যে নামাজে মিরাজের স্বাদ পাওয়া যায়


প্রকাশিত: ০৬:০৭ এএম, ১৪ আগস্ট ২০১৫

শুক্রবার এলেই মানুষ দল বেঁধে মসজিদে যায়। ঈদের উৎসবের মতো উৎসব পালন করে থাকে। তাই শুধু জুমার নামাজে গেলেই নামাজের হক আদায় হবে না। প্রতিটি মুসলিমকে যথাসময়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেই হবে। দুনিয়ার সুখ শান্তি ও পরকালীন মুক্তির অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নামাজ। নামাজ ইসলামে দ্বিতীয় রুকন। ইসলামে নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। তাইতো ঈমানদার নারী-পুরুষ যেখানে থাকুন, যে কাজই করুন না কেন দৈনিক (দিনে ও রাতে) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথারীতি আদায় করতেই হবে।

যথারীতি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করলেই মানুষ পাবে পথের দিশা। পক্ষান্তরে অনিয়মিত নামাজ আদায়কারীদের ব্যাপারে রয়েছে কঠোর থেকে কঠোরতম হুঁশিয়ারি। জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য নামাজের করণীয় বিষয়গুলো কি কি তা  তুলে ধরা হলো-

নামাজের ব্যাপারে সতর্কতা
নির্ধারিত সময়ে নামাজ পড়াই যথেষ্ট নয়, নামাজকে নিয়ম অনুযায়ী, যথাযথভাবে এবং সহিহশুদ্ধভাবে পড়াও জরুরি। কারণ নিয়মবহির্ভূত নামাজ পড়া, অশুদ্ধ নামাজ পড়া নামাজ না পড়ারই সমতুল্য।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি যথারীতি নামাজ আদায় করবে, তা কিয়ামতের দিন তার জন্য মুক্তির অসিলা, আলোকবর্তিকা ও যুক্তি-প্রমাণ হবে। আর যে যথারীতি নামাজ আদায় করবে না, তার জন্য তা আলোকবর্তিকাও হবে না, যুক্তি-প্রমাণও হবে না এবং মুক্তির অসিলাও হবে না।

অধিকন্তু সে কিয়ামতের দিন ফেরাউন, কারুন, হামানসহ ইসলাম বিদ্বেষীদের সঙ্গী হবে। সুতরাং নামাজের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর ব্যাপারে অলসতা না করে যথা সময়ে যথাযথ নিয়মে নামাজ আদায় করে আল্লাহর ভয়াবহ পরিনাম থেকে মুক্ত থাকি।

নামাজি ব্যক্তির জন্য অতিব প্রয়োজনীয় ৮টি টিপস-
১. নামাজের দিকে ধাবিত হওয়া : আজানের সঙ্গে সঙ্গেই মসজিদমুখি হওয়া, জামাআত শুরুর পূর্বেই মসজিদে উপস্থিত হওয়া, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাআতের সহিত আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের জরুরি অবশ্যকীয় কাজ। শুধু নামাজ পড়াই আল্লাহর আদেশ নয়, জামাআতের সহিত নামাজ পড়াও আল্লাহর আদেশ। আল্লাহ বলেন-  `আর নামাজে অবনত হয় তাদের সঙ্গে নামাজে অবনত হও।` (সূরা আল-বাক্বারা : আয়াত ৪৩)

২. নামাজে তাড়াহুড়া : নামাজের জামাআত শুরু হওয়ার পর অনেকে দৌঁড়ে আসেন। আবার অন্যদেরকেও দৌঁড়ে আসতে বলেন, যা ঠিক নয়। হাদিসে নামাজে দৌড়ে আসতে নিষেধ করা হয়েছে। হাদিসে এসেছে- নামাজের ইকামাত হলে তাতে দৌড়ে আসবে না। তাতে হেঁটে আসবে। স্থিরতা অবলম্বন করবন। যতটুকু পাবে ততটুকু নামাজ আদায় করবে আর যা ফওত হয়ে যাবে তা পরে পূরণ করে নেবে। (বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ)

৩. মসজিদে প্রবেশের পর করণীয় : অনেকেই মসজিদে প্রবেশ করেই বসে পড়েন। এটাও ঠিক নয়। মসজিদে প্রবেশ করে আগে দু`রাকাআত দুখুলিল মসজিদ নামাজ আদায় করা এবং পরে বসা হচ্ছে সুন্নতি আমল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- `তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে সে যেন বসার পূর্বে দুই রাকাআ`ত নামাজ আদায় করে নেয়। (বুখারি) স্বাভাবিকভাবে মসজিদে প্রবেশ করে আগে নামাজ পড়া এমনকি দুই মিনিট বাকি থাকলেও দুই রাকাত নামাজ পড়ে তারপর বসাই নিয়ম।

৪. নামাজে তাকবিরে তাহরিমা কুরআন ও দুআ`-দরুদ পড়া : অনেক নামাজিই নামাজের তাকবিরে তাহরিমার আল্লাহু আকবার, কিরাত ও দুআ`-দরুদ এমনভাবে পড়েন যাতে ঠোঁট, জিহ্বা, মুখ নড়ে না। মনে হয় তারা মনে মনে এগুলো পড়েন। যেসব নামাজে তিলাওয়াত আস্তে আস্তে পড়ার নিয়ম সেসব নামাজে সূরা কিরাআ`ত এমনভাবে পড়তে হবে যাতে নিজের তিলাওয়াতের শব্দ নিজ কান পর্যন্ত পৌঁছায়। পড়ার সময় ঠোঁট-জিহ্বা-মুখ নড়াচড়া করে, কিরাত পড়ার সময় জিহ্বা ও ঠোঁট ব্যবহারের মাধ্যমে হরফের সহিহ উচ্চারণ হয়। হজরত আবু মামার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা হজরত খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি জোহর ও আসরের নামাজে কুরআন পড়তেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমরা প্রশ্ন করলাম আপনারা কিভাবে বুঝতেন? তিনি বললেন, তাঁর দাড়ি মোবারক নড়াচড়া দ্বারা। (ফাতহুল বারি)

৫. নামাজের কাতারে ফাঁক না রাখা : নামাজ আদায়ের সময় কাতারের ফাঁক থাকলে শয়তান প্রবেশ করে মানুষকে কুমন্ত্রণা দেয়, যাতে মানুষ আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হতে হয়। হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নামাজরে ইকামত হয়ে গিয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সামনে মুখ ফিরালেন। বললেন, `তোমরা তোমাদের কাতারসমূহ সোজা করবে এবং মিশে মিশে দাঁড়াবে।` (বুখারি)  অপর বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে যে, `আমাদের প্রত্যেকে স্বীয় কাঁধকে সঙ্গির কাঁদের সঙ্গে, পা-কে সঙ্গির পায়ের সঙ্গে মিলিয়ে দাঁড়াত।` তোমরা তোমাদের কাতারগুলোতে মিশে মিশে দাঁড়াবে। অপর হাদিসে বলেন, `ওই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, আমি দেখছি শয়তান তোমাদের মাঝে ফাঁক করে নেয় এবং ভেড়ার বাচ্চার মতো কাতারের ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়ে।` (আবু দাউদ)  জামাতে নামাজ আদায়ের সময় প্রত্যেকে ডানের এবং বামের জনের সঙ্গে মিশে মিশে দাঁড়িয়ে আমরা হাদিসের নির্দেশকে বাস্তবায়নে সচেষ্ট হতে পারি।

৬. কাতার সোজা করা : জামাআতে নামাজ আদায়ের সময় আমরা যেনতেনভাবে দাঁড়াই, কেউ আগে আবার কেউ একটু পিছে।  যা একেবারে নিষিদ্ধ। ইমাম, মুয়াজ্জিনের আহবানেও আমরা এ ব্যাপারে ভ্রুক্ষেপ করি না অথচ একটু সচেতন হলেই কাতার সোজা করা সহজ ও সম্ভব। এ ব্যাপারে হাদিসে হাদিস- `তোমাদের কাতারগুলো সোজা করবে, কারণ কাতার সোজা করা সালাত পূর্ণাঙ্গ হওয়ার অঙ্গ।` (বুখারি) অপর বর্ণনায়, তোমরা কাতার সঠিক করবে কেননা কাতার সঠিক করা নামাজরে সৌন্দর্যের অঙ্গ। (মুসলিম)

৭. রুকু-সেজদা : জামাআতে নামাজ পড়ার সময় ইমামের আগে রুকু-সেজদার ব্যাপারে হাদিসে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। জামাতে নামাজ আদায়কালীন সময়ে অনেকে এ কাজগুলো করে থাকেন। আবার এরকম নামাজিও কম নন যারা ইমামের সঙ্গে সঙ্গে কাজগুলো করতে গিয়ে ইমামের আগেই কাজগুলো সেরে ফেলেন। হাদিসে এসেছে- ‘তোমাদের কেউ কি এ কথার ভয় করে না যে, ইমামের পূর্বে সে যদি তার মাথা রুকু ও সেজদা থেকে তুলে নেয় তবে আল্লাহতায়ালা তার মাথাকে গাধার মাথা বা তার চেহারাকে গাধার চেহারায় পরিণত করে দেবেন? (বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজি ও নাসাঈ)

