নারী কি শুধুই পুরুষের জন্য!

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১১:৫৯ এএম, ০৩ মে ২০২১

পৃথিবীর অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও এখনো অনেকে মনে করে নারী বিষয়ক যে কোনো আলোচনা অশ্লীল, বিতর্কিত। নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলাও এই অশ্লীলতা ও বিতর্কের একটি অংশ। ধর্মীয় পুস্তক ও মুনি-ঋষিদের পাণ্ডুলিপিতেও নারী বিষয়ে একই ধারণা পোষণ করা হয়েছে।

নারীর চারিত্রিক বিচার করার সম্মতি দেয়া হয়েছে সে কিভাবে কথা বলে, কোন পরিচ্ছদে থাকে, কতখানি হাসে, কেমন শব্দ করে হাঁটে ইত্যাদি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। তার জ্ঞান-বুদ্ধি, মেধার কোনো প্রয়োজন হয় না এই বৈচারিক কাজে।

সর্বোপরি নারীকে বিচার করতে হবে যৌন অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে। নারী যতদিন যৌনতার পাঁচিল টপকায়নি, কোনো পুরুষের সঙ্গে কথা বলেনি, একসাথে বসে হাসেনি ততদিন সে সতী-সাধ্বী স্ত্রীলোক। আর বাকি পরনারীদের অবস্থা শোচনীয়।

সুযোগ পেলেই তার চুল কামিয়ে, চরিত্রের উপর বিশেষ সীলমোহর মেরে, পাথর নিক্ষেপ করে, উদোম করে, মুখে চুনকালি মাখিয়ে সমাজের কাছে উপস্থাপন করা হয়। তখন আর নারী মায়ের জাত নয়। তার স্তন, কোমর, তলপেট, উরু হয়ে যায় কামনার বিষয়বস্তু।

কোথায় কতটুকু মিশতে হবে, হাসতে হবে, কথা বলতে হবে, হাঁটতে হবে সব কিছুর পরিমাপক থাকবে। নারীকে মাপজোক নিয়ে তারপর পা ফেলতে হবে। নারীর কোনোকিছুই নারীর জন্য নয়। সব কিছু পুরুষের জন্য। তাই নারী অচল হলে, শরীর না চললে পুরুষকে অন্য নারীর সন্ধানে বেরুতে হয়।

মানে নারী নিজের জন্য নয় শুধু পুরুষের জন্য। নারীর কাজই হচ্ছে অন্যের জন্য বেঁচে থাকতে হবে, নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে হবে। সবখানে বলা হয়েছে স্বামী অর্থাৎ প্রভুর সেবাই পরম ধর্ম! সুলিখিত বিধি মেনে ঘরে তুললেই অলিখিত নীতিতে স্বামী একজন সেবাদাসী পেয়ে যায়।

আর পরনারীদের যেহেতু সব পুরুষ এভাবে পান না তাই তারা শুধু পুরুষের চরিত্রই স্খলনের কাজে লাগে, এর বাইরে তারা আর কোনো কাজে লাগে না। যদিও অন্যান্য ধর্মের মতো ইসলাম ধর্মে নারীর মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে তার প্রমাণ, আল্লাহ স্বামী-স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন পরস্পরের সুখ আর প্রশান্তির জন্য।

যেমন, সুরা রুম-এ আল্লাহ বলেন, ‘আর তার একটি নিদর্শন হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাদের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য প্রশান্তি। তোমাদের মধ্যে তিনি সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও মায়া।’

বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী এবং যে দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজেই নারী তা সত্ত্বেও সেই দেশে নারীর প্রতি সবচেয়ে বেশি অবিচার, অত্যাচার এবং অনাচার! কারণ সমাজ, ধর্ম এখনও স্বীকৃতি দেয়নি যে নারীরও সমান অধিকার রয়েছে স্বামীর কাছে, পরিবারের কাছে, সমাজের কাছে।

উন্নত বিশ্বের নারীমুক্তি ও নারীজাগরণের উত্তাল ঢেউয়ের আলোড়ন আমাদের নারীসমাজের কাছে পৌঁছাবার বহু পূর্বেই কিন্তু বেগম রোকেয়ার সাহিত্যকর্মে তার যুক্তিনির্ভর ও সাহসী বক্তব্য, ব্যক্তিগত জীবনের কর্মকাণ্ড এ দেশের নারীসমাজকে নারীর অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করে তোলে এবং এই প্রাপ্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অনুপ্রেরণা দেয়।

