ফেলে আসা দিনগুলোতে ফেরার আকুতি

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ০৪:৪৬ পিএম, ১৫ এপ্রিল ২০২১

এক বছর হয়ে গেল সুইডেনের বাইরে যাওয়া হয়নি। এমনকি স্টকহোমের বাইরেও খুব একটা যাওয়া হয়নি শুধুমাত্র করোনার কারণে। অনেক স্মৃতিচারণ করেছি, জীবনের অনেক ঘটনাকে তুলে ধরেছি, তখন আর এখনকার মধ্যে পার্থক্য খুঁজতে চেষ্টা করেছি।

চিন্তা-ভাবনার মধ্যে প্রচুর পার্থক্য ধরা পড়েছে। পার্থক্য বলতে এমন নয় যে অতীতের সব কিছু আজকের জায়গা থেকে ভাবলে নিম্নমানের তা নয়। অনেক কিছু কেন যেন মনে হয়েছে তখন ভালো ছিল এখনকার তুলনায়। আবার এখনকার অনেক কিছুই তখনকার তুলনায় ভালো, শুধু পরিবর্তন হয়েছে চিন্তার ধরণ।

হঠাৎ অতীতের কথা আর পুরনোস্মৃতিগুলো মনের জানালায় এসে হাজির হয়েছে দূরপরবাসে স্পেনের মালাগা শহরে। মালাগা স্পেনের একটি বড় শহর। চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো, হিব্রু কবি সোলেমন ইবনেসিন গোবিরল এবং অভিনেতা এন্টানিও বান্দেরাস এখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, আমার শ্বশুর বাড়ি স্পেনে। ১৯৬৫ সালে আন্টোনিও বার্সেলো সুইডেনের KTHএ (Royal Institute of Technology) ছাত্রবস্থায় স্টকহোমের এক অপরূপা সুন্দরী রমনী বির্গিত লিন্ডকে ভালোবেসে বিয়ে করেন। পরে সেই থেকে সুইডেন এবং স্পেনের সঙ্গে হৃদ্যতা এবং ভালোবাসার সেতু গড়ে উঠে আর জন্ম নেয় আমার সহধর্মিণী মারিয়া।

মারিয়া তার বাবার একমাত্র সন্তান। এসেছি মারিয়ার সঙ্গে তার বাবার বাড়িতে এবারের পহেলা বৈশাখে। স্পেনে এসেছি অনেকবার তবে পহেলা বৈশাখে এই প্রথমবার।

তাই নতুন করে এখানকার সবকিছু দেখছি, মন উজাড় করে। পহেলা বৈশাখ প্রত্যেক বছরই আসে! বহু দিন, বহু মাস, বহু বছর যে দিনটি আগে এসেছে, তা আবার ঘুরে ফিরে হাজির হয়েছে কিছুটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এবং ফিরে এসেছে কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ে নতুন করে সেই দিনপঞ্জিকাটিতে।

এসো হে বৈশাখ এসো এসো। পুরাতনের বিদায়, নতুনের আগমনে আশা ভরসা ভালোবাসার স্বপ্ন ঘুরঘুর করছে চারপাশে। মনে হচ্ছে পরিবর্তন হবে, কিন্তু কিসের? ভাগ্যের! খুশিতে চোখে জল আসছে। ভাবি, এ কিসের জল? নতুন কিছু পাওয়ার? নাকি হারাবার!

নতুন বছর মানেই সবার কাছে নতুন দিনের প্রেরণা, নতুনভাবে জেগে ওঠার কল্পনা। অচেনা অজানার বিরুদ্ধে নতুন করে লড়াই করার স্বপ্ন দেখা। তাই পুরনো দিনের গ্লানি ভুলে নতুনভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদেই এ দিনটিকে আপন করে নিতে এত আয়োজন।

বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উদযাপন বাঙালির প্রাচীনতম ঐতিহ্য। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশে এই নববর্ষ উদযাপন পরিণত হয়েছে সর্বজনীন উৎসবে। আবহমানকাল ধরে বাংলার ঘরে ঘরে পালিত হচ্ছে বর্ষবরণের উৎসব।

হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান তথা বাঙালি জাতির একান্ত এ উৎসবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে আসছে সবাই। বাংলার কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজে নতুন ফসলকে কেন্দ্র করে যে উৎসবের সূচনা, কালক্রমে সেটাই পরিণত হয়েছে নববর্ষ বরণ উৎসবে। শতাব্দীর পর শতাব্দী পার হয়েছে, বহুবার বদল হয়েছে শাসকের, কিন্তু বৈশাখ চিরন্তন উৎসবের রূপে জড়িয়ে রেখেছে বাংলার জনপদকে।

