জীবনানন্দের প্রেতাত্মা

মো. ইয়াকুব আলী
মো. ইয়াকুব আলী মো. ইয়াকুব আলী
প্রকাশিত: ১২:৪২ পিএম, ১৫ নভেম্বর ২০২১

গায়ের রাস্তা ধরে গরুর গাড়ি চলেছে একঘেয়ে ক্যা-কু শব্দ করে। গাড়িতে হাসিনা খাতুন আর তিন সন্তান। বড় আর মেঝো দু’জন পিঠাপিঠি তাই তারা গাড়ির উপর থেকে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে চারপাশটা। গ্রামের রাস্তার দু’পাশে ফুটে থাকা নাম না জানা অসংখ্য ফুলে তাদের শিশু মনে আনন্দ দিয়ে যাচ্ছে।

নানা বাড়িতে গেলেই মায়েরা সব বোন মিলে পাশের নদীতে দলবেধে গোসল করতে যায়। আর বাচ্চাদের কোলে করে নিয়ে নদীর পাড়ে বসিয়ে রাখে। নদীতে গোসল করার সময় অনেক ধরনের খেলায় খালারা মেতে উঠেন আরা অপার বিস্ময় নিয়ে নদীর পাশে বসে থাকা বালক বালিকারা সেটা দেখে।

কলমিলতার বা হেলেঞ্চার ডাটা পানিতে ফেলে সবাই মিলে সেটাকে ঢেউ দিয়ে হারিয়ে ফেলা। এরপর যে সবার আগে সেটা খুঁজে পেয়ে একটা ডুব দিতে পারবে তার এক পয়েন্ট। কিন্তু ডুব দেওয়ার আগেই যদি কেউ তার মাথা ছুয়ে ফেলে তাহলে সে কোনো পয়েন্ট পাবে না। গোসলের শেষের দিকে নদীর আঁঠাল (এঁটেল) মাটি দিয়ে চুল পরিষ্কার ব্যাপারটা খুবই অবাক করতো শিশুদের।

নদীর পানি বেড়ে গিয়ে একটা সময় কাছাকাছি সমতল ডুবিয়ে দিয়ে বন্যার আকারে চারপাশে ছড়িয়ে পড়া শুরু করে। প্রথমে নিচু জায়গাগুলো প্লাবিত করে তারপর আসতে আসতে উঁচু জায়গাগুলোও গ্রাস করতে শুরু করে। মানুষ নিজ উদ্যোগে নিজেদের ঘরবাড়ির ভিটে উঁচু করে নেয় তাই দিন দিন রাস্তাটা নিচু হয়ে যায়। রাস্তা দিয়ে বন্যার পানি বয়ে চলেছে।

হাসান তার ফুপাতো চাচা (আব্বার ফুপুর ছেলে) কুদ্দুসের সঙ্গে মিষ্টি কুমড়োর ফুলের ভেতরের অংশ দিয়ে এক মজার খেলায় মেতে ওঠেছে। কুদ্দুস চাচা পানির গতির ভাটির দিকে আর হাসান উজানের দিকে। হাসান কুমড়োর ফুলের অংশটা পানিতে ছেড়ে দেয়। সেটা পানির সঙ্গে বয়ে চলে এক সময় কুদ্দুস চাচার কাছে হাজির হয় তখন চাচা সেটাকে পানি থেকে তুলে হাসানের দিকে ছুড়ে মারে। হাসান সেটা আবার পানিতে ভাসিয়ে দেয়।

বন্যার পানিতে গোসল করতে গিয়ে হাসান অবাক বিস্ময়ে দেখে লালচে লালচে কিসের যেন দলা ভেসে যাচ্ছে। কাছে দেখে অসংখ্য লাল পিঁপড়া একসঙ্গে হয়ে এই দলা তৈরি করেছে। পরে বড়দের কাছ থেকে জেনেছিল বন্যা আসলেই পিঁপড়ারা এভাবে জোটবদ্ধ হয়ে ভেসে চলে যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা কোনো স্থলের সঙ্গে আটকে যায়।