৮. সূরা তথা কিরাআত পড়া : নামাজ কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে বিশুদ্ধ তিলাওয়াত। নামাজে সূরা ক্বিরাআত অশুদ্ধ পড়লে নামাজ ভঙ্গ হয়ে যায়। এ কারণে প্রত্যেক মুসল্লিকে সূরা ফাতিহা এবং কমপক্ষে ৪টি সূরা অথবা ছোট ছোট ১২টি আয়াত বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শিখে নেয়া অতিব জরুরি। পাশাপাশি নামাজের অন্যান্য করণীয় তথা আল্লাহু আকবর থেকে শুরু করে নামাজ শেষের আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ পর্যন্ত সহিহ শুদ্ধ করা। বিশুদ্ধভাবে কুরআন শিক্ষা করা প্রত্যেক ঈমানদার নারী-পুরুষের জন্য ফরজ।

নামাজে উদাসিনতার ফল-
অনেকে নামাজ পড়ে না। আবার অনেকে যথারীতি আদায় করলেও সূরা ক্বিরাত সহিহ শুদ্ধ করার ব্যাপারে সম্পূর্ণরূপে উদাসীন। সব ধরনের লাজলজ্জা ত্যাগ করে কুরআন শেখার ব্যাপারে, কমপক্ষে নামাজ আদায়ের উপযোগী সূরা কিরাত শেখার ব্যাপারে প্রত্যেক নামাজিকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ, পদক্ষেপ নেয়া সব কাজের বড় কাজ। যে সব নামাজি তিলওয়াতসহ নামাজে পঠিত দুআ`গুলো শিখে না, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ সব নামাজি অন্যায়কারী সাব্যস্ত হচ্ছে। কষ্ট করে নামাজ আদায় করছে ঠিকই, সে নামাজ তার চেহারার দিকেই আবার ছুঁড়ে মারা হচ্ছে। হাদিসে এসেছে- সব চেয়ে বড় চোর হলো সেই ব্যক্তি যে নামাজে চুরি করে। জিজ্ঞাসা করা হলো, কিভাবে নামাজে চুরি করা হয়? রাসূল বললেন, যথাযথভাবে রুকু-সিজদা না করা এবং সহিহভাবে কুরআন না পড়া। (মুসনাদে আহমাদ)

নামাজ মানুষকে অভিশাপ দেয়-
যারা সঠিকভাবে নামাজ আদায় করে না ঐ সব লোকদেরকে নামাজ অভিশাপ দিতে থাকে। হাদিসে এসেছে- `আর যখন নামাজে রুকু সিজদা ও কুরআন পাঠ সহিহভাবে করে না, তখন নামাজ তাকে বলে, তুমি যেমন আমাকে নষ্ট করলে, আল্লাহও তোমাকে নষ্ট করুক। অতঃপর তা অন্ধকারে আচ্ছন্ন অবস্থায় আকাশে উঠে যায়। তার জন্য আকাশের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর তাকে পুরনো কাপড়ের মতো গুটিয়ে নামাজির মুখের ওপর ছুড়ে মারা হয়।

আল্লাহ বলেন- `এরূপ নামাজিদের জন্য বড় সর্বনাশ যারা স্বীয় নামাজ হইতে গাফেল। (সূরা মাউন : আয়াত ৪,৫)

পরিশেষে আশা-
নামাজ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের জন্য নামাজের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক করেছেন। কারণ, একমাত্র ইবাদত নামাজ যা পালনের মাধ্যমে মানুষকে লাভ করে থাকে অগণিত অসংখ্য কল্যাণ। আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় নামাজ সব ধরনের অশ্লীল ফাহেশা তথা মুনকার কাজ থেকে বিরত রাখে।

সুতরাং মানুষের উচিত সঠিক নিয়মে যথাযথভাবে নামাজ আদায় করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিকভাবে নামাজ আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

জাগোনিউজ২৪.কমের সঙ্গে থাকুন। সুন্দর সুন্দর ইসলামী আলোচনা পড়ুন। কুরআন-হাদিস মোতাবেক আমলি জিন্দেগি যাপন করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করুন। আমিন, ছুম্মা আমিন।

এমএমএস/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :