মানুষের ঘুমান্ত বিবেককে জাগ্রত করার বর্ণনা পড়া হবে আজ

ধর্ম ডেস্ক
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:৫৪ পিএম, ১১ জুন ২০১৮

আজ রমজানের ২৬তম তারাবিহ। আজকের তারাবিতে সুরা মুলক, সুরা আল-ক্বালাম, সুরা আল-হাক্কাহ, সুরা আল-মাআ’রিজ, সুরা নূহ, সুরা জিন, সুরা আল-মুযযাম্মিল, সুরা আল-মুদ্দাছছির, সুরা আল-ক্বিয়ামাহ, সুরা আল-ইনসান ও সুরা আল-মুরসালাতসহ মোট ১১টি সুরা পড়া হবে। সে সঙ্গে ২৯তম পাড়ার তেলাওয়াত শেষ হবে আজ।

আজকের তারাবিহতে পঠিত সুরাগুলোর ফজিলত ও আলোচ্য বিষয়গুলো নামাজ আদায়কারীদের জন্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-

সুরা মুলক : আয়াত ৩০
সুরা মুলক মক্কায় নাজিল হয়েছে। সুরাটিকে তাবারাকা, মুনজিয়াহ ও মানেয়া নামও দেয়া হয়েছে। এ সুরার ফজিলত বর্ণনায় হাদিসে এসেছে-

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহ আনহু বলেন, নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কুরআন মাজিদে একটি সুরা আছে, যা ৩০ আয়াত বিশিষ্ট; যে তা তেলাওয়াত করবে কেয়ামতের দিন এ সুরা তার জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করে জাহান্নাম থেকে বের করাবে এবং বেহেশতে প্রবেশ করাবে। আর সে সুরাটি হলো- تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ

এ সুরায় ইসলামি শিক্ষার মূল বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। আবার যে সব লোক বেপরোয়া এবং অমনোযোগী ছিল তাদেরকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে সজাগ করে দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে এ সুরায় মানুষের ঘুমন্ত বিবেক ও অনুভূতিকে জাগ্রত করার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

সুরা আল-ক্বালাম : আয়াত ৫২
মক্কায় নাজিল হওয়া সুরা আল-ক্বালাম ২ রুকু এবং ৫২ আয়াতে বিভক্ত। মক্কায় যখন প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরোধীতা প্রবল আকার ধারণ করে তখন এ সুরাটি নাজিল হয়। এ সুরা তিন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।

>> ইসলাম বিদ্বেষীদের আপত্তি ও সমালোচনার জবাব দেয়া হয়েছে এ সুরার মাধ্যমে।
>> তাদেরকে তাদের কাজের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে এবং উপদেশ প্রদান করা হয়েছে।
>> ইসলাম বিদ্বেষীদের যাবতীয় নির্যাতন হয়রানি প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ধৈর্যধারণ ও অবিচল থাকার উপদেশ দেয়া হয়েছে।

সুরা আল-হাক্কাহ : আয়াত ৫২
সুরা হাক্কাহ মক্কায় নাজিল হয়েছে। এ সুরায় রয়েছে ২ রুকু এবং ৫২ আয়াত। এ সুরার প্রথম রুকুতে পরকালের বর্ণনা করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় রুকতে কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হওয়া এবং হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে, আল্লাহ রাসুল; এ কথার সত্যতা বর্ণনা করা হয়েছে।

সুরা আল-মাআ’রিজ : আয়াত ৪৪
সুরা মাআ’রিজ মক্কায় নাজিল হয়েছে। এ সুরাটি ৪৪ আয়াত এবং ২ রুকুতে বিভক্ত। এ সুরায় কাফেরদের ওই সব কথা ওঠে এসেছে; যা ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য অশোভণীয়।

এ সুরায় মক্কার অবিশ্বাসীরা প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিয়ামত, আখেরাত, দোযখ ও বেহেশত সম্পর্কিত বক্তব্য নিয়ে যখন বিদ্রুপ ও উপহাস করতো।

প্রিয়নবিকে এ মর্মে চ্যালেঞ্জ করতো যে, তুমি যদি সত্যবাদী হয়ে থাকো আর তোমাকে অস্বীকার করার কারণে আমরা যদি জাহান্নামের শাস্তি লাভের উপযুক্ত হয়ে থাকি; তাহলে তুমি আমাদেরকে যে জাহান্নামের ভয় দেখাও তা আমাদের সামনে নিয়ে এসো।

এ সুরায় ওই সব বিদ্রেুাপকারী কাফেরদেরকে সতর্ক করা হয়েছে। সত্যের উপদেশবানী শোনানো হয়েছে। মূলত অবিশ্বাসীদের চ্যালেঞ্জের জবাবেই পুরো সুরাটি নাজিল করা হয়েছে।

সুরা নূহ : আয়াত ২৮
সুরা নূহ-এর আয়াত সংখ্যা ২৮ ও ২ রুকুতে বিভক্ত। সুরাটি মক্কায় নাজিল করা হয়। এ সুরায় নবুয়তের সত্যতা প্রমাণে হজরত নূহ আলাইহিস সালামের বিস্তারিত ঘটনা প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নাজিল করা হয়েছে।

প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে মানুষদেরকে জানানো হয়েছে যে, তোমরা হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যে আচরণ করছো; হজরত নূহ-এর ওপর তার কাওমও সে রকম আচরণ করতো।

তোমরা যদি প্রিয়নবির সঙ্গে তোমাদের আচরণ ভালো না কর; তবে তোমাদের ওপরও নূহ আলাইহিস সালামের কাওমের শাস্তির পতিত হবে।

