ঘুরে এলাম ঐতিহাসিক আখারনুন

রাকিব হাসান রাফি
রাকিব হাসান রাফি রাকিব হাসান রাফি , স্লোভেনিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৯:১৩ পিএম, ২৫ অক্টোবর ২০২০

শনিবার সকালে বেরিয়ে পড়ি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন নগরী এথেন্স দেখার জন্য। ফেসবুকের কল্যাণে আগে থেকেই আমার সঙ্গে এক বাংলাদেশি ভাইয়ের পরিচয় ছিল। তিনি প্রায় এক বছর ধরে এথেন্সে বসবাস করছেন।

তার নাম গাজী সাদ্দাম, নোয়াখালীর। এথেন্সের আখারনুনে তিনি বসবাস করেন। সেখানে তার চাচার ব্যবসা দেখাশোনা করেন। এথেন্সে এসেছি শুনে বারবার ফোন দিয়ে তিনি অনুরোধ জানালেন দেখা করার জন্য। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ছুটে গেলাম আখারনুন দেখা করার জন্য।

আমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তিনি জড়িয়ে ধরলেন যেনও মনে হলো বহুকাল পর দুইজন কাছের মানুষ এক হয়েছে। পরে তিনি তার সাইফুল ইসলাম নামক এক বন্ধুকে বললেন তার দোকানে আসার জন্য। কিছুক্ষণ পর দেখলাম সাইফুল ইসলাম ভাই সেখানে এসে হাজির। সাইফুল ভাই রংপুরের বাসিন্দা। তিনি প্রায় সতেরো বছর ধরে গ্রিসে বসবাস করছেন।

সাইফুল ইসলাম ভাই এবং গাজী সাদ্দাম ভাইকে সঙ্গে নিয়ে আমাকে সেদিন এথেন্সের সিনতাগমা স্কয়ারের দিকে ছুটে গেলাম। সিনতাগমা স্কয়ার হয়েছে এথেন্সের সিটি সেন্টারের প্রধান চত্বরভূমি। গ্রিসের ন্যাশনাল পার্লামেন্টের অবস্থান এ সিনতাগমা স্কয়ারে। এমনকি গ্রিসের জাতীয় উদ্যান থেকে শুরু করে অলিম্পিয়ান জিউসের মন্দিরসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থানের অবস্থান এ সিনতাগমা স্কয়ারের আশপাশে।

সিনতাগমা স্কয়ারের প্রধান ভবনটি এক সময় আধুনিক গ্রিক সাম্রাজ্যের রাজপ্রাসাদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ রাজপ্রাসাদের সামনে গ্রিসের ইতিহাসে সংগঠিত বিভিন্ন যুদ্ধে নিহতদের স্মরণে একটি প্রতিমূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। অলিম্পিয়ান জিউস মন্দিরটি জিউসের কলাম হিসেবেও পরিচিত। প্রাচীন গ্রিক পুরানে উল্লিখিত সকল দেব-দেবীর মাঝে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন এ জিউস।

তার স্মরণে এটি নির্মিত। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এ সময় থেকে শুরু করে ৬৩৮ বছরেও পরিপূর্ণভাবে এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়নি। খ্রিস্টপূর্ব ১৪৬ সালে গ্রিস রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। রোমান সম্রাট হাদ্রিয়ানের শাসন আমলে এ মন্দিরটিকে পরিপূর্ণ রূপ দেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়।

jagonews24

রোমান শাসনামলে প্রায় ১৪০টি সুউচ্চ কলাম বিশিষ্ট এক সুবিশাল মন্দির হিসেবে এ স্থাপনাটিকে গড়ে তোলা হয়। সে সময় গ্রিসের ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে বড় মন্দির। সময়ের সঙ্গে এ সকল কলামের অধিকাংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। এর পেছনে মূল কারণ ছিল বিভিন্ন সময়ের বহিঃশত্রুর আক্রমণ। কেবলমাত্র ১৫টি কলামের দেখা মেলে, আরও একটি কলাম মাটিতে পড়ে ভূমির সঙ্গে স্পর্শ অবস্থায় রয়েছে। মূলত ১৮৫২ সালে এক ঝড়ের কবলে পড়ে এ কলামটি ভেঙে মাটিতে পড়ে যায়।

বিকেলের দিকে জুয়েল মামা আমাদেরকে পিরাউসে নিয়ে গেলেন। পিরাউস মূলত এথেন্সের কাছে তীরবর্তী সামুদ্রিক এলাকাগুলোর মাঝে অন্যতম। ছুটির দিন হওয়ায় বিকেলের দিকে সেখানে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখেপড়ার মতো। গ্রিকরা তাদের জীবনকে উপভোগ করতে ভালোবাসে, ছুটির দিনগুলোতে দেশটির তরুণ প্রজন্মের অনেকে পার্টিতে মেতে উঠে। আর পার্টি কিংবা যে কোনও উৎসব আয়োজনের জন্য এ রকম এলাকার জুড়ি নেই।

আমাদেরকে গাড়ি পার্ক করার জন্য ফাঁকা জায়গা পেতে প্রায় এক ঘণ্টার মতো ছোটাছুটি করতে হয়েছিল। করোনার প্রভাবে অন্যান্য জায়গাতে তেমন মানুষের সমাগম চোখে না পড়লেও এ এলাকাটি ছিল একেবারে ব্যতিক্রম। আশপাশের রেস্টুরেন্টগুলোতে মানুষের উপচেপড়া ভিড়। কেউ এসেছে তার বান্ধবীকে নিয়ে, কেউবা তার বন্ধুদের নিয়ে, কেউবা আবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে।

সামুদ্রিক মাছের গ্রিল ও ওয়াইনের গন্ধে আশপাশের রেস্টুরেন্টগুলো ম-ম করছে। পিরাউস এথেন্সের অন্যতম প্রসিদ্ধ পোতাশ্রয়। তাই পুরো এলাকাজুড়ে যেদিকে চোখ যায় সেদিকে জাহাজ, রিভার ক্রুজ কিংবা মাছ ধরার নৌকা ছাড়া আর কিছু চোখে পড়বে না। কিছু কিছু রিভার ক্রুজ আছে যেগুলো কেবলমাত্র শৌখিন মানুষদের জন্য।

যারা বিত্তবান তাদের অনেকে এ সকল রিভার ক্রুজে রাত কাঁটাতে সেখানে একত্রিত হন। কোনও কোনও রিভার ক্রুজে করে বিভিন্ন গ্রিক আইল্যান্ডে পাড়ি দেয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে সেজন্য পয়সা খরচ করতে হবে সে রকম। সান্তোরিনি, মিকোনোস, করফুসহ বিভিন্ন আইল্যান্ডগুলোতে যাওয়ার জন্য ফেরি পিরাউস থেকে ছাড়ে। রাতের বেলা জুয়েল মামা আমাদের গন্তব্য ছিল মাউন্ট লিকাবেটোস।

মাউন্ট লিকাবেটোস এথেন্সের সবচেয়ে উঁচু জায়গা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত চুনাপাথরের এ পাহাড়ের ওপর থেকে পুরো এথেন্সকে অবলোকন করা যায়। কারও যদি টেলিফেরিক কিংবা ক্যাবল কারের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা থাকে তাহলে মাউন্ট লিকাবেটোস হতে পারে একটি আদর্শ জায়গা। পাহাড়ের সর্বোচ্চ পয়েন্টে সাদা রংয়ের একটি অর্থোডোক্স চার্চ রয়েছে।

এছাড়াও রয়েছে আরও একটি রেস্টুরেন্ট। জুয়েল মামার মতে দিনের তুলনায় রাতের বেলায় মাউন্ট লিকাবেটোস পরিভ্রমণ করা অধিকতর প্রশান্তির। এ সময় থাকে না রৌদ্রের উত্তাপ, রাতের মেঘমেন্দ্র বাতাসে কৃত্রিম আলোয় উদ্ভাসিত এথেন্সের চারদিকের দৃশ্য আপনার চোখের পর্দায় ভেসে উঠবে তখন অন্যরকম এক পরিতৃপ্তির সাগরে আপনি নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাইবেন। এ রকম সুখকর অনুভূতি হয়তো বা জীবনে সচরাচর খুঁজে পাওয়া যায় না।

পরের দিন সকালে আবার গেলাম আখারনুনে। জুয়েল মামা সেদিন ব্যস্ততার কারণে প্রথম দিকে আমাদের সময় দিতে পারেনি। তাই সাইফুল ভাই আর গাজী সাদ্দাম ভাইকে নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। অনেকদিন ধরেই আমার ইচ্ছা ছিলও অলিম্পিক স্টেডিয়ামটি দেখার জন্য।

অলিম্পিক স্টেডিয়ামটি গ্রিসের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শ্বেতহস্তীর মধ্যে একটি। এথেন্সের উপকণ্ঠে অবস্থিত মারুসিতে এর ১৯৮২ সালে এথেন্সে আয়োজিত ইউরোপিয়ান অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপ টুর্নামেন্টকে ঘিরে এ স্টেডিয়ামটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৮৯৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম আধুনিক অলিম্পিক টুর্নামেন্টের ম্যারাথন গোল্ড মেডেলিস্ট স্পাইরোস লুইসের নাম অনুসারে এ স্টেডিয়ামটির নামকরণ করা হয়।

পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালের ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালসহ ১৯৯৪ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল ম্যাচটিও আয়োজিত হয়েছিল এ স্টেডিয়ামে। বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক কিংবা জাতীয় পর্যায়ের অনেক ইভেন্টের আয়োজন করা হয় এ স্টেডিয়ামে। এমনকি গ্রিসের ঘরোয়া ফুটবলের অন্যতম প্রধান দুইটি দল এইকে এথেন্স এবং প্যানাথিনাইকোস তাদের হোম গ্রাউন্ড হিসেবে এ স্টেডিয়ামকে ব্যবহার করে।

২০০৪ সালে এথেন্সে আয়োজিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক টুর্নামেন্টের প্রাণকেন্দ্র ছিল এ স্টেডিয়াম এবং এ অলিম্পিক টুর্নামেন্টকে ঘিরে স্টেডিয়ামটি ব্যাপক সংস্কার করা হয়। অলিম্পিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে গ্রিসের পুরো অবকাঠামোকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করা হয়। এরই প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করা হয় এথেন্সের বর্তমান এয়ারপোর্টটি।

পাশাপাশি নতুন করে অসংখ্য রাস্তাঘাঁট নির্মাণ করা হয় এবং এথেন্সে মেট্রো পরিষেবারও উদ্বোধন করা হয়েছিল এ অলিম্পিক উৎসবকে ঘিরে। অর্থনীতিবিদের মতে, গ্রিসের অর্থনীতির এ দুর্দশার অন্যতম কারণ হচ্ছে কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া ২০০৪ সালে অলিম্পিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের মতো একটি সিদ্ধান্ত নেয়া। অলিম্পিক উৎসবকে ঘিরে গ্রিসে যে সকল অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল নতুন করে অলিম্পিক টুর্নামেন্ট শেষ হয়ে যাওয়ার পর তার মাঝে অনেক অবকাঠামো সেভাবে কাজে আসেনি।

jagonews24

সেগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করতে গ্রিস সরকারকে বাড়তে অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। এমনকি এ স্টেডিয়ামটি বছরের নির্দিষ্ট দিন ছাড়া তেমনভাবে ব্যবহৃত হয় না বললেই চলে। অলিম্পিক স্টেডিয়ামের পরিদর্শন শেষে আমদের গন্তব্য হয় অ্যাক্রোপোলিস।

বলা হয়ে থাকে যে সকল পর্যটক গ্রিস ভ্রমণে আসেন তাদের কেউই অন্ততপক্ষে অ্যাক্রোপোলিস না ঘুরে গ্রিস ত্যাগ করেন না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রাচীন এক সভ্যতার ধারক ও বাহক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এ অ্যাক্রোপোলিস। এখানকার প্রতিটি বালুকণা যেনও সেই কয়েক হাজার বছর পূর্বের ইতিহাসকে ধারণ করে।

