নন্দিত দুই বুদ্ধিজীবীর বিদায় এবং কিছু কথা

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭:৩৯ পিএম, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১

মো. মাহমুদ হাসান, কলামিস্ট, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

‘সবকিছু বলতে চাই না। সুবিধাবাদীদের রাজ্যে বাস করে সত্য বলা কঠিন’। কথাটি প্রখ্যাত সাংবাদিক নঈম নিজামের। সাংবাদিক নঈম নিজাম বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক ধারক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন কলম সৈনিক।

এককালে ছাত্র রাজনীতিতে পুরোধা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সামরিক একনায়কের চক্ষুশূল হয়ে নানা নির্যাতনেরও শিকার হয়েছেন। বটবৃক্ষসম কিংবদন্তিতুল্য আওয়ামী লীগ নেতাদের স্নেহধন্য হয়ে এখনো পরম ভালোবাসার ছায়াতলে।

শেখ হাসিনার কঠিন সময়ে তার সফরসঙ্গী হয়ে যিনি পাশে থেকেছেন, প্রভাবশালী দেশের কূটনীতিকরাও যাকে সমীহ করেন, এমন মানুষ যদি বলেন, সত্য বলা কঠিন; তাহলে তো আমার মতো ছা-পোষাদের বেঁচে থাকাই দায়। প্রিয় কলামিস্ট-সাংবাদিক নঈম ভাইয়ের লেখাটি পড়তে পড়তে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে।

বঙ্গবন্ধু মুজিবের বাংলায়, মুজিবের ‘স্বপ্নের সোনার বাংলা’ই যার ধ্যান-জ্ঞান, এমন মানুষ যদি আতঙ্কিত হন, কালো মেঘের পূর্বাভাসের শঙ্কা তো থেকেই যায়। এমন এলোমেলো ভাবনা নিয়ে আমি যখন মোহাচ্ছন্ন, তখনই জানতে পারি লেখক, কলামিস্ট, প্রগতির বাতিঘর, অসাম্প্রদায়িক আদর্শের এবং মুক্তচিন্তার আপসহীন কলম সৈনিক সৈয়দ আবুল মকসুদ আর বেঁচে নেই।

সেলাইহীন সাদা পোশাকে সারাজীবন যে মানুষটি শুভ্রতাকে ই জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে মনে করেছেন, এমন সত্যাশ্রয়ী মানুষের তিরোধানে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা কি আর কোনোদিন পূরণ হবে? সাহিত্য, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ নানামুখী প্রতিভায় সমৃদ্ধ এমন স্পষ্টবাদী লেখক, গবেষকের আকস্মিক চিরবিদায়ে মেধা আর শুদ্ধাচারের জগতে অপূরণীয় ক্ষতি হলো।

চল্লিশটিরও বেশি সাহিত্য ও গবেষণাকর্মের মাধ্যমে জাতির জন্য নিজেকে যেভাবে নিবেদিত করেছিলেন, তার কিয়দাংশ যদি পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে প্রস্ফুটিত হয়, তবেই তার অন্তরাত্মা শান্তি পাবে।

প্রগতির ধারক সৈয়দ আবুল মকসুদের চিরবিদায় যখন মনোজগতকে বিক্ষিপ্ত করে দিচ্ছিল, এরই মাঝে জানতে পারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ আর নেই। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে আজ অবধি কত গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর এলেন-গেলেন।

মেধা বিচক্ষণতায় অনেকেই হয়তোবা তার চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বও দাবি করতে পারেন, কিন্তু দেশমাতৃকার বিবেচনায় তার চলে যাওয়া সমাজ ও রাষ্ট্রে যে হাহাকার সৃষ্টি করেছে, তা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম।

স্পষ্টবাদী, সুলেখক, সমাজহিতৈষী অর্থনীতিবিদ ইব্রাহিম খালেদের মতো অনাচারের বিরুদ্ধে এমন বজ্রকণ্ঠ সুধীজন আজ সমাজে বড়ই বিরল। দেশের প্রতি আনুগত্য, বঙ্গবন্ধুর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাবোধের পাশাপাশি প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকে ও তিনি উন্নয়নের অন্তরায় মনে করতেন।

আমাদের দেশে সুশীল বুদ্ধিজীবী মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। তারা ধারায় ধারায় বিভক্ত। তাদের ক’জন ই বা সাধারণ মানুষের চিন্তার প্রতিনিধি হয়ে উঠতে পেরেছেন?

