মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় সুনাম হলেও নার্সিংয়ে বদনাম

মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল
মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১২:০৯ পিএম, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৭

চলতি বছর সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ ছিল বির্তকহীন। ফলে সর্বমহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। অন্যদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (বিপিএসসি) অধীনে অনুষ্ঠিত ছয় সহস্রাধিক নার্স নিয়োগের পরীক্ষা বাতিল করা হয়। কিন্তু অপকর্মের সঙ্গে জড়িতরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। প্রশ্ন ফাঁস এবং এর হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় বদনাম হয়েছে সরকারের।

‘বির্তকহীন’এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষা :

সুষ্ঠুভাবে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের জন্য ১ সেপ্টেম্বর থেকে মেডিকেল ভর্তি কোচিং সেন্টার বন্ধের নির্দেশনা জারি করে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদফতরের চিকিৎসা, শিক্ষা ও জনশক্তি উন্নয়ন শাখা থেকে র‌্যাব, সিআইডি, এসবি, ডিবিসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের আগাম চিঠি দিয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখার অনুরোধ জানানো হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে করণীয় নির্ধারণে ওভারসাইট কমিটিতে গত বছরের ন্যায় এবারও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা সম্পন্ন করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের শতাধিক সদস্যের সমন্বয়ে পরিদর্শক টিম করা ছাড়াও বিশিষ্ট নাগরিকদের সমন্বয়ে ওভারসাইট কমিটির সদস্যদের বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন কমিটিতে রাখা হয়।

পরীক্ষার আগের দিন বিভিন্ন কলেজের দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষ কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে প্রশ্নপত্র সিলগালা করে কেন্দ্রে পাঠানো হয়। যে গাড়িতে প্রশ্নপত্র পাঠানো হয় সে গাড়িতে বিশেষ ডিভাইস সংযুক্ত করে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হয়। বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের প্রধানরা পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর থেকেই অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীর সংখ্যার সঙ্গে উত্তরপত্র মিলিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশি প্রহরায় স্বাস্থ্য অধিদফতরে পাঠানো শুরু করেন।

পরীক্ষার আগের দিন প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ছড়ানোর অভিযোগে কয়েক যুবককে আটকও করে গোয়েন্দা পুলিশ। আগের বছরগুলোতে শুধু অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন (ওএমআর) মেশিনে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হলেও চলতি বছর ইন্টেলিজেন্ট ক্যারেক্টার রিকগনিশন (আইসিআর) মেশিনের সাহায্যে খাতা মূল্যায়ন ও পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালের নেতৃত্বে দুই দফায় পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন শেষে ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

প্রশ্নপত্র ফাঁসে নার্স নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল :

গত ৬ অক্টোবর পিএসসির অধীনে নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি অধিদফতরের মোট ৪ হাজার ৬০০ সিনিয়র স্টাফ নার্স (ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সাযেন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি ৩ হাজার ৬০০ ও মিডওয়াইফ ১ হাজার) নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানীর ১০টি কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ওই পরীক্ষায় মোট ১৬ হাজার ৯০০ জন নার্স অংশ নেন।

পরীক্ষার আগের রাতেই (৫ অক্টোবর) চার সেট প্রশ্নের (শিউলি, হাসনাহেনা, রজনীগন্ধা, কামিনী) সব কটি প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যায়। নার্স নেতারা বিভিন্ন নার্সিং হোস্টেলে গিয়ে সর্বনিম্ন ২০ হাজার থেকে ৫০-৬০ হাজার টাকায় এসব প্রশ্নপত্র বিক্রি করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পিএসসির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক প্রথমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ‘অনিবার্যকারণবশত পরীক্ষা বাতিল করা হলো’ বলে নির্দেশনা জারি করে পিএসসি।

গত ১৬ নভেম্বর গোয়েন্দা পুলিশ নার্স নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের হোতা সাইফুল ইসলাম ও আরিফুল ইসলাম নামে দুই নার্স নেতাকে গ্রেফতার করে। সাইফুল ইসলাম বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন (বিএনএ) ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) শাখার নির্বাচিত ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও আরিফুল ইসলাম স্বাধীনতা নার্সেস পরিষদের (স্বানাপ আনিস গ্রুপ) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

রিমান্ড জিজ্ঞাসাবাদে এ দু’জন আরও কয়েকজন শীর্ষ নার্স নেতার নাম প্রকাশ করেন। তাদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা হয়। মামলার এজাহারভুক্ত নার্স নেতারা কেউ আগাম জামিনে আবার কেউবা জামিন না নিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সরকারি দলের বলে কেউ তাদের গ্রেফতার করতে পারবেন না- এমন দম্ভোক্তিও করছেন কেউ কেউ। বাতিলকৃত পরীক্ষার দিনক্ষণ এখনও ঘোষণা করেনি পিএসসি।

তাই সংশ্লিষ্ট সবাই বলছে, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় সুনাম কুড়ালেও নার্সিং পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁসে বদনাম হয়েছে সরকারের।

এমইউ/এমএমজেড/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :