ভেজাল ওষুধে নতুন রোগ!

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ০১:২৮ এএম, ১০ জুন ২০২১ | আপডেট: ০১:৩১ এএম, ১০ জুন ২০২১
রহমান মৃধা

সমাজের আইন-কানুন মানুষের সুবিধার্থে করা। এখন যদি সুবিধাগুলো অসুবিধায় পরিণত হয় তখন কী করা! যেমন : অসুখ হয়েছে, গেলাম সুস্থ হওয়ার জন্য চিকিৎসকের কাছে। ওষুধ সেবনের পর দেখা গেল অসুখ কমেনি, বরং বেড়েছে। কারণ জানতে নতুন চিকিৎসকের সহায়তা নিতে জানা গেল, ভেজাল ওষুধের কারণে নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে।

যেক্ষেত্রে ওষুধ আমাদের রোগমুক্ত করার মাধ্যম, কিন্তু দেখা গেল ভেজালের কারণে তা হয়েছে রোগবৃদ্ধির কারণ। বাংলাদেশে কিছু মানুষ নামের দানবেরা টাকার জন্য মানুষের ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। এরা বাংলাদেশের খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত এবং সমাজের চোখে বিবেকবান নাগরিক।

এরা ভালোভাবে জানে যে, মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ওষুধ বিক্রি বা সেবন করা নিষিদ্ধ, তারপরও এ ধরনের কুকর্ম! এদের শুধু কি জেল হাজতে ঢুকালেই সমস্যার সমাধান হবে? নাকি আরও কিছু করা দরকার?

ওষুধের মতো চলছে দেদারছে খাবারেও ভেজাল। যারা ভেজালের সঙ্গে জড়িত কী উদ্দেশ্য তাদের! লাভবান হওয়া, পরিবেশ নষ্ট করা, সবাইকে আস্তে আস্তে শেষ করা নাকি কাস্টমার বৃদ্ধি করা? দুধে পানি মিশিয়ে ওজন (volume) বাড়ানো মানে লাভবান হবার চেষ্টায় পানি মেশানো হয়েছে।

ক্রেতা পানি মেশানো পাতলা দুধ পেয়েছে, বলা যেতে পারে ক্রেতাকে ঠকিয়ে লাভবান হবার প্রবণতা। কিন্তু দুধে কোনো বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশিয়ে দুধের ওজন বৃদ্ধি করে বিক্রি করা, শুধু ক্রেতাকে ঠকানো নয় তাকে অসুস্থ করা। শেষে তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

এখন দুধে এই রাসায়নিক মিশ্রণ, এটা কি জেনে-শুনে এবং বুঝে করা, নাকি না বুঝে করা? এভাবে হাজারও ভেজালের বর্ণনা এবং তার ধরণ যেমন কাপড়ের রং মিষ্টিতে মেশানো ইত্যাদি চলছে যা সারা দিন লিখলেও শেষ করা যাবে না।

আমরা কি জেনে শুনে সব করছি, নাকি না জেনে সব করছি? যদি জেনে শুনে করি তবে বলব ‘We are living in hell.’ কিন্তু যদি না জেনে শুনে করি তবে আমাদের জানতে হবে, শিখতে হবে এবং পড়তে হবে। যখনই শেখা বা জানার প্রবণতা দেখা দিবে তখনই মনে করতে পারব যে আমরা ভুলের সংশোধন করতে আগ্রহী। ভাববো ‘We still have a hope for better quality of life.’

এখন শেখা বা জানার পদ্ধতি কীভাবে হওয়া দরকার এবং কে বা কারা নেবে সেই দায়িত্ব? সরকার, পুলিশ কর্তৃপক্ষ, রাজনৈতিক নেতারা নাকি আমরা? আমরা সবাই জানি ‘অন্যায় যে করে, অন্যায় যে দেখে বা অন্যায় যে সহে সবাই সম অপরাধী।’ সবাই যেখানে অপরাধী তখন কি উচিত হবে শুধু সরকারকে দায়ী করা?

এখন সরকার যদি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয় তবে সরকার বলতে আমাদেরকেই বোঝায়। কিন্তু যদি তা না হয় তখন ‘We have big problem.’ এক্ষেত্রে কেউ দায়িত্ব নিতে রাজি হবে না। কারণ সবাই দায়ভার এড়িয়ে সরকারের ওপর চাপিয়ে দেবে। সেটা কিন্তু স্পষ্ট লক্ষণীয় বাংলাদেশে।

যা কিছু ভালো সব কৃতিত্ব কিন্তু সরকারকে দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে যা কিছু খারাপ তাও নিয়ম অনুযায়ী সরকারকেই গ্রহণ করার কথা, কিন্তু সেগুলো সরকার বিরোধী দলের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে বা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এই কারণে সব কৃতিত্ব এবং সব সমস্যার দায়ভারগুলো প্রধানমন্ত্রী এবং মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক লোকের ওপর পড়ছে। একটি সৃজনশীল দেশের দায়ভার সবাইকে নিতে হবে তা নাহলে আমরা যেমন আছি তেমনই থাকব।

এখন সবাইকে দায়িত্ব নিতে হলে জনগণের প্রতিনিধির ওপর বিশ্বাস আনতে হবে এবং তার জন্য দরকার গণতান্ত্রিক প্রতিনিধি নিয়োগ করা। প্রতিনিধি নিয়োগ ‘Is a democratic choice’ এবং এর জন্য দরকার ‘FAIR ELECTION.’

যদি এত বছরেও বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বেস্ট প্র্যাকটিস না হয়ে থাকে সময় এসেছে তা শুরু করার। শুধু সরকারের ওপর ভরসা না করে সবাইকে দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের স্বার্থে নৈতিকতার মান উন্নয়ন করতে হবে।

একই সঙ্গে ভেজাল এবং দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আর কম্প্রোমাইজ নয়, আইন প্রয়োগে জিরো টলারেন্স ব্যবস্থা গ্রহণ করে দেশের মানুষের জীবনের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

কীভাবে বাংলাদেশ তার নিজ দেশের জাতীয় ফল ফরমালিন এবং ভেজালযুক্ত, কাঁচা এবং পচা কাঁঠাল, আম, সবজি এবং পচা মাছ পাঠাতে পারে দেশের বাইরে? ভাবতেই গা শিউরে উঠে আমার। কবে হবে বাঙলির চরিত্রের পরিবর্তন? এত সুন্দর ফলমূল দেশে থাকা সত্ত্বেও নৈতিকতার অবনতির কারণে তাকে বিশ্ববাজারে বিক্রি করা যাচ্ছে না এর চেয়ে কি লজ্জা এবং ঘৃণা থাকতে পারে?

সরকার এবং কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি পরিবর্তনের জন্য। বাংলাদেশের পরিচয় হোক তার সুকর্মে এমনটি অধিকার দাবি করতে পারি একজন সুযোগ্য নাগরিক হিসেবে। আমি আমার বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পেতে নিজ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশ স্বাধীন করতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেই স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে অনুরোধ করছি প্লিজ নৈতিকতার বিসর্জন না দিয়ে বরং দুর্নীতি এবং ভেজালমুক্ত পণ্য দ্রব্য বিদেশে পাঠান।

আমরা আর বিশ্বের দরবারে অবহেলিত এবং অসৎ জাতি হিসেবে পরিচিত হতে চায় না। যা কিছু বাংলাদেশ থেকে পাঠানো হয় তার সব কিছুতে কোনো না কোনো দুর্নীতি জড়িত কিন্তু কেন? নিজের দেশ না হলে এতদিন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে চাপ সৃষ্টি করে বাংলাদেশ থেকে সব ধরণের পণ্যেদ্রব্যে আনা নিষিদ্ধ করতে বাধ্য করতাম। শুধু দেশের গরীব দুঃখীদের কথা চিন্তা করে অনেক কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না।

