তুরস্কের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কুতাহইয়ার রমজান সংস্কৃতি

রাকিব হাসান রাফি
রাকিব হাসান রাফি রাকিব হাসান রাফি , স্লোভেনিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০১:১২ পিএম, ১৯ এপ্রিল ২০২১

আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগের কথা। ইরাসমাস প্লাস একচেঞ্জ স্টাডি প্রোগ্রামের আওতায় তুরস্কে গেছিলাম। ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যারা পড়াশোনা করেন তাদের প্রায় সবাই ‘ইরাসমাস প্লাস একচেঞ্জ স্টাডি প্রোগ্রাম’ এ শব্দটির সাথে পরিচিত।

ইরাসমাস প্লাস একচেঞ্জ স্টাডি প্রোগ্রাম হচ্ছে এক ধরনের মোবিলিটি প্রোগ্রাম যেখানে কোনো একজন শিক্ষার্থী তার নিজস্ব ইউনিভার্সিটির সঙ্গে অ্যাফিলিয়েটেড এমন কোনো ইউনিভার্সিটিতে একটি নির্দিষ্ট সেমিস্টার কিংবা একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাবর্ষ সম্পন্ন করতে পারেন।

এটি একটি স্কলারশিপ প্রোগ্রাম, তাই যখন কোনো শিক্ষার্থী ইরাসমাস প্লাস একচেঞ্জ প্রোগ্রামের আওতায় অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে যান তখন তাকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ প্রদান করা হয় স্টাইপেন্ড হিসেবে।

jagonews24

ইরাসমাস প্লাস স্টাডি একচেঞ্জ প্রোগ্রামের জন্য ইউরোপের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর পছন্দ স্পেন, পর্তুগাল এবং হাঙ্গেরি। তবে আমার পছন্দের দেশ ছিল তুরস্ক।

সেই ২০১৭ সালের কথা, বাংলাদেশ থেকে যখন প্রথম ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। টার্কিশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটের সুবাদে ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতির সুযোগ হয়। ইস্তাম্বুলের আতাতুর্ক এয়ারপোর্টে আমাদের ট্রানজিট ছিল প্রায় ছয় আট ঘণ্টার।

ঢাকা থেকে ইস্তাম্বুলের উদ্দেশে ছেড়ে আসা ফ্লাইটটি ইস্তাম্বুলের আতাতুর্ক এয়ারপোর্টে ল্যান্ডিংয়ের জন্য অগ্রসর হয় অ্যারোপ্লেনের জানালার ভেতর দিয়ে ইস্তাম্বুলের যতটুকু রূপ অবলোকন করতে পেরেছিলাম, সেটাই যেন অন্তরে চিরজীবনের জন্য গেঁথে গিয়েছিল।

jagonews24

কল্পনায় ঘুরে ফিরে তাই বারবার ফিরে আসত ক্ষণিকের জন্য স্বাদ পাওয়া সেই সুন্দর মুহূর্তটির। এরপর থেকে সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। কবে ইস্তাম্বুল ভ্রমণ করতে পারব। বিমান থেকে সামান্য সময়ের জন্য ইস্তাম্বুলের যতটুকু দৃশ্য চোখে ধরা দিয়েছিল বারবার যেন মনে হচ্ছিল সেটি ছিল জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য।

ইউরোপের অনেক দেশ এবং অনেক নগর ঘুরলেও তুরস্ক ও ইস্তাম্বুলের প্রতি ছিল আলাদা ক্ষুধা। তাই ইরাসমাস প্লাস একচেঞ্জ স্টাডি প্রোগ্রামের আওতায় যখন তুরস্কের কুতাহইয়া ডুমলুপিনার ইউনিভার্সিটিতে এক সেমিস্টার পড়াশোনার সুযোগ আসে, আমি সেটিকে লুফে নিতে ভুল করিনি।

