আত্মগ্লানি থেকে মুক্তি পেয়েছি আমরা

প্রবাস ডেস্ক
প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:৪৩ পিএম, ১৯ জুন ২০২২
লুনা রাহনুমা

লুনা রাহনুমা, যুক্তরাজ্য

যে কোনো ঘটনাকে নিরপেক্ষভাবে বিচার করতে পারার ক্ষমতা থাকা খুব জরুরি। এতে করে অন্য সবার সঙ্গে ন্যায়বিচার করা হয়, আবার নিজের সাথেও সমঝোতা করে নেওয়ার কাজটি সহজ হয়।

একটি ছোট উদাহরণ দেই। আমার বড় মেয়ে পারিশা, সাঁতার শিখতে যায় সপ্তাহে একদিন। সুইমিং তার ভীষণ পছন্দ। যতক্ষণ পানিতে থাকে, ততক্ষণ ওর কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু ওর ড্ৰাই স্কিনের সমস্যা আছে। তাই সুইমিং শেষে পুল থেকে উঠে যত দ্রুত সম্ভব শরীর শুকিয়ে ক্রিম দিতে হয় ড্ৰাই স্ক্রিনে। তারপর সে পরিষ্কার শুকনো কাপড় পরতে পারে।

সুইমিংপুলে চেঞ্জিংরুম মাত্র দুটি। একসাথে ১০-১২টা বাচ্চা সুইমিং শেষ করে শাওয়ার করা আর শুকনো কাপড় পরতে ব্যস্ত হয়ে যায়। পারিশা সুইমিং পুলে যাওয়ার আগে নিজের কাপড়ের ব্যাগটি একটি চেঞ্জিংরুমের ভেতরে রেখে রুমটাকে তার জন্য বুক করে রেখে যেত, যাতে করে কাপড়ের ব্যাগটি দেখে অন্য কেউ আর সেই রুমটি নিয়ে না নেয়। আর পারিশাও পুল থেকে ওঠে এসে একটা রুম পেয়ে যায় নিশ্চিত।

কয়েকমাস এভাবেই চলছিল। কিন্তু, ‘চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়’, এই গানের মতো পারিশারও দিন বদল হলো। চেঞ্জিংরুমগুলো আসলে আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে ব্যবহার করার নিয়ম। আগে থেকে ব্যাগ বা কাপড় রেখে আটকে রাখার কথা নয়। স্বাভাবিকভাবেই বাবা-মা’দের কেউ কেউ পারিশার এমন করে ব্যাগ রেখে যাওয়ার ব্যাপারটি লক্ষ্য করছিল। কিন্তু তারা কেউ মৌখিকভাবে কিছু বলেনি।

তবে একদিন পুল থেকে চেঞ্জিংরুমে ফিরে পারিশা দেখে ওর ব্যাগের শুকনো কাপড়ে কেউ অনেক শ্যাম্পু ঢেলে রেখেছে। পারিশার ব্যাগের ভেতরে রাখা শ্যাম্পুর বোতল অর্ধেক ঢেলে দিয়ে ওর কাপড়গুলো নষ্ট করে রেখেছে। শ্যাম্পুতে ভিজে থকথকে হয়ে আছে শুকনো কাপড়ের বেশিরভাগটুকু। সেই কাপড় না ধুয়ে আর পরার উপায় নেই একেবারেই।

পরপর কয়েকটি সপ্তাহে ঘটলো একই ঘটনা। শ্যাম্পু মাখা কাপড় পরা যাবে না, ড্ৰাইস্কিনে খারাপ রি-অ্যাক্ট করবে। তাই একটি শুকনো তোয়ালে দিয়ে গা পেঁচিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয় সে। শেষ যেদিন এই ঘটনাটি ঘটলো সেদিন আমি নিয়ে গিয়েছিলাম ওকে সুইমিংয়ে। চেঞ্জিংরুম থেকে বের হয়ে আসলো মুখ কালো করে। গায়ে ভেজা কাপড় আর তোয়ালে জড়ানো। বললৈা, এই কাপড় পরা যাবে না।

আমি বললাম, তাহলে চলো এভাবেই বাসায় চলে যাই। বাড়ি গিয়ে অন্য কাপড় পরে নিয়ো। ঘটনার শুরু থেকেই পারিশা কিছু বলছিল না। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে আমার পেছন পেছন বাইরে এসে গাড়িতে বসলো খুব স্বাভাবিকভাবে। শুধু বললো, বাসায় গিয়ে কাপড় পরতে পারবো। দশ মিনিটে কিছু হবে না।

কয়েক মিনিট গাড়ি চলার পর আমি পারিশাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কাপড়ে শ্যাম্পু ঢেলে দেওয়ার ব্যাপারটি কেমন লাগছে তোমার কাছে? তুমি কি অ্যাংরি ফিল করছো? পারিশা বললো, না। এই থিঙ্ক এই ডিসার্ভ ইট। আমার সঙ্গে তো এমনটাই হওয়ার কথা। আমি ঠিক কাজ করছিলাম না।

আমিও আর কিছু বললাম না। সুইমিং সেন্টার থেকে আমাদের বাড়ি কাছাকাছি হওয়ায় তেমন বিশেষ অসুবিধা হয়নি সেদিন আমাদের। এরপর থেকে পারিশা আর কখনো চেঞ্জিংরুমে ব্যাগ রেখে পুলে নামে না। অন্যান্য বাচ্চাদের সঙ্গে একসঙ্গে পুল থেকে উঠে আসে, চেঞ্জিংরুম খালি হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে। এতে করে আমাদের বাসায় ফিরতে একটু দেরি হয় মাঝে মাঝে কিন্তু তেমন কোনো বিরূপ ঘটনায় পড়তে হয়নি আর।

আমাদের চারপাশে এমন অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে আমাদের সঙ্গে অনেক সময়। যার ফলাফল আমাদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মেলে না। আমরা কষ্ট পাই। কষ্ট পাওয়ার চেয়েও বেশি ক্রূদ্ধ হই। প্রচণ্ড রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে আক্রমণ করি অন্যদের। এই প্রচণ্ড রাগ এবং আক্রোশ আমাদের নিজেদের ব্যক্তিত্বের জন্য যেমন খারাপ, শরীরের জন্যও তেমন খারাপ।

রাগ হলে আমাদের শরীরে হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন হয়ে যায়, আমাদের শরীর ঘামতে শুরু করে। ফলে পরিপাক ক্রিয়া ধীরগতিতে চলতে শুরু করে। একই সঙ্গে মস্তিষ্কও ভিন্ন আচরণ করা শুরু করে। অতিরিক্ত রাগ হলে আমাদের হার্ট অ্যাটাক ও সেরিব্রাল অ্যাটাকের সম্ভাবনা দেখা যায়, শরীরে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, মনে বিষণ্নতা বাড়ে, আমাদের আয়ু কমে যায়।

তাই এতসব ক্ষতিকর দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হলে আমাদের নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখতে হবে। অপ্রীতিকর ঘটনাকে সহজভাবে নিতে জানতে হবে। তবে সব ঘটনাতেই যে আমাদের নিজেদের দোষ থাকে, এমনটা নয়। সম্পূর্ণ বিনা কারণেও আমরা লাঞ্চিত হতে পারি, অপমানিত, কিংবা প্রতারিত হতে পারি।

সেইসব অবাঞ্চিত ঘটনায় যেহেতু আমাদের হাত থাকে না, তাই সেই ক্ষতিটুকু সহজভাবে নিজের কাছে স্বীকার করে নিতে পারলে নিজের জন্যই মঙ্গল হয়। দুর্ঘটনায় যেটুকু ক্ষতি হওয়ার তা হয়তো হয়েই গেছে, সে নিয়ে খুব বেশি আক্ষেপ এবং হতাশা আমাদের আরো বেশি ক্ষতির দিকে ঠেলে দেবে।

তাই নিজেকে যদি সান্তনা দেওয়া হয় আর মনে রাখা যায় যে বাহ্যিক এসব ক্ষতির চেয়ে আমাদের শারীরিক সুস্থতা বেশি মূল্যবান, তাহলে হয়ত আমরা ক্ষতি, লস, লজ্জা, লোকসানের ব্যাপারগুলোকে সহজভাবে নিতে পারবো। আর নিজের মনকে শান্ত রেখে শরীরকে সুস্থ রাখতে পারবো।

কণ্টকময় পৃথিবীতে কিছু কাঁটার আঘাত আমাদের রক্তাক্ত করার জন্য ওঁৎ পেতে আছে, মেনে নিতে পারলে ব্যাপারটি খানিকটা সহজ হয়। তবে কিছু মানুষ কিছুতেই নিজের দোষ দেখতে পায় না, এদের বোঝানো খুব কঠিন। যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজের ভুলটুকু বুঝতে পারার ক্ষমতা, একটি বড় গুণ মানুষের জন্য।

এই গুনটি অপরপক্ষের জন্য যেমন সহায়ক, ঠিক তেমনি আমাদের নিজেদের মানসিক শান্তির জন্যও পরম সহায়ক। তাই শরীর ও মনের শান্তির জন্য কিছু অপচয় আর কিছু দুর্ভাগ্যময় ক্ষতি হাসি মুখে সয়ে যাওয়াতেই বিচক্ষণতার পরিচয়।

লেখক: লুনা রাহনুমা, যুক্তরাজ্য

এমআরএম/জিকেএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]