এ সুরায় মানুষের নিকট আল্লাহ তাআলার দাওয়াত পৌছানোর পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে।

সুরা জিন : আয়াত ২৮
সুরা জিন মক্কায় অবতীর্ণ। ২রুকু ও ২৮ আয়াতে সুবিন্যস্ত। এ সুরা নাজিলের একটি চমৎকার ঘটনা রয়েছে। আর তা হলো-

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কয়েকজন সাহাবিকে নিয়ে উকায বাজারে যাচ্ছিলেন। পথে নাখলা নামক স্থানে তিনি ফজরের নামাজে ইমামতি করেন।

সে সময় একদল জিন ওই স্থান অতিক্রম করছিল। তারা প্রিয়নবির কুরআন তেলাওয়াতের শব্দ শুনে সেখানে থেমে যায় এবং গভীর মনোযোগসহ কুরআন শুনতে থাকে। এ সুরাতে এ ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে।

সুরা আল-মুযযাম্মিল : আয়াত ২০
মক্কায় নাজিল হওয়া সুরা মুযযাম্মিল ২ রুকু এবং ২০ আয়াতে সুবিন্যস্ত। এ সুরার রুকু ২টি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নাজিল হয়।

এ সুরার মাধ্যমে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রাতের বেলায় ওঠে আল্লাহ তাআলার ইবাদত বন্দেগি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যাতে তাঁর মধ্যে নবুয়তের মতো গুরু দায়িত্ব গ্রহণের শক্তি ও সামর্থ্য তৈরি হয়।

তাছাড়া এ সুরার মাধ্যমে অর্ধেক রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ের বিষয় এবং বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করার নির্দেশ প্রদান করেছেন আল্লাহ তাআলা।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ধৈর্য, সহমর্মিতা প্রদান এবং উপদেশ দেয়া হয়েছে এ সুরায়।

সুরা আল-মুদ্দাছছির : আয়াত ৫৬
সুরা মুদ্দাছছির মক্কায় নাজিল হয়। এ সুরাটি ২ রুকুতে বিভক্ত হলেও এর আয়াত সংখ্যা ৫৬। এ সুরাটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যবহুল সুরা। এ সুরাটি প্রিয়নবির নবুয়তি জীবনের প্রাথমিক কর্মসূচি।

এ সুরায় কিয়ামতে বর্ণনা, কাফের সর্দার ওয়ালিদ ইবনে মুগিরার আলোচনাসহ কুরাইশদের ঈমান আনা ও না আনার কারণ এবং তার ভয়াবহ পরিণতির কথা আলোচিত হয়েছে।

ইবনে জারীর বর্ণনা করেন, ‘প্রথম ওহি নাজিলের পর প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট বেশ কিছু দিন ওহি নাজিল হওয়া বন্ধ থাকে। সে সময় প্রিয়নবি এতো কঠিন মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন যে, কোনো কোনো সময় তিনি পাহাড়ের চূড়ায় ওঠে সেখান থেকে নিজেকে নিচে নিক্ষেপ করতে বা গড়িয়ে ফেলে দিতে উদ্যত হতেন।

কিন্তু যখনই তিনি কোনো চূড়ার পাশাপাশি যেতেন, তখনিই হজরত জিবরিল আলাইহি সালাম তাঁর সামনে এসে বলতেন, ‘আপনি তো আল্লাহর নবি! এতে তার হৃদয় মন প্রশান্তিতে ভরে যেতো এবং তার অশ্বস্তি ও অস্থিরতা ভাব বিদূরিত হয়ে যেতো।

সুরা আল-ক্বিয়ামাহ : আয়াত ৪০
সুরাটি মক্কায় নাজিল হয়েছে। এতে রয়েছে ২ রুকু এবং ৪০ আয়াত। এ সুরায় প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে যে, আপনি ওহি মুখস্ত করতে দ্রুততর জিহ্বা নাড়াবেন না। এ সুরায় অবিশ্বাসীদের কৃতকর্ম এবং মুমিন বান্দার করণীয় ওঠে এসেছে।

সুরা আল-ইনসান : আয়াত ৩১
সুরা আল-ইনসানের আরেক নাম সুরা আদ-দাহর। এ সুরাটি মদিনায় অবতীর্ণ এবং সুরাটিতে ৩১টি আয়াত এবং ২টি রুকু রয়েছে। এ সুরার মূল কথা হলো মানুষকে দুনিয়ায় তার প্রকৃত অবস্থা এবং মর্যাদা অবহিত করা।

মানুষ আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হলে ফলাফল কি হবে আর অকৃতজ্ঞ হলে তার ফলাফল কি হবে সে সব বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে এ সুরায়।

সুরা আল-মুরসালাত : আয়াত ৫০
এ সুরাটি মক্কায় নাজিল হয়। সুরাটি ২ রুকু এবং ৫০ আয়াতে সুবিন্যস্ত। এ সুরায় মক্কাবাসীকে সতর্ক করা হয়েছে। পরকালের প্রমাণ এবং সত্য গ্রহণের সুফলের পাশাপাশি সত্যকে মিথ্যা সাব্যস্ত করার যে পরিণতি ভোগ করতে হবে তা এ সুরায় ওঠে এসেছে।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে কুরআনের এ গুরুত্বপূর্ণ সুরাগুলো বুঝে পড়ার এবং তাঁর ওপর আমল করার পাশাপাশি নিজেদের আকিদা-বিশ্বাসকে শিরকমুক্ত রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএমএস/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :