তুষার আবৃত্ত স্বপ্ন

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:৪২ পিএম, ২৩ জানুয়ারি ২০২১

কাজী এনায়েত উল্লাহ, প্যারিস, ফ্রান্স

আচমকা বাতাসে ধেয়ে আসা তুষারে ঢেকে গেছে ফারুকের সারা শরীর। মুখের ওপর থেকে সেগুলো সরানোর মতো শক্তিও তার হাতে নেই। সাদা বিছানাটা বড়ই হিমশীতল। আকাশটা ছাদ হলেও দেওয়ালগুলো সীমানাবিহীন। চারদিকে শুধু সাদা আর সাদা। ব্যাকপ্যাকের শুকনা খাবার ও পানি শেষ হয়েছে দু’দিন আগেই। সে একা নয়। সাথে আছে আরও চব্বিশজন। সবাই আটকা পড়েছে এই তুষার ঝড়ে।

কিছুক্ষণ আগেই মারা গেছে বাম পাশের শফিক। অন্যদের কে কে বেঁচে আছে তা বোঝার উপায় নেই। যেন নিষ্প্রাণ পড়ে আছে সবাই কাছাকাছি। আকাশ থেকে পেঁজা তুলোর মতো ঝরে পড়ছে বাসমতী চালের ধবধবে সাদা ভাতের মতো তুষারগুলো। সময় থমকে গেছে জীবনের ভারে। রোদগুলো বরফের মতো সাদা আজ। সূর্যটা দেখা যাচ্ছে, তবে ঘোলা চশমা দিয়ে কুয়াশার আবছা।

ভাবনার জগতে ফারুক নস্টালজিক হয়ে পড়ছে বারবার। স্মৃতিতে সরব মাছ ধরা নৌকা, সাগরের উত্তাল ঢেউ, রূপালি ইলিশ নিয়ে ঘাটে ভেড়া। মনে পড়ছে ছোট বোনগুলোর কথা। বৃদ্ধ মা-বাবা, বিধবা বড় ভাবি আর ভাইয়ের রেখে যাওয়া কবুতরের ছানার মতো যমজ দুটি মেয়ের মুখ দূর আকাশে অসহায় সূর্যের আয়নায় ভেসে উঠছে যেন সিনেমার মতো; একের পর এক। আরেকজনের কথাও এই মুহূর্তে ফারুকের খুব মনে পড়ছে। যাকে অল্প সময়ের জন্য কাছে পেয়েছিল খুব একান্তে।

পাহাড়সমান স্বপ্ন দেখতে দেখতে ভোলার চরফ্যাশনের এক আদম ব্যাপারি আসরাফের হাতে জীবন সঁপে দেয় ফারুক। গত তিন বছরে জমিজমা বিক্রি আর চড়া সুদে এনজিওর লোন তুলে আসরাফকে দেয় সতেরো লাখ টাকা। স্বপ্ন একটাই-বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ফ্রান্সে গিয়ে পৌঁছাবে। আসরাফ বলেছে, ‘একটু কষ্ট করো মিয়া। ফ্রান্সে গেলেই দেখবা আকাশে-বাতাসে ‘ইউরো’ উড়তাছে। সব ঋণ শোধ করতে ছয় মাস লাগব। দুই বছর পর আইসা বউরে নিয়া যাবা। বউরে নিয়া আইফেল টাওয়ারের সামনে খাড়াইয়া সেলফি তুলবা। জীবনে আর কী লাগে?’

ডিগ্রি পাস করে ফারুক বাবার সঙ্গে সাগরে মাছ ধরে। বাবার বয়স হয়েছে। তার একার শ্রমে সংসার চলে না। সংসারের চাকার মরিচা তুলতে গিয়ে পড়াশোনা আর এগোয়নি। আসরাফের দেখানো স্বপ্ন যদি সত্যি হয়, তাহলে তো তিন বছরে সে কোটিপতি!

ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির মাঝে মিষ্টি নিয়ে আসরাফ একদিন ফারুকের বাড়িতে আসে। অনেক বড় সুসংবাদ বয়ে এনেছে সে। ফারুকসহ চারজনের ভিসা হয়ে গেছে। এখন শুধু বিমানের টিকেট কাটার পালা। বাড়ির জমি বন্ধক দেয়া হয়েছে বেশ আগেই। হালের গরুগুলো বিক্রি করে সাথে নেয় আড়াই লাখ টাকা। ভিসা হওয়ার পরদিনই ফরিদার সাথে ফারুকের বিয়ে হয়। বিয়ের চার দিনের মাথায় ফারুক ফ্রান্সের উদ্দেশে পা বাড়ায়।

বিদায়ের সময় চার চারটি বোন ফারুককে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকে। বৃদ্ধা মা ছেলের চোখেমুখে হাত বুলিয়ে চুমু খাচ্ছিল বারবার। বাবা কালেমা শাহাদাত পড়ে মাথায় ফু দিয়ে দিল, পথে যাতে কোনো বালা মুছিবত না হয়। সবার সামনে নববধূ না পারল তাকে জড়িয়ে ধরতে না পারল তাকে বিদায় দিতে।

আঁচলে মুখ ঢেকে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে বারান্দার বাঁশের খুঁটি ধরে। লাজুকতার ভারে ফারুকও মা-বাবার সামনে বউকে জড়িয়ে ধরে যে সান্ত্বনা দেবে, সেটাও পারল না। এরই মধ্যে আসরাফ এসে তাড়া দেয়, ‘এত কান্নাকাটির কী হইল তোমাগো? পোলা তো যাইতাছে ট্যাকা কামানোর লাইগা। হাসিমুখে বিদায় দাও। গাড়ি খাড়াই রইছে। জলদি আসো মিয়া।’

ভোলা থেকে ঢাকা। এরপর বিমানে কলকাতা। সেখান থেকে ট্রেন ও বাসে করে পাকিস্তান হয়ে ইরান। মাইলের পর মাইল বনজঙ্গল আর পাহাড়-পর্বতবেষ্টিত পথ হেঁটে ইরান থেকে তুরস্ক সীমান্তে প্রবেশ করেই তুষারের কবলে পড়ে ফারুকের দল। ইরান থেকে সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও ১৫ জন। অন্যদের ভাষা না বুঝলেও এটা তারা বুঝেছে যে সবার গন্তব্য একটাই–স্বপ্নের দেশ ফ্রান্স অথবা ইতালি।

ফারুকদের সঙ্গে আসরাফের কথা ছিল কলকাতা থেকে বিমানে সরাসরি ফ্রান্সে নিয়ে আসবে। কিন্তু কলকাতায় পৌঁছানোর পর সব হিসাব পাল্টে যায়। সেখানে তাদের বোঝানো হয়, সরাসরি ফ্রান্সে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। বাধ্য হয় তারা স্থলপথে যাত্রা শুরু করতে। কেননা পেছনে ফেরার পথ নেই।

এই পথ শুধু সামনে এগোনোর। উন্নত জীবনযাপনের আশায় পথিমধ্যে এসব কষ্ট তাদের কাছে নস্যি। গন্তব্য তাই দিগন্তের ওপারে। রঙিন স্বপ্নগুলো যেখানে ভেসে বেড়ায় মেঘদূত হয়ে। সেসব যে ধরতে পারে তা হলেই সেটা তার। সেখানে কোনোভাবে পৌঁছাতে পারলেই চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মিলে যাবে একেবারে জ্যামিতিক হারে।

দুর্গম বন্ধুর পথ চলতে চলতে হঠাৎ করে যে তুষার ঝড় শুরু হবে, সেটা কেউই ভাবেনি। আর এই তুষারের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। শরীরের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হলে দেহ যেভাবে ছেড়ে দেয়, তুষারে আজ তাদের সেই অবস্থা। সবাই শুয়ে আছে জঙ্গলে। তুষারে ঢেকে গেছে পুরো শরীর। শীত নিবারণের তেমন বস্ত্রও সঙ্গে নেই। জীবনে হার না মানা তারুণ্য কি আজ তুষারের কাছে হেরে যাবে?