বন্যার পানিতে প্রায় সব জায়গায় ডুবে গেছে ভিটেবাড়ির বাইরে সামান্য যে জায়গাটুকু জেগে থাকে সেখানে দুনিয়ার সকল ইঁদুর এসে বাসা তৈরি করেছে। বাড়ির কুকুর সেই ইঁদুর ধরার জন্য গর্তের বাইরে শিকারি ভঙ্গিতে বসে আছে। হাসান গিয়ে গর্তের আড়ালে দাঁড়িয়ে অনায়াসেই একটু ধাড়ি সাইজের ইঁদুর ধরে ফেলে। তারপর সেটা নিয়ে কুকুরটার সঙ্গে এক মজার খেলায় মেতে ওঠে।

সে তার ইঁদুর ধরে রাখা হাতটা একটু নিচু করে আর কুকুরটা সেটা লাফ দিয়ে ধরার চেষ্টা করে। কুকুরটা একটা সময় সফলকাম হয়। কিন্তু হাসানের ডান হাতের বুড়ো আঙুলে বসে যায় কুকুরের দাঁতের দাগ। যেটা বেশ কিছু দিন লুকিয়ে রাখার পর সবাই জেনে যায় যার ফলশ্রুতিতে হাসানের নাভির চারপাশে নিতে হয় চোদ্দটা ইনজেকশন।

নদীতে নতুন চর জেগেছে। আগের ভিটের মাটি জেগে উঠেছে যেটা নদী বেশ ক’বছর আগে গলাধকরণ করেছিল। গ্রামের সবাই এক মৌসুমের জন্য অস্থায়ীভাবে ঘরবাড়ি বানানো শুরু করেছে চরে এবং চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সকল সরঞ্জাম নৌকাতে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

সর্বশেষে হালচাষের জন্য গরু নিয়ে যাবে বাড়ির রাখাল। বাড়ি শিশুরা বাইনা ধরেছে তারাও যাবে চরে। কিন্তু সবার আবদার মঞ্জুর করা হচ্ছে না। হাসান একটু বয়সে বড় আবার বংশের বড় ছেলেও, তাই তার আবদারটা রক্ষা করা হলো। নদী পার হওয়ার সময় রাখালের শিখিয়ে দেয়ামতো হাসান ভয়ে ভয়ে শক্ত হাতে গরুর লেজ ধরে থাকে। সাঁতরে গরু নদী পার হয়ে যায় সেইসঙ্গে হাসানও।

চরে সাধারণত এক মৌসুম ক্ষেতি করা হয় তাই বড় বড় গাছপালা বা বাড়িঘর নেই। চারদিকে একেবারেই খোলামেলা পরিবেশ। দিনের বেলাতে দৃষ্টিসীমার মধ্যে প্রায় পুরো চরটাই দেখা যায়। রাতের বেলা থাকে অন্ধকার আর আশপাশের ঘরে জ্বলতে থাকা কেরোসিনের কুপি বাতির আলো। কিন্তু ব্যতিক্রম হয় জ্যোৎস্না রাতে। দিনের মতোই রাতেও পুরো চরটা দেখা যায় কিন্তু কোনো একটা কিছু আলাদা মনে হয় হাসানের কাছে।

jagonews24

সেটা যে কি তার শিশুমন ধরতে পারে না কিন্তু খটকাটা মনে থেকে যায়। নদীর পারে, পটল, উচ্ছে, বাংগির ক্ষেত। স্কুল শেষ করে সেটা পাহারা দিতে আসে হাসান। আর ছুটির দিনে সারাদিনই থাকে। সারাদিন সব ছেলেরা দল বেধে নদীর পানিতে গোসল করতে যায়। যাওয়ার পথে নদীর উঁচু পারে গর্ত করে বাধা বাসা থেকে শালিকের ছানা ধরে নিয়ে আসে তারা।

তাছাড়াও নদীর বালুচরে গজিয়ে উঠা কইউকরা, কাঠালিচাপা দিয়ে নানান রকমের খেলনা বানায় তারা। সবচেয়ে মজার খেলা হচ্ছে কইউকরার সরু কালো শেকড় দিয়ে গোল চাকতির মতো বানিয়ে সেটাকে ছেড়ে দিলেই সেটা বাতাসের চাপে ঘুরতে ঘুরতে অনেকদূর চলে যায়। তখন ছেলেরা সবাই মিলে সেটাকে কার আগে কে ধরতে পারে সেই প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে।

নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। ঘরবাড়ি সরাতে হবে। পরীজান বিবি চিন্তা করলেন এরপর আবারো আমরা নদীর পাড়েই ঘর বাঁধবো এবং আবারো সেটা ভাংবেই। তাই মোটামুটি স্থায়ী একটা জায়গা কিনে একটা বাড়ি বানানোর দরকার। নদীর পাশে অবশ্য নতুন বাড়িটা করতেই হবে কারণ তা না হলে জায়গা জমি দেখাশোনা করবে কীভাবে।

শহরতলিতে নতুন জায়গা কিনে বড় ছেলে আর তার পরিবারকে সেখানে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বড় ছেলে একদিন নৌকা ভাড়া করে সেখানে ঘরের খুঁটি-চালা বোঝায় করে নদীপথে রওয়ানা দেয় নতুন বাড়ির উদ্দেশ্যে। তার ছেলেরাও থাকে তার সঙ্গে। ছেলেরা অবাক বিস্ময়ে ভাদ্রমাসের ভরা নদীর স্রোত, বিভিন্ন প্রকারের পাক দেখে আর জিজ্ঞেস করে কেন পানির মধ্যে এমন হচ্ছে।

চলছে বর্ষাকালের অঝোর ধারার বর্ষণ। হাসিনা বেগম তার ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে আর বড় দু’জনকে পাশে শুইয়ে ঘুমপাড়ানি ছড়া আউড়ে চলেছে। এক সময় তিনি এবং তার ছোট ছেলে ঘুমিয়ে পড়েন। কিন্তু তার বড় এবং মেঝো ছেলে শক্ত হয়ে বিছানায় পড়ে থাকে গভীর ঘুমে অচেতন হবার ভান করে। যেই না তিনি ঘুমিয়ে পড়েন তারা দু’জন দৌড় দিয়ে বের হয়ে যায় বৃষ্টিতে ভিজতে।

প্রথমে টিনের চালের কিনারে দাঁড়িয়ে একটু চুপচুপে হয়ে ভিজে তারা অভিযানে নেমে পড়ে। হুদাদের বাগানে বিভন্ন রকমের ফলের গাছ আছে বৃষ্টি হলে কিছু না কিছু পাওয়া যায়ই যায়। সেখানে থেকে কুড়ানি পর্ব শেষ করে তারা এসে ঝাঁপ দিয়ে নিহার বাবুর পুকুরে নামে। পুকুরের পানির মধ্যে ডুব দিয়ে তারা বাইরের বৃষ্টির ফোঁটার শব্দ শুনে। যেটা অনেকটা বলাই দাদার খোলের শব্দের মতো।

হাসান বয়সে অনেক বড় হয়ে যাওয়ার পর একদিন হাতে পায় লাল শাপলা ফুলের প্রচ্ছদের একটা চটি কবিতার বই, নাম: রূপসী বাংলা। হাসান কবিতা দু’চোখে দেখতে পারে না, কারণ কবিতা মানেই অন্তত প্রথম আট লাইন দাড়ি কমাসহ মুখস্থ করতে হবে যেটা হাসানের জন্য অনেকটা পুলসেরাত পার হওয়ার মতো। কিন্তু এই কবিতার বইয়ের কবিতাগুলো কেন জানি তার খুব মনে ধরে গেলো।

