কোটা সিস্টেম : সুইডেন বনাম বাংলাদেশ

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ০৮:০৯ পিএম, ০৬ মে ২০২১

সুইডেন গণতন্ত্রের বেস্ট প্র্যাকটিসে যথেষ্ট এগিয়ে রয়েছে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো সেখানেও কোটা সিস্টেম রয়েছে। তবে বাংলাদেশের মতো নয়। সুইডেনের সমাজে যারা নিপীড়িত, নির্যাতিত, অবহেলিত, প্রতিবন্ধী, রিফিউজি, বেকার এদের জন্য রয়েছে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা।

সব সুযোগ-সুবিধার মূলে যে জিনিসগুলো লক্ষ্যণীয় তা হলো দেশের সার্বিক পরিকাঠামোর উন্নয়নকেই সব সময় প্রাধান্য দেয়া হয়। সমমানের চাকরির ক্ষেত্রে নারী পুরুষের বেতনের স্কেল, পারস্পরিক সম্মানসহ দেশের পরিকাঠামোর ভারসাম্য রক্ষার্থে সব সময় সব বিষয়ের উপর যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে।

কোনো রকম চ্যুতি দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে তা অ্যাডজাস্ট করাও হয়ে থাকে। তারপরও দেশের স্বার্থে কোয়ালিটির সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করতে দেখিনি কখনও, হোক না সে রাজপরিবারের সন্তান বা অন্য কেউ। যদি যোগ্যতার অভাব থাকে সেক্ষেত্রে হুট করে কাউকে কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সাধারণত দেওয়া হয় না।

ব্যতিক্রম থাকতে পারে তবে সেটা খুবই নগণ্য। আমি সুইডেনে বসবাস করি তাই সুইডেনের কোটার উপর বর্ণনা দিলাম বটে তবে যদি বলি এমনটি রয়েছে পাশ্চাত্যের সর্বত্র তাহলে ভুল হবে না। কারণ দেশের উন্নতির স্বার্থে দক্ষ বা মেধাকে বাদ দিয়ে কোটাধারীদের সুযোগ কখনও দেওয়া হয় না এসব দেশে।

সুইডেনে সবাই একটি ন্যূনতম মানসম্পন্ন জীবন যাপন করতে পারে, এমন ব্যবস্থা রয়েছে। সবারই অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের শতভাগ নিরাপত্তার সুনিশ্চিত ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে যোজন-যোজন পিছিয়ে। তাই কোনো বিষয়ে সরাসরি সুইডেনের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করা ঠিক হবে না।

তবে দেশকে ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে যেমন আছি তেমন থাকলেও চলবে না, সেক্ষেত্রে বিশ্বের ধনী দেশগুলোকে রোল মডেল হিসেবে অনুসরণ করে আমরা এগিয়ে যেতে পারি।

এবার দেখা যাক কী অবস্থা বাংলাদেশের। বলা হয়েছে দেশের প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরির প্রবেশ পদে সব ধরনের প্রাধিকার কোটা তুলে নেয়া হবে। এটাও বলা হয়েছে নিয়োগ হবে শুধু মেধার ভিত্তিতে। গত কয়েক বছর আগে কোটাপদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে বড় একটি ছাত্র আন্দোলন হয়েছে।

তাদের দাবি ছিল কোটার হার কমানোর, যদিও সব কোটা বাতিলের দাবি তারা তোলেনি। প্রধানমন্ত্রী আন্দোলন চলাকালে ঘোষণা দেন, সব কোটা বাতিল করা হবে। পরে এ সংক্রান্ত একটি কমিটি গঠন করে দেয়া হয়। সেই কমিটি সুপারিশ করে, কোনো ক্ষেত্রেই প্রাধিকার কোটার আর প্রয়োজন নেই।

সরকারের যে কোনো সিদ্ধান্তই কারও না কারও অসুবিধার কারণ হয়ে থাকে। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দীর্ঘদিন যাদের প্রাধিকার কোটায় উচ্চতর চাকরি সহজলভ্য ছিল, তারা প্রতিবাদী হবেন—এটাই স্বাভাবিক। দেখা যাচ্ছে প্রাধিকার কোটা ভোগকারী কোনো কোনো মহল সভা-সমাবেশের মাধ্যমে কিছু কোটা বহালের দাবি জানাচ্ছে।

তাদের ক্ষোভের যৌক্তিকতা ও পরিসর তলিয়ে দেখার আবশ্যকতা রয়েছে। প্রাধিকার কোটা ছিল মূলত মুক্তিযোদ্ধার পোষ্য, নারী, জেলা, উপজাতি ও প্রতিবন্ধীদের জন্য। সময়ান্তরে লক্ষ্য করা যায়, মেয়েরা ছেলেদের মতোই পড়াশোনায় ভালো করছে। আর যোগাযোগব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি গোটা দেশকে একসূত্রে গেঁথে ফেলেছে।

কাজেই নারী ও জেলা কোটার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। উল্লেখ্য, আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে নজর দিলে দেখা যাবে সেসব দেশ যেমন ভারতে নারী কোটা বা কোনো আঞ্চলিক কোটা নেই।

এখন প্রশ্ন যাদের পিতা বা মাতা সরকারি বা বেসরকারি দ্বিতীয় শ্রেণির বা সমমানের চাকরি করে বা যাদের একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের বার্ষিক আয় আছে, তাদের অন্যান্য অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কোটা ভোগ করা উচিত কি? তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়ে যারা সরকারি চাকরি করেছেন, তাদের সন্তানাদি সে সনদেই আবার এই সুবিধা ভোগ করতে পারেন কি না।

উল্লেখ্য, কেউ কেউ তা করছে। আমি এভাবে সুবিধা ভোগ করাকে অনৈতিক মনে করি। এই সুবিধাদির লোভে পড়ে বেশ কিছু মানুষ জালিয়াতি করেও সনদ নিয়েছে। তাদের মধ্যে কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও রয়েছে। বিষয়টি উন্মোচিত হলেও কারও কিছু হয়নি। প্রশ্ন উঠতে পারে, এত কিছুর পরেও আবার এসব কথা কেন? কথা হবেই। বাস্তবতা সব সময়ই পরিবর্তনশীল।

সমাজের অনগ্রসর শ্রেণিকে মূলধারায় আনার জন্য তো সাংবিধানিক ব্যবস্থাও রয়েছে। এ ধরনের ইতিবাচক পক্ষপাত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রয়েছে। আমাদের এখানেও বিদ্যমান। এখনো নিচের দিকের চাকরিগুলোতে তা রয়েছে। যখন মেধাকেই সর্বাধিক প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, তখন কিছু ক্ষেত্রে সামান্য হারে কোটা সংরক্ষণে তেমন কোনো আপত্তি আসবে বলে মনে হয় না।

সম্প্রতি সরকারের বদান্যতায় সরকারি চাকরির বেতন-ভাতা প্রায় দুই গুণ হয়ে যাওয়ায় সরকারি চাকরি যথেষ্ট আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেছে। এই চাকরির প্রতি আকর্ষণ শতগুণে বেড়েছে। কোনো চাকরি যখন আকর্ষণীয় হয়, তার জন্য চাকরিপ্রার্থীরা সব ধরনের সুযোগ খুঁজবে, এটাই স্বাভাবিক। যদিও আমাদের সবারই আশা দেশটি বল প্রয়োগের মধ্য দিয়ে নয়, বরং যুক্তি, জ্ঞান ও দক্ষতায় উন্নতির পথে অগ্রসর হোক।

মুক্তিযোদ্ধা কোটা বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। যারা জীবন বাজি রেখে গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের জন্য স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, তাদের জন্য আমাদের কৃতজ্ঞতা থাকা স্বাভাবিক এবং এই প্রকাশ যথেষ্ট নয়।

তাদের এই আত্মত্যাগ, দেশের জন্য ভালোবাসা যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে আবেশিত করা যায়, তার জন্য নানারকম স্মৃতিস্মারকও তৈরি করা দরকার। তাদের বীরত্বগাথা গ্রন্থাগারে, স্কুলে-কলেজে, খেলার মাঠে ও অন্যান্য দৃশ্যমান জায়গায় সংরক্ষণ করা উচিত।

মহান মুক্তিযুদ্ধে না গিয়ে একটি নিরাপদ জীবন বেছে নিলে হয়তো তাদের জীবন এবং তাদের উত্তর-পুরুষদের জীবনযাপন অন্য রকম হতে পারতো। তাই তাদের এই বিষয়টিও আমাদের সমাজকে দেখতে হবে।

আমাদের সমাজে একজন মানুষের ভালো-মন্দ কাজের ভাগ তার সন্তানাদি কিংবা পিতামাতা পাবেন না। তবে বাস্তবে পিতামাতা যা রেখে যান তা সন্তানেরা উপভোগ করেন এবং পিতামাতার আকাঙ্ক্ষাও তা-ই থাকে। এখন কোটার ক্ষেত্রেও সেটা যদি চলতে থাকে তবে বাংলাকে সোনার বাংলা করা যাবে না।

আবার একটি দেশের জনগণের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করতে দরকার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, সৃজনশীল শিক্ষা, ভালো স্বাস্হ্য ব্যবস্থার, সঙ্গে প্রশাসন, প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং জনগণের সম্পৃক্তকরণ।

সেটার যখন অভাব দেখা দেয় তখন কোটাকেন্দ্রিক রাষ্ট্র পরিচালনা একটি দেশের মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে ফেলে। যার ফলে সমাজে সব সময় অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে। জনগণ যেমন সরকার এবং প্রশাসনের উপর বিশ্বাস হারায় সরকারও ক্ষমতার অপব্যবহার করে শাসন এবং শোষণের রাজ্য কায়েম করতে উঠে পড়ে লাগে। অতীতে এমনটি বিশ্বের অনেক দেশে ঘটেছে এখন তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে এসব ঘটনা বিরাজমান।

