ক্রোয়েশিয়া সীমান্তে মার খেয়ে পড়ে আছে শরণার্থীরা

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭:৩৪ পিএম, ২৫ অক্টোবর ২০২০

বসনিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা শরণার্থী নাকি অভিবাসী, স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়েছে নাকি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। সেসব নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক হতেই পারে। তবে একটি বিষয়ে সবার সোচ্চার হওয়া উচিত। তা হচ্ছে ওদের পেটানো বন্ধ করতে হবে, এক্ষুণি।

বসনিয়ার ভেলিকা ক্লাদুসায় শরণার্থী বিষয়ক সংবাদের অভাব নেই। রাস্তায় এদিক-সেদিক তাকলেই দেখবেন দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের নানাদেশের মানুষ ঘুরছে। বেশিরভাগই হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে মাথা নিচু করে হাঁটেন সাধারণত। নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে চান না।

আবার দোকানে গেলে দেখবেন কোনো এক বসনীয় হয়ত দক্ষিণ এশীয় কারো দিকে বাকা চোখে তাকাচ্ছে, এক তরুণীতো আমার সামনেই এক শরণার্থীকে বললো, ‘গোসল করো গিয়ে, তোমার গা থেকে গন্ধ আসছে।’ বলে তিনি নাকে রুমাল চাপলেন।

অথচ এই করোনাকালে একটু আগেও তিনি মাস্ক ছাড়াই বসেছিলেন। এমনকি আমার সঙ্গেও প্রথমে কথা বলতে চাইলেন না, এমনভাব করলেন ইংরেজি জানেন না বা বোঝেন না। পরে ডয়চে ভেলের সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তার মুখেই ইংরেজিতে খৈ ফুটতে শুরু করেছিল।

এতটুকু পড়েই বসনীয়দের বিষয়ে কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাবেন না যেন। তাদের আরও অনেক দিক তিনদিনে দেখেছি। তার উদাহরণ পাবেন বাকি লেখায়। তার আগে শিরোনামটা ‘জাস্টিফাইড’ করে নেই।

ক্রোয়েশিয়া সীমান্তের একেবারে লাগোয়া শহর ভেলিকা ক্লাদুসা। ছোট্ট শহরটির মূল বাসিন্দা হাজার চল্লিশের মতো, তবে সেখানে এখন অন্তত হাজার দুয়েক শরণার্থী এবং অভিবাসী বাস করছেন। তাদের লক্ষ্য একটাই।

যেকোন উপায়ে অবৈধপথে ক্রোয়েশিয়া সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ করা। এজন্য দলে দলে তারা হঠাৎ হঠাৎ সীমান্তের কোনো এক দুর্গম, পাহাড়ি জঙ্গল ঘেরা অংশ দিয়ে ক্রোয়েশিয়া ঢুকতে চান। তাদের ভাষায় এটাকে বলে ‘গেম মারা।’

এ রকম এক গেম মারার প্রস্তুতির সংবাদ যখন করছিলাম, তখন এক আফগান হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে তার ফোনে আমাদের কিছু একটা দেখাতে চাইলেন।

আমি অবাক বিস্ময়ে দেখলাম কয়েকজন বাংলাদেশি কাপড় খুলে শরীরে লাঠি পেটার দাগ দেখাচ্ছেন। সীমান্তে নাকি তাদের বেধাড়ক পেটানো হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। সাংবাদিক মন থেকে সন্দেহের সুরে তাকে বললাম, এটা যে কিছুক্ষণ আগের তার প্রমাণ কী? আর ক্রোয়েশিয়া সীমান্তের ঘটনা সেটাই বা কিভাবে বুঝব?

