‘হঠাৎ দেখি আমার অ্যাকাউন্টে অনেক টাকা’

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ০২:৪৮ পিএম, ১৩ জুন ২০২১

করোনা মহামারির কারণে চারপাশে সবকিছু বন্ধ। টেলিফোনে সামাজিকতা আর ভালো লাগে না। হঠাৎ করেই একটি সাইটে ঢুকলাম, দেখি আমার সমবয়সী একটি মেয়ে কিছু ছবি ছেড়েছে, হাল্কা পাতলা কাপড় পরা। পুরো শরীরটার আকর্ষণীয় অংশগুলো সম্পূর্ণভাবে না দেখা গেলেও ভাবনায় অনেক কিছুই দেখার মতো জায়গা তৈরি হয়েছে।

কিছুক্ষণ সাইটের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করলাম। সাইটে লিখেছে যেমন- বয়স ১৮ প্লাস হতে হবে। আমার বয়স ১৭, একটু ফেক জন্ম তারিখ লিখে চেষ্টা করতেই একটি অ্যাকাউন্ট হয়ে গেল। নিজের কয়েকটি ছবি ছাড়তেই অনেকেই লাইক দিতে শুরু করল। পরে দেখলাম কিছু ছবির চাহিদা বেশি, নিয়ম-কানুন জেনে নতুন করে ট্রাই করলাম, দেখি অলফ্যান্স বলে একটি সাইট রয়েছে।

তাদের মতো করে আমিও শুরু করলাম। তিন মাস যেতে না যেতেই বেশ অর্থ অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। হঠাৎ অনেকেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করল, কীভাবে আমাকে আরো সক্রিয় করা যায় এবং প্রচুর অর্থ রোজগার করা সম্ভব। অলফ্যান্স সাইটের মাধ্যমে আমার পরিচয় ঘটে মাক্সের সঙ্গে।

সে আমার থেকে বয়সে বড়। ১৮ বছর বয়সী আমান্ডা কথা বলছে আজকের সকাল বেলার নিউজ প্রোগ্রামে। সুইডিশ টেলিভিশন নিউজ প্রোগ্রাম (nyhetsprogram På TV4) বর্তমান ঘটনার উপর সংবাদগুলো সম্পর্কে শ্রোতাদের আগ্রহী হতে সাহায্য করছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা মুখে দিতেই মারিয়া আমার স্ত্রী, ড্রয়ই রুম থেকে ডাক দিল আমি চায়ের কাপ নিয়ে যেন সেখানে আসি।

আমি বললাম কেন? উত্তরে বললো টিভিতে একটি ডকুমেন্টারি প্রোগ্রাম দেখাচ্ছে যা তোমার লেখার একটি বিষয় হতে পারে। আমি চায়ের কাপটি নিয়ে মারিয়ার পাশে বসে প্রোগ্রামটি দেখতে শুরু করলাম। সুইডিশ টেলিভিশনের এই চ্যানেলটি নির্দিষ্ট ধরনের সংবাদ যেমন আর্থিক খবর বা স্পোর্টসের সংবাদ প্রকাশ করতে মনোনীবেশ করে এবং চেষ্টা করে নির্দিষ্ট একটি গ্রুপ যারা আগ্রহী যে বিষয়ে তাদের লক্ষ্য করে প্রোগ্রামগুলো করে।

অন্যান্য নিউজ প্রোগ্রামগুলো উদাহরণস্বরূপ, রাজনীতি এবং সমাজের আরও সাধারণ ইভেন্টগুলো কাভার করে বৃহত্তর শ্রোতাদের লক্ষ্য করে। নিউজ প্রোগ্রামগুলোও বিশ্বব্যাপী বা কম বেশি স্থানীয় ভিত্তিক হতে পারে।

আজকের প্রোগ্রাম বেশ যুগোপযোগী। গত প্রায় দুই বছর ধরে করোনার কারণে স্কুল-কলেজ সবকিছু লকডাউনে, যার ফলে তরুণ- তরণীরাসহ অনেকেই বিশ্বব্যাপী যে জিনিষগুলোর উপর আকৃষ্ট হয়েছে বেশি সেগুলো হলো প্রযুক্তি এবং তার ব্যবহার। যেমন- শোপিং, ডেটিং, কানেক্টিং, সোইং, বায়ইং অ্যান্ড সেলিং।

সুইডিশ টেলিভিশন নিউজ প্রোগ্রামের স্টুডিওতে এসেছে আমান্ডা এবং মাক্স। টিকটিক সাইটের অলফ্যান্স নেট সাইট আজকের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু।