আজকের দিনের গোটা পশ্চিমা বিশ্ব যেনও সে ইতিহাসের ওপর ভর করেই দাঁড়িয়ে আছে। অ্যাক্রোপোলিস হচ্ছে মূলত একটি সিটাডেল বা দুর্গ যা একটি পাথরের টিলার ওপর অবস্থিত। ‘অ্যাক্রোপোলিস’ শব্দটি মূলত প্রাচীন গ্রিক শব্দ অ্যাক্রোন এবং পোলিস এ দুইটি শব্দের সমন্বয় যার বাংলা অর্থ যথাক্রমে সর্বোচ্চ বিন্দু ও শহর। গ্রিসে এ রকম অনেক অ্যাক্রোপোলিসের অস্তিত্ব থাকলেও এথেন্সের এ অ্যাক্রোপোলিসটি অন্য সকল অ্যাক্রোপোলিসের থেকে আলাদা।

আক্রোপোলিস মূলত প্রাচীন কিছু স্থাপত্যকর্ম এবং ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বেশ কিছু ভবনের ধ্বংসাবশেষের জন্য প্রসিদ্ধ। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শনটির নাম পার্থেনন। গ্রিক পুরান অনুসারে এ স্থানটির নাম সেক্রোপিয়া। গ্রিক পুরানে উল্লিখিত কিংবদন্তি সেক্রোপসের নাম অনুসারে এ স্থানটির নাম রাখা হয় সেক্রোপিয়া। গ্রিক পুরান অনুযায়ী সেক্রোপসের হাত ধরে এথেন্সসহ গোটা গ্রিক সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হয়।

সেক্রোপসের শরীরের অর্ধেকটা ছিলও মানুষের মতো এবং বাকি অর্ধেক ছিল সাপের মতো। তবে বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা অনুযায়ী প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দ থেকে এ স্থানে মানুষের বসবাস ছিল। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে স্থানীয় শাসক পেরিক্সের হাত ধরে পার্থেননসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো নির্মিত হয়।

একজন সুবক্তা এবং একই সঙ্গে একজন সেনাপতি হিসেবে সে সময় পেরিক্সের সুনাম ছিলো সর্বজনবিদীত। পার্থেনন মূলত গ্রিক দেবী এথিনার স্মরণে নির্মিত একটি মন্দিরের স্থাপনা। গ্রিক পুরান অনুযায়ী এথিনা হচ্ছেন জ্ঞানের দেবী। বাইজেনটাইন শাসন আমলে পার্থেননকে ভার্জিন মেরির চার্চে রূপান্তর করা হয়।

এরপর অটোমান শাসনাধীন গ্রিসে পার্থেননকে ব্যবহার করা হত সেনাদের সদর দফতর হিসেবে। বর্তমানে গোটা অ্যাক্রোপোলিস অঞ্চলে ১৪টির মতো স্থাপনার অবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়। পার্থেনন ছাড়া উল্লেখ করার মতো অন্যান্য স্থাপনার মধ্যে রয়েছে এথেন্সের প্রাচীন মন্দির, ইরেসিথেয়াম, প্রপিলাইয়া, ইলিউসিনিউন ইত্যাদি। এ সকল স্থাপনার বেশিরভাগই নির্মিত হয়েছিল মন্দির হিসেবে।

অ্যাক্রোপোলিসের ভেতরে প্রবেশ করতে ২০ ইউরো দিয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে হয় তবে বিশেষ কিছুদিনে কোনো ধরনের টিকিট ছাড়া অ্যাক্রোপোলিসের ভেতর প্রবেশ করা যায়। আমরা যেদিন অ্যাক্রোপোলিস পরিদর্শনে গিয়েছিলাম সেদিন ছিল ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ডে আর এ কারণে আমরা কোনো টিকিট ছাড়া অ্যাক্রোপোলিস ভ্রমণের সুযোগ লাভ করি।

