আত্মশুদ্ধি অর্জনের গুরুত্ব

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:১১ পিএম, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২

নফসের পরিশুদ্ধি দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নফসের পরিশুদ্ধি ছাড়া মানুষের ঈমান ও ইসলাম কখনো বিশুদ্ধ ও পরিপূর্ণ হয় না। মানুষের বাহ্যিক ও আত্মিক দুইটি দিক আছে। ইসলাম যেমন মানুষের বাহ্যিক তথা বাহিরের দিককে সুন্দর ও পরিপাটি করতে চায় তেমনি আভ্যন্তরীণ বা আত্মিক দিককেও করতে চায় সুন্দর ও সম্পূর্ণ কুলুষমুক্ত। মানুষের আভ্যন্তরীণ তথা আত্মিক দিকের পরিশুদ্ধিকেই কোরআনের ভাষায় বলা হয় তাযকিয়াতুন নফস।

নফসের পরিশুদ্ধি কত বেশি প্রয়োজন তা এটাক উদাহরণের মাধ্যমে আমরা বোঝার চেষ্টা করতে পারি। যেমন- যদি কেউ বাহ্যিকভাবে প্রচলিত নিয়মে নামাজ রোজা হজ জাকাত পালন করে থাকে কিন্তু তার নফস পবিত্র ও পরিশুদ্ধ না হয়; তবে তার সে আমল হবে ওই ফুলের মতো, যার রং সুন্দর এবং দেখতে আকর্ষণীয় কিন্তু তার কোনো সুঘ্রাণ নেই। এগুলো হয়ে যাবে নিষ্প্রাণ ইবাদত।

ইসলামের আলোকে যদি কোনো ব্যক্তিকে পরিমাপ করতে হয় তবে দেখতে হবে তার নফস কতখানি পুতঃপবিত্র এবং কুলুষমুক্ত। কেননা মহান আল্লাহ বান্দার অন্তরকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, তার বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানকে নয়।

মনে রাখতে হবে, একজন মানুষ তার নফসকে পবিত্রকরণ ও মনের কুলুষ দূরীকরনের মাধ্যমে নিজের আবেগ অনুভূতিকে আল্লাহ তাআলার সুন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এমনভাবে নিয়োজিত করতে পারে যে, দ্বীনের বাহ্যিক ইবাদত-বন্দেগি তার আগে ও নফসের দাবিতে রূপায়িত হয়ে যাবে। কাজেই নফস পরিশুদ্ধ করা এবং এ উদ্দেশ্যে তার ওপর সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণ ও শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা দ্বীনের একটি অতি অপরিহার্য কর্তব্য এবং সবচেয়ে বড় জিহাদ।

দেহের যেমন রয়েছে দুটি অবস্থা সুস্থতা ও অসুস্থতা। ঠিক তেমনি আত্মারও রয়েছে সুস্থতা ও অসুস্থতা। দেহ অসুস্থ হলে যেমন চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে সুস্থ করে তুলতে হয়, তেমনি আত্মা রোগাক্রান্ত হলেও তাকে সুস্থ বা পরিশুদ্ধ করে তুলতে হয়। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا قَدْأَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا
‘আর শপথ নাফসের এবং তাঁর, যিনি তাকে সুঠাম করেছেন। এরপর তাকে অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। অবশ্যই সেই সফলকাম হবে যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করবে। আর অবশ্যই সেই ব্যর্থ মনোরথ হবে যে নিজকে কলুষিত করবে।’ (সুরা আশ-শামস : আয়াত ৭-১০)

এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য প্রথমে জ্ঞানের প্রয়োজন আর মানুষকে দুই রকম জ্ঞান দেয়া হয়েছে। এক. অসৎকর্মের জ্ঞান, দুই. সৎকর্মের জ্ঞান। আয়াতের আলোকে পরিশুদ্ধির বিষয়টি দুইভাবে চিন্তা করা যায়-
১. মন্দদিক : যা আখলাকে সায়্যিয়াহ বা মন্দ চরিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য যাবতীয় পাপ, অন্যায় ও অপবিত্র কাজ থেকে মুক্ত হওয়া অর্থাৎ যাবতীয় অসৎ গুণাবলী বর্জন করা। যেমন- শিরক, রিয়া, অহংকার, আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা, হিংসা, ঘৃণা, কৃপণতা, ক্রোধ, গিবত, পরনিন্দা, চোগলখুরি, কুধারণা, দুনিয়ার প্রতি মোহ, আখেরাতের উপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়া, জীবনের প্রতি অসচেতনতা, অর্থহীন কাজ করা, অনধিকার চর্চা প্রভৃতি হতে নিজেকে এবং দেহ ও আত্মাকে মুক্ত রাখা। আত্মা মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রুতে পরিণত হয় যখন সে তাকে পাপাচার ও সীমালংঘনের দিকে আহবান করে। কেননা এই অপরিশুদ্ধ, পাপাচারী, ব্যাধিগ্রস্ত অন্তর মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মহান আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা আলাইহিস সালামকে এই মর্মে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে-
اذْهَبْ إِلَىٰ فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَىٰ فَقُلْ هَلْ لَكَ إِلَىٰ أَنْ تَزَكَّىٰ وَأَهْدِيَكَ إِلَىٰ رَبِّكَ فَتَخْشَىٰ
‘তুমি ফেরাউনের কাছে যাও, নিশ্চয় সে সীমালংঘন করেছে’। এরপর তাকে বল ‘তোমার কি ইচ্ছা আছে যে, তুমি পবিত্র হবে? ‘আর আমি তোমাকে তোমার রবের দিকে পথ দেখাব, যাতে তুমি তাঁকে ভয় কর?’ (সুরা আন নাযিআত : আয়াত ১৭-১৯)

২. ভালোদিক : যা আখলাকে হাসানা বা সচ্চরিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। উত্তম গুণাবলী দ্বারা আত্মার উন্নতি সাধন করা। প্রশংসনীয় গুণাবলী অর্জনের মাধ্যমে পরিত্যাগকৃত অসৎ গুণাবলীর শূন্যস্থান পূরণ করা। সৎ গুণাবলী হল তাওহিদ, ইখলাছ, ধৈর্যশীলতা, তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা, তওবা, শুকর বা কৃতজ্ঞতা, আল্লাহভীতি, আশাবাদিতা, লজ্জাশীলতা, বিনয়-নম্রতা, মানুষের সাথে উত্তম আচরণ প্রদর্শন, পরস্পরকে শ্রদ্ধা-সম্মান ও স্নেহ, মানুষের প্রতি দয়া, ভালবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শন, ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ, পরোপকার প্রভৃতির মাধ্যমে সর্বোত্তম চরিত্র অর্জন করা। হাদিসে পাকে এসেছে-
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহ আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলা হলো-
أَىُّ النَّاسِ أَفْضَلُ قَالَ ‏كُلُّ مَخْمُومِ الْقَلْبِ صَدُوقِ اللِّسَانِ‏ قَالُوا صَدُوقُ اللِّسَانِ نَعْرِفُهُ فَمَا مَخْمُومُ الْقَلْبِ قَالَ‏ هُوَ التَّقِيُّ النَّقِيُّ لاَ إِثْمَ فِيهِ وَلاَ بَغْىَ وَلاَ غِلَّ وَلاَ حَسَدَ
কোন ব্যক্তি সর্বোত্তম? তিনি বললেন, ‘প্রত্যেক বিশুদ্ধ অন্তরের অধিকারী সত্যভাষী ব্যক্তি। তারা বলেন, সত্যভাষীকে তো আমরা চিনি, কিন্তু বিশুদ্ধ অন্তরের ব্যক্তি কে? তিনি বলেনঃ সে হলো পূত-পবিত্র, নিষ্কলুষ চরিত্রের মানুষ, যার নাই কোন পাপাচার এবং নাই কোন দুশমনি, হিংসা-বিদ্বেষ, আত্মহমিকা ও কপটতা। (ইবনে মাজাহ)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য দোয়া করতেন। হাদিসে পাকে এসেছে-
হজরত যায়িদ ইবনু আরকাম রাদিয়াল্লাহ আনহু বর্ণনা করেন, আমি কি তোমাদের কাছে তেমনই বলবো যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَالْهَرَمِ وَعَذَابِ الْقَبْرِ اللَّهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا وَزَكِّهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلاَهَا اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لاَ يَنْفَعُ وَمِنْ قَلْبٍ لاَ يَخْشَعُ وَمِنْ نَفْسٍ لاَ تَشْبَعُ وَمِنْ دَعْوَةٍ لاَ يُسْتَجَابُ لَهَا
‘হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই, অক্ষমতা, অলসতা, কাপূরষতা, কৃপণতা, বার্ধক্য এবং কবরের আজাব থেকে। হে আল্লাহ! তুমি আমার নফসে (অন্তরে) তাকওয়া দান কর এবং একে পরিশুদ্ধ করে দাও। তুমি সর্বোত্তম পরিশোধনকারী, মালিক ও আশ্রয়স্থল। হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই অনুপোকারী ইলম থেকে ও ভয় ভীতিহীন কলব থেকে; অতৃপ্ত নফসের অনিষ্ট থেকে ও এমন দোয়া থেকে যা কবুল হয় না।’ (মুসলিম)

