দ্বন্দ্ব আর ব্যর্থতার বছর ডিএসইর

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৩১ এএম, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭

দীর্ঘ মন্দার পর দেশের শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখিতা ফিরে আসলেও ২০১৭ সাল খুব একটা ভালো কাটেনি দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) জন্য। বছরটিতে একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। শীর্ষ কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সুবিধা নেয়া এবং বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা বিতর্ক। একজন কর্মকর্তা অনিয়মের প্রতিবাদ করে চাকরি ছেড়েছেন। আর এক কর্মকর্তা প্রকাশ্যে তর্ক-বিতর্কে জড়িয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তার সঙ্গে। সেই সঙ্গে ডিএসই ব্যর্থ হয়েছে কৌশলগত বিনিয়োগকারী আনতে।

২০১৭ সালে ডিএসইর কর্মকর্তাদের মধ্যকার অসন্তোষ প্রথম প্রকাশ্যে আসে সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মোহাম্মদ ওবায়দুর হাসানের পদত্যাগের মাধ্যমে। আইন ভেঙে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়ার প্রতিবাদে চাকরি ছাড়েন ওই কর্মকর্তা। এরপর বেরিয়ে আসে ডিএসইর বেতন বৈষম্য নিয়ে বিভিন্ন তথ্য। বছরটিতে কারও বেতন এক লাফে বেড়েছে ৮০ শতাংশের ওপরে। আবার কেউ কেউ আট বছরেও পদোন্নতি পাননি। কেউ আবার নিজের চুক্তিভিত্তিক চাকরিকে স্থায়ী করে নিয়েছেন।

কৌশলগত বিনিয়োগকারী আনতে ব্যর্থ ডিএসই :
২০১৩ সালের স্টক এক্সচেঞ্জ ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইনে ২০১৬ সালের মধ্যে কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কাছে স্টক এক্সচেঞ্জের সংরক্ষিত ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রির বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই করার বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে নির্ধারিতে সময়ে কৌশলগত বিনিয়োগকারী না পাওয়ায় দ্বিতীয় দফায় ৬ মাস সময় বাড়িয়ে ২০১৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দেয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ দফাতেও কৌশলগত বিনিয়োগকারী চূড়ান্ত করতে ব্যর্থ হয় ডিএসই। এ পরিস্থিতিতে তৃতীয় দফায় আরও ৬ মাস সময় দেয়া হয়। তবে এ দফাতেও প্রতিষ্ঠানটি কৌশলগত বিনিয়োগকারী পায়নি। ফলে কৌশলগত বিনিয়োগকারীর বিষয়ে ব্যর্থতার মাধ্যমেই ২০১৭ সাল শেষ করেছে ডিএসই।

রেকর্ড বিদেশ ভ্রমণ :
কৌশলগত বিনিয়োগকারী খুঁজে না পেলেও ২০১৭ সালে ডিএসই বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ খরচ করেছে। বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে শীর্ষ ছিলেন ক্ষোদ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কে এ এম মাজেদুর রহমান। এ কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণে ডিএসইর খরচ হয়েছে ৩০ লাখ টাকার ওপরে। এমডি হিসেবে যোগদানের পর তিনি ডিএসই’র টাকায় শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড, চীন ও তুরস্ক ভ্রমণ করেছেন।

এমডির পাশাপাশি ডিএসইর পরিচালক, কর্মকর্তা, এমনকি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কর্মকর্তদের পিছনেও মোটা অংকের টাকা খরচ হয়েছে। যে কারণে ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশনের পর প্রথমবারের মতো বিদেশ ভ্রমণ খাতে ডিএসইর কোটি টাকার ওপরে খরচ হয়।

ডিএসইর টাকায় বিদেশ ভ্রমণ করেছেন- ডিএসইর সাবেক চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান, সাবেক পরিচালক ব্রি. জেনারেল মো. মুজিবুর রহমান, শেয়ারহোল্ডার পরিচালক শাকিল রিজভী, রকিবুর রহমান ও মোহাম্মদ শাহজাহান, বিএসইসির কমিশনার হেলাল উদ্দীন নিজামী, বিএসইসির ডিডি (ডেপুটি ডিরেক্টর) হাসান মাহমুদ, মোহাম্মদ সাইফুল আজম ও শেখ মো. লুতফুল কবির।

বেতন বৈষম্য :
নিয়ম অনুযায়ী ডিএসইর স্থায়ী কর্মকর্তাদের একবারে মোট বেতন বাড়বে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ। কিন্তু ২০১৭ সালে দু’জন কর্মকর্তার বেতন ৮০ শতাংশের ওপর বাড়নো হয়েছে। ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এ এম মাজেদুর রহমান এবং প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) আব্দুল মতিন পাটোয়ারীর আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত দুই কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুর রহমান এবং মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিয়ার বেতন একবারে ৮০ শতাংশের ওপরে বাড়ানো হয়।

মোহাম্মদ আসাদুর রহমানের মাসিক বেতন গত এপ্রিলে ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার টাকা, যা জুন মাসে বেড়ে হয় ২ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। এ বেতন বৃদ্ধির হার ৮২ শতাংশ। অপর কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের বেতন এপ্রিলে ছিল ৭১ হাজার টাকা, জুলাইতে এই বেতন ৮৫ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয় ১ লাখ ৩১ হাজার ২৫০ টাকা।

চুক্তি ভিত্তিক চাকরি স্থায়ী :
চুক্তি ভিত্তিক চাকরিতে যোগদান করে সিএফও আব্দুল মতিন পাটোয়ারী এবং প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) জিয়াউল করিম নিজেদের পদকে স্থায়ী করে নিয়েছেন। একই সঙ্গে এ দুই কর্মকর্তা এমডির পাশাপাশি নিজেদের বেতনও বাড়িয়ে নিয়েছেন। এমডি মাজেদুর রহমান নিজের বেতন ৫ লাখ টাকা থেকে ২০ শতাংশ বাড়িয়ে ৬ লাখ করে নিয়েছেন। সিএফও আব্দুল মতিন পাটোয়ারী এবং সিটিও জিয়াউল করিমের বেতন ২১ শতাংশ বেড়ে ৪ লাখ থেকে হয়েছে ৪ লাখ ৮৩ হাজার টাকা।

চুক্তি ভিত্তিক হওয়ায় সিএফও এবং সিটিও পদ দু’টিতে উচ্চ বেতনে প্রবেশ করেন আব্দুল মতিন পাটোয়ারী এবং জিয়াউল করিম। কিন্তু নিজেদের পদ স্থায়ী করে নিলেও তাদের বেতন কাঠানো নতুন করে নির্ধারণ করা হয়নি। বরং নতুন করে তারা গ্রাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, আর্ন লিভ, ওয়ার্কার প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড সুবিধা পাচ্ছেন। এতে এই দুই কর্মকর্তা গড়ে প্রতিমাসে যে বেতন পাচ্ছেন, তা এমডির থেকেও বেশি। সব সুবিধা বিবেচনায় নিলে এই দুই কর্মকর্তার মাসিক গড় বেতন-ভাতা ৬ লাখ ১১ হাজার টাকার ওপরে।

কর্মকর্তাদের ক্ষোভ :
চুক্তি ভিত্তিক চাকরি স্থায়ী করে নেয়ার পাশাপাশি শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেতন বাড়ানো নিয়ে ডিএসইর কর্মকর্তাদের মধ্যে ২০১৭ সালের শেষ দিকে এসে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়। গোপনে বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা বিষয়টির সমলোচনা করলেও প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলছিল না। এক পর্যায়ে গত নভেম্বরে সিএফও’র সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন ফৌজিয়া সিদ্দিক নামের এক কর্মকর্তা। একটানা ২৬ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের ধরে চলা সেই তর্কের একটি অডিও কিছুদিনের মধ্যেই ইউটিউব ছড়িয়ে পড়ে।

ছড়িয়ে পড়া রেকর্ড থেকে জানা গেছে, ওই ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা সিএফও আব্দুল মতিন পাটোয়ারীকে উদ্দেশ্য করে বলেন- পৃথিবীর কোথাও নেই সি লেভেলের কর্মকর্তা স্থায়ী চাকরি করেন, কিন্তু আপনি করেন। এটি এক ধরনের অনিয়ম। এর আগেও আপনার কাছে জানতে চেয়েছিলাম কিন্তু আপনি বলতে পারেননি। আপনার কেপিআই (কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর) কি? আপনার কেপিআই কর্মচারিদের বেতন কমানো। খরচ কমানোর মানে কর্মচারিদের বেতন কমানো নয়। তাদের সুযোগ কমানো নয়। আপনি আয় বাড়াবেন। সে জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।

ওই কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, এখানে কাজের মূল্যায়ন করা হয় না। এখানে বেতন অর্ধেক করে দিবেন আর আমরা কাজ করব। আপনি একজন স্থায়ী চাকরিজীবী। আপনি সর্বোচ্চ বেতনভোগী। আপনার বেতন কত? আপনার বেতন দেড় থেকে দুই লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। অথচ আপনি অনেক বেশি নিচ্ছেন। আপনি কন্ট্রিবিউট করা ছাড়াই টাকা পাচ্ছেন। তাহলে আমরা কাজ করব কেন? আপনি আমাদের মতো পিএফ, ইন্সুরেন্স সুবিধা নিচ্ছেন। আপনি স্যালারি বেশি নিচ্ছেন। আপনার কন্টিবিউশন কি? কেউ কি বলতে পারবেন সিএফও স্যার আসার পর স্টক এক্সচেঞ্জে এই জিনিসটা চেঞ্জ হয়েছে?

প্রতিবাদে এজিএমের পদত্যাগ :
আইন ভেঙে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়ার প্রতিবাদে ২০১৭ সালে চাকরি ছেড়েছেন ডিএসইর হিসাব বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মোহাম্মদ ওবায়দুল হাসান। তিনি বিএসইসিতে লিখিত অভিযোগ করেছেন, ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পর্ষদ ‘ডিএসই বোর্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রেজুলেশন ২০১৩’ এবং ডিএসই সার্ভিস রুলস’র ৯.১.১ ও ৯.১.২ ধরা লঙ্ঘন করেছে।

ওবায়দুল হাসান অভিযোগ করেন, ডিএসই সার্ভিস রুলসের ৯.১.১ ও ৯.১.২ ধরা অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হবে বার্ষিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ভিত্তিতে। যা বিভাগীয় প্রধানের সুপারিশের ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনুমোদন করবেন। কিন্তু সম্প্রতি ব্যবস্থাপনা পর্ষদের কিছু সদস্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পরিচালকে ‘ভোট’ নিতে বাধ্য করেন। ব্যবস্থাপনা পর্ষদের কিছু সদস্যের এমন অবৈধ প্ররোচনায় প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে ‘ভোট’ পদ্ধতি সমর্থনযোগ্য ও প্রতিপালনযোগ্য নয়।

বিএসইসিকে তিনি জানান, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ‘বোর্ড অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রেজুলেশন ২০১৩’ এর ১০(৫) ধরা অনুযায়ী, স্বাধীন, সঠিক, স্বচ্ছ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্টক এক্সচেঞ্জ পরিচালনা করা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব। সুতরাং এই ধরা অনুযায়ী কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে ‘ভোট’ সঠিক ও স্বচ্ছ পদ্ধতি নয়। তালিকাভুক্ত কোম্পানির নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এমন অনৈতক কার্যকালাপের উদাহরণ ডিমিউচ্যুলাইজেশন পরবর্তী ডিএসইর সুনাম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

এমএএস/এমএমজেড/এমএস