মাদরাসায় হিন্দু ধর্ম পড়ানোর প্রস্তাবের প্রতিবাদ ও নিন্দা

ধর্ম ডেস্ক
ধর্ম ডেস্ক ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮:৩১ পিএম, ০৪ মার্চ ২০২১

ভারতের মাদরাসাগুলোতে নতুন জাতীয় শিক্ষা নীতির আওতায় জ্ঞান-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির চর্চা হিসেবে হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ বেদ, গীতা, রামায়ণ পড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মাদরাসায় হিন্দু ধর্ম পড়ানোর প্রস্তাবের বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে দেশ-বিদেশে মন্তব্য ও নিন্দার ঝড় বইছে।

মাদরাসাগুলোতে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদ, গীতা ও রামায়ন সিলেবাসভুক্ত করায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে কিনা তা নিয়ে রীতিমতো দেশটির শিক্ষাবিদরাই সন্দিহান। অনেকেই বিবিসি বাংলার কাছে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন।

> অধ্যাপক অমরিন্দর আনসারি
দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক অমরিন্দর আনসারি জানিয়েছেন, ‘প্রথমত মাদরাসাগুলো কিন্তু সংগঠিত শিক্ষা খাতের ভেতরে পড়ে না। সেখানে একটা বহুত্ববাদী সংস্কৃতির দেশে এরকম কিছু চালু করতে গেলে সেটা কিন্তু জোর করে চাপিয়ে দেয়া হিসেবেই দেখা হবে। মাদরাসাগুলোর স্বশাসনেরই বা কী হবে?’

তিনি আরও বলেন, ‘হ্যাঁ, বেদ-গীতা-রামায়ণের বদলে যদি 'ভারতীয় ধর্ম' বলে একটা বিষয় চালু করা হত, যেখানে দেশের সব ধর্মের শিক্ষাই থাকবে, সেটা হয়তো মেনে নেয়া যায়। মাথায় রাখতে হবে, ধর্ম আর ধর্মগ্রন্থ কিন্তু দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।’

> সুরেন্দ্র জৈন
বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সর্বভারতীয় নেতা সুরেন্দ্র জৈন সরকারের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে যুক্তি দিচ্ছেন, গীতা-রামায়ণ-বেদকে আসলে শুধু হিন্দু ধর্মগ্রন্থ হিসেবে দেখাটাই ভুল।

তিনি বলেন, ‘এগুলোকে শুধু হিন্দুদের বলে চিহ্নিত করাটা দুর্ভাগ্যজনক। কারণ এই গ্রন্থগুলো বিশ্বজনীন মানবতার কথা বলে। আমরা মনে করি, এই গ্রন্থগুলো যে মূল্যবোধের শিক্ষা দেয় তা পড়ানোটা ভারতে বসবাসকারী প্রত্যেকের জন্য বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।’

> মহম্মদ আলাউদ্দিন
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় নাজবুল হক হাই মাদরাসার প্রধান শিক্ষক, মহম্মদ আলাউদ্দিন ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, এই সব গ্রন্থে আপত্তিকর কিছু নেই। তিনি বলেন, আমার কথা হল হিন্দু ধর্মে তো খারাপ কিছু নেই। কেউ যদি সেরকম বলে - তাহলে সেটা তার ভুল ধারণা।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেকে হয়তো ধর্মের ব্যাখ্যাকে খারাপভাবে ব্যবহার করছে, কিন্তু ধর্মগ্রন্থে খারাপ কিছু আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু সেই সঙ্গেই তিনি যোগ করছেন, ‘তারা মাদরাসায় বাধ্যতামূলকভাবে কোনও ধর্মশিক্ষা দেন না। ফলে জোর করে কোনও ধর্মীয় শিক্ষা চাপিয়ে দিতে গেলে ফল ভাল না-ও হতে পারে।’

মাদরাসায় কিন্তু আমরা শাস্ত্রশিক্ষা দিই না, পড়াশুনো করাই। যেমন আরবি পড়ানো হয় একটা ভাষা হিসেবে, এখানে ধর্মের কোনও ব্যাপার নেই। এমন কী কেউ চাইলে আরবি নিতেও পারে, কেউ আবার না-ও নিতে পারে। এটা ছাত্রদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। সেই জায়গায় পাঠক্রমে ধর্মগ্রন্থ নিয়ে এলে সমস্যা হতেও পারে, আবার না-ও হতে পারে। বলা আসলে খুব কঠিন, আর এ বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকাই ভাল বলে উল্লেখ করেন নজবুল হক হাই মাদরাসার প্রধান শিক্ষক মহম্মদ আলাউদ্দিন।

নিন্দা ও প্রতিবাদ
ভারতের মাদরাসাগুলোতে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদ, গীতা, রামায়ণ পড়ানোর প্রস্তাবের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি ও সাবেকমন্ত্রী মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস ও সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব শায়খুল হাদিস মাওলানা ড.গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম।

নেতৃদ্বয় বলেন, ভারতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার নামে সুকৌশলে মুসলমানদেরকে হিন্দু বানানোর গভীর চক্রান্ত করছে ভারত। বহুত্ববাদী সংস্কৃতির দেশ হচ্ছে ভারত। সে দেশে সংস্কৃতি রক্ষার নামে মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাদরাসায় হিন্দুগ্রন্থ পড়ানোর প্রস্তাব মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের নামান্তর।
তারা আরও বলেন, ‘ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। প্রত্যেক নাগরিক নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মুসলমানদের উপরে অন্য ধর্মের গ্রন্থ চাপিয়ে দেয়াটা অন্যায়। নেতৃদ্বয় ভারতের সরকারকে মানবতার কল্যাণে এই সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানান।’

উল্লেখ্য, ভারতীয় গণমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া সূত্রে জানা যায়, জাতীয় ওপেন স্কুলিং সংস্থার (এনআইওএস) নতুন এই প্রস্তাবে এবার থেকে মাদরাসাতেও পড়ানো হবে বেদ, গীতা, রামায়ণ। প্রাথমিকভাবে ১০০ মাদরাসায় তৃতীয়, পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে পড়াতে এ বিষয়গুলো রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। পরবর্তীতে ৫০০ মাদরাসায় তা চালু করা হবে।

গত মঙ্গলবার (২ মার্চ) ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর রমেশ পোখরিয়াল দাবি করেন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ওপেন স্কুলিংয়ের নতুন এই প্রস্তাব মাদরাসা ও আন্তর্জাতিক পড়ুয়াদের ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বুঝতে সাহায্য করবে।

তবে দ্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ওপেন স্কুলিং (এনআইওএস)-এর সহকারী পরিচালক শোয়েব রাজা খান জানান, ‘পাঠ্যক্রমে অন্যান্য বিষয়গুলোর সঙ্গে বেদ, গীতা, রামায়ন সবার জন্য পড়ার সুযোগ থাকবে। শিক্ষার্থীরা নির্দ্বিধায় এ বিষয়গুলো বেছে নিতে পারবে। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়।

আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় মাদরাসা শিক্ষার্থীরা বেছে নিতে পারে এমন অনেক বিষয় থাকবে। তবে এটা তাদের পছন্দের বিষয়। মাদরাসার কোনো শিক্ষার্থীকে এ বিষয়গুলো নেয়ার ব্যাপারে জোর করা হবে না বলেও জানিয়েছেন শোয়েব রাজা খান।

এমএমএস/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]