মোজাম্বিকে সন্তানদের নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় বাংলাদেশিরা

ফারুক আস্তানা
ফারুক আস্তানা ফারুক আস্তানা , দক্ষিণ আফ্রিকা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৭:০০ পিএম, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০
মোজাম্বিকের নামপুলা প্রদেশে নিজস্ব দোকানে এক বাংলাদেশি

করোনাকালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বেড়েছে খুন, গুম, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। তাদের অধিকাংশই প্রবাসী ব্যবসায়ী। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করলেও ইদানিং দেশটির শহর-গ্রাম সর্বত্রই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বাংলাদেশিরা।

প্রতিবেশী দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি খুন ও অপহরণের শিকার হলেও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া মোজাম্বিকে বাংলাদেশিরা এত বছর ধরে নিরাপদে ব্যবসা-বাণিজ্য করে আসছিলেন।

গত নভেম্বরেই ডাকাত দলের শিকার হয়ে মারা গেছেন দুই বাংলাদেশি। অপহৃত হয়ে মুক্তিপণ দিয়ে বেঁচে ফিরেছেন একজন। এ ছাড়া জঙ্গি গোষ্ঠীর হাতে মারা গেছেন আরও এক বাংলাদেশি।

দেশটির সমুদ্র লাগোয়া অঞ্চলগুলোতে জঙ্গি উৎপাত বেড়েছে। চুরি, ডাকাতি, খুন, অপহরণ বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। এমন পরিস্থিতিতে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করেছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

মোজাম্বিকে ভারত ছাড়াও অন্যান্য দেশের অভিবাসীর পাশাপাশি প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশির বাস। মূলত মুদি, ইলেকট্রনিক ও কৃষিবীজ কেন্দ্রিক মৌসুমী ব্যবসা করেন তারা। ব্যবসা-বাণিজ্যে লাভ হওয়ায় অনেকেই দেশটিতে পরিবার নিয়ে বসতবাড়িও গড়ে তুলেছেন।

দেশটিতে দীর্ঘদিন ভারতীয় ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে অপহরণ করে অর্থ আদায় করে ছেড়ে দিয়ে আসলেও সম্প্রতি বাংলাদেশিদের সঙ্গে ডাকাতি, খুন, অপহরণের মতো অপরাধগুলো বেড়েছে।

jagonews24

চলতি বছরের ২৯ নভেম্বর গভীর রাতে মোজাম্বিকের জাম্বেজিয়া প্রদেশের মাজেমাত এলাকায় ডাকাত দল বাংলাদেশি সরোয়ার হোসেনকে (২৮) পিটিয়ে ও গুলি করে হত্যার পর মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়ে যায়। নিহত সরোয়ারের বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায়।

কিছুদিন আগে ১৫ নভেম্বর নামপুলা প্রদেশের সালাওয়া এলাকায় বেলা ১১টার সময় মুখে পলিথিন মোড়ানো অবস্থায় মিজানুর রহমানের মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয়রা। তিনি ওই এলাকায় ব্যবসা করতেন। তার বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় বলে জানা গেছে।

স্থানীয় বাংলাদেশিরা জানান, নিহত মিজানুর রহমান (৩০) ওই বাড়িতে একাই থাকতেন। ধারণা করা হচ্ছে, শনিবার রাতে সংঘবদ্ধ ডাকাত দল তার বাসায় হানা দিয়ে টাকা-পয়সা মালামাল লুট করে। পরে হাত পা বেঁধে মুখ পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে চলে যায়। এতে শ্বাসরোধ হয়ে তিনি মারা যান।

গত ৩ নভেম্বর দেশটির মনিকা প্রদেশের চিমোইও এলাকা থেকে প্রভাবশালী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মুহাম্মদ রশিদকে (৩৮) তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে থেকে আচমকা গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় কৃষ্ণাঙ্গদের একটি দল। তিনি ওই এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। অপহরণকারীদের চাহিদা মতো মুক্তিপণ দিয়ে ১১ নভেম্বর ভোরে মুক্ত হন তিনি।

এর আগে ১২ সেপ্টেম্বর মোজাম্বিকের প্রেম্বা এলাকা থেকে বাংলাদেশি নুরুল ইসলাম (৩০) নামের এক ব্যবসায়ী নিখোঁজ হন। পাঁচ দিন পর তার মরদেহ জঙ্গলে পাওয়া যায়। স্থানীয়রা বলছেন, নুরুল ইসলাম জঙ্গি গোষ্ঠীর হাতে নিহত হয়েছেন। তার দেশের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার বাসখালী উপজেলায়।

jagonews24

মোজাম্বিকের প্রেম্বা এলাকায় জঙ্গি হামলায় নিহত বাংলাদেশি

এ ছাড়াও প্রতিদিন দেশটির কোথাও না কোথাও বাংলাদেশিদের ব্যবসা- প্রতিষ্ঠান, বাসাবাড়িতে চুরি, ডাকাতির ঘটনা ঘটছে।

স্থানীয় বাংলাদেশিরা জানান, মোজাম্বিকে মহামারিকালে অপরাধের মাত্রা বেড়ে গেছে। দেশটিতে যারা বড় ব্যবসায়ী পরিবার নিয়ে যারা বসবাস করে আসছেন, যাদের বাচ্চাদের স্কুলসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে বাইরে যেতে হয়। সেসব বাংলাদেশিরা বেশি আতঙ্কে রয়েছেন।

কেননা অপহরণকারীদের প্রধান টার্গেট শিশুরা। কারণ সন্তানদের তুলে নিতে পারলে অভিভাবকদের থেকে বেশি অর্থ আদায় করা যাবে। সম্প্রতি বাংলাদেশি অপহরণের ঘটনায় অপহরণকারীদের কাছ থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। এতে অভিভাবকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা বেড়েছে।

মোজাম্বিকের নামপুলা প্রদেশে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী জিকু বলেন, এখানে বর্তমানে প্রবাসীরা চরম হুমকির মধ্যে আছে। যে যেভাবে পারছে নিরাপদে থাকার চেষ্টা করছে। অনেকে বাইরে যাওয়াও কমিয়ে দিয়েছেন

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান মোজাম্বিক থেকে জানান, মোজাম্বিকেও একদল বাংলাদেশি এই অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত। ফলে তাদের কারণে অনেকেই পরিবার ছেলে সন্তান নিয়ে আতঙ্কে দিন পার করেছেন। বাচ্চাদের সাথে সারাক্ষণ থাকতে হচ্ছে। স্কুলে নিয়ে বাইরে বসে থাকতে হচ্ছে।

এমআরএম/এসএ/এমকেএইচ

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - jagofea[email protected]