চন্দ্রা কি কোনোদিন দেখা পাবে না সেই ছেলেটির

শায়লা জাবীন
শায়লা জাবীন শায়লা জাবীন
প্রকাশিত: ০৪:৩৭ পিএম, ১০ আগস্ট ২০২২
ছবি: সংগৃহীত

চন্দ্রা চুপচাপ বসে আছে হুড ফেলা রিকশায়, ক্রিসেন্ট লেকের মাঝামাঝি, একটা জায়গায় কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে। আর খুবই মনোযোগ দিয়ে রিকশাগুলোর আসা যাওয়া দেখছে। পথচারীদের দেখছে, ঠিক রিকশা না। আসলে রিকশার যাত্রীদের দেখছে। যদি আবারো একবার দেখা পায়!

একটু দূরে নিচে বসে থাকা রিকশাওয়ালা চাচা বসে আছে। মাঝে মাঝে বলছে, আপা আর কতক্ষণ বইসা থাকবেন? কেউ কি আইবো! চন্দ্রা খুবই বিরক্ত হলেও ঠান্ডা গলায় বললো, চাচা, ঘণ্টা প্রতি যা বলেছেন তাই তো দেবো। আপনার সমস্যা কোথায়? আমি আরও এক ঘণ্টা থাকবো। আপনাকে টাকা অ্যাডভান্স দেবো? বাদাম খাবেন? চা বা ঝালমুড়ি? কিনে খান, টাকা দিচ্ছি। ভাড়ার টাকা ছাড়াই দিচ্ছি।

তাও থাকেন প্লিজ, আর বেশি দূরে যাবেন না, বেশি কথাও বলবেন না। এদিকটাতেই থাকেন। রিকশাওয়ালা বিরস মুখে টাকা নিয়ে চা কিনতে গেলো। চন্দ্রা বসে রইলো কৃষ্ণচূড়ার গাছের দিকে তাকিয়ে। আগুন রঙা কৃষ্ণচূড়ার পাঁপড়ি উড়ে এসে তার হাতে পড়লো।

মনের ভেতরটাও পুড়িয়ে আগুন করে দিলো যেন। আচ্ছা এমন কখনো হয়? যে কেউ শুনলে তো চন্দ্রাকে পাগল ভাববে। চন্দ্রা কাউকে বলতেও পারছে না।

প্রতি মাসের ২৯ তারিখ চন্দ্রা জায়গাটিতে এসে ২ ঘণ্টা বসে থাকে। বাসা থেকে শপিংয়ের জন্য বের হয়। এরপর আসাদ গেটের আড়ংয়ে এসে ড্রাইভারকে বিদায় দেয়। এরপরে বয়স্ক দেখে একটা রিকশাওয়ালাকে ২ ঘণ্টার চুক্তি করে ক্রিসেন্ট লেকের মাঝামাঝি কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে এসে বসে থাকে।

কেন? ঠিক ১৫ বছর আগের কথা। ২৯ শে মার্চ, চন্দ্রারা কয়েকজন বান্ধবী মিলে লাল শাড়ি পরে ক্রিসেন্ট লেকে এসেছিলো কৃষ্ণচূড়া ফুলের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে। চন্দ্রাও এসেছিলো কিন্তু একটু দেরিতে।

যে রিকশায় করে এসেছিল, সেই রিকশার বারবার চেন পড়ে যাচ্ছিল, চন্দ্রা খুবই বিরক্ত হয়ে রিকশাওয়ালা মামাকে বললো, কি রিকশা নিয়ে বের হয়েছেন খালি চেন পড়ে? দুইবার হলো দশ মিনিটের মধ্যে।

চাঁদের মতো গায়ের রং চন্দ্রার, তাই বুঝি নামও চন্দ্রা। পরেছিল আগুন রঙা শাড়ি, ঠিক যেন স্বয়ং কৃষ্ণচূড়া। মায়ের শাড়ির আলমারিতে কোনো লাল শাড়ি খুঁজে পায়নি চন্দ্রা, তাই খালার কেনা আগুন রঙা নতুন শাড়িটাই বেছে নিয়েছিল সে।

আয়নায় নিজেকে দেখে চমকে গেলো ২১ বছরের ভয়ঙ্কর রূপবতী কেউ। কাজল আর ছোট্ট কালো টিপ দিয়ে ঠিক সময়েই বের হয়েছিল চন্দ্রা দুই ঘণ্টার জন্য মা’কে বলে।

শেষ পর্যন্ত আবারও যখন তৃতীয়বারের মতো ক্রিসেন্ট লেকে এসে রিকশার চেন পড়লো তখন চন্দ্রার মেজাজ খুবই খারাপ হলো। সে প্রায় এসেই পড়েছিল। আর একটু পরেই নামতে পারতো। আবারও চেন পড়লো! রিকশাওয়ালা মামা চেন ঠিক করছে, চন্দ্রা বিরক্ত মুখে বারবার ঘড়ি দেখছে।