সমস্ত কূটনীতিকদের নির্দেশ দিতে সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তাদের নীরবতার ভূমিকা দেশকে ধংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে, একই সাথে সীমিত কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়িক মালিকানা ঊর্ধতন কর্মকর্তাসহ রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের হাতে রেখে এক তরফা ব্যবসা করে চলছে। যারফলে বাজারে কোন প্রতিযোগিতা নাই।

যে কারণে হঠাৎ এসব কথা

এসেছিলাম স্টকহোম শহরে বাজার করতে। এখানে দুইটি বিশেষ বাজার আছে যাদেরকে স্যালুহল বলা হয়। একটির নাম ওস্টেরমাল্ম স্যালুহল অন্যটির নাম হোতরিয়েত স্যালুহল। এগুলেতে সিলেক্টিভ পণ্যদ্রব্য বিক্রি হয়। জিনিসপত্রের দাম একটু বেশি তবে কোয়ালিটি ভালো। আমার আবার ছোটবেলার অভ্যাস একই জায়গায় বাজার করা।

যেহেতু পরিচিত মুখ সেহেতু হাই হ্যালো বলা, তাছাড়া বিক্রেতারা জানে আমি কী পছন্দ করি। সব মিলে আমার ভালোই লাগে এখানে বাজার করতে। ছোটবেলা যখন গ্রামে থেকেছি ঠিক একইভাবে নির্দিষ্ট দোকান থেকে পণ্যদ্রব্য কিনেছি।

যেমন নারানকুরি খুড়োর দোকান থেকে মিষ্টি, আমার প্রিয় চাচা আতিয়ার শিকদারের দোকান থেকে অন্যান্য জিনিস কেনা, সঙ্গে একটু আড্ডা মা'রা ছিল বাজার করার সঙ্গে কিছুটা বাড়তি বিনোদন। এ কারণে বাজার করাকে কাজ বলে মনে হয়নি কখনই।

আমি আবার আম, কাঁঠাল এবং লিচুর পাগল। ভালো লিচু অথবা আম পেতে লন্ডন পর্যন্ত যাই। কারণ বাংলাদেশ থেকে ফলগুলো সরাসরি লন্ডনের লাইম হাউজের আশপাশে সিলেটি ভাইদের দোকানে পাওয়া যায়। কিন্তু এবার সে সুযোগ নেই। কী করা!

তবে সুইডেনে লিচু আর কাঁঠাল হয়ত মিলবে না, তবে আম পাওয়া যায়। এখানে নানা দেশ থেকে ফল আমদানি করা হয়। সুদূর আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, পেরু, এছাড়া এশিয়ার বিভিন্ন দেশর নানা বর্ণ এবং নানা স্বাদের আম এখানে পাওয়া যায়।

আমরা বলি ফলের রাজা আম, কারণ যেমন এর স্বাদ তেমন মিষ্টি। কয়েকদিন আগের ঘূর্ণিঝড় আম্পানে বাংলাদেশে আম চাষে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে যা দেখেছি খবরে, বেশ খারাপ লেগেছে। এই ঝড়ের কারণে সেই ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। তখনও কিন্তু ঝড়ে আম পড়ে অনেক ক্ষতি হতো।

যাইহোক আজ স্টকহোমের হোতরিয়েত স্যালুহলে কিছু ভিন্ন ধরনের আম চোখে পড়ল। এগুলো এসেছে পেরু এবং জাপান থেকে, দামও খুব চড়া। পেরুর আমের কেজি দুইশো পঞ্চাশ ক্রোনার এবং জাপানি আমের কেজি তিনশো ক্রোনার (এক ক্রোনা=১০ টাকা মানে তিন হাজার টাকা)।

একোলোজি (জীবজগৎ ও পরিবেশের বিজ্ঞান সম্মত সামঞ্জস্যের নাম একোলজি) উৎপাদিত পণ্য মানে একেবারে গাছপাকা এবং বিশেষ যত্ন করে আমগুলো গাছ থেকে পাড়া হয়েছে। আমের গায়ে ছোট করে লেখা রয়েছে তার জন্মের ইতিহাস। জীবনে কত আম খেয়েছি এবং টুকটাক ইতিহাস জেনেছি সত্য, তবে এই ধরণের আমের ইতিহাস এর আগে কখনও ভাবনাতে আসেনি।

যেমন জাপানি আমের গায়ে লেখা রয়েছে তার নাম ‘এগ অফ সান।’ এই আম জাপানের বিশেষ জায়গায় উৎপাদিত হয়। প্রথম যে আমগুলো পাকে তা সেখানে নিলামে বিক্রি হয়। সুইডেনেও অবশ্য এমনটি হয়ে থাকে। যেমন বছরের প্রথম গোলআলু যখন বাজারে আসে তার দাম পাঁচশো থেকে আটশো ক্রোনার প্রতি কেজি হয়ে থাকে (সাধারণ সময় যার দাম দশ ক্রোনার)।

যেহেতু প্রথম বাজারে এসেছে তাই অনেকে সখ করে এগুলো কিনে থাকে এবং এর ওপর নিউজ, লেখালেখিও হয়। আমি যে আমগুলো সুইডেনে কিনি তা সাধারণত থাইল্যান্ড, পাকিস্তান মাঝে মধ্যে পেরু এবং স্পেন থেকে আসে। আজ জাপানের একটি আম কিনলাম। দেখতে অর্ধেক লাল, অর্ধেক হলুদ। এ আমগুলো জাপানেও রেয়ার, যার কারণে দাম একটু বেশি।

আমরা বাংলাদেশে যেভাবে ফলমূল সহজ উপায়ে উৎপাদন করি সেভাবে বিশ্বের অন্যান্য দেশে ফলমূল উৎপাদিত হয় না। কারণ বাংলাদেশের মাটি সেই গানের কথায় ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি, আমার দেশের মাটি।’ সেক্ষেত্রে অতি সহজে আমরা যা ফলাই মাটিতে তাই ফলে কিন্তু অন্যান্য দেশে ফুল এবং ফলের চাষ করতে চাষিকে অনেক সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়।

যেমন জাপানে প্রতিটি আম গাছে থাকা অবস্থায় তা সুন্দর করে জালে জড়িয়ে রাখা হয়। তারপর আমগুলোকে নির্দিষ্ট পরিবেশে রাখা হয় যাতে করে সূর্যের আলো আমের একটি নির্দিষ্ট অংশে পড়ে। অন্যদিকে ঠিক একইভাবে পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, পেরু এবং স্পেনের আম উৎপাদনেও এরা যথেষ্ট সময় ব্যয় করে থাকে।

সুইডেনে যেহেতু বিভিন্ন দেশের ফলমূল পাওয়া যায়, সেহেতু দাম একটু বেশি হলে ক্ষতি কি? আমি বাংলাদেশের সব খাবারই পছন্দ করি, বিশেষ করে আম ভালোবাসি। তারপর সেগুলো যদি খেতে ভালো হয় স্বাদে ও গন্ধে তাহলে তো কোন কথাই নেই।

তবে ছোটবেলায় যেসব আম খেয়েছি সে স্বাদের সঙ্গে তুলনা করার মত আম এখানে আজও খাইনি। বড় সাধ জাগে সারা বিশ্বে লিটিল বাংলাদেশ দেখি, যেখানে সব কিছু পাওয়া যাবে এবং যা খেতে সকল দেশের খাবারে চেয়ে সেরা খাবার হবে।

লেখক : রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন। [email protected]

এমআরএম/এমএসএইচ

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]