তার পাগলামো ভাবটা রয়ে যায়। আর লোকজন বাবাকে পাগল নামে ডাকতে শুরু করে। আমাদের পাগলার ছেলে হিসেবে ডাকতে শুরু করে।

লোকজন বাবার নাম বললে চিনত না। নামের শেষে পাগলা নাম ব্যবহার করতে হত। প্রথম প্রথম যখন কেউ পাগলার ছেলে বলে ডাকত তখন রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়তাম। অনেক সময় ইচ্ছে করত তাদের টুটি চেপে বলি, আমার বাবা পাগল তো কি হয়েছে, বাবা তো চুরি করেন না। ঘুষ খান না। তিনি কারো মাথায় বাড়ি দেন না। নিজে পরিশ্রম করে সৎ উপায়ে আমাদের ভরণপোষণ করেন।

একই জিনিস যখন মানুষ বারবার শুনে তখন সে নিজেকে সেই রকম ভাবতে শুরু করে। আপনি যখন একজন সুস্থ মানুষকে তার কানের কাছে বারবার পাগল বলবেন সে তখন এই নামের সাথে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। নিজেকে সে একটা সময় পাগল ভাবতে শুরু করবে। আমার ঠিক একই অবস্থা হয়েছিল। সবসময় পাগলার ছেলে শুনতে শুনতে এক সময় নিজেকে পাগলার ছেলে মনে হতো লাগল।

তখন কেউ পাগলার ছেলে বললে রাগ হত না। কেউ বাবার নাম জিজ্ঞেস করলে নিজেই বাবার নামের শেষে পাগলা শব্দটা ব্যবহার করতাম।একদিন এক স্কুল শিক্ষক বাবার নাম জিজ্ঞেস করলে আমি বলেছিলাম, আমার বাবার নাম অমুক পাগলা। তিনি সাথে সাথে প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, ছি! ওমর বাবাকে পাগলা বলতে নেই। তুমি তোমার বাবার নাম বলবে এতে কেউ চিনলে চিনুক না চিনলে নাই। তোমার বাবা খুবই ভালো মানুষ।

বাবার প্রশংসা শুনে সেদিন বাবাকে নিয়ে খুব গর্ব হয়েছিল। আগেই বলেছি বাবাকে নিয়ে লিখলে লেখা শেষ করা সম্ভব হবে না। তাই বাবার ছোট একটি ত্যাগের গল্প বলেই শেষ করছি। সেবার ঈদের সময় বাবা সবার জন্য নতুন জামা কিনে আনেন। আমরা বছরে দুই ঈদের এক ঈদে নতুন জামা পেতাম আরেক ঈদে পুরনো জামা ইস্ত্রি করে পরতাম।

সেবার ঈদে বাবা আমাদের সবার জন্য নতুন জামা কিনে আনলেন। আমরা নতুন জামা পেয়ে আনন্দে দিশেহারা। রাতে মা বাবাকে বললেন, আমার জন্য কাপড়টা না আনলেও পারতেন।

কম দামে পাইলাম তাই নিয়ে আসলাম। তাছাড়া তোমাকে কাপড় কিনে দিয়েছি এক বছর আগে। আপনি হাটে-বাজারে যান আপনার জন্য একটা পাঞ্জাবি আনলেই পারতেন। আমি তো বাসায় থাকি, আমার নতুন কাপড় না হলেও চলত। আমার যেটা আছে সেটাই ধুয়ে ইস্ত্রি করে পরব।

সেদিন মা-বাবার কথোপকথন শুনে খুব কষ্ট হয়েছিল। ঈদের দিন সকালে আমরা সবাই নতুন জামা পরে আনন্দে হৈ-হুল্লোয় মেতে উঠি। সেদিন আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছিলাম বাবা ছেড়া জামা পরলেও আমাদের গায়ে নতুন পোশাক দেখে তার মুখে প্রশস্ত হাসি। তখন বাবার মুখের হাসি দেখে মনে হয়েছিল, সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই বাবারা সুখ খুঁজে পান, পৃথিবীর সেরা সুখ।

তবে বাবার কষ্ট, ত্যাগ বৃথা যায়নি। আমরা উপার্জন করতে শুরু করার সাথে সাথে বাবাকে সমস্ত কাজ থেকে রিটায়ার্ড নিতে বলি। বাবা প্রথমে রাজি হয়নি, আমাদের অনুরোধে বাবা সমস্ত কর্ম থেকে রিটায়ার্ড করেন। এখন তিনি সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। আমার প্রত্যাশা বাবা আমাদের মাঝে আরো একশো বছর বেঁচে থাকুক। বাবা হলো আমাদের জন্য বটবৃক্ষ। তার বটবৃক্ষের ছায়াতলেই জীবনের স্বার্থকতা খুঁজে পাই।

ওমর ফারুকী শিপন সিঙ্গাপুর থেকে/এমআরএম/এমকেএইচ

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - jagofeature@gmail.com