এমন সময় দুইটা ছেলে পাশ দিয়ে শিস দিতে দিতে যাচ্ছিল, যাওয়ার সময় চন্দ্রাকে দেখেই থেমে গেলো। চন্দ্রার সেদিকে চোখ পড়তেই শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেলো। এত বিশ্রী চাহনি ছেলে দুটোর, যেন চোখ দিয়েই গিলে ফেলবে। চন্দ্রা রিকশাওয়ালা মামাকে বললো, তাড়াতাড়ি মামা, তাড়াতাড়ি।

ছেলে দুটো এগিয়ে আসছে চন্দ্রার দিকে, বলছে এই আগুন এখানে একা, মামা আর কি করবে। আমরা আছি তো। চন্দ্রা খুবই ভয় পেলো কিন্তু বাইরে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। আড়চোখে চারপাশ দেখছে, ছেলে দুটো এগোচ্ছে তার দিকে।

রিকশাওয়ালা মামা বলে উঠলো, এদিকে আসেন কেন? ভদ্রলোকের মাইয়া, অন্যদিকে যান। ছেলে দুটো জোরে জোরে হাসছে। বলছে আমরা কি খারাপ নাকি? আমরাও ভদ্রলোক! মুহূর্তেই সব কিছু ঘটে যাচ্ছে।

চন্দ্রা কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। পুরো শরীর ঘেমে ভিজে গেছে। ভয়ে কাঁপছে। মনে মনে আয়াতুল কুরসী পড়ছে। হঠাৎ করে চোখ পড়লো ক্রিসেন্ট লেকের ফুটপাত দিয়ে একটা শ্যামলা, লম্বা, শুকনা ছেলে একটু অন্যমনস্ক হয়ে হেঁটে আসছে। চন্দ্রার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ছেলেটা থেমে গেলো।

চন্দ্রার কি যেন হলো, মনে হলো অনেক দিনের চেনা কেউ, চন্দ্রা আগে পিছে কোনো কিছু চিন্তা না করেই রিকশা থেকে নেমেই দৌড় দিয়ে গিয়ে ছেলেটার হাত ধরে ফেললো। বলে উঠলো, তুমি এত দেরি করে আসলে কেন? আমি সেই কখন থেকে বসে আছি।

সময়ের কোনো কান্ডজ্ঞান হবে না কোনোদিন? দুটো বখাটে ছেলে কতক্ষণ ধরে জালাচ্ছে আমাকে। এত অদ্ভুত তুমি! আমার কথা একবারও মনে থাকে না? একটানা কথাগুলো বলে চন্দ্রা হাঁপাচ্ছে। ছেলেটা খুবই শান্ত চাহনিতে চন্দ্রার দিকে তাকিয়ে আছে, চন্দ্রা শক্ত করে ছেলেটার হাত ধরে আছে।

রিকশাওয়ালা মামা বলে উঠলো ঠিক সময়ে আসছেন মামা। পোলা দুইটা আপা মনিকে জ্বালাইতেছিল, আমি মানা করছি, আমার কথা শোনে না। চেন ঠিক হয়েছে, উঠেন আপনারা। তবে এরপর আপা মনির আগে আইসেন।

বখাটে ছেলে দুটো যেখানে দাঁড়িয়েছিলো, সেখানেই আছে। চন্দ্রা ছেলেটাকে হাত ধরা অবস্থায় টেনে নিয়ে রিকশায় উঠে বসলো, ছেলেটা এখনো চুপ। রিকশা এগোচ্ছে।

একদম অচেনা-অজানা একটা ছেলের সঙ্গে রিকশায় বসতে চন্দ্রার একটুও খারাপ লাগছে না। মনে হচ্ছে কত যুগের চেনা, শক্ত করে ধরে থাকা হাতটা ছেড়ে দিলো এবার। সুনসান নীরবতা, শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ। একটু পর নীরবতা ভঙ্গ করে চন্দ্রাই বললো উঠলো আপনি না থাকলে আজ যে কি হতো।

আমি বান্ধবীদের সঙ্গে শাড়ি পরে ছবি তুলবো বলে বাসা থেকে বেরিয়েছি। রাস্তায় রিকশার চেন পড়ে যাওয়ায় থামতে হয়। হঠাৎ দুটো বখাটে ছেলে এসে জ্বালাচ্ছিলো, তাই কোনো উপায় না দেখে দৌড়িয়ে আপনার হাত ধরে ফেলেছিলাম। কিছু মনে করেননি তো?

ছেলেটি এই প্রথম বলে উঠলো, আমি বুঝতে পেরেছি কিন্তু আপনি কিভাবে বুঝলেন যে আমি বখাটে না? চন্দ্রা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললো মেয়েরা ছেলেদের চোখ দেখলেই বুঝতে পারে কে কেমন!

