ফিনল্যান্ড ভ্রমণে সেদিন সাওনাতে যা ঘটেছিল

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১১:০৮ পিএম, ২১ ডিসেম্বর ২০২১

পৃথিবীর যা কিছু নতুন সৃষ্টি এবং যা মানব কল্যাণকর তার সম্পর্কে আমরা কমবেশি জানি। আজ জানাবো জানা-অজানার মাঝে কিছু নতুন তথ্য, যা হতে পারে জীবনে প্রথম শোনা কাহিনি। ফিনল্যান্ড স্ক্যান্ডিনেভিয়ার পাঁচটি দেশের (সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড) মধ্যে একটি দেশ এবং এর চারপাশজুড়ে রয়েছে নরওয়ে, সুইডেন, এস্টোনিয়া এবং গালফ অব ফিনল্যান্ড। দেশটির লোক সংখ্যা ৫.৫ মিলিয়ন।

হাজারও লেকের সমন্বয়ে এ সুন্দর দেশ যার আয়তন বাংলাদেশের চেয়ে তিনগুণ বড়। ফিনল্যান্ডের অফিসিয়াল ভাষা দুটো- ফিনিস এবং সুইডিস। ফিনিস ভাষা সম্পূর্ণ ভিন্ন সুইডিস, ডেনিস বা নরওয়েজিয়ান ভাষার তুলনায়। এদের আর্কিটেক্ট এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর দক্ষতা সত্যি প্রশংসনীয় বিশেষ করে কনস্ট্রাকশন ডিজাইনের ক্ষেত্রে।

ফিনল্যান্ড বরফের দেশ সত্ত্বে ও এদের সামারের সৌন্দর্য সুইডেনের মতো মনোরম এবং যা তিন থেকে চার মাস সময় মে, জুন, জুলাই, আগস্ট অব্দি। এরাও শীতের সময় নানা ধরনের অ্যাক্টিভিটিস করে সুইডেন, নরওয়ে এবং ডেনমার্কের মতো। ফিনল্যান্ডের এক বিশ্বয়কর আবিষ্কার তা হলো ‘ফিনিস সাওনা’ যা সুইডেনে ‘বাসতু’ নামে পরিচিত।

ফিনল্যান্ডের বাথরুমের সঙ্গে বা যৌথ গোসলখানায় বা বাইরে এই সাওনাঘর তৈরি করা হয়। এ সাওনাঘর তৈরি করা হয় পুরো কাঠ দিয়ে, কোনো জানালা ছাড়া। এর ভেতরে ইলেক্ট্রিক হিটার বা কাঠের জ্বালানি চুলা ব্যবহার করে এই সাওনাঘর খুব গরম করা হয়। সাওনাঘর ড্রাই আকারে কোনো পানি ছাড়া বা বাষ্প আকারে পানির সমন্বয়ে হয়ে থাকে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গ্রামের বাড়িতে জ্বালানি কাঠ বা ইলেক্ট্রিক হিটার ব্যবহার করে সাওনাঘর গরম করা হয়।

jagonews24

সাওনাঘর ফিনিসদের জন্য কাইন্ড অব ফিনিস ঐতিহ্য এবং বিনোদনমূলক রিলাক্সেশন বলা যেতে পারে। সাওনাঘরের ভেতরের তাপমাত্রা ৫৫-৭৫ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড অব্দি হতে পারে এবং বাতাসের আর্দ্রতা ৩০ শতাংশ। মাঝে মধ্যে আগুনে বা হিটারে পানির ছিটা দিলে গরমের সঙ্গে বাতাসের আর্দ্রতা বেশি হয় এবং তখন প্রচুর গরম মনে হয়। সাওনাঘরে পুরুষ ও নারীরা যৌথ বা আলাদাভাবে যেতে পারে, তা নির্ভর করে পরিবেশ পরিস্থিতির ওপর।

সুইডেনেও সাওনার ব্যবহার রয়েছে; তবে সুইডিস ভাষায় একে আমরা বাসতু বলে থাকি। আজ বলব আমার জীবনের ফিনিস সাওনার ওপর প্রথম অভিজ্ঞতার কথা। এসেছি হেলসিঙ্কিতে বেড়াতে (আমার ফিনিস বান্ধবী ছালা বার্ক যার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল স্পেনের গ্রানক্যানেরি আইল্যান্ডে) তার বাড়িতে।

দুদিন হেলসিঙ্কি ঘোরার পর হেলসিঙ্কি থেকে গাড়িতে তার বাবা-মা এবং ছোট বোন মিলে রওয়ানা দিলাম যয়েনসুরের উদ্দেশ্যে। যয়েনসু ফিনল্যান্ডের আরেকটি শহর। হেলসিঙ্কি থেকে যয়েনসুর গাড়ির দূরত্ব ৬-৭ ঘণ্টার জার্নি। যয়েনসু রাশান বর্ডারের খুবই কাছে।

যয়েনসুতে ছালার নানিবাড়ি এবং তার বড় খালাও সেখানে থাকেন। সন্ধায় পৌঁছে গেলাম যয়েনসুতে। বিশাল বাড়ি, লেকের ধারে, সব দেখে মনে হোল প্যারাডাইসে এসেছি। চারদিকে বরফ আর বরফ। সবাই জানে আমরা আসব। আজ আয়োজন করেছে বাইরে সাওনার অ্যাক্টিভিটিসের ওপর প্রতিযোগিতা এবং শুধু ছেলেদের জন্য। কাঠের তৈরি এই মডার্ন সাওনা-ঘরে জ্বলছে কাঠের আগুন এবং উপরে বিরাট এক পানির ট্যাংক যেখানে পানি টগবগ করে ফুটছে।