কালোকে কালো আর সাদাকে সাদা বলার সৎ সাহস ক’জনই বা রাখেন! সকল ধারা আর বলয়ের ঊর্ধে উঠে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের বিবেক হয়ে উঠেছিলেন খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ।

ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খেলাপি সংস্কৃতি আর অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে এমন সোজাসাপটা মন্তব্য তিনি ছাড়া আর কেউ করেছেন কি-না জানা নেই। দেশে অনেক বিনয়ী, মেধাবী অর্থনীতিবিদ আছেন, তাদের সততাও প্রশ্নবিদ্ধ নয়। তবুও তারা কেন ইব্রাহিম খালেদের মতো বলতে পারেন না ‘অনাচারের গুরুদের ক্ষমতার শীর্ষে রেখে ব্যাংকিং খাতের সুশাসন সম্ভব নয়’?

বহু সভা, সমাবেশ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম আর পত্র-পত্রিকা আর গণমাধ্যমে অসীম ক্ষমতাধর আর্থিক খাতের দুর্বৃত্তদের নাম ধরে বলতেও তো তার বুক কাঁপেনি। এমন অসীম শক্তি আর সাহস তিনি কীভাবে অর্জন করেছিলেন?

আজকালের সুশীলরা বলার আগে পাওয়া, না পাওয়ার হিসাব করেন। কেউবা একবার পেয়েছিলেন বলে, কৃতজ্ঞতায় নত হয়ে সত্যিটা চেপে যান। কেউবা ভবিষ্যতে পাওয়ার আশায় স্তুতিবাক্য আওড়াতেই ব্যস্ত থাকেন। আবার কেউ হয়রানির শঙ্কায় নিজেকেই আড়ালে রাখেন।

এমন পরিস্থিতিতেও ইব্রাহিম খালেদ সত্যাশ্রয়ী নির্ভীক হয়ে সকল অনিয়ম অনাচারের বিরুদ্ধেই কথা বলেছেন। সত্যিকারের নির্লোভ চরিত্রের সাদামাটা জীবনে পাওয়া না পাওয়ার হিসাব ছিল না বলেই একজন ডেপুটি গভর্নর হয়েও তিনি বাংলাদেশের আর্থিক খাতের বিবেক হয়ে উঠেছিলেন। দেশপ্রেমিক মানুষ তাকে আজীবনই স্বচ্ছতা আর নৈতিকতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে জাতি।

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, উন্নয়নে বিস্ময়কর সাফল্যও আছে। প্রবাসে অর্থপাচার, নামে-বেনামে ঋণ খেলাপি, ওভার/আন্ডার ইনভয়েসিং-এর মাধ্যমে দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি, ব্যাংক ব্যবস্থার পারিবারিকীকরণ, শেয়ারবাজার আর ব্যাংকিং খাতের সুশাসন এখনো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

উন্নত বাংলাদেশের পথে এসব চ্যালেঞ্জে জয়ী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। করোনাকালে হারিয়ে যাওয়া প্রগতির বাতিঘর খ্যাত সর্বজন শ্রদ্ধেয় ড. আনিসুজ্জামান, খ্যাতিমান প্রকৌশলী অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, সৈয়দ আবুল মকসুদ, খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদদের দেখানো পথে চললেই সেসব চ্যালেঞ্জ উতরানো সহজ হয়ে যাবে।

এমআরএম/জিকেএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]