এ দেশের নারীসমাজ তারই আলোকবর্তিকার দ্বারা ধীরে ধীরে অন্ধকার থেকে আলোকিত জীবনের দিকে অগ্রযাত্রা শুরু করতে সক্ষম হয়েছে, এ কথা বিনা দ্বিধায় আজ আমরা বলতে পারি। বেগম রোকেয়া নিজেই বলে গেছেন তাকে ৫ বছর বয়স থেকে পর্দা করতে হত। সেই পর্দাকে পরিণত বয়সে মনের ভেতর থেকে তিনি কখনই সমর্থন করেননি।

কিন্তু মেয়েদের অভিভাবকরা যাতে তাদের স্কুলে পাঠায় তার জন্য তিনি নিজে পর্দা করে, বোরকা পরে মেয়েদের বাড়ি বাড়ি যেতেন। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় সংখ্যক মানুষ আজও বিশ্বাস করে ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাক জড়িত। রাত-বেরাতে একা নারী বাইরে বের হলে ধর্ষণ হবেই বলে মত দেয় বেশির ভাগ মানুষ।

অথচ একজন মানুষ হিসেবে নারী-পুরুষ যে কেউ তার পছন্দ অনুযায়ী পোশাক পরার স্বাধীনতা রাখে। দিনে-রাতে যে কোনো সময় একা বা সঙ্গীসহ বাইরে বের হওয়ার অধিকার রাখে। কোনোভাবেই তাদের পোশাক বা বাইরে বের হওয়াকে ধর্ষণের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি না। বরং ধর্ষণের জন্য একমাত্র অভিযুক্ত পুরুষকেই দায়ী করতে হবে। দুনিয়ার সমস্ত পাপের মূলে নারী রয়েছে বলে একটি ধারণা সমাজে জন্মেছে। যা সত্যি নারীর প্রতি অতি অন্যায়।

একজন পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে আমার মনে হয়েছে যে নারীর দৈহিক এবং যৌন পরিচয়ের বাইরে যে আরও পরিচয় আছে, সে ব্যাপারে হয়তো আমাদের নিজেদের আরও শিক্ষিত করতে হবে। এই বিষয়টা যদি আমরা মনেপ্রাণে ধারণ না করতে পারি, তাহলে পুরুষ হিসেবে নারীর সমান মর্যাদা আমরা কখনোই দিতে পারবো না।

একজন পুরুষের ব্যক্তিগত বা পেশাগত চরিত্র নিয়ে যখন সমালোচনা করা হয়, তখন প্রায় কখনোই তার দৈহিক বা যৌন সক্ষমতার কথা উঠে আসে না। কিন্তু লক্ষ্য করে দেখবেন যে একজন নারীর সমালোচনা শুরুই হয় এসব বিষয় নিয়ে।

তার মানে হচ্ছে শরীর এবং যৌনতার বাইরে যে নারীর আরও অনেক বড় পরিচয় আছে সে ব্যাপারটি আমরা সমাজ হিসেবে বিশেষ করে পুরুষ সমাজ হিসেবে মনেপ্রাণে গ্রহণ বা ধারণ করতে পারিনি। এটা যতদিন আমরা না করতে পারব, ততদিন বৈষম্য দূর করাটা এক অবাস্তব স্বপ্ন হয়েই থাকবে।

বৈষম্য দূরীকরণের ব্যাপারে সাংস্কৃতিক জগতের বাসিন্দা হিসেবে সেই জগতের ভূমিকা নিয়ে একটু বলতেই হয়। আমরা এখনো নারীদের নেতৃত্বের জায়গা তো দূরের কথা একজন পুরুষের পাশে সমান জায়গাও দিতে পারিনি। হয়তো নারীকে সমানভাবে দেখতে আমরা অভ্যস্ত না, সে কারণেই। কিন্তু আমাদের অভ্যস্ত হতে হবেই।

প্রতিদিনই নারীঘটিত ঘটনা চোখে পড়ে বিশ্বের সর্বত্রই, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। সব নারী ঘটিত ঘটনার সাথে পুরুষ জড়িত সত্ত্বেও নারীর প্রতি অবিচার বিচারের আগেই।