অলফ্যান্স হলো এমন সাইট যা প্রাপ্ত বয়স্করা কোনো লক করা অ্যাকাউন্টে ফটো এবং ভিডিও আপলোড করতে পারে এবং গ্রাহকরা সামগ্রীটি দেখার জন্য অর্থ প্রদান করে। এখানে যে কোনো সামগ্রী আপলোড করা সম্ভব এবং কোনও বিধিনিষেধ নেই, যা মূলত সাইটটিকে একটি অর্থ প্রদানের পর্নো সাইট করেছে। পে-ওয়ালগুলোর পেছনে শিল্পী, গেমার এবং ব্যক্তিগত প্রশিক্ষকও রয়েছে। ছোট বড় সবাই এসব সাইটে অনায়াসে ঢুকছে প্রতিনিয়ত।

আমরা মানুষ জাতি সবসময় কিছু একটার ওপর ভর করে সফল হতে চায়। শিক্ষার্থীরা গাইড লাইনের ওপর, চাকরিপ্রার্থীরা অর্থ বা মামা-খালুর ওপর, কখনো নেতা বা পীর সাহেবের ওপর। কিন্তু নিজের উপর ভর করতে সাহস পায় না। নিজের মাথার ঘিলু যে সবচেয়ে উপকারী বন্ধু সেটার ব্যবহার করতে ভুলে যায়, ভুলে যায় নিজের মাথা, নিজের ঘিলু, নিজের যোগ্যতা এবং নিজের দক্ষতাকে।

নিজেকে দক্ষ করে তৈরি করলে সবাই যে আমাকে খুঁজবে, আমাকে চাইবে, আমাকে যথাযথ সম্মানী দেবে এমনটি সাহসও হারিয়ে ফেলি। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সম্মান দেবে যখন আমার কোয়ালি সমকক্ষ লোক না পাবে। আর যখন আমার নিজের যোগ্যতার ঘাটতি থাকবে তখনই দরকার হবে চাচা, মামা, মন্ত্রীর।

দক্ষতা বাড়িয়ে নিজের পা শক্ত করাটা এখন খুব জরুরি। যে কোনো একটি বিষয়ে পারদর্শী হতে হবে। মানুষ তার যোগ্যতায় যে কোনো পেশায় সফল হয় এটা মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু দুঃখ লাগে যখন দেখি অসংখ্য যোগ্য প্রার্থী স্রেফ প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার না করার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় আমাদের এখন প্রো-অ্যাকটিভ হওয়া জরুরি।

জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হলো কল্পনা। কল্পনা থেকেই তৈরি হয় নতুন পণ্যের ধারণা। টিকটক নতুন প্রজন্মের এক বিনোদনের প্লাটফোর্ম। বিশ্বের অনেক দেশের মতো সুইডেনের কিছু সংখ্যক তরুণ সমাজও কল্পনাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির এক নতুন শক্তি তৈরি করেছে অলফ্যান্সের মাধ্যমে।

বিশ্বের তরুণ সমাজ অলফ্যান্স সাইটে ঢুকে, কেউ দেখাচ্ছে, কেউ দেখছে, কেউ করছে কেউ করাচ্ছে। প্রযুক্তির সুযোগ আছে ব্যবহার হচ্ছে। নারীর শরীরকে পুরুষ জাতি ব্যবহার করছে বিনোদনের অংশ হিসাবে।

নতুন প্রজন্মসহ সবাই দেখছে সেটা, বিনিময়ে অনেকই আকৃষ্ট হচ্ছে এ পথটি বেছে নিতে। একই সঙ্গে সমাজে ধর্ষণ, নৈতিকতা, মানবতার পতন হচ্ছে।

আমি কিছুদিন আগে লিখেছি ‘জাগো বাংলাদেশ জাগো, নতুন করে ভাবো’ যেখানে বর্ণনা করেছি নতুন প্রজন্মের নেট সাইটে বিভিন্ন গেমসের উপর আকৃষ্টের কারণ, করণীয় এবং বর্জনীয়। আমরা বলছি বাচ্চারা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, মুঠোফোনে কী করছে তার দিকে কড়া নজর রাখেন।

সবাই মিলে সুস্থ পরিবেশ গড়ে তোলার মন্ত্রে এগিয়ে আসুন। বাচ্চাগুলোকে এক রকম ‘পোলট্রি ফার্মে’র মতো ঘরবন্দি না রেখে তাদের সামাজিক মূল্যবোধ চর্চা, সৃজনশীল পরিবার গঠন, স্বার্থপরতা বর্জন এবং নৈতিকতা কী, সে বিষয়ে শিক্ষা দিন। জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা আমাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হতে পারি, গড়ে তুলতে পারি উন্নততর ভবিষ্যৎ।