ছেলেটি বলে উঠলো আপনার বাসায় আয়না নেই? চন্দ্রা অবাক হয়ে বললো, কেন? আছে তো! এরপরে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় কাউকে সঙ্গে নিয়ে বের হবেন, আজকে বোধহয় আয়নায় নিজেকে দেখে বের হননি।

চন্দ্রা চুপ হয়ে গেলো, কোনো কথা খুঁজে পেলো না। কানে আসলো বান্ধবীদের গলা, সে তার বান্ধবীদের দেখতে পাচ্ছে, চন্দ্রা রিকশাওয়ালাকে থামতে বললো। বুঝে উঠতে পারছে না বান্ধবীদের কি বলবে! ভাড়া দিয়ে রিকশাওয়ালা মামাকে বললো, উনি কোথায় যাবেন নামিয়ে দিয়েন মামা।

রিকশাওয়ালা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে চন্দ্রার দিকে। চন্দ্রার বান্ধবীরা হৈচৈ করতে করতে এগিয়ে এলো। কেউ বলছে এত দেরি কেন? কেউ বলছে ওই ছেলেটাকে? কেউ বলছে কিরে তু্ই তো নিজেই কৃষ্ণচূড়া হয়ে এসেছিস! কেউ বলছে আগে বলিসনি তো তোর কেউ আছে? প্রশ্নের ভিড়ে হারিয়ে গেলো চন্দ্রা।

শুধু জানলো পারলো না তখন যে সে নিজেও কিছু হারিয়ে ফেললো জীবন থেকে! পরে বান্ধবীরা সব শুনে খুবই অবাক হয়েছে, সুমি তো বলেই বসলো তু্ই এত নিরামিষ কেন রে? ছেলেটাকে একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত দিলি না? ঠিকানা নিসনি, নামটাও জানিস না, এত সুন্দর একটা গল্পের শুরুতেই শেষ!

তোকে দেখেই তো ছেলেটার প্রেমে পড়ে যাওয়ার কথা! চন্দ্রার যে আফসোসের শেষ নাই, আসলেই সে ছেলেটার নাম, কোথায় থাকে বা কি পড়ে কিছুই জানে না। এমন কি নিজের নাম ঠিকানাও দেয়নি, সারাক্ষণ মনের ভেতরের খোঁচা দেয়, দলা পাকানো গুমোট কান্নাকে টেনে আনে।

এরপর কত রাত যে চন্দ্রা কেঁদেছে। কতবার যে ঠিক সেই এক জায়গাতেই এসেছে। জানতেও পারবে না কেউ তা। এরপরে একে একে কেটে গেছে ১৫টি বছর! ওই ঘটনার দুই বছর পর চন্দ্রার বিয়ে হয়ে যায় বেশ ধুমধাম করে। বিয়েতে না বলার কোনো কারণ নেই, কে বিশ্বাস করবে? নাম না জানা, অজানা অচেনা এক ছেলের প্রেমে পড়ে গেছে সে!

যে সারাক্ষণ মাথার ভেতরে থাকে। চন্দ্রার বর বেশ ভালো, সুদর্শন, ব্যবসায়ী। নামকরা শিল্পপতির ছেলে। চন্দ্রার জন্য তার ভালোলাগা আছে কিন্তু প্রেম নেই। ভয়াবহ ব্যস্ত সে, দম ফেলার সময় নেই, চন্দ্রার শ্বশুরের মৃত্যুর পর বড় ছেলে হিসেবে তাকেই ব্যবসার সব কিছু তদারকি করতে হয়।

কিন্তু জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকীর উপহার সময়মতো পায়, বছরে দু’বার বেড়াতেও নিয়ে যায় দূরে কোথাও, না দেখা কোনো শহর বা দেশে। সবচেয়ে বড় কথা চন্দ্রাকে ঘাটায় না সে, তাকে তার মতো থাকতে দেয়, ভাগ্গিস দেয়। চন্দ্রার একটা ১০ বছরের ছেলেও আছে, সবকিছুই নিয়ম মাফিক চলে, সবকিছুই আছে চন্দ্রার কিন্তু কিছু একটা নেই, একদমই নেই।

মনের ভেতরের দীর্ঘশ্বাস দিনদিন ভারি হয়ে আসে। সেই ২৯ শে মার্চ এরপর থেকে চন্দ্রা প্রতি মাসের ২৯ তারিখ ক্রিসেন্ট লেকে এসে বসে থাকে ঠিক বিকেল ৪টা থেকে ৬টা। যদি সে মনে করে একদিন আসে।

আচ্ছা তার কি মনে পড়ে চন্দ্রার কথা? নাকি স্বার্থপর মেয়ে ভেবে চন্দ্রাকে ভুলে গেছে! চন্দ্রা বসে বসে ভাবে এমন হলো কেন তার জীবন? এক মুহূর্তের জন্য সে ভুলতে পারে না সেই চেহারা। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে।

সে কি আর কোনোদিন দেখা পাবে না? লম্বা, শ্যামলা, শুকনা নাম না জানা ছেলেটা কে? প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস এলেই কষ্টে চন্দ্রার বুক ফেটে যায়, সব ফেব্রুয়ারি মাসে ২৯ তারিখ নেই যে, অপেক্ষার পালা আরো দীর্ঘতর হয়!

এমআরএম/এএসএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]