একটি গল্প মনে পড়ে গেল একটা সময় প্রায়ই যাত্রীপ্লেন ছিনতাই হতে শুরু হয়। এক যাত্রী কয়েকবার নতাইকারীদের কবলে পড়ে। এবার সে নিজেই প্লেনের পাইলটের মাথায় পিস্তল ধরে বলে, কোনো কথা শুনবো না সোজা নিউইয়র্কে চালাবে নইলে ঘিলু বের করে দেব। পাইলট হতভম্ব হয়ে বললো আমি তো সেখানেই যাচ্ছি। অতীতে যখন আশানুপাত ফলাফল যাত্রী পায়নি সেক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছিল।

বাংলাদেশ সংবিধানুযায়ী একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এখানকার যে কোন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক তার পছন্দ অনুযায়ী সম্পর্ক স্থাপনের অধিকার রাখে। প্রেম-ভালোবাসা করার অধিকার রাখে। কিন্তু সম্প্রতি ধর্মীয় মৌলবাদি গোষ্ঠীর উত্থানের সাথে সাথে দেখা যাচ্ছে প্রেম-ভালোবাসার মতো সম্পর্কের ক্ষেত্রে নানা ফতোয়া দেয়া হচ্ছে।

বিশেষত নারীকে অপরাধী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রেমের মতো স্বর্গীয় সম্পর্ককে অন্যায় হিসেবে দেখানো, বিয়ের আগে প্রেম করলে জাহান্নামের ভয় দেখানোর মাধ্যমে ভালোবাসাহীন অসার পৃথিবীর প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছরে নারীর সঙ্গে সংঘটিত প্রত্যেক অপরাধের ঘটনায় একই ধারা লক্ষ্য করা গেছে। তনু, নুসরাত, ঢাবি শিক্ষার্থী, সিলেটের এমসি কলেজে সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনায় আমরা এসব দেখতে পাই।

একটি অল্প বয়সী মেয়ে একাকী লাখ টাকা ভাড়ার ফ্ল্যাটে কীভাবে থাকে কিংবা তার থাকাটা কতটা নৈতিক সেই প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। তার অভিভাবকদের ভাবা উচিত ছিল বিষয়টি। ভাড়াটেরও বিষয়টি জানা উচিত ছিল। ইচ্ছে করলে পুলিশ কর্তৃপক্ষের নজরে দিতে পারত দুর্ঘটনার আগেই। মেয়েটি যে সম্পর্কে বিলাসিত জীবন পেয়েছিল সেখানেও তার বোঝাপড়ার অভাব ছিল।

পুরুষের মুখে নোংরা ভাষা ব্যবহার এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং সমাজের একটা বড় শ্রেণির পুরুষরা নারী সম্পর্কে এই ধরনের মন্তব্য করে থাকে, ধারণা পোষণ করে। বাংলাদেশের অধিকাংশ ঘরেই নারী সম্পর্কে পুরুষদের মুখে আপত্তিকর শব্দ শোনা যায় যা বলাই বাহুল্য।

আমাদের শিল্প-সাহিত্য, নাটক-সিনেমায় এসব শব্দও ফুটে ওঠে। নারীকে বেশ্যা প্রমাণে বাংলাদেশের সমাজের একটা শ্রেণির পুরুষ যে শক্তি ব্যয় করে তা কোনো উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করলে দেশ ও জাতি বরং উপকৃত হত। তাই সমাজের সবার প্রতি আহ্বান নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় শুধু নারীকেই দোষারোপ না করে বরং অভিযুক্ত আসামির শাস্তি তরান্বিত করতে ভূমিকা রাখুন।

তাতে আমরা একটি মানবিক, দুর্নীতিমুক্ত এবং অপরাধমুক্ত বাংলাদেশ পাব। আসুন নারীকে শুধু ধর্ষণের চোখে না দেখে বরং নারীর প্রতি রেসপেক্ট, ভালোবাসা এবং হিংসতামুক্ত চোখে দেখি। আসুন বাংলাদেশে গড়ে তুলি একটি মানবিক পুরুষ সমাজ।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

এমআরএম/জিকেএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]