মাতৃভাষা বাংলা ও ভাষার গান

ধর্ম ডেস্ক
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৪৫ এএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | আপডেট: ১১:০২ এএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

আমরা সে ভাষাতেই কথা বলব; যে ভাষায় কথা বললে সবাই হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবে। সহজে একে অপরকে আপন করে নিতে হবে। যার সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল যুগে যুগে নবি-রাসুলগণের বেলায়।

আল্লাহ তআলা যুগে যুগে প্রত্যেক জাতির কাছে তাদের নিজ ভাষায় নবি-রাসুল ও আসমানি গ্রন্থ নাজিল করেছেন। যাতে তারা হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করতে পারে। আর আল্লাহর মিশন বাস্তবায়নে নবি-রাসুলদের জন্য সহজ হয়। এ প্রসঙ্গে কুরআনে কারিমে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন-

‘আর আমি প্রত্যেক পয়গম্বরকেই (নবি-রাসুলগণকে) স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, যাতে করে তাদেরকে সুস্পষ্টভাবেু বুঝাতে পারে। (সুরা ইবরাহিম : আয়াত ৪)

শুধু স্বগোত্রীয় ভাষায় নবি-রাসুল পাঠিয়েই আল্লাহ তাআলা ক্ষ্যন্ত হননি, তিনি একই ভাষায় বিভিন্ন আঞ্চলিকতার প্রতিও গুরুত্বারোপ করেছেন। সে কারণেই আরবি ভাষাকে ৭টি পঠন রীতিতে নির্ধারণ করেছেন।

মানুষ যেন যার যার আঞ্চলিকতায় সহজেই ভাষার উচ্চারণ করতে পারে। রাসুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যেমনিভাবে কুরআনকে আরবি ভাষায় নাজিল করেছেন। তেমনি কুরআনের পঠন রীতির বিভিন্নতা রেখেছেন। এ পঠন রীতিকে সাত ক্বিরাত বলা হয়।
সহজে মনের ভাব প্রকাশে ভৌগলিক আঞ্চলিকতার ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলার কৌশল সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দেন-

‘আর মহান আল্লাহর নিদর্শসমূহের হতে (একটি নিদর্শন হলো) আসমান ও জমিন সৃষ্টি এবং মানুষের ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতা। এর মধ্যে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য উপদেশ রয়েছে।’ (সুরা রূম : আয়াত ২২)

আজ একুশে ফেব্রুয়ারি, ভাষার মাস। মায়ের ভাষায় কথা বলার মাস। মায়ের ভাষায় কথার ফুল ফোটাতেই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানির হানাদার বাহিনীর জুলম-নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়েছিল অনেককেই।

মায়ের ভাষার মর্যাদায় রক্ষায় অস্ত্রের মুখে জীবন দিতে হয়েছিল দেশ মাতৃকার সূর্য সন্তান সালাম, জাব্বার, রফিক ও বরকত, সালাহউদ্দিনদের মতো একদল দেশপ্রেমিক বীর মুজাহিদদের। যাদের রক্তের বিনিময়ে আজ আমাদের মুখ থেকে শর্তহীনভাবে বাংলা ভাষার খই ফোটে।

বিশ্বব্যাপী এ রক্তের বিনিময় ইতিহাসের পাতায় নাম লেখিয়েছে বাংলা ভাষা ও ভাষা সৈনিকরা। আজ ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।’ যার এ ভাষার সন্তানদের হত্যা করেছিল তারাও আজ পালন করছে এ ভাষা দিবস।

নিজের ঘর থেকে স্কুল-কলেজে, অফিস-আদালত, কোট-কাচারিতে চলছে বাংলা ভাষা। সুমধুর কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয় ইসলাম ও মুসলিম তাহজিব তমদ্দুনের দাওয়াত, ইসলাম ও কুরআন-সুন্নাহর নসিহত। এ সবই মহান আল্লাহর নেয়ামত।

মায়ের ভাষা বাংলা শুধু এ দেশেই নয় বিশ্বের অন্য দেশেও রাষ্ট্রীয় দাফতরিক ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলা ভাষা। ডাক ওঠেছে, দাবি ওঠেছে বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের সপ্তম দাফতরিক ভাষার স্বীকৃতি প্রদানের।

পরিশেষে...
মায়ের ভাষা বাংলা ভাষা মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার ও দান। সুতরাং সালাম, জাব্বার, রফিক, বরকত, সালাহউদ্দিনসহ সব ভাষা সৈনিকদের আত্ম-ত্যাগ আল্লাহ তাআলা সর্বোচ্চ মর্যাদায় কবুল করুন।

ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা যেমন প্রতিটি মানুষের ঈমানি দাবি। তেমনি ভাষার জন্য যাদের অবদান রয়েছে সে সব ভাষা শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনা করাও ঈমানের দাবি। আল্লাহ তাআলা সকল ভাষা শহীদদের সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন।

মনে রাখতে হবে ভাষা ও দেশ এক সুতোয় গাঁথা। আল্লাহ তাআলা ভাষাকে দেশের সঙ্গে এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবেই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তাই আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা ‘বাংলা ভাষা’র প্রতি যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান করা জরুরি। কবির ভাষায় বলতে চাই-

‘পাখির ভাষায় গাইছে পাখি
ভোর বিহনের গান
আমার ভাষায় তেমনি আমি
তুলব সুরের তান
আমার গানে আমার সুরে
জাগবে সাড়া ভুবন জুড়ে
জানবে সবে বাংলা ভাষার
নিবিড় উপাখ্যান-
বাংলা ভাষায় গাইব আমি
বাংলাদেশের গান।’

আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জাতি গোষ্ঠীকে তাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার তাওফিক দান করুন। ভৌগলিক অঞ্চলভেদে প্রত্যেকের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর তাওফিক দান করুন। বাংলা ভাষা-ভাষি মানুষকে আত্ম-ত্যাগের এ ভাষাকে দুনিয়ার জীবনের সর্বক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ব্যবহার ও সম্মানের মাধ্যমে মর্যাদা ও সম্মান দেয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএমএস/পিআর