কেন জানি তার মনে হলো এই কবি তার শৈশবের স্মৃতিময় দিনগুলোকেই বইয়ের পাতায় উঠিয়ে এনেছে। কবির নাম: জীবনানন্দ দাশ। নামটা মনের মধ্যে এমনভাবে গেঁথে গেল যে সে হন্যে হয়ে এই কবির বই খোঁজা শুরু করলো। কিন্তু কেনার সামর্থ্য না থাকাতে ইচ্ছেটা ইচ্ছেতেই সীমাবদ্ধ থেকে গেলো। আরো একটু বড় হয়ে চাকরি করে এক সময় কিনে ফেললো জীবনানন্দ দাশ সমগ্র।

আব্দুল মান্নান সৈয়দের সম্পাদনায় তখন পর্যন্ত তা প্রকাশিত অপ্রকাশিত সব কবিতার সংকলন দুই মলাটের মধ্যে। বইয়ের প্রচ্ছদটা এখনও মনে আছে। সাদা জমিনের মধ্যে এলোমেলো শিউলি ফুল ছড়ানো। পড়তে শুরু করে দেয় সে, কিন্তু এগোতে পারে না। কারণ তার প্রায় প্রতিটা কবিতায় হাসানকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় তার ফেলে আশা শৈশবের দিনগুলোতে।

এরপর থেকে হাসানের ওপর ভর করে বসে জীবনানন্দ দাশের প্রেতাত্মা, কারণ তিনি মারা গিয়েছিলেন অপঘাতে তাই তার আত্মা হয়তো পৃথিবীতেই ছিল। এখন সেটা ভর করে আছে হাসানের ওপর। এরপর থেকে হাসানের চরিত্রে কিছু মৌলিক পরিবর্তন হয়। জ্যোৎস্না রাতে সে কেন জানি ঘুমাতে পারে না। যদি ঘুমিয়েও যায় রাত্রের কোনো না কোনো সময় সে হুড়মুড় করে জেগে ওঠে।

দরজা খুলে বাইরে এসে দেখে চাঁদটা এখন কোথায়, সেটাকে কি দেখা যাচ্ছে না কি মেঘে ঢেকে গেছে। বৃষ্টির রাত্রে তারতো কিছুতেই ঘুম আসতে চাই না। ইচ্ছে করে সারারাত জেগে সে বৃষ্টি দেখবে (আসলে তার ইচ্ছে করে ভিজতে কিন্তু বাস্তবতার কারণে সেটা যেহেতু করা যাচ্ছে না তাই দেখেই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো আর কি)।

রাতের বেলা পাশের গাছে শব্দ শুনে বের হয়ে এসে দেখে একটা বাদুড় এসে সেই গাছে বসেছে। তখন হাসান তার মেয়েকে নিয়ে বারান্দায় বসে পড়ে যতক্ষণ পর্যন্ত বাদুড়টা থাকে সেই গাছটাতে। রাতে অবিরাম শব্দে ডেকে চলা ঝিঝি পোকাটার একাকিত্ব তাকে উতলা করে। ছুটির দিনের দুপুরে বাসার বাইরের ঘাসের ডগার বাতাসের নাচন তাকে উদাস করে।

ভোরে স্টেশনে যাওয়ার পথের ধারের বিভিন্ন ফুলের গন্ধ তার পথরোধ করে। এ যেন এক ভূতে ধরা রোগী যেখানে রোগীর সবকিছুই ভূতের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আর সেই অশরীরী আত্মার নাম: জীবনানন্দ দাশ। এখন মাঝ রাত পেরিয়ে গেছে, দু’চোখে রাজ্যের ঘুম। সারাদিন ছেলেমেয়ে দুটোকে নিয়ে অনেক ছুটাছুটির পর অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রেতাত্মা তাকে জাগিয়ে রেখেছে যে আজ থেকে তেপান্ন বছর আগে কোনো এক দুর্ঘটনায় অপঘাতে মৃত্যুবরণ করেছিল।

এমআরএম/জিকেএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]