অ্যাক্রোপোলিস থেকে আমরা আবার ছুটে গেলাম সিনতাগমা স্কয়ারের দিকে। জুয়েল মামা আমাদেরকে গ্রহণ করার জন্য সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। আমাদের সবার পরবর্তী এবং সর্বশেষ গন্তব্য ছিল প্যানাথেনাইকো স্টেডিয়াম। মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথম অলিম্পিক টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়েছিল এথেন্সে আজকের থেকে আনুমানিক তিন হাজার বছর পূর্বে।

খ্রিস্টপূর্বাব্দ অষ্টম শতাব্দী থেকে শুরু করে চতুর্থ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে পশ্চিম পেলোপোনিস উপদ্বীপে এ অলিম্পিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত। মূলত সে সময় অলিম্পিক উৎসব ছিল গ্রিক দেবতা জিউসকে সন্তুষ্টির একটি মাধ্যম। ইতিহাসের প্রথম অলিম্পিক টুর্নামেন্টটি যে স্টেডিয়ামে আয়োজিত হয়েছিল বলে বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায় তার নাম হচ্ছে প্যানাথেনাইকো স্টেডিয়াম।

১৮৯৬ সালের প্রথম আধুনিক অলিম্পিকের যাত্রাও এখান থেকে শুরু, আমাদের সর্বশেষ গন্তব্য ছিল এ স্টেডিয়াম। আসলে কিছু কিছু বিশেষ স্থান আছে যেখানে মানুষ যায় মূলত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শেকড়ের সন্ধানে। এ প্যানাথেনাইকো স্টেডিয়ামটিও সে রকম, স্টেডিয়ামের ভেতরে প্রবেশ করতে হলে পাঁচ ইউরো দিয়ে টিকিট ক্রয় করতে হয় তবে শিক্ষার্থী বিশেষ করে যে সকল শিক্ষার্থীর বয়স পঁচিশ বছরের নীচে তারা অর্ধেক মূল্যে সেখানে প্রবেশ করতে পারে।

স্টেডিয়ামের ভেতরে একটি ছোটো গ্যালারি রয়েছে যেখানে বিগত বিভিন্ন সময়ে আয়োজিত অলিম্পিক টুর্নামেন্ট চলাকালীন সাধারণ করা কিছু ছবির সংগ্রহ রয়েছে। প্যানাথেনাইকো স্টেডিয়ামটি মার্বেল পাথর দ্বারা নির্মিত। একটু একটু করে স্টেডিয়ামের ভেতরের দিকে হেঁটে যাবেন আপনার কাছে মনে হবে যেনও অতীতের কোনও একদিনে আপনি চলে যাচ্ছেন, হয়তো বা গ্ল্যাডিয়েটর কিংবা ট্রয়ের মতো বিখ্যাত সিনেমাগুলোর দৃশ্যপট আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকবে।

এ স্টেডিয়ামটি পরিদর্শন শেষে আমি, গাজী সাদ্দাম ভাই, জুয়েল মামা এবং সাইফুল ভাই অর্থাৎ আমরা সবাই একত্রিত হয়ে গ্রুপ ছবি তুলি। সাদ্দাম ভাইয়ের অনুরোধে আমরা এরপর ছুটে যাই আখরানুনে, সেখানে এক বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট থেকে সবাই মিলে দুপুরের খাবারের স্বাদ নিই এক সাথে।

এরপর বিদায়ের পালা, সাদ্দাম ভাই এবং সাইফুল ভাই এ দুইজনের আন্তরিকতা আমাকে এতটা মুগ্ধ করেছিল যে আমার তাদেরকে বিদায় জানাতে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছিল। বারবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সে বিখ্যাত কবিতার বিখ্যাত চরণের কথা মনে আসছিলো-

‘যেতে নাহি দিব। হায়, তবু যেতে দিতে হয়,
তবু চলে যায়।’

এমআরএম/এমকেএইচ

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]