আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাস মহররম


প্রকাশিত: ০৮:০৩ এএম, ৩১ অক্টোবর ২০১৫

চলছে মহররম মাস। এ মাসের মধ্যভাগ আমরা অতিক্রম করছি। আল্লাহ তাআলা চারটি মাসকে হারাম মাস হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তন্মধ্যে মহররম একটি। এ মাসে আল্লাহ তাআলা সর্ব প্রকারের যুদ্ধ-বিগ্রহসহ খুন-খারাবি তথা রক্তপাতকে হারাম করেছেন। তাঁর নৈকট্য অর্জনের জন্য এ মাসকে গ্রহণ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ মাসের ফজিলত অত্যধিক। কুরআনের অনেক ঘটনার সমাপ্তি ও ক্ষমা এ মাসেই হয়েছিল। যার কিছু তুলে ধরা হলো-

وَذَا النُّونِ إِذ ذَّهَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ أَن لَّن نَّقْدِرَ عَلَيْهِ فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ     

অর্থাৎ ‘এবং মাছওয়ালার কথা স্মরণ করুন তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গিয়েছিলেন, অতপর মনে করেছিলেন যে, আমি তাঁকে ধৃত করতে পারব না। অতপর তিনি অন্ধকারের মধ্যে আহবান করলেন- তুমি ব্যতিত কোনো উপাস্য নেই; তুমি নির্দোষ আমি গুনাহগার।     (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৮৭)

আল্লাহ তায়ালা হজরত ইউনুছ আলাইহিস সালামকে মুসিল অঞ্চলের নিনওয়া নামক স্থানের নবি করে পাঠান। তিনি সেখানে মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করেন। মানুষ তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করেনি। ইউনুস আলাইহিস সালাম সেখান হতে চলে যাওয়ার জন্য সমুদ্র পাড়ে গিয়ে নৌকায় ওঠলেন। নৌকা সমুদ্রে কিছুদূর যাওয়ার পর ঝড়ের কবলে পড়ে গেল। সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো নৌকা থেকে একজনকে ফেলে দেয়া হবে। সেখানে লটারি করা হলো কাকে সমুদ্রে ফেলে দেয়া হবে। তিন বার লটারিতে হজরত ইউনুছ আলাইহিস সালামের নাম ওঠে। কিন্তু লোকজন তাঁকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করতে অসম্মতি জানায়। হজরত ইউনসু আলাইহিস সালাম সবার হিফাজতের কথা ভেবে নিজেই দাঁড়িয়ে গেলেন এবং কাপড় খুলে নদীতে লাফিয়ে পড়লেন।

আল্লাহ তাআলা ‘বাহরে আখদার’ তথা সবুজ সাগর থেকে একটি বিরাটাকার মাছ পাঠিয়ে দিলেন। মাছটি পানি ফেড়ে এসে হজরত ইউনুছ আলাইহিস সালামকে গিলে ফেললেন। আল্লাহর নির্দেশে মাছ তাঁর মাংস খেল না। তার হাঁড় ভাঙাসহ কোনো ক্ষতি করল না। এ মাছের পেট তাঁর জন্য ছিল কয়েদখানা। মাছের পেটে তিনি আল্লাহর তাসবিহ শুনে তাঁর সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। আর বলেন, হে আল্লাহ আমি এমন একস্থানে আপনার সিজদা করছি। যে স্থানে কেউ কোনো দিন আপনাকে সিজদা করেনি। তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থণা করলে আল্লাহ তাআলা হজরত ইউনুছ আলাইহিস সালামকে মুক্তি দিলেন।

আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে ‘জুলমাত’ অন্ধকারের বহুবচন  ব্যবহার করেছেন, তার কারণ হলো- হজরত ইউনুছ আলাইহিস সালাম প্রথমত, মাছের পেটে অন্ধকারে ছিলেন, দ্বিতীয়- নদীর পানির ভিতর অন্ধকারে ছিলেন, তৃতীয়ত- তিনি রাত্রির অন্ধকারে ছিলেন। সেখানেই তিনি এভাবে দোয়া করলেন, ‘অতপর তিনি অন্ধকারের মধ্যে আহবান করলেন- তুমি ব্যতিত কোনো উপাস্য নেই; তুমি নির্দোষ আমি গুনাহগার।’ অতপর আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন। যা কুরআনে এভাবে এসেছে-

فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ نُنجِي الْمُؤْمِنِينَ     

অর্থাৎ অতপর আমি তাঁর আহবানে সাড়া দিলাম এবং তাঁকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। আমি এমনি ভাবে বিশ্ববাসীদেরকে মুক্তি দিয়ে থাকি। (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৮৮) আর দিনটি ছিল মহররম মাসের ১০ তারিখ। যে দিনটিতে আল্লাহ হজরত ইউনুছ আলাইহিস সালামকে ক্ষমা করেছিলেন।

এভাবে আল্লাহর নবি হজরত আইয়ুব আলাইহিস সালামের কথাও কুরআনে এসেছে । হজরত আইয়ুব আলাইহিস সালামকে আল্লাহ আর্থিক, দৈহিক ও সন্তানের দুঃখ-কষ্টে পতিত করেন। তার ধন-সম্পদ জীব-জন্তু, ক্ষেত-খামার, বাগ-বাগিচা সবই ছিল। তাঁর ওপর আল্লাহর পরীক্ষা আসে, এবং তার সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যায়। তার সম্পূর্ণ দেহ কুষ্ঠরোগে ভরে যায়। আল্লাহর নিকট তিনি দোয়া করেন-

وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ

অর্থাৎ ‘এবং স্মরণ করুন আইয়্যুবের কথা, যখন তিনি তাঁর পালনকর্তাকে আহবান করে বলেছিলেনঃ আমি দুঃখকষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি দয়াবানদের চাইতেও সর্বশ্রেষ্ট দয়াবান। (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৮৩)

অতপর আল্লাহ তাআলা হজরত আইয়ুব আলাইহিস সালামকে ক্ষমা করে তার সমুদয় সম্পদ, স্ত্রী-সন্তানসমেত পুনরায় দান করেন-

فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِن ضُرٍّ وَآتَيْنَاهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُم مَّعَهُمْ رَحْمَةً مِّنْ عِندِنَا وَذِكْرَى لِلْعَابِدِينَ অর্থাৎ অতপর আমি তাঁর আহবানে সাড়া দিলাম এবং তাঁর দুঃখকষ্ট দূর করে দিলাম এবং তাঁর পরিবরাবর্গ ফিরিয়ে দিলাম, আর তাদের সঙ্গে তাদের সমপরিমাণ আরও দিলাম আমার পক্ষ থেকে কৃপাবশত আর এটা এবাদত কারীদের জন্যে উপদেশ স্বরূপ। (সুরা আম্বিয়া : আয়াত ৮৪)  তাও ঘটেছিল এ মহররম মাসে।

পৃথিবীর আদি হতে শুরু হয়ে কারবালার ঘটনা পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা অগণিত অসংখ্য ত্যাগ ও ক্ষমার নজির মুসলিম উম্মাহর জন্য দৃষ্টান্ত স্বরূপ উল্লেখ করেছেন। এ মাসেই কারবালার প্রান্তরে হজরত ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত সংঘটিত হয়ে ইসলামের নবজীবনের বীজ অংকুরিত হয়েছিল। এ মাস মুসলিম উম্মাহর ত্যাগ, ক্ষমা, শিক্ষা গ্রহণের মাস। এ মাসের পবিত্রতা রক্ষা করা প্রত্যেক ঈমানদার মুসলমানের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

আল্লাহর কুরআন ও রাসুলের হাদিস সাক্ষী এ মাস মাগফিরাতের মাস। এ মাসটি শেষ হওয়ার আগেই আমরা আল্লাহর দরবারের কঠিন কঠিন বিপদ-মুসিবত থেকে ক্ষমা প্রার্থণা করি। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য মাগফিরাত ও ক্ষমা দান করুন। এ মাসের হক আদায় করার তাওফিক দান করুন। এ মাস আমাদের জন্য রহমত বরকত ও কল্যাণের বারতা নিয়ে আসুক। আমল-ইবাদাত-বন্দেগি ও তাকওয়ার মাধ্যমে এ মাসকে অতিবাহিত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : খতিব, মসজিদে নূর (খানকা মসজিদ), যাত্রবাড়ী, ঢাকা।

জাগো ইসলামে লেখা পাঠাতে ই-মেইল : [email protected]


জাগোনিউজ২৪.কমের সঙ্গে থাকুন। কুরআন-হাদিস মোতাবেক আমলি জিন্দেগি যাপন করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করুন। আমিন, ছুম্মা আমিন।

এমএমএস/এমএস