উর্দু ভাষায় সেই আফগান শরণার্থী জানালেন, আহতরা কয়েকজন হেঁটে হেঁটে ফিরছেন, তবে ধীরগতিতে আসতে হচ্ছে আহত বলে। তোমরা গাড়ি নিয়ে একটু সামনে গেলেই তাদের দেখা পাবে।

দেরি করলাম না, সহকর্মী অনুপমকে নিয়ে বাংলাদেশি শরণার্থীরা যে পাহাড়ে থাকে সেদিকের রাস্তায় ছুটলাম। আহরা সেই পথেই ফিরছেন। একটু পরে কয়েকজন বাংলাদেশি আমাদের গাড়ি আটকালেন। জানালেন, এইমাত্র এক বাংলাদেশি রক্তাক্ত অবস্থায় সীমান্ত থেকে কোনক্রমে ফিরেছেন।

গাড়ি থামিয়ে তার কাছে গেলাম। ডানচোখের উপরের দিকের কোনার চামড়া বেশ খানিকটা কেটে গেছে তার। সেলাই ছাড়া এই ক্ষত সারবে না। চোখের মধ্যে জমে গেছে রক্ত। ঠোঁটের বামদিকও ফাঁটা, রক্তাক্ত। হাতে, শরীরে শক্ত কিছু দিয়ে পেটানোর দাগ।

জানতে চাইলাম, কারা পিটিয়েছে। উত্তর, ক্রোয়েশিয়ার সীমান্ত পুলিশ। কালো পোশাক আর মুখ ঢাকা এই পুলিশ অত্যন্ত বর্বর বলে জানালেন সেখানকার আরো কয়েকজন।

সত্যি বলতে কী, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত একটি দেশের সীমান্তে মানুষকে এভাবে পেটানো হতে পারে, সেটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকছিল। জানতে চাইলাম, অন্য শরণার্থীরা মেরে এই হাল করেনিতো। এমনওতো হতে পারে নিজেরা নিজেরা মারামারি করে এই অবস্থা হয়েছে।

কিন্তু না, অল্প সময়ের মধ্যে আরও কয়েকজন আহতের কথা জানলাম আমরা। পেলাম আরও কয়েকজনের ভাষ্য। তাতে এটা স্পষ্ট যে সীমান্তেই ধরে নিয়ে আয়োজন করে আলাদা আলাদাভাবে পেটানো হয় তাদের, সেটা কোনো এক বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর কাজ।

ভেলিকা ক্লাদুসা শহরটা ছোট। ডয়চে ভেলের দুই সাংবাদিক যে ক্যামেরা নিয়ে শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই তথ্যটা তাই অনেকেই দ্রুত জেনে গিয়েছিল। বিশেষ করে পুলিশ এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো আমাদের বেশ গুরুত্বসহকারে নিয়েছিল মনে হয়েছে।

শরণার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, আমরা সেখানে যাওয়ার পর অনেক কিছু ঘটেছে যা সাধারণত দেখা যায় না। সেই ‘অনেক কিছুর’ একটি হচ্ছে আহত শরণার্থীকে সরিয়ে নিতে কিছুক্ষণের মধ্যে এক অ্যাম্বুলেন্সের আগমন।

শুধু তাই নয়, বাকি আহত শরণার্থীদের নিয়ে যেতে গাড়ি নিয়ে সেখানে আসে আইওএম। প্রতিষ্ঠানটির যে নিরাপত্তা কর্মকর্তা একদিন আগেও কিছুটা কঠিন রূপে আমাদের সঙ্গে কথা বলছিল, তিনি আহতদের বহনকারী গাড়ি থামিয়ে আমাকে বললেন, ‘ওদের নিয়ে যাচ্ছি। আরও কয়েকজন আহত হয়ে সীমান্ত পড়ে আছে শুনেছি। তাদের আনতেও গাড়ি পাঠানো হয়েছে। সবাইকে ক্যাম্পে রেখে চিকিৎসা দেয়া হবে।’

ক্যাম্প বলতে তিনি বোঝাচ্ছিলেন ‘মিরাল ক্যাম্পের’ কথা। আইওএম পরিচালিত এই ক্যাম্পে সাতশ'র মতো শরণার্থী থাকতে পারেন। তবে, তার চেয়ে অন্তত দ্বিগুণ সংখ্যক মানুষ থাকেন পাশের পাহাড়ে এবং একটি পরিত্যক্ত ভবনে।

সেই ক্যাম্পে গিয়ে দেখলাম, নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনে আহত আরও অনেক শরণার্থীকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। কারো কারো হাত-পাও ভেঙে গেছে। একজনের ডানহাততো প্রায় অচল হয়ে গেছে সীমান্তে নিরাপত্তা বাহিনীর কুকুরের কামড়ে।

সাংবাদিক হিসেবে অনুভূতি না দেখানোরই চেষ্টা করি। কিন্তু নিজের দেশের মার খাওয়া মানুষের করুণ মুখ দেখে চোখে জল এসে গেয়েছিল। কেন ওদেরকে এভাবে জানোয়ারের মতো পেটানো হবে? কোন দেশের আইন এটা সমর্থন করে? এত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আর এই লঙ্ঘন ঘটছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বহিঃসীমান্তে।

ইউরোপীয়দের কাছে এর চেয়ে লজ্জাকর ব্যাপার আর কী হতে পারে! সারা দুনিয়াকে মানবাধিকার শেখানো ইইউ নিজের সীমান্তেই মানবাধিকার নিশ্চিত করতে পারছে না। আমি এটা কোনোভাবে আশা করিনি।

ভেলিকা ক্লাদুসার অনেক সাধারণ মানুষও বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ। ডয়চে ভেলে সেখানকার মানুষের কাছে বেশ পরিচিত গণমাধ্যম মনে হল। এক সন্ধ্যায় আমাদের পথরোধ করেন এক বসনীয়।

ভাঙা ভাঙা জার্মান ভাষায় জানান, একটি ভিডিও আমাদের দিতে চান তিনি। কারিগরি জটিলতায় সেই ভিডিও তিনি শেষ পর্যন্ত দিতে পারেননি। তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভিডিওটি জঙ্গলে কাঠ কাটার সময় তার বন্ধু ধারণ করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছিল, ক্রোয়েশিয়া সীমান্তে মার খেয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে আছে কিছু মানুষ।

কারো মুখ ফেটে গেছে, কারো হাতে, পিঠে মারের দাগ। ভিডিওটি দেখে আমাদের সঙ্গে থাকা বাংলাদেশিরা কয়েকজনকে আমাদের সামনেই শনাক্ত করতে পেরেছিলেন। এই বসনীয় চান, সীমান্তে নির্যাতন বন্ধ হোক। তারমতোই আরেকজন বাসার ওয়াইফাই নেটওয়ার্কের পাসওয়ার্ড মুছে ফেলেছেন যাতে শরণার্থীরা সেটি কোন বাধা ছাড়া ব্যবহার করতে পারেন।

কেউ কেউ আবার জামাকাপড়, জুতা এনে রাস্তার পাশে রেখে যান। সেগুলো বেশ কাজেও লাগে, কারণ সীমান্তে নাকি পেটানোর পর কখনো কখনো প্রায় নগ্ন করে শরণার্থীদের বসনিয়ায় ‘পুশ ব্যাক’ করা হয়। তখন এসব কাপড়ই ভরসা।

যা বলতে চাচ্ছি, তা হচ্ছে বসনিয়া-ক্রোয়েশিয়া সীমান্তে যে বাংলাদেশিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শরণার্থী বা অভিবাসীদের নিয়মিত পেটানো হচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এই পেটানো অনতিবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এজন্য উদ্যোগ যেমন নিতে হবে, তেমনি যেসব দেশের শরণার্থীরা মার খাচ্ছেন, সেসব দেশের সরকারেরও এটা বন্ধে সোচ্চার হতে হবে।

তাদের আশ্রয় দেয়া বা না দেয়া একটি দেশের ইচ্ছার ব্যাপার হতে পারে, কিন্তু পেটানো কোনভাবেই সভ্য কোন দেশের কাজ নয়। তাই এই অসভ্যতা ইইউকেই দ্রুত বন্ধ করতে হবে।

সূত্র: ডিডাব্লিউ

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]