বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে দেশকে ব্র্যান্ডিং করতে হবে

আহমাদুল কবির
আহমাদুল কবির আহমাদুল কবির , মালয়েশিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৮:৩৭ পিএম, ২৪ অক্টোবর ২০২১

বিশ্বায়নের এই যুগে বাংলাদেশের খ্যাতি ও সুনাম বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার জন্য জোরেসোরে দেশকে ব্র্যান্ডিং করতে হবে। এই ব্র্যান্ডিংয়ের মানে হচ্ছে দেশের আলোকিত দিকগুলো বিশ্বের কাছে তুলে ধরা।

২৩ অক্টোবর একান্ত সাক্ষাতে কথাগুলো বলছিলেন মালয়েশিয়া সানওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান। ময়মনসিংহের কৃতী সন্তান অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষার্থী।

মালয়েশিয়ায় মেধা ও প্রজ্ঞায় নিজ দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন তাদেরই একজন, মালয়েশিয়া সানওয়ে ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান।

jagonews24

যিনি মেকানিক্যাল সাইন্টিস্ট হিসেবে বিশ্বের ৪৯তম এবং এনার্জিতে ৫০তম স্থান দখল করেছেন। এছাড়া বিশ্বসেরা গবেষকের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন সাঈদুর রহমান। ল্যাঙ্কাস্টার জরিপে ২০২০ সালের সেরা চারজন গবেষকের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে মালয়েশিয়ার সানওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যানোমেটেরিয়ালস এবং এনার্জি টেকনোলজির অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান রয়েছেন সেরা চারে।

সাইদুর রহমান বলেন, বিশ্বায়নের এই যুগে দেশের খ্যাতি ও সুনামকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার জন্য দেশকে ব্র্যান্ডিং করতে হবে। এই ব্র্যান্ডিংয়ের মানে হচ্ছে দেশের আলোকিত দিকগুলো বিশ্বের কাছে তুলে ধরা। ব্র্যান্ডিংয়ের সুফল হচ্ছে, দেশের ইতিবাচক ব্র্যান্ডিং খাড়া করতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে দেশের জনশক্তি, পর্যটন, দেশে তৈরি পণ্য, বিনিয়োগ ও অন্যান্য সেবাও মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে এবং গ্রহণযোগ্যতা পায়।

তিনি বলেন, ইদানীং বিশ্বের বিভিন্ন শহরেরও একটি ব্র্যান্ডিং ইমেজ রয়েছে। সেই ইমেজ দেখেই মানুষ ঠিক করে কোন শহরে বেড়াতে যাবে। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই ব্র্যান্ডিংকে গুরুত্ব দিচ্ছে। রেডিও, টেলিভিশন ও সোশ্যাল মিডিয়ার বিজ্ঞাপনে তা উঠে আসছে। যেমন- মালয়েশিয়া ‘ট্রুলি এশিয়া’, ভারত ‘ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া’, চীন সারা বিশ্বের ‘কারখানা’ এবং শ্রীলঙ্কা ‘রিফ্রেশিংলি শ্রীলঙ্কা’ হিসেবে পরিচিত।

jagonews24

এছাড়া থাইল্যান্ড নিজেকে তুলে ধরছে ‘অ্যামেজিং থাইল্যান্ড’ নামে। বিভিন্ন নামে চলছে বিভিন্ন দেশের ইতিবাচক প্রচারণা। উপযুক্ত ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশের ইমেজ প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব কিছু নয়। কেননা আমাদের দেশে মেধার অভাব নেই। পোশাক শিল্পের পর বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের চমকপ্রদ অগ্রগতি হয়েছে। এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার ৯ শতাংশেরও বেশি এবং বিশ্বের ১৬০টি দেশে বাংলাদেশ এখন ওষুধ রপ্তানি করছে। বাংলাদেশের অন্যতম ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান স্কয়ার এবং বেক্সিমকো সম্প্রতি আমেরিকার বাজারে প্রবেশের অনুমোদন পেয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ওষুধ শিল্পের ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। পাটকে বলা হয় সোনালি আঁশ। একটা সময় সোনালি আঁশের দেশ বলতে বাংলাদেশকেই চিনত সারাবিশ্ব। মেধা ও যুগোপযোগী প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে পাটকে বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য ব্যবহার করতে পারে। দেশের একটি গ্রহণযোগ্য ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি করতে হলে প্রয়োজন ঐকমত্য। সরকার, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, দেশ এবং প্রবাসের বাসিন্দা সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় এক কোটিরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন। যারা দেশের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করতে পারেন। বিশ্বের জনশক্তির বাজারে শুধু শ্রমিক রপ্তানির কথা না ভেবে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশের ইমেজ বদলে যাবে। সমস্যা আমাদের আছে ঠিকই, কিন্তু গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে হলে নেতিবাচক দিকগুলোকে পেছনে রেখে বিশ্বের কাছে দেশকে নিয়ে একটি সুন্দর বার্তা পৌঁছে দিতে হবে, যা বাংলাদেশকে নিয়ে বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে দেবে।

অধ্যাপক সাইদুর রহমানের গবেষণার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, শিক্ষাবিদ, গবেষকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, সবাই মিলে বাংলাদেশকে বিশ্বে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে। তিনি তার মেধা বাংলাদেশে কাজে লাগাতে প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন।

jagonews24

সাইদুর রহমান বলেন, একটা সময় ছিল দরিদ্রপীড়িত বাংলাদেশকে বিশ্ব চিনত, এরপর কায়িক পরিশ্রম করা কর্মীদের দেখছে বিশ্ব। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে যে মেধা ও কৃতিত্বের বিস্ফোরণ দেখাচ্ছে বাংলার মেধাবী সন্তানরা সেসব প্রকাশ পাচ্ছে এখন। এ যেন সেই ’৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনের মতোই। যার যা আছে তাই নিয়ে লড়াই করে বিশ্বের বুকে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে গবেষণা সহযোগিতা হতে পারে। বাংলাদেশি গবেষকদের জন্য অনলাইন গবেষণা সেমিনার আয়োজন করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, এনার্জি এখন বিশ্বের অন্যতম অনুষঙ্গ, উন্নয়ন বা ভোগের অন্যতম চালিকাশক্তি। অল্প বিনিয়োগে অধিক এনার্জি উৎপাদন, টেকসই উন্নয়নে গবেষণা এবং এর প্রয়োগের বিকল্প নেই।

সাইদুর রহমান ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে মালয়েশিয়ার সানওয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণায় পুরস্কারও পেয়েছেন। তিনি ল্যাঙ্কাস্টারের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শক্তি প্রযুক্তি বিভাগ এবং মালয়েশিয়ার সানওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যানোম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড এনার্জি টেকনোলজির অধ্যাপক।

তার কাজের মধ্যে ল্যাঙ্কাস্টারের এনার্জি রিসার্চ গ্রুপের নবায়নযোগ্য শক্তির জন্য ন্যানোম্যাটেরিয়ালের গবেষণা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশ্বের পাঁচ শতাধিক জার্নালে তার গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।

তার গবেষণাপত্র বিশ্বের অন্যান্য গবেষকদের কাছে সব থেকে বেশ সমাদৃত। গবেষণা কাজগুলো ৪৫ হাজারেরও বেশি উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। ওয়েব অব সাইন্স ন্যানোফ্লুয়েড গবেষণায় তিনি প্রথম স্থানে রয়েছেন বলে জানা গেছে। ২০১৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি বিশ্বসেরা গবেষক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।

এমআরএম/জিকেএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]