ফুটবলে মেয়েদের উত্থান ছেলেদের পতন

রফিকুল ইসলাম
রফিকুল ইসলাম রফিকুল ইসলাম , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১০:৩০ এএম, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭

কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে আরেকটি বছর। একদিন পর দেয়ালের পুরনো ক্যালেন্ডারটি সরিয়ে জায়গা করে নেবে নতুন একটি। ২০১৮ সালকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে গোটা বিশ্ব। স্মৃতির খেরোখাতা থেকে ইতোমধ্যেই মানুষ মেলাতে শুরু করছে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব। সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো ক্রীড়াঙ্গনে চলছে সফলতা ও ব্যর্থতার চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিদায়ী বছরে দেশে ও দেশের বাইরে ক্রীড়াঙ্গনের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো নিয়ে ধারাবাহিক পর্যালোচনার চতুর্থ পর্বে থাকছে ফুটবল।

দেশের ফুটবলকে আরেকটি হতাশার খবর দিয়েই বিদায় নিচ্ছে ২০১৭ সাল। একদিন আগে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) নতুন বছরে ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য এশিয়ান গেমসে পুরুষ ফুটবল দল না পাঠানোর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পুরুষ ফুটবলের হতাশার খবরের দিনে সুখবর নারী ফুটবলে। প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমস ফুটবলে অংশ নেবে লাল-সবুজ জার্সিধারী মেয়েরা।

jagonews24

শেষ দিনের এ দুটি খবর আসলে পুরো বছরেরই প্রতিচ্ছবি। বিদায় বছরটিতে বাংলাদেশের ফুটবল নেমেছে নিচের দিকে। তবে মেয়েরা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। জাতীয় দল এক বছর নির্বাসনে কাটালেও কিছু সাফল্য আছে বয়সভিত্তিক ফুটবলে। ফুটবলে বাংলাদেশের পতাকাটা উঁচিয়ে রেখেছে আসলে ছেলে ও মেয়েদের বয়সভিত্তিক দলগুলোই। খেলা থেকে নির্বাসিত থাকায় ফিফা র্যাংকিংয়েও ক্রমপতন বাংলাদেশের। ২০০ ছুঁইছুঁই করে বাংলাদেশ এখন ১৯৭ নম্বরে। উন্নতি হয়েছে মেয়েদের ফুটবলে। ফিফার সর্বশেষ ঘোষিত র্যাংকিংয়ে নারী ফুটবলে বাংলাদেশ এগিয়ে অবস্থান করছে ১০০ নম্বরে।

নারী ফুটবল প্রসঙ্গ উঠলেই ভেসে আসে একঝাঁক কিশোরীর মুখ। বছরের শুরুতে ভারতের শিলিগুড়িতে মেয়েদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমবারের মতো ফাইনাল খেলেছে বাংলাদেশ। ভারতের কাছে হেরে রানার্সআপ হলেও মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন বাংলাদেশের মেয়েরা। বছরের বাকি মাসগুলোতে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে খেলা হয়নি মেয়েদের। তবে দুটি বয়স ভিত্তিক দল দুর্দান্ত নৈপূণ্য দেখিয়ে নারী ফুটবলে বাংলাদেশকে তুলেছে নতুন উচ্চতায়।

আগের বছর সেপ্টেম্বরে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইয়ের ঢাকা পর্বে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলাদেশ চূড়ান্ত পর্বে নাম লিখিয়েছিল। এ বছর সেপ্টেম্বরে সেই খেলা হয়েছে থাইল্যান্ডে। এশিয়ার সেরা ৮ দলের ওই লড়াইয়ে বাংলাদেশের গ্রুপে ছিল উত্তর কোরিয়া, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। এশিয়ার পরাশক্তি এ দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষে পেরে ওঠা সম্ভব না সেটাই স্বাভাবিক।

মাঠে বাংলাদেশের মেয়েদের যাতে বড় বিপর্যয় না হয় সেজন্য বাফুফে বছরব্যাপী অনুশীলন করিয়েই তাদের পাঠিয়েছিল থাইল্যান্ডে। তার ফলও এসেছে- চূড়ান্ত পর্বে সুন্দর ফুটবল খেলেছে বাংলাদেশ। কোনো ম্যাচ না জিতলেও মাঠের নৈপূণ্য দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন কৃষ্ণা-মনিকারা। বিশেষকরে জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের মেয়েরা খেলেছে লড়াকু ফুটবল।

jagonews24

শুরুটা যদিও ভালো হয়নি। উত্তর কোরিয়ার কাছে হেরেছিল ৯-০ গোলে। শেষ দুই ম্যাচে লাল-সবুজ জার্সিধারী মেয়েরা দেখিয়েছেন নারী ফুটবলে কতটা এগিয়েছে বাংলাদেশ। জাপান ৩-০ গোলে হারিয়েছে বাংলাদেশকে। অথচ কয়েক বছর আগে জাপানের সঙ্গে খেলতে নামলে ডজন ডজন গোল খেতো বাংলাদেশের মেয়েরা। শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে তো হারানোর সম্ভাবনাই তৈরি করেছিল সাবিনারা। পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশ এক পর্যায়ে এগিয়েও গিয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। অধিনায়ক কৃষ্ণা লাল কার্ড পাওয়ায় ম্যাচটি ধরে রাখতে পারেনি মেয়েরা।