বাংলাদেশ এ সমস্যা এড়াতে সক্ষম হবে বলে মনে হয় না যদি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এই কোটা সুবিধাগুলো চলতে থাকে, সময়ের পরিক্রমায় একপর্যায়ে গিয়ে সম্ভবত দেশে দক্ষ এবং যোগ্য মানুষের অভাব হয়ে দাঁড়াবে। তখন যে কোনো নাগরিকই কোনো না কোনোভাবে একজন মহান মুক্তিযোদ্ধার উত্তর-পুরুষ হয়ে যাবে, যা রীতিমত আমরা দেখছি।

সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনা পুলিশ অফিসার, মাজিস্ট্রেট এবং ডাক্তারের ব্যবহার ঢাকার রাস্তায় জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। সেখানে পরিষ্কার দেখা গেছে তারা নিজেদের মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে মুক্তিযাদ্ধার সন্তান পরিচয় দিতেই বেশি গর্ববোধ করেছে। আমার ধারণা গোটা প্রশাসনযন্ত্র যদি মেধার চেয়ে কোটার ওপর সওয়ার হয়ে পরিচালিত হয় তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ। আশাকরি পরিস্থিতি অতোটা ভয়াবহ হয়নি।

আমি নিজেই একজন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। সব সময় ভেবেছি, এখনও ভাবি মানুষের জন্য, সমাজ কিভাবে ক্রমাগতভাবে উন্নতি করে যাবে, সাধারণ মানুষের দুর্দশা কিভাবে লাঘব হবে, সে বিষয়ে। সেই অর্থে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের হতে হবে দেশপ্রেমিক ও মেধাবি।

অন্যদিকে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে একজন তার পিতামাতা কিংবা পূর্বপুরুষের কেউ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি বলে বঞ্চিত হবে—এ রকমটি ভাবারও কারণ নেই এবং তা ন্যায্যও নয়। কোটাপদ্ধতি প্রবর্তনের মূল মর্ম হলো, কোনো গোষ্ঠী বঞ্চিত হলে কিংবা পিছিয়ে থাকলে, তাদের এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা। এটা বিশেষ করে সুইডিশ জাতি ভাবে, এমনটি আমিও ভাবি।

একেবারেই সরলরৈখিক চিন্তা না করে একটি বিকল্প ভাবনার সূচনা করতে চাই, যা নিয়ে বিজ্ঞজনেরা ভাবতে পারেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরা যাতে নিজেদের যোগ্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের অন্যান্য নাগরিকের সঙ্গে একই সূচকের বিচারে চাকরি পেতে পারেন, তার ব্যবস্থা করতে হবে।

দেশের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের যে ব্যক্তিস্বার্থ হানি হয়েছে, সে কথাটি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ রেখে শ্রেয়তর জীবনের লক্ষ্যে তাদের সন্তানদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা হোক এবং তা বিনা ফিতে।

যেমন তাদের শিক্ষার মানকে উন্নত করার জন্য বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। আমরা আশা করতে পারি যে যাদের দেহে প্রবাহিত হচ্ছে মহান মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ত, তারা নিশ্চয়ই দেশের কল্যাণে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সচেষ্ট এবং সক্ষম হবেন। কিন্তু সেটা কি আমরা দেখছি?

আমারও জানতে ইচ্ছে করে যে পরিবার থেকে আমি এসেছি তারা তো বলতে গেলে সবাই স্বাধীনতা চেতনার তৎকালীন সৈনিক। অনুপ্রেরণা দেয়া থেকে শুরু করে সরাসরি যুদ্ধ করেছে, অনেকে যুদ্ধে জীবন দিয়েছে, কই জানা মতে কেউ তো তেমন কোনো কোটাভিত্তিক সুযোগ সুবিধা পায়নি।

দেশ স্বাধীন হবার পরও তো আমার পরিবারের বলতে গেলে সবাই বাংলাদেশে ১০-২০ বছর অবধি ছিল, কখনও তো শুনিনি যে কোটার সুযোগে কিছু হয়েছে। তার অর্থ এই নয় যে আমরা প্রতিষ্ঠিত হতে পারিনি। অথচ এখনকার সময় কোটা ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়, কারণ কি?

দেশকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে হলে দক্ষতা এবং মেধার প্রাধান্য দিতেই হবে তা না হলে সোনার বাংলা গড়া সম্ভব হবে না, হতে পারে না। আসুন দেশ গঠনে শুধু কোটা নয় গোটা জাতির সার্বিক উন্নায়নের কথা ভাবি—সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

এমআরএম/জিকেএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]