শহরে বৈশাখ যে ব্যাপক উৎসবের উপলক্ষ নিয়ে আসে গ্রামীণ জীবনে তার আমেজ ভিন্ন। নগরজীবনে এ দিন যেমন পান্তা-ইলিশ খাওয়ার ধুম পড়ে যায়, তেমনি যুক্ত হয় নতুন কাপড় পরার আয়োজনও। গ্রামবাংলায় সকালবেলা দই-চিড়া দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করার রেওয়াজ ছিল।

ব্যবসায়ীরা দোকানে দোকানে হালখাতার আনুষ্ঠানিকতায় মিষ্টি দিয়ে তাদের ক্রেতাদের স্বাগত জানাতো। কালের বিবর্তনে নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক পুরানো উৎসবের বিলুপ্তি ঘটেছে, আবার সংযোগ ঘটেছে অনেক নতুন উৎসবের। আমার ছোটবেলার দিনগুলোতে ঘোড় দৌড়ের প্রতিযোগিতা ছিল এক অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ বিনোদন।

পহেলা বৈশাখের প্রভাতে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হতো নববর্ষের উৎসব। নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। এদিন সাধারণত সব শ্রেণির এবং সব বয়সের মানুষ ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পোশাক পরিধান করে।

নববর্ষকে স্বাগত জানাতে তরুণীরা লালপেড়ে সাদা শাড়ি, হাতে চুড়ি, খোপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা এবং কপালে টিপ পরে, আর ছেলেরা পরে পাজামা ও পাঞ্জাবি। কেউ কেউ ধুতি-পাঞ্জাবিও পরে।

বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা দিনটি নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ হিসেবে বরণ করে নেয়। এ উৎসব শোভাযাত্রা, মেলা, হালখাতা খোলা ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়। এখনকার দিনে সকালবেলা পান্তা ভাত খাওয়া একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে, সঙ্গে থাকে ইলিশ মাছ ভাজা।

এভাবে লোকজ বর্ষবরণ প্রথাগুলির কোনো কোনোটির অনুসরণের মাধ্যমে হয়তবা গ্রামীণ ঐতিহ্য অনেকটা সংরক্ষিত হচ্ছে। ভাবনাতে ঢুকেছে সেই ফেলে আসা ছোটবেলার দিনগুলোর কথা, সেই হালখাতার কথা। একই সঙ্গে বড় ইচ্ছে করছে ভাবতে বাংলাদেশেকে যদি স্পেন বা সুইডেনের মত করে গড়তে পারতাম।

যেখানে রয়েছে গণতন্ত্রের পরিকাঠামো মজবুত যা সহজে নড়চড় হয় না। যেখানে রয়েছে মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস যা সহজে ভঙ্গ হয় না। যেখানে রয়েছে সাগরের ঢেউ যা এদের মনকে উদার করেছে। যেখানে রয়েছে সুশিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের নিরাপত্তা।

এখানে প্রতি বছরের মতো নতুন বছর আসে এবং তা মধুময় স্মৃতি হয়ে ইতিহাসের পাতায় সাক্ষী হয়ে থাকে। আজ আমি তেমন একটি দেশে বসে কবি গুরুর কথায় ভাবছি ‘মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই’। আমার ভাবনায় ঠিক এমন একটি পহেলা বৈশাখ দেখার ইচ্ছে জেগেছে।

বাংলাদেশে কবে আসবে এমন একটি পহেলা বৈশাখ? কবে সম্ভব হবে তা বাস্তবে রূপ দেবার? কবে গাইবে গান সেই রমনা পার্কের বটতলায় সবাই মিলে, যেখানে থাকবে না দিনের আলোয় এক অন্ধকার ভরা পহেলা বৈশাখ।

এবারের পহেলা বৈশাখ হতে পারে কি ভবিষ্যত নির্মাণের চাবিকাঠি যা সবার জন্য বয়ে আনবে ভালোবাসা। বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী শুভেচ্ছা বাক্য হলো ‘শুভ নববর্ষ’। লকডাউনে সবাইকে নববর্ষের প্রাণঢালা শুভেচ্ছা এবং ভালোবাসা।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

এমআরএম/এমকেএইচ

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]