ঘুমের মাঝে মানুষ যেভাবে স্বপ্ন দেখে, ফারুক জেগে থেকে দেখছে সেসব। এটা কি ঘোর নাকি মৃত্যুর আগে নিভে যাওয়া প্রদীপ যেভাবে দপ করে জ্বলে ওঠে, সেভাবেই ভাবছে সবকিছু? এই মুহূর্তে তার মাকে খুব মনে পড়ছে। তিন-চার দিন পর সাগর থেকে মাছ ধরে বাড়ি ফিরলে আগে যেত অন্ধ মায়ের কাছে।

ছেলেকে চোখে দেখতে না পেলেও গালে-মুখে হাত বুলিয়ে যেন অন্তরের দর্পণে মা দেখতে পেত তাকে। ফারুক একটা সময় স্বপ্ন দেখত, তার যখন অনেক টাকা হবে, তখন মায়ের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনবে যে করেই হোক। আইলার আঘাতে মাছধরা ট্রলারডুবিতে বড় ভাই মারা যাওয়ার পর ভাবি আর যমজ দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকালে বুকটা হুহু করে ওঠে তার।

অতি কষ্টে তাদের জীবনযাপন। ছেঁড়া পালের নিরুদ্দেশ নৌকার মতোন। অন্যদিকে ছোট বোনগুলো প্রাইমারি আর উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ছে। সবারই একমাত্র যক্ষের ধন ফারুক। যার মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে আছে সবাই নিবু নিবু প্রদীপের মতো।

এই তো কদিন আগেই হলো তাদের বাসর রাত। ফরিদার সাথে তার দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বেকার ফারুকের কাছে তো আর মেয়েকে বিয়ে দেয়া যায় না এই কথাটা ফরিদার বাবা ভালো করেই বুঝত। তবে ফারুকের ভিসা হলেই তাদের বিয়ে, এটাই কথা ছিলো। বাসরঘরে ভালোবাসার মানুষটিকে কাছে পেয়েও ফরিদা অভিমান করে বসে ছিল চকির আরেক কোণে। একটু পরপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে

কাঁদছিল। অনেক চেষ্টায় ফরিদার মান ভাঙানোর পর ফারুকের বুকে মাথা রেখে সে বলেছিল, ‘তিন দিন পরই তো আমাকে ছাইড়া চইলা যাইবা। তাইলে আরও আগে বিয়া করলা না কেন? আর পেপার-পত্রিকায় পড়ছি, ফরাসি মাইয়ারা বেজায় সুন্দরী হয়। সেখানে গিয়া আমাকে ভুইলা কোনো ফরাসি মাইয়ারে বিয়া করবা না তো? ছেলেদের বিশ্বাস নাই। সুন্দরী মাইয়া দেখলেই বিড়ালের মতো চুকচুক করে।’

দেখো ফরিদা, আজ আমাদের বাসররাত। এভাবে সময় নষ্ট করা কি উচিত কিনা বলো? আসো, বুকে আসো। তুমি আমার সবকিছু, এটা তুমি ভালো করেই জানো, বলো জানো না! গত চার বছরে একটা চুমু পর্যন্ত খেতে দাওনি। শুধু বলেছ, বিয়ের আগে তুমি এটা করবে না। আজ কিন্তু আমি চার বছরের শোধ তুলব।

হুম, কত পারো দেখা যাইবো - এ কথা বলতেই ফরিদাকে বুকের সাথে জাপটে ধরে ফারুক। না, সে আর কিছুতেই অতীত, বর্তমান মনে করতে পারছে না। ফরিদার মতো সত্য এই পৃথিবীতে আর কিছু নেই, থাকবেও না! ঠোঁটে ঠোঁট রেখে দুজনেই দৃষ্টিবিহীন। ভোকাট্টা হয়ে যায় তাদের ঘুড়ি। ঘুড়ির পেছনে দুজন ছুটছে তো ছুটছেই।

ফরিদার শীৎকারের শব্দে তোলপাড় এই পৃথিবীর সবকটা ঘর। সেই শব্দে ফিকে হয়ে আসে তুষার পড়ার দৃশ্য। ফারুক হয়তো আর কোনো দিনই জানবে না যে তুরস্কের এই সীমান্তবর্তী জায়গা থেকে তার ফরিদা আর ফ্রান্স কতদূরে।

এমআরএম/এমকেএইচ

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]