মাত্র ৯ ঘণ্টার রোজা আর্জেন্টিনায়

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮:৫৬ এএম, ০১ মে ২০২২

মুসলিম বিশ্বের মহিমান্বিত মাস রমজান। এ মাস ঘিরে নানা অনুষ্ঠান আর রীতি-রেওয়াজ আছে। রোজা রাখা, ইফতারের পর তারাবির নামাজ পড়া ইত্যাদি ছাড়াও আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয় খুশির আমেজ। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চেয়েও এসব রীতি সাংস্কৃতিক উদযাপন হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। ফুটবলের দেশ আর্জেন্টিনা। সেখানে কীভাবে রমজান পালিত হয়, তা জানাচ্ছেন মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ

আর্জেন্টিনায় ইসলামের আগমন
পিউ রিসার্জের আর্জেন্টিনার পাঁচ কোটি জনগণের প্রায় ২.৫ শতাংশ মুসলিম। জনসংখ্যার বিচারে মুসলিমরা দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় জনগোষ্ঠী। বর্তমানে আর্জেন্টিনায় প্রায় ১০ লাখ মুসলিম বসবাস করে, যাদের এক-পঞ্চমাংশই বাস করে রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সে। আর্জেন্টিনায় সর্বপ্রথম ইসলামের আগমন হয় স্পেনের নির্বাসিত মুসলিমদের মাধ্যমে। যারা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিল। বিশ শতকের শুরুতেও বহু আরব মুসলিম আর্জেন্টিনায় পাড়ি জমিয়েছেন। যাদের বেশির ভাগ সিরিয়া ও লেবাননের অধিবাসী। তবে বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম অভিবাসীদের সংখ্যা আরব অভিবাসীদের ছাড়িয়ে গেছে।

উৎসাহ ও উদ্দীপনায় রমজানকে স্বাগত
আর্জেন্টিনার মুসলিমরা রমজানকে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে স্বাগত জানায়। তাদের কাছে জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক সাধনার মাস রমজান। তারা জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য মসজিদে সমবেত হয়। রমজানে মসজিদে দ্বীনি শিক্ষার বিশেষ আয়োজন করা হয়। বিশেষ ইফতারির আগ থেকে তারাবির পর পর্যন্ত তারা মসজিদে অবস্থান করার চেষ্টা করে। রাজধানীর প্রধান প্রধান মসজিদে দিনের বেলায়ও দীর্ঘ সময় ইসলামি বিধানাবলি শিক্ষা দেওয়া হয়।

মুসলিম স্কলারদের কাছ থেকে ধর্মীয় বিধিবিধান শেখা
পর্যাপ্ত ইসলামি শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকা আর্জেন্টিনার মুসলিমদের প্রধান সমস্যা। তারা নতুন প্রজন্মকে ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারছে না। প্রথমত তারা স্থানীয় সমাজব্যবস্থার সঙ্গে মিশে যেতেই বেশি পছন্দ করছে। দ্বিতীয়ত ইসলামি শিক্ষা উপকরণের অভাব। নতুন প্রজন্ম স্প্যানিশ ভাষা ছাড়া অন্য ভাষা জানে না। আর স্প্যানিশ ভাষায় ইসলামি জ্ঞানোপকরণ খুবই কম। তাই রমজানকে আর্জেন্টিনার মুসলিমরা ইসলামি শিক্ষা গ্রহণের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখে। এ সময় আরব ও অনারব দেশ থেকে আগত মুসলিম স্কলারদের কাছ থেকে ধর্মীয় বিধিবিধান শেখার চেষ্টা করে। তারাবির পর মুসলিমরা পরস্পরের সঙ্গে দেখা করে এবং উপহার দেয়।

রমজানে আর্জেন্টিনার আফ্রিকান মুসলিমদের উচ্ছ্বাস
রমজানের আগমনে সবচেয়ে বেশি খুশি হয় আর্জেন্টিনার আফ্রিকান মুসলিমরা। যারা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের তাড়নায় আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এ দেশে পাড়ি জমিয়েছে। কেননা, রমজানে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তাদের সাহায্য-সহযোগিতায় ব্যাপকভাবে এগিয়ে আসে। রমজানের সহযোগিতা প্রধানত মুসলিমরা পেয়ে থাকলেও অনেক অমুসলিম ব্যক্তিকেও তা দেওয়া হয়।