চলুন, সবাই মিলে বাচ্চাদের জন্য বাসযোগ্য সুন্দর পরিবেশ গড়ি। বাচ্চাগুলোর মানসিক গঠনে সাহায্য করি। নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের কথা না ভেবে পরিবার, সমাজ তথা দেশের জন্য ভাবি। দেশকে ভালোবাসি ইত্যাদি। কিন্তু কখনও অপ্রিয় সত্য কথাগুলো স্বীকার করছি না সেটা হলো অনলাইনে আমরা নিজেরাই প্রতিদিন নানা সাইটে ঢুকছি, যা খুশি দেখার দেখছি, অথচ সমস্ত দোষ চাপিয়ে দিচ্ছি নতুন প্রজন্মের উপর।

প্রযুক্তি মানুষের তৈরি, কেউ কি ভাবছে না প্রতিদিন কে কি করছে সবই সেভ হয়ে আছে, যতই ডিলিট করুন না কেন, মন থেকে যেমন ডিলিট হচ্ছে না, ঠিক সিস্টেম থেকেও তাকে ডিলিট করা সম্ভব নয়। প্রতিদিন কে কি করছে সবই আর্কাইভ হয়ে আছে এবং সবকিছু তদন্ত করা সম্ভব বিষয়টি সবার মনে রাখা দরকার।

আগেই বলেছি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হলো কল্পনা। কল্পনা থেকেই তৈরি হয় নতুন পণ্যের ধারণা। পাবজি, পর্নোগ্রাফি বা ফ্রি ফায়ার বন্ধ করার কথা না ভেবে বরং প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে শিখতে হবে। যা সৃষ্টি হয়েছে তার চাহিদা না থাকলে শেষ হয়ে যাবে।

প্রযুক্তি নতুন প্রযুক্তি নিয়ে হাজির হবে, সো মাস্ট গো অন। পুথিগত বিদ্যার বাইরে খেলাধুলা, গান-বাজনা, দেশ-বিদেশ ঘোরার অভ্যাসটা বাড়াতে হবে। সবক্ষেত্রে জয়ী হওয়ার মনোভাব পাল্টে সঠিককে যৌক্তিকতার বিবেচনায় মেনে নেয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। যেমন তরুণ প্রজন্ম বর্তমানে পর্নোগ্রাফি আসক্তির ভয়াল নেশায় মত্ত হয়ে আছে।

টিন এজার থেকে শুরু করে অনেক মধ্যবয়সী পুরুষও পর্নোগ্রাফি আসক্তিতে ভুগছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় পর্নোগ্রাফি আসক্তিকে তেমন ক্ষতিকর নয় ব্যাখ্যা দিলেও এর আছে দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব। নিয়মিত পর্নো ছবি দেখার মাধ্যমে নিজের অজান্তেই পুরুষ তার পুরুসত্বকে দুর্বল করে ফেলে। নারীর কাছে ঘৃণার পাত্র হয়ে যায়।

রুচি বোধের অবনতি ঘটে। নিয়মিত পর্নো ছবি দেখতে দেখতে বাস্তব জগৎ ছেড়ে পুরুষরা ফ্যান্টাসি দুনিয়াতে চলে যায়। অতিরিক্ত পর্নো নেশার কারণে সাধারণ নারীদের প্রতি বিতৃষ্ণা চলে আসে পনো আসক্তদের।

একজন নারীর জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনা বা তার জীবনকে ধ্বংস করা একটি অশ্লীল চরিত্রের কারণে, এটা নিশ্চয় কেউ জেনে-শুনে করবে না। এমতাবস্থায় কি করণীয়, কি বর্জনীয় এটাই এখন প্রশ্ন? আমি এতটুকু বলব খোলামেলা আলোচনা করতে হবে, ভয় দেখিয়ে নয় বরং আলোচনার মধ্য দিয়ে জয় করতে হবে পর্নোগ্রাফিকে।

প্রযুক্তির ভালো-মন্দ দুইটি দিক রয়েছে। শুধু ভালোকে গ্রহণ আর মন্দকে বর্জন করা শিখতে হবে, বলা যত সহজ করা তত সহজ নয়, তবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চেষ্টা করে গেলে সফলতা আসবেই।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

এমআরএম/জিকেএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]