মেয়েরাই বিজয়ের মাসে দেশবাসীকে আরেকটি বিজয় উপহার দিয়েছেন সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতে। সাফের এটি ছিল প্রথম টুর্নামেন্টে। ঢাকায় বাংলাদেশের মেয়েরা অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ফাইনালে ভারতকে ১-০ গোলে হারিয়ে। লিগ পর্বে বাংলাদেশ ৬-০ গোলে নেপালকে এবং ৩-০ গোলে ভুটান ও ভারতকে হারিয়েছিল। একই টুর্নামেন্টে ভারতকে ২ বার হারানোর কৃতিত্ব মেয়েদের আরো আছে।

২০১৭ সালে বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য আরেকটি ভালো খবর ছিল বাফুফের সদস্য এবং মহিলা উইংয়ের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণের ফিফার নির্বাহী কমিটির সদস্য হওয়া। বাংলাদেশের প্রথম কোনো সংগঠক হিসেবে তিনি ফিফার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ৮মে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি এশিয়ার ফুটবলের পরাশক্তি, বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রায় নিয়মিত খেলা অস্ট্রেলিয়ার প্রার্থী ময়াডোড্কে ২৭-১৭ ভোটে হারিয়ে হয়েছেন ফিফার মেম্বারর্স অ্যাসোসিয়েশন কমিটির সদস্য। ফিফা কাউন্সিলে যে ৬টি কনফেডারেশনের মহিলা প্রতিনিধি আছেন তাদের ৫জনই মনোনীত। একমাত্র মাহফুজা আক্তার কিরণ সেখানে নির্বাচিত সদস্য।

ছেলেদের ফুটবলেও বয়সভিত্তিক পর্যায়ে ভালো-মন্দের মিশেলে বছর পার করেছে বাংলাদেশ। জুলাইয়ে অনূর্ধ্ব-২৩ দল ফিলিস্তিনে খেলেছে এএফসির টুর্নামেন্ট। এ টুর্নামেন্টে অবশ্য বাংলাদেশ জয়ের মুখ দেখেনি। তিন ম্যাচের তিনটিই হেরেছে। জর্ডানের কাছে ৭-০, তাজিকিস্তানের কাছে ৩-১ এবং ফিলিস্তিনের কাছে ৩-০ গোলে হারে লাল-সবুজ জার্সিধারী ছেলেরা।

jagonews24

অনূর্ধ্ব-১৮ দল সেপ্টেম্বরে ভুটানে খেলেছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। এ টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ রানার্সআপ হয়েছে। তার চেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল প্রথম ম্যাচে ভারতের বিরুদ্ধে ৩-০ গোলে পিছিয়ে গিয়েও ৪-৩ ব্যবধানের জয় পাওয়াটি। মালদ্বীপকে ২-০ গোলে ও ভুটানকে ৩-০ গোলে হারায় বাংলাদেশ। নেপালের কাছে হারে ২-১ গোলে।

এ দলটিই পরের মাসে তাজিকিস্তানে খেলে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপ। ৫ দলের গ্রুপে বাংলাদেশ হয় তৃতীয়। তাজিকিস্তানের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে বাংলাদেশ। মালদ্বীপকে ১-০ ও শ্রীলংকাকে ৪-০ গোলে হারায় লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। উজবেকিস্তানের কাছে হারে ১-০ গোলে।

অনূর্ধ্ব-১৫ ও ১৬ দলও ভালো বছর কাটিয়েছে। আগস্টে নেপালে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ হয় তৃতীয়। শ্রীলংকাকে ৪-০, ভুটানকে ৩-০ গোলে হারালেও নেপালের কাছে হারে ৪-২ গোলে। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে বাংলাদেশের কিশোররা ৮-০ গোলে উড়িয়ে দেয় ভুটানকে।

সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ কাতারে খেলে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাই পর্ব। ইয়েমেনের কাছে ২-০ গোলে হারলেও স্বাগতিক কাতারকে ২-০ গোলে হারিয়ে তাক লাগিয়ে দেয় বাংলাদেশের কিশোররা।

আরআই/আইএইচএস/আরআইপি