ছোট্ট এই সাওনা-ঘরের ভেতরে তৈরি হয়েছে প্রচুর বাষ্প যা দেখতে মেঘের মতো এক পরিবেশ, কাউকে দেখার কোনো উপায় নেই, কারণ বাইরের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড, দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই তাপমাত্রা +৭৫ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড। কি এক অদ্ভুত বিপরীত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি! ৮ জন ছেলে-মেয়ে তার ভেতরে অলরেডি ঢুকে আছে সেই সাওনা-ঘরের ভেতরে।

jagonews24

জীবনে প্রথম ফিনল্যান্ডে আদম সেজে ঢুকে গেলাম আমরাও ভেতরে। সবাইকে জাস্ট হাই বলতেই বেশ একটু নতুন পরিবেশ সৃষ্টি হলো। তাদের ধারণা ছিল ছালা বার্কের বয়ফ্রেন্ড নিশ্চয় সুইডিস হবে এবং সাওনাতে অভ্যস্ত, আমাকে দেখে কিছুটা হতাশ হয়েছে তারা, কারণ প্রতিযোগিতা ভালো হবে না। তাদের ধারণা, বাংলাদেশের ছেলে, পাঁচ মিনিটও এ গরমে টিকবে না!

আমি ভেতরে ঢুকে বেশ চুপচাপ। হাতে সবার কোল্ড ড্রিংক, এবার দেখি পানি বেশ মারছে আগুনের উপর তাতে করে তাপমাত্রা আরও বেশি ধারণ করছে। ছোট ছোট পাতা ভরা গাছের ডাল (দেখতে কিছুটা বাংলাদেশের দেবদার গাছের পাতার মতো হবে) সাওনা-ঘরের মধ্যে, তা দিয়ে একে অপরকে বেশ করে বাড়ি মারছে মাঝে মধ্যে, সাথে আমাকেও। মনে হলো শরীরের তাপমাত্রার ভারসাম্যতা ঠিক রাখতে এমনটি ব্যবস্থা। এতক্ষণ পরে এবার আমিও পানি মারা শুরু করলাম।

এক পর্যায় সবাই না টিকতে পেরে বেরোই গেলো সাওনা থেকে রিল্যাক্স রুমে। ওরা ইচ্ছে করে বেশি পানি মেরেছে আমাকে জব্দ করার জন্য এবং মনে মনে ভাবছে আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারব না এই সাওনা-ঘরে। পরে জানতে পারি বিষয়টি। ওদের ধারণা নেই যে বাংলাদেশে চৈত্র মাসে গরমের সময় আমরা কী ভাবে ম্যানেজ করি! সবাই পরাজিত প্রথম পর্বে।

এবার প্লান করেছে সাওনা-ঘর থেকে বাইরে পুরো আদম সেজে দৌড়ে তুষারের ভেতর হেঁটে গিয়ে লেকের মধ্যে বেশ ছোট্ট করে একটু গর্ত করা রয়েছে সেখানে গিয়ে ডুব মেরে আবার ফিরতে হবে সাওনা-ঘরে। ১৫ মিনিট সময়ের মধ্যে যে বেশিবার পারবে সেই হবে উইনার। পায়ে উলের মোটা মোজা পরা থাকতে হবে নইলে পা গরম এবং ঠান্ডার সমন্বয়ে জমে ফেঁটে যেতে পারে।

বিষয়টি নিয়ে বেশ ভয় এবং চিন্তার মধ্যে পড়ে গেলাম। ভাবলাম ওরা যখন পারছে আমি কেন পারবো না? লেগে গেলাম তাদের সঙ্গে! বিশ্বাস আমারই হয়নি জানতে পেরে যে আমি তাদের সবার থেকে একবার বেশি ডুব দিয়ে সবাইকে হারাতে পেরেছিলাম সেদিন। সেদিনের সাওনার অ্যাক্টিভিটিসে জেতার কারণে ফিনল্যাল্ডে জিরো থেকে হিরো হয়ে ঐ দিনেই সবার ভালো বন্ধু হয়ে গেলাম।

jagonews24

জীবনের এ এক নতুন অভিজ্ঞতা, তা সম্ভব হয়েছিল ফিনিস বান্ধবীর সাথে বন্ধুত্বের কারণে। প্রসঙ্গত বলতে হয় আমি সুইডেনে এসে সুইডিস বাসতু ব্যবহার করেছি এর আগে বিধায় ফিনল্যান্ডের সেদিনের প্রতিযোগিতায় জেতাটি কিছুটা সুবিধার হয়েছিল। আমি নিশ্চিত বাংলাদেশের যারা ফিনল্যান্ডে আছে তাদের এ এক্সপেরিয়েন্স না থাকলেও তারা জানে এর সম্বন্ধে যা শুধু অনুভব করার মতো।

আজ থেকে ৩৬ বছর আগের কথা! ফিনল্যান্ডের সাওনা, সঙ্গে তুষারের ভেতর হেঁটে লেকের মধ্যে ডুব দিয়ে আবার সাওনা-ঘরে ফিরে আসা! কী ভাবে ভুলি এমনটি অভিজ্ঞতা? জানি আমাদের সমাজে এটা বেমানান তবে পৃথিবীতে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা কারো জন্য মানান কারো জন্য বেমানান, আর এই মানান এবং বেমানানের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে মানুষ জাতি। অন্তর যদি হয় সুন্দর তাহলে সব কিছুই অ্যাডজাস্ট করা সম্ভব।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

এমআরএম/এআরএ

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]