মার্বেলের দিনে

মো. ইয়াকুব আলী
মো. ইয়াকুব আলী মো. ইয়াকুব আলী অস্ট্রেলিয়া
প্রকাশিত: ০৭:২৩ পিএম, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

ঠিক কোন বয়স থেকে গুলি (মার্বেল) খেলা শুরু করেছিলাম সেটা আজ আর মনে নেই কিন্তু খেলাটা একটা সময় নেশাতে পরিণত হয়েছিলো। আর গ্রামে গুলি দিয়ে দুইভাবেই খেলা যেতো টাকা ছাড়া এবং টাকাসহ। টাকাসহ খেলাটাকে বলা হতো জুয়া। তবে আমরা ছোটরা মার্বেলের বিনিময়ে মার্বেলই নিতাম। মার্বেলগুলার আকারের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন নামও দিতাম আমরা।

যেমন সবচেয়ে বড়টির নাম হচ্ছে ডাগা বা ডাগ আর সবচেয়ে ছোটটির নাম হচ্ছে চুই। আমরা আমাদের হাইস্কুলের হেডস্যারকে চুই বলে ডাকতাম এই কারণে। যাইহোক সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হতো দুটো দাগ দিয়ে। একটা দাগের পেছনে দাঁড়িয়ে অন্য দাগটার সামনের একটা নির্দিষ্ট গর্তের যত কাছাকাছি পারা যায় একটা মার্বেল ফেলা হতো।

গর্তটার নাম আজ আর মনে নেই। তারপর যার মার্বেল গর্তের সবচেয়ে কাছে তার চাল আসতো সবার আগে। সব খেলোয়াড় সমান পরিমাণ মার্বেল দিয়ে দান চালা হতো। আবারো সেই আগের দাগের পেছনে দাঁড়িয়ে অন্য দাগের সামনে মার্বেলগুলাকে চেলে দেয়া হতো। যে মার্বেলগুলা অন্য দাগটা পার হতে পারতো না সেগুলোকে বলা হতো বাদ বা পচা। দাগ পার হওয়া মার্বেলগুলা থেকে একটাকে আবার বাদ দিয়ে দেয়া হতো।

সেটা হতো এমন একটা মার্বেল যেটাকে খেলোয়াড় অন্য একটা মার্বেল দিয়ে সহজেই ছুয়ে দিতে পারবে এবং ভুলক্রমে সেটাকে যদি ছুয়ে দেয় তাহলে সেই খেলোয়াড়কে ডোন বা দণ্ড দিতে হবে আরো একটা মার্বেল। কিন্তু যদি সে অন্য মার্বেলগুলার কোনো একটাকে যদি ছুঁয়ে দেয় তাহলে বলা হবে সে দান মেরে নিয়েছেন কিন্তু যদি ভুলক্রমে দুটোকে ছুয়ে দেন তাহলেও ডোন হবে এবং দণ্ড দিতে হবে। এভাবেই একজন একজন করে খেলোয়াড় দান মারার চেষ্টা করে যাবেন।

আর অন্য খেলাটা ছিলো চারজনের এবং এটার কারণেই মূলত মার্বেল খেলা অভিভাবকদের কাছে ছিলো ত্রাসের নাম। মাটির উপর একটা ক্রস চিহ্ন দিয়ে তার চার কোণায় চারটি সংখ্যা লেখা হতো রোমান হরফের আদলে। যেমন শূন্য লেখা হতো একটা গোল্লা দিয়ে এবং সেটাকে বলা হতো লক্ষ্মী। এরপর একেবারে দুই দাগ, তিন দাগ এবং চার দাগ দেয়া হতো আর বলা হতো দুরি, তিরি এবং চারি।

একজন খেলোয়াড় তার হাতের মার্বেলগুলো দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে ঝাকি দিয়ে একটা হাত ক্রস চিহ্নটার মাঝে নিয়ে এসে দেন তখন অন্য তিনজন খেলোয়াড় তিনটা ঘরে তাদের ইচ্ছেমতো মার্বেল রাখেন আর একটা ঘর ফাঁকা রাখেন এবং সেটাতে খেতে বলেন। তখন প্রথম খেলোয়াড় তার হাতের মুঠো খুলে দিয়ে মার্বেলগুলা হিসেব করতে শুরু করেন চারটা চারটা করে। যদি ফাঁকা ঘরের সমান সংখ্যক মার্বেল অবশিষ্ট থাকে তাহলে তিনি জিতে যাবেন তা নাহলে অন্য যে ঘরের সাথে মিলে যাবে সেখানে রাখা মার্বেলের সমপরিমাণ মার্বেল সেই খেলোয়াড়েরাকে দিয়ে দিতে হবে।

এই খেলাটাই বড়রা খেলতো টাকা দিয়ে। এমন অনেক গল্প শুনেছি যে টাকা হারতে হারতে একসময় বসতভিটা এমনকি বউ পর্যন্ত ধরে বসতেন। অবশ্য আমাদের সেই সুযোগ ছিলো না কারণ ছোটদের নামে বসতভিটা বা বউ কোনটায় ছিলো না। মার্বেল অন্য সময়ে খেলা হলেও ঈদের সময়ে না খেলা হলে ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পেতো না। ঈদের সময় গ্রামের মুদি দোকানগুলো ঈদকে সামনে রেখে নতুন নতুন মার্বেল নিয়ে এসে রাখতো।

আমরা সালামির টাকা দিয়ে সেইসব নতুন মার্বেল কিনে খেলতে বসে যেতাম। এরপর আর আমাদেরকে উঠানো মুশকিল হয়ে যেতো। ঈদের দিন সামান্য যে দুয়েকজন অতিথির বাসায় যাওয়া লাগতো আমরা সেখানে যেতেও চাইতাম না খেলা ফেলে তাই বাধ্য হয়েই আমাদের বাবা-মা লাঠি নিয়ে তাড়া দিতেন। খেলতে যেয়ে অবধারিতভাবেই আমাদের মধ্যে একসময় মারামারি লেগে যেতো। তখন ঘুষাঘুষি, কিলাকিলি এবং মালাম ধরার মতো ঘটনাও ঘটতো অনেক সময়।

মালাম ধরাটা অনেকটা চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বলি খেলার মতো কে কাকে নিচে ফেলে দিতে পারে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে একটু পরেই আবার আমরা গলাগলি ধরে বিভিন্ন লোকের গাছের ফল চুরি করতে বেরিয়ে পড়তাম। আসলে গ্রাম বাংলার জীবন একসময় এমনই অনাড়ম্বর ছিলো। প্রতিবেশী প্রতিবেশীতে এই ঝগড়া এই মিল।

jagonews24

আবার বিপদে সবার আগে এসে পাশে দাঁড়ানো। সেটা দেখেই হয়তো ছোটদের মধ্যেও এমন সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো। আমরা নিজেরা মারামারি করবো কোন সমস্যা নেই কিন্তু বাইরের কেউ এসে বাগড়া দিলেই আমরা দুজন মিলে তখন তাকে পিট্টি দিতাম।

অস্ট্রেলিয়া আসার পর আমার শৈশবের সব আনন্দ উপকরণই আমি আমার বাচ্চাদের জন্য জোগাড় করেছি হোক সেটা সুপারির পাতায় চড়ে ঘুরে বেড়ান বা লুডু এবং ক্যারম খেলা। অবশেষে একদিন তাহিয়াকে গুগুল করে মার্বেলের ছবি দেখিয়ে বললাম এগুলো কোথায় পাওয়া যেতে পারো জানো? সে বললঃ বাবা আমি এগুলো কেমার্টে দেখছি। কেমার্ট নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যাদির চেইনশপ।

আমি আর তাহিয়া আজ বিকেলে কেমার্টে যেয়ে মার্বেল খুঁজছিলাম। তাহিয়াই খুঁজে বের করলো। আমাকে নিয়ে এসে দেখলো ক্যাটক্যেটে হলুদ রঙের মার্বেল। আমি বললাম অন্য কোন রঙের নেই। তখন তাহিয়া বললোঃ খুঁজে পাচ্ছি না বাবা। আমি বললাম স্টাফদের সাহায্য নাও। আমাদের পাশেই একজন স্টাফ কাজ করছিলেন। তাহিয়া উনার কাছে যেয়ে সাহায্য চাইতেই উনি এসে একটা বাক্স খুঁজে দিলেন যেখানে হরকে রকমের মার্বেল সাজানো রয়েছে।

আমি তার মধ্যে থেকে খুঁজে খুঁজে আমাদের শৈশবে খেলা মার্বেলের কাছাকাছি রঙের একটা বস্তা বেছে নিলাম। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে আমাদের ছোটবেলাতেও আমরা এমন একটা বস্তার মধ্যেই মার্বেলগুলো সংরক্ষণ করতাম।

মার্বেলগুলো কেনার আগে আমরা আমাদের আবিষ্কার করা নদীর (ক্রিকের) ধারে গিয়েছিলাম। সেই নদীটার দুই পাশেই উঁচু মাঠ। আমরা ছোটবেলায় নদীর ধারে গরু চড়ানোর সময় গাছের তলায় মার্বেল খেলতাম। এই নদীর ধারের মাঠেও তেমন কয়েকটা ঝাউ গাছ আছে। আর তার পাশেই একটু জায়গা কারা যেন ঘাস উঠিয়ে পরিষ্কার করে রেখেছে।

আমার পরিকল্পনা হলো ওই জায়গাটাকে মার্বেল খেলার জায়গা বানানো। তারপর কেমার্ট থেকে তাহিয়ার জন্য আরো এক বস্তা মার্বেল কিনে নিয়ে ওখানে খেলতে চলে যাওয়া। আমি অপেক্ষায় আছি কবে আমরা সেটা সম্ভব করতে পারবো।

এমআরএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]