বঙ্গবন্ধু : আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ পরিচিতির মহান কারিগর

মুহাম্মাদ ইছমাইল
মুহাম্মাদ ইছমাইল মুহাম্মাদ ইছমাইল , আরব আমিরাত প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৫:৫৫ পিএম, ১৮ মার্চ ২০২১

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। পানি ছাড়া যেমন জীবন কল্পনা করা যায় না ঠিক তেমনি বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশও ভাবা যায় না।

যে নেতা যৌবন কাটিয়েছেন পাকিস্তানের কারাগারে, ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, যে নেতা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য-আদর্শ সামনে নিয়ে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করে, মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার বীজ রোপণ করেছিলেন তার ফলশ্রুতিতে ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে ১০ লক্ষাধিক লোকের জনসমুদ্রে গণনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

সর্বোপরি যে নেতার জন্ম না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হত না। যার হৃদয়ে সবসময় ছিল বাংলাদেশের গরিব দুঃখী মানুষের অবস্থান। রাষ্ট্রপরিচালনার সব যোগ্যতা নিয়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যার নেতৃত্বে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ অতি অল্প সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করে।

স্বাধীনতার পর পরই বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক দেশের স্বীকৃতি লাভ করেছিল। বিশ্বসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ইতিহাসের মহানায়ক হিসেবে শ্রদ্ধার আসনে সমাসীন হয়েছেন। সে সময় বাংলাদেশ যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করেছে- তার মধ্যে কমনওয়েলথ অব নেশনস, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, ইসলামিক সম্মেলন সংস্থা, জাতিসংঘ অন্যতম।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশের মাটিতে পা রেখেই আত্মপ্রত্যয়ী ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন বঙ্গবন্ধু দেশ গড়ার কাজে লেগে যান। দেশের জন্য রচনা করেন সংবিধান। সে সঙ্গে প্রণয়ন করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি। পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক কথা—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এবং ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান’ এর ওপর ভিত্তি করেই আজকের বাংলাদেশ বিশ্ব সমাজের সঙ্গে দৃঢ়তর সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রথম বিদেশ সফর করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পরম মিত্র প্রতিবেশী ভারতের কলকাতায় ২০ লক্ষাধিক মানুষের মহাসমুদ্রে তিনি বক্তব্য দিয়েছিলেন। ২৯ ফেব্রুয়ারি পাঁচ দিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে তিনি মস্কোর উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। ১৬ মার্চ সফর করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের আরেক মিত্রদেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ আইএমএফ (১৭ মে), আইএলও (২২ জুন), আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়ন (২০ সেপ্টেম্বর), ইউনেসকো (১৯ অক্টোবর), কলম্বো প্ল্যান (৬ নভেম্বর) ও গ্যাটের (৯ নভেম্বর) সদস্য পদ লাভ করে।

১৯৭৩ সালের ৩ আগস্ট কানাডার রাজধানী অটোয়ায় ৩২টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছিল কমনওয়েলথ সম্মেলন। সে সম্মেলনে সব নেতাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে সর্বমোট ৬ জন নেতার নামে তোরণ নির্মিত হয়েছিল। তাদের মধ্যে জীবিত দুই নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অন্যজন মার্শাল জোসেফ ব্রোঞ্জ টিটো।

আলজেরিয়ার মঞ্চে দাঁড়িয়েই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, বিশ্ব আজ দু’ভাগে বিভক্ত। শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।
১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। পরের দিন বঙ্গবন্ধু লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করেন। লাহোরে এ সম্মেলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।

১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য হিসেবে গ্রহণ করে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশগ্রহণের জন্য ২৩ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু ঢাকা ত্যাগ করেন।

২৫ সেপ্টেম্বরে জাতির জনক প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার প্রতি সুগভীর দরদ ও মমত্ববোধ থেকে জাতিসংঘে মাতৃভাষা বাংলায় বক্তব্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অনন্য ও মহত্তর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুই প্রথম রাষ্ট্রনায়ক, যিনি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তব্য দেন।

বঙ্গবন্ধু ৫ নভেম্বর মিসর ও ১০ নভেম্বর কুয়েত সফরে যান। একই মাসে পূর্ব জার্মানির প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় আসেন। ৩ ডিসেম্বর মালয়েশিয়ার রাজা ঢাকা সফরে আসেন। ডিসেম্বর মাসে ঢাকা সফরে আসেন ভুটানের রাজা এবং এফএও-এর মহাপরিচালক।

১৮ ডিসেম্বর আমিরাতের প্রয়াত রাষ্ট্রপ্রতি শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের আমন্ত্রণে বঙ্গবন্ধু সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেন। মূলত বঙ্গবন্ধুর সে সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও আরব আমিরাতের মাঝে সু’সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যার ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বর্তমানে প্রায় ১০ লক্ষাধিক প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন।

অনেকেই জানেন না আমিরাতের রাজধানী আবুধাবির প্রথম মহাসড়ক এর ইঞ্জিনিয়ারিং বাংলাদেশের করা। আমিরাতে জনশক্তি রফতানি শুরু হয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার, চিকিৎসকসহ নানা পেশাজীবি আসার মাধ্যমে। যার শুভ সূচনা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর আমিরাত সফরের মাধ্যমে।

১৯৭২ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই ১৯৭৫, মাত্র সাড়ে তিন বছরে যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ৫০টির মতো রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের সফরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের শতাধিক সফর অনুষ্ঠিত হয়। স্বল্প সময়ের বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার নানা বিষয়ে ৭০টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে।

অনেক দেশ ও সংস্থা বাংলাদেশকে কোটি কোটি ডলারের বিভিন্ন ধরনের ঋণ সাহায্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রদান করে। বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকতেই সৌদি আরব, সুদান, ওমান ও চীন ছাড়া বিশ্বের সব রাষ্ট্রই বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

নতুন একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য এর চেয়ে আর কি হতে পারে! এই সাফল্যের পেছনে ছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা ও বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক। বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিশ্বনেতাদের ছিল গভীর শ্রদ্ধা। আন্তর্জাতিক রাজনীতির হিমালয়সম উচ্চতায় আসীন ছিলেন ক্ষনজন্মা এ মহানায়ক।

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমুন্নত রাখতে ২০১৬ সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রথম কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভবনের নামকরণ করা হয় বঙ্গবন্ধুর নামে। আমিরাতের রাস আল খাইমা বাংলাদেশ ইংলিশ প্রাইভেট স্কুল অ্যান্ড কলেজে নতুন ভবনের নামকরণ করা হয় বঙ্গবন্ধু ও শেখ জায়েদ ফ্রেন্ডশিফ একাডেমি নামে।

তারই ধারাবাহিকতায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষীকীতে আরব আমিরাতের ২৮ বছরের পুরোনো স্কুল ‘বাংলাদেশ ইংলিশ প্রাইভেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ এর নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

জন্মশতবার্ষিকীতে দেশের বাইরে বঙ্গবন্ধুর নামে স্কুল তৈরি নতুন এক দৃষ্টান্ত স্হাপন করবে। যার ফলে শত বছর নয় হাজার হাজার বছর বাঙ্গালীদের পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের ইতিহাস ঐতিহ্যে স্থান করে নেবে বঙ্গবন্ধু নাম আদর্শ ও সংগ্রামী জীবন।

এমআরএম/জিকেএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]