পাকিস্তানের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, ভারতের জয়জয়কার

ক্রীড়া প্রতিবেদক ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৩৭ পিএম, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৭

দেখতে দেখতে শেষ হয়ে এলো আরেকটি বছর। পুরোণো দিনপঞ্জিকা বদলে নতুন পঞ্জিকা দেয়ালে টানানোর সময় হয়ে এলো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কেমন গেল ২০১৭ সালটা? আসুন দেখে নেই এক ঝলকে-

পাকিস্তানে ক্রিকেট ফেরা
‘পরের জায়গা, পরের জমি, ঘর বানিয়ে আমি রই’- টেস্ট খেলুড়ে দেশ হয়েও পাকিস্তানের দশাটা হয়েছে এমন। বড় কোনো দল খেলতে যাচ্ছে না। যাযাবরের মতো আরব আমিরাতকে নিজের ঘর বানিয়ে ঠেকায় কাজ চালিয়ে নিতে হচ্ছে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। এভাবে আর কতদিন? ঘরের দর্শকরা কি বিশ্ব ক্রিকেটের বড় তারাদের সামনে থেকে দেখতে পাবে না?

পুরোটা না হলেও এবার সেই আক্ষেপের ক্ষতে কিছুটা প্রলেপ দিতে পেরেছে পাকিস্তান। ২০০৯ সালে যে শ্রীলঙ্কা দলের উপর হামলায় ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত দেশটি, সেই শ্রীলঙ্কাকেই এ বছর নিজের দেশে টি-টোয়েন্টি সিরিজের একটি ম্যাচ খেলাতে পেরেছে তারা।
এখানেই শেষ নয়। ড্যারেন স্যামি, তামিম ইকবালদের মতো বিশ্ব ক্রিকেটের বড় তারকাদের নিজেদের দেশে নিতে আরেকটি বুদ্ধি এঁটেছিল পাকিস্তান। তাতেও শতভাগ সফল দেশটি। বিশ্ব একাদশের ব্যানারে পাকিস্তান থেকে খেলে এসেছেন বড় বড় তারকারা। এরপর দলগুলো নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে একটু তো ভাববেই!

jagonews24

নেতৃত্বের হাতবদল
ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। প্রায় প্রতি বছরই চিরন্তন সেই বাণীটির সত্যতা টের পান কেউ না কেউ। ২০১৭ সালেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। নেতৃত্বের পালাবদলে কেউ হয়েছেন তুষ্ট, কেউবা রুষ্ট।

জানুয়ারিতে আজহার আলিকে দিয়ে শুরু। দলের ক্রমাগত ব্যর্থতায় ওয়ানডের নেতৃত্ব হারান পাকিস্তানি অধিনায়ক। তার জায়গায় আসেন সরফরাজ আহমেদ। পরে জুলাইয়ের দিকে মিসবাহ-উল-হক অবসরে গেলে তিন ফরমেটের নেতৃত্বই পেয়ে যান এই উইকেটরক্ষক এই ব্যাটসম্যান। এদিকে, বছরের শুরুতেই ওয়ানডের নেতৃত্ব ছাড়েন ভারতের মহেন্দ্র সিং ধোনিও। তার জায়গায় তিন ফরমেটে অধিনায়ক হন বিরাট কোহলি।

অ্যালিস্টার কুক টেস্ট নেতৃত্ব ছেড়ে দেবার পর ফেব্রুয়ারিতে বড় ফরমেটে ইংল্যান্ডের অধিনায়কত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয় জো রুটকে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ব্যর্থতার পর দেশের মাটিতে জিম্বাবুয়ের কাছে ওয়ানডে সিরিজ হারে বাধ্য হয়েই নেতৃত্বের মায়া ছাড়তে হয় শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউজকে। আগস্টে দক্ষিণ আফ্রিকা ওয়ানডে দলের দায়িত্ব ছাড়েন এবি ডি ভিলিয়ার্স। ফাফ ডু প্লেসি হন প্রোটিয়াদের তিন ফরমেটের নেতা। বাংলাদেশেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। মার্চ-এপ্রিলে শ্রীলঙ্কায় টি-টোয়েন্টি সিরিজের পর ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম ভার্সন থেকে সরে দাঁড়ান মাশরাফি বিন মর্তুজা। ফলে নেতৃত্বও ছাড়েন তিনি। নতুন অধিনায়ক হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয় সাকিব আল হাসানের। বছরের শেষ দিকে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের ব্যর্থতার কারণে মুশফিকুর রহীমকে পরিবর্তন করে সাকিবের কাঁধেই তুলে দেয়া হয় টেস্ট নেতৃত্ব। সাকিব এখন দুই ফরম্যাটের অধিনায়ক।

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি পাকিস্তানের
ভারতের কাছে হারে শুরু। বড় টুর্নামেন্টে ভারত ভীতিটা আরও একবার জেঁকে ধরেছিল পাকিস্তানকে। শেষ পর্যন্ত ফাইনালে আবারও ভারতের মুখে পড়ায় চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিটা আগেভাগেই কোহলিদের হাতে দিয়ে দিয়েছিলেন অনেকে।

তারা বোধ হয় ভুলে গিয়েছিলেন ’আনপ্রেডিক্টেবল’ তকমাটা এমনি এমনি জুড়ে যায়নি পাকিস্তানের গায়ে! যারা ভারতের সাথে বড় টুর্নামেন্টে পারে না, এবারও প্রথম ম্যাচেই বিধ্বস্ত; তারাই ফাইনালের মঞ্চে উড়িয়ে দিলো দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। ভারতকে ১৮০ রানে হারের লজ্জা দিয়েই অপ্রত্যাশিতভাবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফিটা হাতে তুলে নেয় সরফরাজ আহমেদের দল।

jagonews24

ভারতের জয়জয়কার
চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিটা হাতের দূরত্ব থেকে ফস্কে গেছে; কিন্তু বছরজুড়ে দুই চোখে কেবল সাফল্য আর সাফল্যই দেখেছে ভারত। কি টেস্ট সিরিজ, কি ওয়ানডে: ব্যর্থতা নামের দৈত্যটাকে এ বছর যেন বোতলবন্দী করে রেখেছিল বিরাট কোহলির দল। এ বছর একটি টেস্ট সিরিজেও হারের স্বাদ পায়নি, কোহলির দল হারেনি ওয়ানডে সিরিজও। টি-টোয়েন্টিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একটি সিরিজ বাদ দিন না! ওই সিরিজে ভারত হারলেও সেটি ছিল কেবল এক ম্যাচের সিরিজ।

এ বছরই প্রথমবারের মত শ্রীলঙ্কাকে তাদেরই মাটিতে টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশের লজ্জা দিয়েছে ভারত। ঘরের মাঠে তারা একে একে নাকানি চুবানি খাইয়েছে নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ আর শ্রীলঙ্কাকে। সব মিলিয়ে টানা নয়টি টেস্ট সিরিজ জয়ের রেকর্ড বিরাট কোহলির দলের।

শুধু কি টেস্ট? ওয়ানডেতেও সাফল্যে কোনো দিক দিয়ে পিছিয়ে ছিল না কোহলির ভারত। এ বছর সাতটি দ্বিপক্ষীয় সিরিজের সব কটিতেই জিতেছে তারা। ম্যাচের হিসেবে ২১ জয়ের বিপরীতে হার মাত্র ৭টিতে।

রোহিতের ডাবলের ট্রেবল
ওয়ানডেতে ডাবল সেঞ্চুরি? একটা সময় তো এটা ছিল কল্পনারও অতীত। সেই কল্পনা বাস্তব তো হলোই, ডাবল সেঞ্চুরিকে একেবারে ডালভাত বানিয়ে ফেললেন রোহিত শর্মা। একটি-দুটি নয়, ওয়ানডেতে এখন তিন তিনটি ডাবল সেঞ্চুরির মালিক তিনি। যেখানে বিশ্বের আর কোনো ব্যাটসম্যানের নেই দুটিও।

২০১৩ সালে ব্যাঙ্গালুরুতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০৯ রানের মহাকাব্য দিয়ে শুরু। পরের ডাবলটাই ২৬৪ রানের। ২০১৪ সালে কলকাতায় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলা এই ইনিংসটা এখন পর্যন্ত ওয়ানডেতে কোনো ব্যাটসম্যানের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ। সর্বশেষ এ বছর ১৩ ডিসেম্বর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই আরেকটি ডাবল সেঞ্চুরি রোহিতের, হার না মানা ২০৮ রানের ইনিংসে হয়ে গেল ’ডাবলের ট্রেবল’।

আইপিএল চ্যাম্পিয়ন মুম্বাই
আইপিএলের এবারের আসরে চ্যাম্পিয়নের নাম মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স। হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত ফাইনালটা ছিল একেবারে ফাইনালের মতোই। রাইজিং পুনে সুপারজায়ান্টের বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই শেষে মাত্র ১ রানের জয় মুম্বাইয়ের। তাতেই আইপিএলের প্রথম দল হিসেবে তিন শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব তাদের।

আফগানিস্তানের সাফল্য
এখনকার ক্রিকেটে ’জায়ান্ট কিলার’ মনে করা হয় আফগানিস্তানকে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি যেন ক্রিকেট প্রতিভার খনি। ক্রিকেটের সেই প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে এ বছর তারা জিম্বাবুয়েকে তাদেরই মাটিতে ওয়ানডে সিরিজে হারের স্বাদ দিয়েছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে করেছে সিরিজ ড্র। আর টেস্ট আঙিনার বাইরের দল আয়ারল্যান্ডকে ভারতের মাঠে ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি দুই সিরিজেই নাকাল করে ছেড়েছে তারা। সবচেয়ে বড় কথা, আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে টেস্ট আঙ্গিনার নতুন সদস্যও হয়েছে তারা।

jagonews24

আইসিসিতে বড় সিদ্ধান্ত
এ বছরই টেস্ট ক্রিকেটকে দুই স্তরে ভাগ করার প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে আইসিসির সভায়। নতুন নিয়মে র‌্যাঙ্কিংয়ের সেরা ৯ দলকে প্রথম স্তরে ও দশম দলসহ আর দুটি সহযোগী সদস্যকে শর্ত সাপেক্ষে টেস্ট খেলার সুযোগ দিয়ে দুটো স্তর ভাগ করা হয়েছে। এছাড়া ১৩ দল নিয়ে করা হয়েছে একটি ওয়ানডে লিগ। এই ১৩ দলের লিগে টেস্ট খেলুড়ে বর্তমান ১০ দলের সঙ্গে থাকছে আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ড। আর আইসিসির সহযোগী সদস্য দেশগুলোকে নিয়ে প্রতিযোগিতা ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগের চ্যাম্পিয়ন দলও ১৩ নম্বর দল হিসেবে এই লিগে থাকছে।

নিষেধাজ্ঞা
পাকিস্তান সুপার লিগে (পিএসএল) ফিক্সিংয়ে জড়িত থাকা কিংবা যথা সময়ে রিপোর্ট করতে ব্যর্থ হওয়ায় এ বছর নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন মোহাম্মদ ইরফান, শারজিল খান, খালিদ লতিফ, নাসির জামশেদরা। মাদক নিয়ে নিষিদ্ধ হন ওয়েস্ট ইন্ডিজের অলরাউন্ডার আন্দ্রে রাসেল। ওজন কমাতে গিয়ে অদ্ভূত এক ভুল করে বসেন মোহাম্মদ শাহজাদ। আফগানিস্তানের এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান নিষিদ্ধ সাপ্লিমেন্ট নিয়ে পড়েন এক বছরের নিষেধাজ্ঞায়।

তবে বছরের সবচেয়ে আলোচিত নিষেধাজ্ঞা ছিল বেন স্টোকসের। নাইট ক্লাবের বাইরে মাথা গরম করে দুই চারজনকে ঘুষি মেরে একেবারে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন ইংলিশ অলরাউন্ডার। ফল যা হবার তাই হয়েছে, অ্যাশেজের মত গুরুত্বপূর্ণ সিরিজের একটি ম্যাচও খেলার সুযোগ হয়নি তার। নিষেধাজ্ঞার বোঝাটা মাথায় এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা এই অলরাউন্ডার। নতুন বছরটা তার জন্য সুখবর নিয়ে এলেই হয়!

এমএমআর/আইএইচএস/আরআইপি