একজন সুইডিশ ফায়ারম্যানের সঙ্গে কিছুক্ষণ

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ০৪:২৩ পিএম, ১৮ জানুয়ারি ২০২১

আজ হাঁটতে বেরিয়েছি বন্ধু টোমি লিন্ডকিভিস্তের সঙ্গে। তার সঙ্গে সম্পর্ক শুধু প্রতিবেশি হিসেবেই নয়, তার ছেলে এবং আমার মেয়ে সমবয়সী। তারা নার্সারি থেকে শুরু করে নবম শ্রেণি পর্যন্ত একই সঙ্গে লেখাপড়া করেছে। টোমি চাকরি করে স্টকহোম ফায়ার ব্রিগেডে এবং একটি ইউনিটের ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে নিয়োজিত।

সময় এবং সুযোগ হলে মাঝে মধ্যে হাঁটতে পথে নানা বিষয়ের উপর তার সঙ্গে আলোচনা করি। প্রসঙ্গত তার ইউনিটের কাজ কী জিজ্ঞেস করলাম যেমন- রাতের ডিউটিতে তারা কী করে ইত্যাদি।

উত্তরে বললো, নিরিবিলি সময়ে নানা বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ চলে নতুন চিন্তা-চেতনা নিয়ে। যেমন গত দুই দিন আগে তারা ড্রাইভিং করেছে রাত আটটা থেকে দশটা অবধি স্টকহোম সিটি হলের (সিটি হলে বার্ষিক নোবেল পুরস্কার অনুষ্ঠান এবং নৈশভোজশালা আয়োজন করা হয়) সামনে, ড্রাইভিয়ের যন্ত্রপাতি সব ঠিক আছে কিনা তা চেক করার জন্য।

পরে রাতের ডিনার সেরে টিম বিল্ডিংয়ের উপর কাজ করেছে। আমি বললাম সে আবার কী? উত্তরে টোমি বললো, যখন অন্যের বিপদে নিজেদের জীবন বাজি রেখে কাজ করতে হয় তখন পরস্পর পরস্পরের উপর যাতে বিশ্বাস না হারায় তার জন্যই এই টিম বিল্ডিং।

তাছাড়া এক স্টেশনে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তাদের থেকে সে বিষয়ের উপর জানা এবং শেখা বা যদি কিছু জানানোর থাকে তাও জানানো হয়। আবার প্রতিদিনই রাস্তার দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে নানা ধরনের বিপদে তার টিম কাজ করে। শরীর ঠিক রাখার জন্য সব সময় শরীরচর্চা ইত্যাদি।

তাকে জিজ্ঞেস করলাম অ্যালার্ম বাজার সঙ্গে সঙ্গে রেডি হয়ে গন্তব্য স্থলে পৌঁছাতে কত সময় লাগে। সে বললো, নির্ভর করে দূরত্বের ওপর। তবে সব মিলে সর্বোপরী সাত মিনিট, এর মধ্যেই আমরা গন্তব্য স্থলে পৌঁছে থাকি। নানা কথা বলতে বলতে গতকাল সন্ধ্যার একটি ঘটনার কথা তুলে ধরলো।

শীতের সময় প্রায়ই শোনা যায় অনেকে লেকের মাঝে হাঁটতে গিয়ে পানিতে ডুবে যায়। বেশ কয়েকদিন ধরে তুষারপাত হচ্ছে সুইডেনে। বাংলাদেশের সেই আষাঢ় শ্রাবণ মাসের মতো ঝরছে, তবে বৃষ্টি না তুষার।

তুষার যখন পড়ে তখন তাপমাত্রা জিরো ডিগ্রির মতো থাকে, তুষার পড়া বন্ধ হলে সাধারণত তাপমাত্রা উঠানামা করে। বর্তমানে সুইডেনের তাপমাত্রা মাইনাসে থাকায় পুরো দেশ বরফে ঢাকা পড়েছে। গাছে কোনো পাতা নেই তবে তুষারে ঢেকেছে পুরো পরিবেশকে, যার ফলে অন্ধকারের চেয়ে কিছুটা আলোময় পরিবেশ বাইরে।

এমন সুন্দর পরিবেশে টিনএজের কিছু ছেলে-মেয়ে সন্ধ্যায় বাইরে তুষারে খেলাধুলা করতে করতে হঠাৎ বাল্টিক সাগরে পা দেয়। তারা মনে করেছে সাগর জমে গেছে। জমেছে ঠিকই তবে পুরোপুরি শক্ত হয়নি। তারপর তুষারে ঢাকা পড়ার কারণে বোঝার উপায় নেই পানির উপরের বরফ কতটা শক্ত।