ফেব্রুয়ারি থেকে জুন এ পাঁচ মাস একচেঞ্জ স্টাডি প্রোগ্রামের আওতায় আমি তাই কুতাহইয়াতে অবস্থান করি, তুরস্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত ইস্তাম্বুল থেকে কুতাহইয়ার দূরত্ব ২১০ মাইল এবং আধুনিক তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা থেকে কুতাহইয়ার দূরত্ব ১৯৬ মাইল।

jagonews24

ভৌগলিকভাবে কুতাহইয়া তুরস্কের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরগুলোর মধ্যে একটি, সিরামিক শিল্পের জন্য পুরো তুরস্কজুড়ে শহরটির আলাদা জনপ্ৰিয়তা রয়েছে। মহাদেশীয় জলবায়ু এবং ভূ-মধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলের সঙ্গমস্থলে অবস্থিত হওয়ার কারণে সারা বছর এখানকার তাপমাত্রা সমভাবাপন্ন থাকে যদিও শীতকালে এখানে তাপমাত্রা অনেক সময় হিমাঙ্কের নিচে নেমে আসে।

সে বছর রমজান শুরু হয় মে মাসের প্রথম সপ্তাহে। আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের জনক মোস্তফা কামালের হাত ধরে তুরস্ক সেক্যুলারিজমের পথে পা বাড়ায়। ইজমির, আনতালিয়া, ইস্কেশেহির, বোদরুমস তুরস্কের ভূ-মধ্যসাগর তীরবর্তী শহরগুলোর বেশিরভাগই দেশটির রাজনীতিতে সেক্যুলারদের দুর্গ হিসেবে পরিচিত যার বেশিরভাগই কুতাহইয়ার আশপাশে অবস্থিত।

সত্ত্বেও কুতাহইয়ার মানুষের মাঝে ধর্মীয় মূল্যবোধের তেমন একটা ভাঁটা পড়ে নি, এখানকার অধিবাসীরা তাই অত্যন্ত ধর্মভীরু। এ কারণে কুতাইইয়াতে অত্যন্ত আড়ম্বরভাবে রমজানকে স্বাগত জানানো হয়। রমজানকে অভ্যর্থনা জানাতে এ সময় সকলের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় ‘হোশ গাল দেনিজ রামাজান।’

রজব মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে কুতাহইয়াতে রমজান উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়, রমজানের এক মাস আগেই তাই কোনো এক রাতে এশার নামাজের পর মুসল্লিরা এলাকার মসজিদে একত্রিত হন। রমজান উপলক্ষে বিশেষ আলোচনা ও দোয়ার আয়োজন করে মসজিদ কর্তৃপক্ষ।

jagonews24

স্থানীয় সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে ঢাকের মাধ্যমে রমজানকে শুভেচ্ছা জানানো হয়। এমনকি সাহরির সময়েও ঢাক-ঢোল পিটিয়ে মানুষকে ঘুম থেকে উঠার জন্য সজাগ করা হয়। রমজানকে স্বাগত জানিয়ে রাস্তার দুই পাশে বিভিন্ন জায়গায় পোস্টার ও বিলবোর্ড ঝোলানো হয়।

রোজাদারদের সম্মান জানিয়ে কুতাহইয়ার বেশিরভাগ খাবারের দোকান দিনের বেলায় বন্ধ রাখা হয়, বিকেলের দিকে কেবলমাত্র ইফতারি বিক্রির জন্য এ সকল দোকান খোলা হয়। কোনো কোনো দোকান অবশ্য পুরো রমজান মাস জুড়েই বন্ধ রাখা হয়। শপিং মল ও গ্রোসারির দোকানগুলোতে রমজান উপলক্ষে বিভিন্ন পণ্যের ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়।

মসজিদগুলোতেও এ সময় মুসল্লিদের আনাগোনা বেড়ে যায়। সুনির্দিষ্ট বিধি-বিধান পালনের মাধ্যমে তুরস্কে মসজিদগুলোতে মহিলা মুসল্লিরাও নামাজ আদায় করতে পারেন। বাড়ির বাচ্চারাও তাদের অভিভাবকের হাত ধরে মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসেন।

তুর্কি ভাষায় রোজাকে ‘অরুচ’ বলা হয়। কুতাহইয়ার সেন্ট্রাল মসজিদ খ্যাত উলু চামি ছাড়া অন্যান্য মসজিদগুলোতে সূরা তারাবির আয়োজন করা হয়। তুরস্কের বেশিরভাগ মানুষ সুন্নি আকীদার অনুসারী এবং তারা কট্টরভাবে হানাফী মাজহাবের অনুসরণ করেন।

jagonews24

এ কারণে তুরস্কের মসজিদগুলোতে বিশ রাকাআত তারাবির নামাজের আয়োজ করা হয়। আমাদের দেশের মতো তারাও তারাবীর নামাজের শেষে জামায়াতবদ্ধভাবে তিন রাকাআত বিতরের নামাজ আদায় করেন তবে তুরস্কে বিতরের নামাজকে সাধারণ সুন্নাত নামাজ হিসেবে দেখা হয় এবং আমাদের সাথে তাদের বিতরের নামাজ আদায়ের কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।

সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পক্ষ থেকে রোজাদারদের জন্য বিনামূল্যে ইফতার সরবারহ করা হয়, রাস্তার দুই ধারের বিভিন্ন স্থানে রমজান উপলক্ষে ছাউনি বসানো হয় যেখানে রোজাদারেরা বসে ইফতার আদায় করতে পারেন।

সূর্যাস্তের সময় ধনী-দরিদ্র থেকে শুরু করে সমাজের সবাই সেখানে সমবেত হন রোজা ভাঙার উদ্দেশ্যে। কোনো ধরণের ভেদাভেদ সেখানে লক্ষ্য করা যায় না। রেস্টুরেন্টগুলোতেও সুলভ মূল্যে এ সময় ইফতারির প্যাকেজ থাকে। রমজানের দিন সাধারণত তুর্কিরা ইফতার এবং সেহেরি এ দুই সময় আহার গ্রহণ করেন, তুর্কিদের ইফতারির আইটেমে খোরমাসহ বিভিন্ন ধরনের ড্রাইফ্রুট, চোরবা নামক এক বিশেষ ধরনের স্যুপ এবং বাকলাভা নামক এক ধরনের ডেজার্ট আইটেমের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে তুরস্ক এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে বাকলাভা ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। রোজার দিন তুরস্কে বাকলাভা বিক্রির ধুম পড়ে যায়। সারাদিন রোযা রাখার পর যখন স্বভাবতই যে কোনো মানুষের শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তুর্কিরা বিশ্বাস করেন ইফতারিতে বাকলাভা তাদের শরীরে আলাদাভাবে সতেজতা প্রদান করে এবং জিহ্বার স্বাদে এক ধরণের ভারসাম্য সৃষ্টি করে।

বাকলাভা ছাড়া তাই তুর্কিরা রমজানকে কল্পনা করতে পারে না। ইফতারিতে তুর্কিদের পাতে রামাজান পিদে নামক এক ধরনের বিশেষ রুটি এবং মিষ্টি কুমড়া থেকে তৈরি মিষ্টিজাতীয় খাবার কাবাক তাতলিশির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। আর ভারী খাবার হিসেবে থাকে মাংসের তৈরি কোনো পদ। বেকারির দোকানগুলো থেকে অনেক সময় বিনামূল্যে রোজাদারদের সম্মানার্থে রামাজান পিদে সরবারহ করা হয়।

চায়ের প্রতি তুর্কিদের দুর্বলতা প্রবল। আমাদের এ উপমহাদেশে দুধ চায়ের প্রচলন বেশি তবে তুর্কিরা ব্ল্যাক টি পান করতে পছন্দ করে। আমরা সচারচর যে ধরনের চা পান করি তার থেকে তুর্কিদের চা একেবারে আলাদা। যদিও তাদের হাতে তৈরি চা দেখতে অনেকটা লাল চায়ের মতো তবে ফ্লেভার একেবারে ভিন্ন।

অতিথি আপ্যায়ন কিংবা আড্ডার ক্ষেত্রে তুরস্কে চা এর জুড়ি নেই। রোজার দিনেও ইফতারি শেষ করতে না করতে অনেক তুর্কি ছুটে পড়েন চা পানের উদ্দেশ্যে।

কুতাহইয়াতে রমজানকে আলাদা উৎসব হিসেবে দেখা হয়, ইফতারির সময় তাই রোজাদারেরা যখন একে অপরের সম্মুখীন হন তখন তারা একে অপরের উদ্দেশ্যে বলেন ‘আল্লাহু কবুল এতসিন।’ যার অর্থ আল্লাহ আপনাকে কবুল করুন। ইফতার গ্রহণের পূর্বে সবাই পরস্পরের কল্যাণ কামনায় প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে মোনাজাত আদায় করেন।

এমআরএম/জিকেএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]