‘আরবরা ভুলে গেছে, তুরস্কই পারে ফিলিস্তিনিদের বাঁচাতে’

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৫০ এএম, ১৭ মে ২০২১

এস,এ, রব, আয়ারল্যান্ড থেকে

জাতিসংঘে ৪৫ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের এবং বাকি ৫৫ শতাংশ ভূমি ইহুদীদের হাতে ছেড়ে দেয়ার মাধ্যমে ফিলিস্তিনকে দ্বিখণ্ডিত করার প্রস্তাব পাশের ভেতর দিয়ে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরাইল নামের কর্তৃত্ববাদী দেশটির জন্ম হয়।

তৎকালীন আরব ভূখণ্ডে ইহুদীদের জ্ঞাতি ভাই হিসেবে ডাকতো ফিলিস্তিনিরা। ইহুদীরা মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। ১) ইসরাইল ইহুদী ২) আরব ইহুদী। রাষ্ট্রবিহীন ইহুদীরা তখন ছিল ছন্নছাড়া ও উদ্বাস্তু। একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের জন্য তাদের ছিল অহরহ সংগ্রাম।

যদিও বেলফোর ডিক্লেয়ারেশনকে আমরা ইসরাইল রাষ্ট্র তৈরির মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে জানি। তবে এই ইহুদিবাদী রাষ্ট্রটি গঠনের মূলে ছিল শেইম ওয়াইজমেন নামে একজন ইহুদীবাদী নেতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অনেক বেশি মাত্রায় ডিনামাইটের ব্যবহার করা হয়েছিল। যার কাছে ডিনামাইট জাতীয় বিস্ফোরক ও বোমা যত বেশি ছিল সে সর্বাপেক্ষা এগিয়ে থাকত যুদ্ধে।

একটা সময়ে এসে ব্রিটেনের কাছে ডিনামাইটে ব্যবহৃত Raw material অ্যাসিটোন (Acetone) কমে যায়। পর্যাপ্ত Raw material সংকুলনের জন্য ব্রিটিশরা উদগ্রীব হয়ে ওঠে। শেইম ওয়াইজম্যান (Chaim Weizmann) ছিলেন অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি করা রাশিয়ায় জন্ম নেয়া একজন ইহুদীবাদী নেতা, যাকে The Father of Industrial Fermentation বলা হয়।

তিনি ডিনামাইট তৈরির Raw material অ্যাসিটোন (Acetone) আবিষ্কার করার জন্য একটা ব্যাকটেরিয়া খুঁজে পান, যেটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের কাছে স্বপ্নের মতো ছিল। এটি দিয়ে ব্রিটিশরা আরো বেশি ডিনামাইট তৈরির মাধ্যমে যুদ্ধ যাত্রায় এগিয়ে থাকে এবং পরবর্তীতে তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জয় লাভ করে।

এই মহা বিজয়ের প্রতিদান হিসেবে তাকে পুরস্কার দিতে চাইলে শেইম ওয়াইজম্যান ইহুদীদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবি করেন। সেটি সময়ের পরিক্রমায় হাজারো ফিলিস্তিনির রক্তের উপর দিয়ে প্রতিষ্ঠিত আজকের ইহুদীবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল। রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ভাষায় শেইম ওয়াইজম্যান হচ্ছেন ইজরাইলের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি।

ফিলিস্তিনি একটি ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক ইস্যু। এর চলমান সঙ্কট মোকাবিলা এবং দেশটির বেসামরিক নাগরিক ও শিশুদের রক্ষা করতে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র তুরস্ক ও এর প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোয়ান পারেন যথাযথ ভূমিকা পালন করতে। ফিলিস্তিনে ক্রমাগত ইসরাইলি হামলা এবং এই ইস্যুর অতীত বর্তমান ও তার সম্ভাব্য সমাধানে সবার পূর্বে মুসলিম বিশ্বের মধ্যে ঐক্য সর্বাধিক প্রয়োজন।

মুসলিম দেশগুলোকে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ফিলিস্তিনি নিয়ে তাদের পরিকল্পনা কী? সেখানে নির্ভর করছে অনেক কিছু। অবিভক্ত মুসলিম বিশ্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে ফিলিস্তিন ইস্যুর প্রকৃত সমাধান আসবে না।

কিংবা প্রয়োজনে যুদ্ধের দিকে ধাবিত হলে সেটি হতে পারে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ; এবং সেটি মাথায় রেখে মুসলিম বিশ্বের মধ্যে একতার কোনো বিকল্প নেই। এর পাশাপাশি ফিলিস্তিনির বৃহৎ দুটি প্রতিরোধ সংগঠন হামাস এবং হিযবুল্লাহর মধ্যে থাকা চলমান বৈরিতা প্রশমন করতে হবে।

কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরে মসুলমানদের অন্যতম স্পর্শকাতর ফিলিস্তিনি ইস্যুতে বেশিরভাগ মুসলিম দেশগুলো নীরব এবং শুধু বিবৃতি সর্বস্ব হিসেবে দেখা যাচ্ছে। একমাত্র তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেসেপ তাইয়েব এরদোয়ান ঘটনার দৃশ্যপটে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরব এবং মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একতা স্থাপনের আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

তাই এই মুহূর্তে এরদোয়ানের উপর নির্ভর করছে ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তার বিষয়টি। ফিলিস্তিনের বেসামরিক নাগরিক ও শিশুদের তুরস্ক ও প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সুরক্ষার বলয়ে রাখা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প রাস্তা দেখছি না এই মুহূর্তে।

ন্যাটো সদস্য দেশ হিসেবে তুরস্কের রয়েছে বিশাল ও শক্তিশালী সেনাবাহিনী। এছাড়া দেশটি ওই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক শক্তি।

এইগুলো বিবেচনায় নিলে তুরস্কই হচ্ছে ইসরায়েলের সঙ্গে টেক্কা দেবার মতো আঞ্চলিক পরাশক্তি দেশ। শক্রুকে বুলেট দিয়ে জবাব দিতে এরদোয়ান যতটা সক্ষম, যুদ্ধ ছাড়া দর কষাকষি করে ফলাফল নিজের অনুকূলে আনতে ও প্রচণ্ড পারদর্শী সুলতান এরদোয়ান।

এক সময় শুধু অশ্রু দিয়ে পাওয়ার বা ক্ষমতাকে সংজ্ঞায়ন করা হত কিন্তু গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে অর্থনীতি, সমাজনীতি ও অবকাঠামো দিয়েও ক্ষমতাকে সংজ্ঞায়ন করা হচ্ছে।

jagonews24

হয়তো ফিলিস্তিন এখন নিগৃহীত এবং শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র বা ইজরাইলের ইন্টারেস্ট এর জায়গা। কিন্তু যদি ফিলিস্তিনিকে তাদের হারানোর গৌরবের ভূমিতে ফেরানো যায় তাহলে এই ফিলিস্তিনকে নিয়ে রাশিয়া ও চায়না একটা সময় এগিয়ে আসবে।

বিষয়টি যখন গ্লোবাল কন্টেক্সট এর বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তখন পরাশক্তিধর দেশগুলো নিজেদের অবনস্থান কখনও ছাড় দিতে চাইবে না।

তাছাড়া ইরানের পর তুরস্ক একমাত্র দেশ যাদেরকে ইসরাইল প্রচণ্ড সমীহ করে। তাই যত দ্রুত ফিলিস্তিনিদের রক্ষায় তুরস্ক হস্তক্ষেপ করবে, তত দ্রুত এই রক্তান্ত সংঘাত বন্ধ হবে। যে কারণে সবাই চেয়ে আছে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের দিকে।

পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত ইরান বড় ধরনের কোনো সংঘাতে ইসরায়েলের সঙ্গে জড়াবে না বলে মনে হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয় ইউনিয়নের সঙ্গে সর্ম্পকের অবনতি না ঘটিয়ে ইরান চাইবে তাদের চূড়ান্ত পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে। এটি তাদের একমাত্র লক্ষ্য।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে আরবদের দৃষ্টিভঙ্গি সবারই জানা। ‘সিরিয়ার ১০ বছরের যুদ্ধ, ইয়েমেনের উপর সৌদি আগ্রাসন, মিসরের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সহিংস পতন, লিবিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং লেবাননের তিন বছরের রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণে আরবরা ভুলে গেছে ফিলিস্তিনিদের ও তাদের সমস্যার কথা। তারা এখন শুধুই নিজেদের সমস্যা নিয়ে ভাবছে। আরবের অনেকে এখন ইসরায়েলের পরম মিত্র।

সৌদির কর্তৃত্ব থেকে বেরিয়ে আসা না পর্যন্ত ওআইসি ফিলিস্তিনি ইস্যুতে কার্যকরি ভূমিকা রাখতে পারবে না এটি এক ধরনের প্রতিষ্ঠিত সত্য। ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে পাকিস্তান সর্বোচ্চ ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দেয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে আর মালোয়েশিয়ার ভূমিকা এখনও পরিষ্কার নয়?

ইসরাইলের সম্প্রতি সহিংস হামলার মুখে পশ্চিম তীর ও গাজার শিশুদের যে অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে সেটি নিয়ে ইসরাইলের রাজনৈতিক মিত্ররা কিছুই বলছে না।

ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার মাটির সঙ্গে পিষে দেবার পরও ইহুদী আগ্রাসনকে মার্কিন-বৃটেন ফ্রান্স এটিকে ইসরায়েলের আত্মরক্ষা বলে মনে করছে!

বছর ধরে নিরপরাধী ফিলিস্তিনিসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তরে মানুষ হত্যা করে ডেমোক্রেসি, লিবারেলিজম ও ক্যাপিটালিজমের ডিসকোর্স শিখিয়ে আপনার-আমার মতো মানুষকে দিনের পর দিন বলদ বানিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমারা।

পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জারাহ এলাকার বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করতে ইসরাইলি আদালতের নির্দেশের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ থেকে এবারের হামলার সূত্রপাত হয়েছে। এর মধ্যে আমাদের প্রথম কেবলা আল আকসায় তারাবির নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিদের ওপর হামলা চালায় ইসরাইল।

এর বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনির প্রতিরোধ সংগঠন হামাস প্রতিবাদ করায় তাদেরকে নির্মূলের নামে গাজায় নির্বিচারে বিমান হামলা শুরু করে ইসরাইল। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সেখানে ১৩৯ জনের উপরে ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

যাদের প্রায় সবাই বেসামরিক নাগরিক, তার মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে। আহত হয়েছে সহস্রাধিক। গাজায় অনেকের বাড়ি ঘর গুড়িয়ে গিয়েছে ইসরাইলের বিমান হামলায়। সেখানে অবস্থিত আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আল-জাজিরাসহ এপি নিউজের বহুতলা অফিস ভবন পর্যন্ত দখলদারদের বোমার আঘাত থেকে বাদ যায়নি।

১৯৬৭ সালের আরব ইসরাইল যুদ্ধের সময় পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয় ইসরাইল। এখানেই অবস্থিত মুসলিমদের প্রথম কেবলা এবং তৃতীয় বৃহত্তম পবিত্র স্থান আল আকসা মসজিদ। ১৯৮০ সালে নগরীর পুরোটা দখলে করে নেয় ইহুদিবাদী দেশটি। আন্তর্জাতিক মহল জেরুজালেমকে ইসরাইলের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও তারা জোরপূর্বক পবিত্র নগরীটি দখল করে রেখেছে।

এমআরএম/জিকেএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]