তাদের মধ্যে একটি ছেলে সাগরের পানিতে পড়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গে ১১২ ইমারজেন্সিতে ছেলেটির খেলার সাথীরা ফোন করে। ঘটনাটি ঘটেছে টোমির রেঞ্জের মাঝে সে তখন তার টিম নিয়ে এসে ছেলেটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে দিয়ে যায়।

বাংলাদেশের ফায়ার ব্রিগেডের দৈনন্দিন কাজের উপর কিছুদিন আগে একটি রিপোর্ট নজরে পড়েছিল যেমন তারা খবর দেওয়ার আধা ঘণ্টা-এক ঘণ্টা পরে আসে। এসে ছাইভস্মের মাঝে পানি ঢালে।

অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার পরও আজ অবধি প্রতিটি উপজেলায় ফায়ার স্টেশন স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। যেসব উপজেলায় ফায়ার স্টেশন নেই সেখানে আগুন লাগলে পার্শ্ববর্তী উপজেলার ফায়ার স্টেশনে খবর দিয়ে দমকল বাহিনী আনতে হয়।

তবে অতি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক প্রতিটি উপজেলায় একটি করে ফায়ার স্টেশন নির্মাণ করে প্রতিটি বিভাগকে আধুনিক ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে জেনেছি।

দেশ এবং দেশের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে ফায়ার সার্ভিসকে দ্রুত আরও আধুনিকায়ন করা দরকার। বহুতল ভবনের অগ্নিনির্বাপণের জন্য মই থেকে শুরু করে নানা ধরণের যন্ত্রপাতি থাকা দরকার। শুধু আশ্বাস থাকলে হবে না বাস্তবায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস সূত্রে যতটুকু জেনেছি, অগ্নিকাণ্ডের সময় সব জায়গায় পানি সহজে পাওয়া যায় না। তাই তারা ওয়াসাকে বিশেষ কিছু স্থানে হাইড্রেন্ট পয়েন্ট স্থাপনের তাগিদ দিয়েছে কিন্তু আজ অবধি হাইড্রেন্ট পয়েন্ট স্থাপিত হয়নি।

উন্নত বিশ্ব যেমন সুইডেনে অগ্নিনির্বাপণে ফায়ার মিক্সড যন্ত্রটি ব্যবহার করে, যা দিয়ে অল্প পানি ব্যয়েই অগ্নিনির্বাপণ সম্ভব। এসব যন্ত্র বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিসে নেই। কবে সংযোজন হবে তা এখনও জানা যায়নি।

ফায়ার স্টেশনগুলোতে জনবলেরও ঘাটতি আছে। নতুন স্টেশন চালু হলে প্রশিক্ষিত দমকল কর্মীর ঘাটতি আরও প্রকট হবে। তারপরও প্রশ্ন আছে কর্মরত ফায়ারম্যানদের অনেকের শারীরিক যোগ্যতা নিয়ে। যাইহোক উপরের বর্ণনায় এটাই পরিষ্কার বাংলাদেশ ফায়ার ব্রিগেডে পর্যাপ্ত পরিমাণ মানসম্মত যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে।

আবার যন্ত্রপাতির ঠিকমতো যত্ন না নেবার কারণে অনেক যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে আছে। টোমি বেশ গর্বের সঙ্গে বললো নাগরিকদের জীবনে স্বস্তি দেয়াই তাদের কাজ। সে ফায়ার ব্রিগেডের উপর পারদর্শী তাই নানা বিষয়ের উপর জানলাম। ভাবনায় এলো শেয়ার করি তার কর্মের অংশটুকু সবার সঙ্গে।

যাইহোক আজকে টোমি একটি নোটিশ দিয়েছে যেন কেউ হাঁটতে পথে বাল্টিক সাগরে না নামে। কারণ কমপক্ষে চার সেন্টিমিটার বরফ পানির উপর জমা হতে হবে। তাপমাত্রা কয়েক দিন যাবত মাইনাসে থাকার পর বরফের উপর দিয়ে হাঁটাহাঁটি থেকে শুরু করে স্কি করা সম্ভব হবে। বাড়ির পাশে বাল্টিক সাগর ঠান্ডায় জমে গেছে সত্বর হাঁটব তার উপর দিয়ে, ভাবতেই গা শিউরে ওঠছে।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন। [email protected]

এমআরএম/জিকেএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]