দক্ষিণ আমেরিকার ইসলামিক সেন্টারের খোঁজ
দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় ইসলামিক সেন্টার ‘বাদশাহ ফাহাদ ইসলামিক কালচারাল সেন্টার’ আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সে অবস্থিত। ১৯৯২ সালে খাদেমুল হারামাইনের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর অধীনে আছে একটি মসজিদ, একটি পাঠাগার, দুটি ধর্মীয় স্কুল ও একটি পার্ক। সেন্টারটি ইসলাম প্রচার, ধর্মীয় শিক্ষাদান, ফতোয়া প্রদান, ইসলামিক ম্যাগাজিন প্রকাশ ও মুসলমানের মাঝে বিয়ে দেওয়ার কাজ করে থাকে।

ইফতার ও সেহরির ব্যবস্থা
রমজানে বাদশাহ ফাহাদ ইসলামিক সেন্টার বহুমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে। যেমন—ইফতার ও সেহরির আয়োজন করা, মুসলিম ও অমুসলিম সব ধর্মাবলম্বীর জন্য তা উন্মুক্ত রাখা, কোরআনের পাঠদান, হিফজুল কোরআন, কেরাত ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা। আর্জেন্টাইন মুসলিমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে রোজা রাখে। রমজানে তারা ধর্মীয় জীবনযাপনের চেষ্টা করে। যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে পরস্পরকে ধর্মীয় কাজে উদ্বুদ্ধ করে। তারা ইফতার ও তারাবির নামাজে মসজিদে একত্র হয়। তারাবির পর থেকে ফজর পর্যন্ত মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারগুলো মুসল্লিদের জন্য খোলা থাকে। কোথাও কোথাও ইফতারের সঙ্গে সঙ্গে মুসল্লিদের জন্য সেহরিরও ব্যবস্থা থাকে।

ইফতার ও সেহরিতে আরব সংস্কৃতি
ইফতার ও সেহরিতে আরব সংস্কৃতির প্রাধান্য দেখা যায়। যেমন—ইফতার আয়োজনে মিষ্টান্নের প্রাধান্য, খেজুর, দুধ ও সিমের উপস্থিতি ইত্যাদি। তবে অন্য অঞ্চলের অধিবাসীরাও রমজানে আপন সংস্কৃতি চর্চায় মনোযোগ দেন। বিশেষত একই অঞ্চলের অভিবাসীরা একত্রে থাকলে তারা দেশীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী রমজান উদযাপন করেন।

কোরআন ও হাদিসের বিশেষ পাঠদান
দক্ষিণ আমেরিকার খ্রিষ্টান প্রধান দেশগুলোর মধ্যে আর্জেন্টিনায় মুসলিমরা সবচেয়ে বেশি সম্মানের সঙ্গে মাহে রমজান পালন করতে পারেন বলে জানান দেশটির মুসলিম অধিবাসীরা। রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সে মুসলিমদের উপস্থিতি বেশি হওয়ায় সেখানে মুসলিমদের রমজান প্রস্তুতি ও রমজানের কার্যক্রম সহজেই চোখে পড়ে। এ শহরে অবস্থিত আহমদ মসজিদ, আত তাওহিদ মসজিদ, রে ফাহাদ বা পার্লামো মসজিদে মুসলিমরা রমজানের তারাবিসহ অন্যান্য ইবাদত পালন করেন। গত পাঁচ বছর যাবত রাজধানীর ‘কিলমিস’ এলাকায় আফ্রিকান বংশোদ্ভূত একদল স্বেচ্ছাসেবক মানুষকে সাধারণভাবে ইসলামের দাওয়াত ও কোরআনে কারিম শিক্ষা প্রদান করে থাকেন। রমজান মাসে তারা কোরআন ও হাদিসের বিশেষ পাঠদান করে থাকেন।

৯ ঘণ্টার রোজা
আর্জেন্টিনা পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধের এমন দেশগুলোর একটি, যেখানে দিবসের সময় খুবই সংক্ষিপ্ত। তাই সেখানে বসবাসকারী মুসলিমদের জন্য রোজা রাখার সময় একেবারেই অল্প। সেহরি থেকে ইফতার পর্যন্ত মাত্র ৯ ঘণ্টা সময় রোজা রাখতে হয় তাদের।

মুনশি/এসইউ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]