সক্ষমতার প্রতীক পদ্মা সেতু

প্রবাস ডেস্ক
প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:৪৯ পিএম, ২৫ জুন ২০২২
লেখকের সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মনিরুল ইসলাম ও মিশরে জাগো নিউজের প্রতিনিধি আফছার হোসাইন

ঈসা আহমাদ ইসহাক, মিশর

পদ্মা সেতু। অবশেষে উদ্বোধন হয়েই গেলো। আজ বাংলার আকাশে উদিত হয়েছে স্বপ্নের সূর্য! পদ্মার বুক চিরে সেই সূর্যালোকে উদ্ভাসিত হয়েছে একটি সেতু। উত্তর থেকে দক্ষিণ, মিলন হবে আপামর জনতার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আশা ও ভরসার। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ নির্মাণ আশ্চর্য্য, সক্ষমতার প্রতীক পদ্মা বহুমুখী সেতু।

দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পেতে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এ এক যুগান্তকারী মাইলফলক। স্বাভাবিকভাবেই সারা বাংলাদেশের মানুষ স্বপ্নের পদ্মা সেতু নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন। সেই সঙ্গে পিছিয়ে নেই সারাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রেমিট্যান্সযোদ্ধা খ্যাত প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তারাও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে পদ্মা সেতু নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন সমানতালে।

২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সেতুর নির্মান কাজে ৩৭ এবং ৩৮ নম্বর পিলারে প্রথম স্প্যান বসানোর মাধ্যমে পদ্মা সেতুর অংশ দৃশ্যমান হয়। পরে একের পর এক ৪২টি পিলারের ওপর বসানো হয় ৪১টি স্প্যান। ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর শেষ ৪১তম স্প্যান স্থাপনের মাধ্যমে বহুমুখী ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার পদ্মা সেতুর সম্পূর্ণ কাঠামো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

মিশর প্রবাসী আফসার হোসাইন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, পদ্মা সেতু আমাদের দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের একটা স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়েছে খুব ভালো লাগছে। আগে ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলে যেতে ফেরি, লঞ্চে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। সেতু হওয়াতে সেটা থেকে মুক্তি পাবে ১৯ জেলার মানুষ।

পদ্মা সেতু নির্মাণে আরেক মিশর প্রবাসী আলমগীর হোসেন বলেন, আমাদের ঢাকা থেকে ফেরিযোগে বাড়ি যেতে এক থেকে দুই দিন লেগে যেতো। এখন পদ্মা সেতু হওয়াতে সেটা লাঘব হয়েছে। আমরা খুলনা, বাঘেরহাট, ফরিদপুরসহ অন্যান্য জেলার মানুষ সহজে যাতায়াত করতে পারবো।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান তার কলামে লেখেন, আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামের এক উজ্জ্বল মাইলফলক। বিপুল আগ্রহ নিয়ে বাংলাদেশের সংগ্রামী মানুষ দুই চোখ ভরে আমাদের আত্মশক্তির এ প্রতীকটি দেখছে।

এ সেতু জাতির আবেগকে কতটা নাড়া দিয়েছে, এর প্রমাণ মেলে যখন মো. জসিম উদ্দিন হাসপাতাল থেকে তার মুমূর্ষু সন্তানকে ষোলো হাজার টাকায় বিশেষ অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে তার অন্তিম ইচ্ছাপূরণের জন্য স্বপ্নের পদ্মা সেতু দেখাতে মাওয়ায় নিয়ে যান। একইভাবে এতদিন বিচ্ছিন্ন থাকা দক্ষিণ বাংলার মানুষের অন্তরে বইছে অন্যরকম এক আনন্দের ঢেউ।

jagonews24মিশরে বাংলাদেশ ভবনে লেখক ও মিশর প্রবাসী আফছার হোসাইন

আবেগ ও উচ্ছ্বাস বাদেও পদ্মা সেতুর প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর যেসব প্রভাব পড়বে তার সারসংক্ষেপ হলো- দক্ষিণ বাংলায় বাংলাদেশের সাতাশ শতাংশ মানুষের বাস। বিচ্ছিন্ন থাকা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ অঞ্চলের দারিদ্র্যের হার সারা দেশের গড় হার থেকে পাঁচ শতাংশ বেশি।

সেতুর কারণে যোগাযোগ ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হলে এ অঞ্চলের দারিদ্র্যের হার ফি বছর ১.০১ শতাংশ হারে কমবে। এর প্রভাবে সারা দেশের দারিদ্র্য কমবে ০.৮৪ শতাংশ হারে। বিসিক বলছে, আগামী পাঁচ বছরে শুধু বরিশাল বিভাগেই পাঁচশ থেকে এক হাজার নতুন শিল্পকারখানা স্থাপিত হবে।

২০০৮ সালে ক্ষমতার গ্রহণের পরপরই আওয়ামী লীগ পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পদ্মা সেতুর জন্য ডিজাইন কনসালট্যান্ট নিয়োগ হয়। কনসালট্যান্ট ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সম্পন্ন করেন এবং সেতু বিভাগ প্রিকোয়ালিফিকেশন দরপত্র আহ্বান করা হয়।

২০১১ সালে সরকার বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণ চুক্তিবদ্ধ হয়। এর পরের বছর ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি বাতিল করে। ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে অন্যান্য দাতা সংস্থাগুলোও ঋণের সিদ্ধান্ত বাতিল করে। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের ভিত্তিতে তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।

যোগাযোগ সচিব মোশাররফ হোসেন ভূইয়াকে জেলে পাঠানো হয়। পরে দুর্নীতির অভিযোগটি মিথ্যা প্রমাণিত হয় এবং কানাডার আদালত দুর্নীতির অভিযোগের মামলাটি বাতিল করেন। এরপর প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নেয়।

সব ষড়যন্ত্র ভেঙে দিয়ে আজ (শনিবার) সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর শুধু প্রধানমন্ত্রী ও অতিথিদের গাড়ি সেতু পাড়ি দেয়। আগামীকাল রোববার ভোর থেকে টোল দিয়ে সাধারণ যানবাহন চলাচল শুরু করবে সেতু দিয়ে।

এমআরএম/জিকেএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]