অন্তর যদি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হয়, তাহলে মানবদেহের বহ্যিক কার্যক্রমও পরিচ্ছন্ন, নির্মল ও কল্যাণকর হয়। আর যদি অন্তর অপবিত্র ও কলুষিত থাকে, তাহলে মানুষের বহ্যিক আচার-আচরণসহ তার সব কার্যাবলী অপরিচ্ছন্নতা ও অকল্যাণের কালো ছায়া পাওয়া যায়। নাফসের পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে একজন ব্যক্তির ঈমান, আমল ও আখলাক পরিশুদ্ধ হয়। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন-
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّىٰ وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّىٰ بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ
‘নিশ্চয়ই সে সাফল্য লাভ করবে যে নিজেকে পরিশুদ্ধি করবে, আর তার রবের নাম স্মরণ করবে, এরপর নামাজ আদায় করবে। বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দাও। অথচ পরকালের জীবন সর্বোত্তম ও স্থায়ী।’ (সুরা আল-আলা : আয়াত ১৪-১৭)

নিজেকে পরিশুদ্ধির তিনটি দিক এ আয়াতে ওঠে এসেছে, তাহলো- এক. আল্লাহকে অধিক স্মরণ (জিকির) করা; দুই. নামাজ আদায় করা; তিন. পরকালকে প্রাধান্য দেওয়া এবং দুনিয়ার জীবনকে তুচ্ছ মনে করা। অন্য আয়াতে জানা যায়, দেহ ও আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য প্রথমে মুমিন হতে হবে। বিষয়টি মহান আল্লাহ এভাবে ঘোষণা করেন-
وَمَنْ يَأْتِهِ مُؤْمِنًا قَدْ عَمِلَ الصَّالِحَاتِ فَأُولَٰئِكَ لَهُمُ الدَّرَجَاتُ الْعُلَىٰ جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا ۚ وَذَٰلِكَ جَزَاءُ مَنْ تَزَكَّىٰ
‘আর যারা তাঁর কাছে আসবে মুমিন অবস্থায়, অবশ্যই সৎকর্ম করে তাদের জন্যই রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা। স্থায়ী জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে স্থায়ী হবে আর এটা হল তাদের পুরষ্কার যারা পরিশুদ্ধ হয়।’ (সুরা ত্বহা : আয়াত ৭৫-৭৬)

এ আয়াতেও মহান আল্লাহ ব্যক্তিকে পরিশুদ্ধ হওয়ার জন্য প্রথমেই আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ ঈমান আনার কথা বলেছেন, তারপর অবশ্যই সৎকর্ম করতে হবে বলে উল্লেখ করেছেন, তবেই তাদের জন্য উচ্চ মর্যাদা, স্থায়ী জান্নাত সুনিশ্চিত।

আয়াতের আলোকে আরও বোঝা যায়, ঈমান বিষয়টি অন্তরের সাথে সম্পর্কিত। আর মানবদেহ পরিচালিত হয় তার কলব বা অন্তরের মাধ্যমে। এ কারণেই হাদিসে পাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন-
الاَ وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ‏.‏ أَلاَ وَهِيَ الْقَلْبُ ‏
‘জেনে রাখো! দেহের মধ্যে এক টুকরা গোশত আছে। যখন তা সুস্থ থাকে তখন পুরো শরীরই সুস্থ থাকে। আর যখন তা নষ্ট হয়ে যায় তখন পুরো শরীরই নষ্ট হয়ে যায়। স্মরণ রেখো! তাহলো কালব বা অন্তর।’

আল্লাহ তাআলা সবাইকে এ অন্তর পরিশুদ্ধির তাওফিক দান করুন। দুনিয়া ও পরকালের সফলতা অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএমএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।