এমন তো হওয়ার কথা ছিল না

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১২:৪৩ এএম, ০৭ এপ্রিল ২০২১

বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য নিয়ে আসুন আলোচনা করি। নিজের চোখে দেখেছি কীভাবে দেশ স্বাধীন হয়েছে। তবে বহু বছর দেশছাড়া, তাই বর্তমানে যা শুনি তা বানানো বা মনগড়া হতে পারে, কিংবা হতে পারে তা ইতিহাস বিকৃতি। তাই যা বর্তমানে দেখি তা থেকেই আমার এ আলোচনা।

প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস আর বিজয় দিবসে দেশের রাষ্ট্রীয় উদযাপনগুলো টিভির সামনে বসে মনোযোগ দিয়ে ছোট বেলার মতো করে দেখা হয় না। স্কুল-কলেজের মাঠে মাসব্যাপী অনুশীলন করে স্বাধীনতা পালন করতাম ছোট বেলায়। সেটার সঙ্গে এখনো আমাদের অন্যরকম একটা অনুভূতি লেগে আছে। আমার মতো যারা এর সাথে জড়িত ছিল তাদের কাছেও বেশি প্রবল সেই অনুভূতিটা।

সেই আবেগটা নিয়ে এখনো এসব দিনে রাষ্ট্রীয় উদযাপনগুলো দেখার জন্য দেশের জনপ্রিয় চ্যানেলগুলো দেখতে চেষ্টা করি। আজকেও তেমনটা আগ্রহ নিয়ে দেখতে গিয়ে একটু পরেই হতাশ হলাম! কোথায় সেই ২৬ মার্চের রাষ্ট্রীয় আয়োজন দেশকে নিয়ে?

এটা কি একটা দলীয় বা পরিবারের আয়োজন? তাও ধৈর্য্য ধরে দেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু এটাতো আমাদের সেই শৈশবের মতো রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা দিবস ছিল না, এটা দেখলাম পুরাই একটা দলীয় দিবস! এক বছর ধরেই তো এই উদযাপন চলছে দেখছি।

ভিন্ন কিছু দেখা আর সারা দেশের সত্য সংবাদ জানারও কোনো সুযোগ নেই? সারাদেশে নেট ছিলো না, পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না, নানা স্থান গৃহযুদ্ধের মতো গেলো, অনেকগুলো প্রাণ গেলো, কতজন যে আহত হলো! দেশের কোনো টিভি নিউজে তা পেলাম না!

এটাতো আমাদের ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস’ ছিল। আর তাই আয়োজনগুলো হওয়ার কথা ছিল সকল দলের, সকল স্তরের জনগণের সম্পৃক্ততায়।

স্বাধীনতা আনন্দের! কিন্তু এমন দিবসে আমার দেশের মানুষ নিজ দেশের কিছু মানুষের হাতে মরছে, মার খাচ্ছে, রক্ত ঝরছে, মত প্রকাশের কোনো স্বাধীনতাই পাচ্ছে না! মোদির তো আজ থাকারই কথা নয় আমাদের সাথে? সে আমাদের যে আনন্দটুকু ছিল তাও ধ্বংস করে গেল? এ দোষ তো তার না।

টিভি দেখতে দেখতে আমার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরছিল যে যারা সরকার পক্ষের বা দলের অন্ধভক্ত তারা কি খুবই আগ্রহ নিয়ে এসব আয়োজন সারা দিন দেখেছে? দেখে? একটুও একঘেঁয়ে লাগে না? নাকি নিজেরা দেখে সময় নষ্ট না করে এসব জোর করে অন্যদের গেলানোর চেষ্টাই করছে? যদিও অনেকে এখন আর বাংলা চ্যানেল দেখে না, হিন্দিগুলোই বেশি চলে ঘরে ঘরে।

আচ্ছা, আজকের এই আয়োজনসহ এক বছরের এত আয়োজনে আর নানা দেশের এসব অতিথিদের আনতে কত কোটি টাকা খরচ হয়েছে? খরচ হওয়া এসব টাকাতো দলীয় টাকা নয়, এগুলোতো দেশের টাকা, জনগণের টাকা। কিন্তু দেশ ও জনগণের কী লাভ হয়েছে?

অবশ্য দেশের সাধারণ মানুষ কার কাছে অভিযোগ করবে? যেখানে একতা নেই সেখানে অভিযোগ অর্থহীন। আমি সুবিধা পেলে আমার মুখ বন্ধ, এই হলো আমাদের আসল রূপ।

দেশে যেমন সেনাবাহিনী আছে, ক্ষমতা নেই, সাংবাদিক আছে, সংবাদ নেই। গত কয়েকদিন ফেসবুক আছে ইন্টারনেট নেই এবং স্বাধীন বাংলাদেশ আছে কিন্তু স্বাধীনতা নেই। ব্যাপারটা কেমন হয়ে গেল না? এমন তো হবার কথা নয় কিন্তু কেন এমনটি হচ্ছে বা হলো? রাতারাতি তো এমন পরিবর্তন হয়নি? কী কারণ এর পেছনে জড়িত? আসুন কিছু অপ্রিয় সত্য কথা তুলে ধরি।

কিছু অতিশিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী যখন সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখী হয় তখন সরকারও সুযোগ নেয় অকাম-কুকাম বেশি করার। সমাজের এই ধরনের টকেটিভ বুদ্ধিজীবীরা শত অকাম-কুকাম হচ্ছে জেনেও ক্রিমিন্যালদের কাজের প্রশংসা করে তাদেরকে আরো বেশি অকামে উৎসাহিত করে।

এটা খুবই লক্ষণীয় বিশেষ করে দেশের টকশো এবং পন্ডিত ব্যক্তিদের লেখাতে। দুধ যেমন তাপে উথলে পড়ে ঠিক তেমনি চামচাগুলোও চেষ্টা করে সরকারকে উথলে পড়তে। এ ধরনের বিবেকহীন বুদ্ধিদীপ্তবান ব্যক্তিদের কারণে দেশে মজবুত গণতন্ত্রের পরিকাঠামো তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ সরকারে কাজে কোনো বাঁধা নেই, থাকবে কি করে বিরোধী দল অচল, অধম, অপারগ।

যার ফলে দেশ এখন একনায়কতান্ত্রিক শাসনের খপ্পরে পড়েছে। তাই তো সবার মুখে তোতা পাখির মতো বুলি একটাই ‘প্রধানমন্ত্রী দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।’ এই ফাঁকে বাকিরা বসে বসে আঙ্গুল চুষছে। যে দেশে একটি কেরানির বদলি হতেও প্রধানমন্ত্রীর সক্রিয় অংশগ্রহণ সেখানে কী আশা করা যেতে পারে?

কোনো রকম প্রমাণ বা যুক্তি ছাড়া উপরের মন্তব্য করা নিশ্চয় ঠিক হবে না এটাই সবাই বলবে। চলুন বিশ্লেষণ করে জেনে নেওয়া যাক এর সঠিক তথ্য।

দেশের মানুষকে বর্তমান সরকার যদি বিনা টাকায় বিদেশে পাঠাতো, কাজের ব্যবস্থা করতো, জনগণের নিরাপত্তা বিধান করতো, আইনের সুশাসন দিতে পারতো, ধনি-গরীবের জন্য আইন সমান করতো, তাহলে সরকার যতোই বিনাভোটের সরকার হোক, জনগণ হয়তো তা ভুলে যেতো।

যে দেশে ক্ষমতার দাপটে এখনও আইনকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে সেখানে মুখোরচক দালালিপনা বড়োই বেমানান। লাখ লাখ টাকা খরচ করে অনিশ্চিতের মধ্যে বিদেশ গিয়ে অনেকে জেল পর্যন্ত খাটে বছরের পর বছর, অথচ সেখানে সরকারের কোনো হস্থক্ষেপ নেই।

কিন্তু সেই লোকগুলোর কঠিন পরিশ্রমের বিনিময়ে যে রেমিট্যান্স সরকার গ্রহণ করছে এবং লাখো লাখো গার্মেন্ট কর্মী মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে উঠে পড়ে লেগেছে তাদের ভাগ্যে এবার স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি পালন করাও হয়নি।

এটা সমাজের জ্ঞানী, গুণী এবং শিক্ষিত মানুষ দেখেছে কিন্তু তারা সম্পূর্ণ চুপচাপ। রাস্তায় কারা নেমেছে সেটা আমার জানানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।

আমাদের দেশে লাখো লাখো স্ত্রী স্বামীর ঘর করে, শুধু সন্তানের কথা ভেবে। সকল অন্যায় অত্যাচার সহ্য করেও মুখ বুঝে পড়ে থাকে, স্বামী নামের হৃদয়হীন মানুষের সাথে। শুধু সন্তানের জীবন এলোমেলো হয়ে যাবে এই চিন্তা করে। ঠিক একইভাবে দেশের মেহনতি মানুষ শুধু তার পরিবারের কথা ভেবে নিজেকে, নিজের জীবনকে বিসর্জন দিয়ে বিদেশ থেকে টাকা সঞ্চয় করে দেশে পাঠায় আর দেশের কুশিক্ষায় শিক্ষিত মানব নামের দানবগুলো সে সঞ্চয় দেশের বাইরে পাঠিয়ে বেগমপাড়ার মতো রাজপ্রাসদ তৈরি করে ভোগবিলাসে আসক্ত।

নিজের জীবন যদি সুখীময় না হয় তবে হবে কি সন্তানকে সুন্দরভাবে লালনপালন করে সুশিক্ষায় গড়ে তোলা? নীরবতা যে সন্তানের জীবনকে তিলে তিলে ধ্বংস করছে না তার কি কোনো প্রমাণ আছে? যদি বলি এই কারণেই সমাজের শিক্ষিত বিবেকবান ব্যক্তিরাই বিবেকহীনভাবে জীবন যাপন করে চলছে, তাহলে কি ভুল হবে?

সমাজে ব্যক্তির সাফল্যের পথে বাধা দিতে সক্ষম শুধুমাত্র একজনই, সে হচ্ছে ‘ব্যক্তি’ নিজে। হয়তো হতে পারে আমি সেই ব্যক্তি যে নিজের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারি, নিজেকে সুখী করতে পারি, নিজেকে সাহায্য করতে পারি।

আমার জীবন বদলে যাবে না যখন আমার অফিসের বস বদলাবে, আমার অভিভাবক বদলাবে, কিংবা যখন আমার বন্ধুরা বদলাবে। আমার জীবন তখনই বদলাবে যখন আমি নিজে বদলাবো। আমার সক্ষমতা সম্পর্কে আমার নিজের বিশ্বাসের সীমাটা যখন আমি অতিক্রম করতে পারবো শুধু তখনই আমার জীবন বদলাবে এবং পূর্ণ হবে জীবনের লক্ষ্যগুলো।

নিজের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হবে আমার চারপাশ। ঠিক একইভাবে সমাজের সকল দুর্নীতি এবং অরাজকতার পথে বাঁধা দিতে সক্ষম শুধু আমি নিজে। যদি সততার সঙ্গে মনে প্রাণে চেষ্টা করার প্রবলতা তৈরি করি তবে আমিই পারবো পরিবর্বতন আনতে এবং এই কুৎসিত সমাজের অন্ধকাচ্ছন্ন কুশিক্ষায় শিক্ষিত মানুষদের মুখোশ বদলাতে।

এখন এই আমি কে? আমি হতে পারি কোনো এক যুবক/ যুবতীর শিক্ষিত এক বাবা, হতে পারি কোনো সমাজের এক প্রভাবশালী শিল্পপতি, হতে পারি কোনো দেশের এক ক্ষমতাশীল নেতা, হতে পারি সেই মুখোশধারী শিক্ষিত, ক্ষমতাশীল প্রশাসন।

আমাকেই জেগে উঠতে হবে, জনগণের বাঁক স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে হবে। সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলা শিখতে হবে। সর্বোপরি ভয়কে জয় করতে হবে।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

এমআরএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]